চাক ভাঙা মধু ~ অয়ন দাস




পোস্ট বার দেখা হয়েছে

চাক ভাঙা মধু

অয়ন দাস


জীবনের শেষ লগ্নে এসে কালজয়ী এক প্রেমের উপন্যাস লিখেছিলেন সাহিত্যের  ঈশ্বর রবীন্দ্রনাথ।উপন্যাসটিতে নিজেকে নিয়েও খানিক ঠাট্টা করেছেন লেখক।(উপন্যাসের নায়ক অমিত বলছে,রবি ঠাকুর লোকটার সবচেয়ে বড় অপরাধ হল এতদিন পর্যন্ত বেঁচে থাকা!) নিজের লেখায় নিজেকে নিয়ে ঠাট্টা করা কম কথা নয়।

আজ যখন একজন লেখকের চোখ দিয়ে  উপন্যাসটি পড়ি তখন সত্যিই অবাক হয়ে যাই। আটষট্টি বছর বয়সে কিভাবে রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ প্যাশনেট প্রেমের উপন্যাস -শেষের কবিতা! আমার মতে সারা পৃথিবীর সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ প্রেমের উপন্যাসের একটি হল শেষের কবিতা। 

এই উপন্যাসে এক শাশ্বত সত্যকে অত্যন্ত সাহসিকতার সঙ্গে উপস্থাপন করেছেন রবীন্দ্রনাথ। জানিয়েছেন বিবাহ ও প্রেমের বিভেদ। সমস্ত উপন্যাস জুড়ে এক সুগভীর প্রেমের পরেও শেষে এসে বিচ্ছেদ হয়ে গেল অমিত ও লাবণ্য'র।

অমিত ও লাবণ্য, পরস্পরের থেকে সরে গিয়ে  বিয়ে করল এমন দুজনকে যাদের কাছ থেকে তাদের কিছু পাওয়ার নেই। ওরা অনুভব করল, দুজনের থেকে দূরে সরে গিয়ে যে বিচ্ছেদের এবং বিরহের কষ্ট তারা সারাজীবন পাবে,সেই কষ্টেই চিরকাল বেঁচে থাকবে ওদের প্রেম।ওদের বিয়ে হলে প্রেম হারিয়ে যাবে অচিরেই এবং তা আরও দুঃসহ হবে দুজনের  কাছে।


বস্তুত নারী পুরুষের প্রেমের সম্পর্কের মত এত মধুর ও উপভোগ্য আর কিছু নেই। আবার এই সম্পর্কের ভাঙন ডেকে আনতে পারে চরম সর্বনাশ। একথা তো অস্বীকার করার উপায় নেই যে মানুষের জিনের মধ্যেই রয়েছে বহুগামিতা। মন কখনও চিরকাল এক জায়গায় আটকে থাকেনা। বিশেষত বিবাহ যেখানে স্থির করে দেয় এক নিষ্ঠুর বিধান, 'শুধু একজনকেই সারাজীবন ভালোবেসে যাওয়াই আরেকজনের কর্তব্য।আমরা বাধ্য থাকব এমন ভালোবাসতে।'ঠিক তখনই এই প্রতিশ্রুতি ঠান্ডা অজগর সাপের মত জড়িয়ে ধরে  সম্পর্ককে,দেখা দেয় একঘেয়েমি।শুরু হয় সহবাসের দহন ও একাকীত্ব। মন বলে, হেথা নয়, হেথা নয়,অন্য কোথা, অন্য কোনোখানে। 


এমন পুরুষ বা নারী, জীবনে তো আসেই,যাকে দেখে ছলাৎ করে ওঠে মন,কেঁপে ওঠে অস্তিত্ব।যে প্রেমে মানুষ ভেসে যেতে চায় অনিশ্চিত উড়ানে।


