পোস্ট বার দেখা হয়েছে
নবগ্রামের চৌধুরী পরিবারের সুনাম চারদিকে। বিশাল জমিজমা, অঢেল সম্পত্তি আর তিন পুরুষের বংশপরম্পরায় একটাই ঐতিহ্য—পরিবারে প্রতি প্রজন্মে সন্তান কেবল একটিই। তিতলীও তাই পরিবারের নয়নের মণি। এক বছরের ছোট একটি ভাই হয়েছিল ঠিকই, কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে সে অকালেই না-ফেরার দেশে চলে যায়। তারপর থেকে তিতলীকে ঘিরে সবার দুশ্চিন্তা আর আদরের সীমা নেই।
ক্লাস নাইনে পড়া তিতলী যেমন রূপসী, তেমনই তার মনটা মায়ায় ভরা। বাড়িতে নাচ আর গানের আলাদা শিক্ষক আসেন। কিন্তু এত ঐশ্বর্যের মধ্যেও তিতলীর মনটা মুক্ত পাখির মতো উড়তে চায়। স্কুলে যাওয়া-আসার পথে তার সাথে সবসময় থাকে বাড়ির বিশ্বস্ত কাজের লোক। তিতলী কতবার মাকে বলেছে, "মা, আমি বন্ধুদের সাথে একা যাব, আমাকে এভাবে পাহারা দিও না।" কিন্তু মা বা পরিবারের কেউ তা মানেনি। বন্ধুদের কাছে এ নিয়ে তিতলীকে কম হাসাহাসিও সইতে হতো না।
নবগ্রামে বছরে দু’বার যাত্রাপালার আয়োজন হয়। গ্রামের সবচেয়ে প্রভাবশালী পরিবার হওয়ায় চৌধুরী বাড়ির বাইরের মহলেই প্রতিবার যাত্রা দলের থাকা-খাওয়ার বন্দোবস্ত করা হয়।
সেবার দুর্গোৎসবে আয়োজন করা হয়েছিল ‘রাধা-কৃষ্ণ’ পালা। যাত্রা দলের কৃষ্ণ যে সাজবে, সে এক বিশ-একুশ বছরের তরুণ। কুঁচকানো কালো চুল, ছিপছিপে লম্বা গড়ন আর মায়াবী চোখ। তিতলী খেয়াল করল, ছেলেটি ভীষণ লাজুক। বাইরের মহলে যখন খাবার দেওয়া হয়, ছেলেটি সবার অলক্ষ্যে চুপচাপ মুখ নিচু করে বসে থাকে। কিন্তু সন্ধ্যায় যখন সেমঞ্চে কৃষ্ণের বেশে নামল, তিতলী যেন চোখ ফেরাতে পারল না! মঞ্চে তার কি অসাধারণ অভিনয়, কি তেজস্বী কণ্ঠ!
কোনো এক ফাঁকে ভাগ্যই হয়তো সুযোগ করে দিল। বাড়ির পেছনের আঙিনায় কৃষ্ণের সাথে তিতলীর সামনাসামনি দেখা। লাজুক ছেলেটি তিতলীর সাথে কথা বলতে গিয়ে তোতলাচ্ছিল, কিন্তু তিতলীর মিষ্টি ব্যবহারে সেই বরফ গলল। দু'জনের মধ্যে পরিচয় হলো, আর কথাশেষে চুপিসারে আদান-প্রদান হয়ে গেল ফোন নম্বর।
যাত্রা দল চলে গেল, কিন্তু থেকে গেল সেই মায়াবী সুর। লুকিয়ে লুকিয়ে ফোনে চলল দু'জনের কথা। সময় গড়ায়। পরের বছর দুর্গাপূজা আসার আগেই তিতলী তার দাদুর কাছে গিয়ে বায়না ধরল—"দাদু, এবারও কিন্তু ওই দলটাকেই ডাকতে হবে!" নাতনির আবদার কি দাদু ফেলতে পারেন? দাদু হাসিমুখে কথা দিলেন।
আবার এলো যাত্রা দল, আবার শুরু হলো চুপিচুপি দেখা আর ফোনে দীর্ঘ কথোপকথন। কিন্তু বাঁধ সাধল ভাগ্য। একদিন তিতলীর মা তাদের লুকিয়ে কথা বলা দেখে ফেললেন। চৌধুরী বাড়ির একমাত্র মেয়ের সাথে এক সাধারণ যাত্রা অভিনেতার সম্পর্ক—এ তো ভাবাই যায় না!
মা তিতলীকে কঠোর শাসন করলেন। তারপর ছেলেটিকে ডেকে পাঠালেন নিজের ঘরে। টেবিলের ওপর এক বান্ডিল টাকা ছুড়ে দিয়ে কড়া গলায় বললেন, "এই নাও বিশ হাজার টাকা। আজকের পর থেকে আমার মেয়ের সাথে আর কোনোদিন যোগাযোগ রাখবে না।"
ছেলেটি টাকার দিকে একবারও তাকাল না। নিঃশব্দে মাথা নিচু করে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। সেই অভিমানে আর আত্মসম্মানবোধ থেকে সে শুধু তিতলীর জীবন থেকেই সরে গেল না, চিরতরে ছেড়ে দিল যাত্রাদলও।
পরের দিন থেকে তিতলী কতবার চেষ্টা করল তার নম্বর ফোনে পাওয়ার। কিন্তু প্রতিবারই ওপার থেকে ভেসে এলো একই যান্ত্রিক কণ্ঠস্বর—"আপনার ডায়াল করা নম্বরটি এই মুহূর্তে বন্ধ আছে।"
মেয়ের মন ভালো করতে আর কুল বাঁচাতে তিতলীর পরিবার দ্রুত তার বিয়ের ব্যবস্থা করল। পাত্র অন্য এক অভিজাত বনেদি পরিবারের একমাত্র ছেলে, বয়সে তিতলীর চেয়ে প্রায় এগারো বছরের বড়।
বিয়ের পর বছর ঘুরে যায়। অঢেল সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য আর ঐশ্বর্যের মধ্যে থেকেও তিতলীর মন কোথাও যেন হারিয়ে থাকে। বাপের বাড়িতে সে আর আগের মতো আসতে চায় না—যেখানে পদে পদে জড়িয়ে আছে এক লাজুক কৃষ্ণের স্মৃতি।
এখনো কোনো গ্রামে বা শহরে যাত্রাপালার খবর পেলে তিতলী চুপচাপ বাড়ির কাজের লোক ও পরিচারিকাদের সাথে দেখতে চলে যায়। কিন্তু প্যান্ডেলের আলো আর মাইকের আওয়াজের ভিড়ে সে যাকে খোঁজে, তাকে পায় না। নিরাশ মনে বারবার তাকে ফিরে আসতে হয়।
তবুও তিতলীর অন্তরের গভীর বিশ্বাস ক্ষয়ে যায়নি। প্যান্ডেলের ম্লান আলোয় দাঁড়িয়ে সে আজও ভাবে—যে কৃষ্ণ একদিন এক পলকের জন্য তার জীবনে এসেছিল, কোনো এক অচেনা মঞ্চের ধুলো উড়িয়ে সে আবার ঠিক সামনে এসে দাঁড়াবে। ভালোবাসা কি এত সহজেই হেরে যাবে?
0 মন্তব্যসমূহ