লাল জামা।। প্রীতম সিংহ




পোস্ট বার দেখা হয়েছে

রিন্টুর মা যখন মারা যায়, তখন রিন্টুর বয়স ৬ বছর।মারা যাওয়ার আগের রাতে মা তার ছেঁড়া গেঞ্জি ধরে বলেছিল, "বাবা বিদেশ থেকে আসলেই তোর জন্য একটা টকটকে লাল জামা আনবে। একদম রাজপুত্রের মতো। তখন আর এই ছেঁড়াটা পরতে হবে না।"

রিন্টু কথাটা বিশ্বাস করে নিয়েছিল। একদম পাথরের মতো করে বিশ্বাস।

তার বাবা সত্যিই দুবাই থাকতো। কিন্তু গত দুই বছর ধরে কোনো টাকা পাঠায় না, কোনো ফোনও না। গ্রামের সবাই জানে, ওখানে সে আরেকটা সংসার করেছে। আর ফিরবে না। সবাই জানে, শুধু রিন্টু জানে না।তার দিদা তাকে অনেকবার নতুন জামা কিনে দিতে চেয়েছে। রিন্টু নেয়নি। বলে, "না, বাবা আনবে। মা বলেছে লাল জামা।"তার একটাই জামা, গলার কাছটা ছেঁড়া। শীতকালে ওটাই পরে থাকে, গরমেও ওটাই।সে রোজ বিকেল ৪টায় স্কুল থেকে এসে রাস্তার মোড়ের বটগাছটার নিচে গিয়ে দাঁড়ায়। ওখান থেকেই বাসগুলো গ্রামে ঢোকে। প্রতিটা বাস থামলেই সে উঁকি দিয়ে দেখে, বাবা নামলো কি না।লোকে হাসে। "কিরে রিন্টু, আজও দাঁড়িয়ে আছিস?"রিন্টু হাসে, "বাবা লাল জামা আনবে আজ।"

গত তিন দিন ধরে রিন্টুর খুব জ্বর। ১০৩ ডিগ্রি। নানী বলছে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাবে, টাকা নেই। জ্বরের ঘোরে সে বিছানায় শুয়ে শুধু একটা কথাই বলছে, "মা, বাবা কোথায়? আমার জামাটা... আমার লাল জামাটা কই?"

আজ সকালে জ্বরটা একটু কমেছে।

দিদা ঘুমিয়ে আছে। রিন্টু চুপচাপ উঠে, তার ছেঁড়া গেঞ্জিটা পরেই, খালি পায়ে, হাতে একটা ছোট পলিথিনের ব্যাগ নিয়ে আবার সেই বটগাছের নিচে গিয়ে দাঁড়িয়েছে। পলিথিনটা এনেছে যাতে বাবা জামাটা আনলে ধুলো না লাগে, সুন্দর করে নিয়ে যেতে পারে।দুপুর গড়িয়ে বিকেল হলো। তিনটা বাস এলো, চলে গেল। বাবা এলো না।

সন্ধ্যা হয়ে গেছে। রাস্তায় এখন আর কেউ নেই। কুয়াশা পড়ছে। রিন্টু এখনো দাঁড়িয়ে আছে। ঠান্ডায় কাঁপছে, কিন্তু যাচ্ছে না।

কারণ মা বলেছে, বাবা আসবে। আর মা কখনো মিথ্যা বলে না। 

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