সহবাস নিয়ে দুর্দান্ত এক সাহসী এক্সপেরিমেন্ট করেছিলেন দুজন কালজয়ী লেখক। এঁরা হলেন জাঁ পল সাঁর্ত্র এবং সিমোন দ্য বোভোয়া। জাঁ পল এবং সিমোন ছিলেন সহপাঠী। কলেজে পড়তে পড়তেই তাদের প্রেম হয়,তাঁরা একসঙ্গে থাকতে শুরু করেন।সাধারণত একই ছাদের তলায় দুজন বুদ্ধিজীবীর সহবাস সুখের হয় না কিন্তু এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম। দুজনের লেখাই তুমুল জনপ্রিয় হতে থাকে।দুজনেই লিখতে থাকেন ধ্রুপদী সাহিত্য। লেখকের গন্ডি অতিক্রম করে দুজনেই মান্যতা পান ফ্রান্সের সবচেয়ে আলোচিত বুদ্ধিজীবী ও দার্শনিক হিসেবে। এবং দুজনেই স্বাদ বদলাতে অন্য সম্পর্কে যেতে থাকেন বারবার। অবশ্যই দুজনকে জানিয়ে।

নোবেল প্রাইজ হেলায় প্রত্যাখ্যান করা জাঁ পল সার্ত্র  শেষ বয়সে  এক কাতর অনুরোধ করলেন ঘরণী সিমোন দ্য বোভোয়া'কে।বললেন, এমন এক যুবতীকে এনে দাও, যাকে স্পর্শ করলে আমি উজ্জীবিত হবো,আমার ধুসর পৃথিবীটা হয়ে উঠবে রঙিন। যার সঙ্গে কথা বললে আমি প্রাণ ফিরে পাবো।আমায় খুঁজে এনে দাও এমন একজন তরতাজা যুবতী। 


সিমোন দ্য বোভোয়া  খুঁজে আনলেন সেই যুবতীকে।সেই যুবতীর সঙ্গে এক অসমবয়সী প্রেম হল জাঁ পল সার্ত্রের।আর সেই অসম প্রেম নিয়ে সিমোন দ্য বোভোয়া লিখলেন এক অনন্য কালজয়ী উপন্যাস। তাঁর জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ উপন্যাস " She came to stay"।


আর সার্ত্র লিখলেন জীবনের এক অমোঘ সত্য।সার্ত্র লিখলেন- এগজিস্টটেনশিয়ালিজম।’ অস্তিত্ববাদ। তিনি বললেন, Existence is prior to essence..  মানুষের স্বাধীন অস্তিত্ব তার সত্তার আগে। মানুষের অস্তিত্বই হচ্ছে তার স্বাধীনতাকে প্রতিষ্ঠা করা।


বস্তুত এই স্বাধীনতা প্রতিটি মানুষের জীবন জুড়ে সক্রিয় থাকার নামই বোধহয় আসলে বেঁচে থাকা।

 


ঋণ - গুগল 

মন বান্ধিবি কেমনে - রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায় 

ছবির দেশে কবিতার দেশে  - সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়


****************




Happy Valentine Day

মুকুল 


সময়টা ২৬৯ (মতান্তরে ২৭০) খ্রিষ্টাব্দ ৷ খ্রিষ্টিয় সভ্যতার লীলাভূমি রোমে তখন পেগান ধর্মের রমরমা ৷ জুপিটার, মারকারি, জুনো প্রভৃতি দেবদেবীর উপাসনায় মেতে থাকত রোমের অধিবাসীগন ৷ রোমান সম্রাট দ্বিতীয় ক্লডিয়াস খ্রিষ্টধর্মের প্রচার ও প্রসার নিষিদ্ধ করেন রোমে ৷ তা সত্ত্বেও সেন্ট ভ্যালেন্টাইন নামে পেশায় চিকিৎসক এক তরুণ খ্রিষ্টান সন্ত গোপনে খ্রিষ্টধর্মের প্রেমের বাণী প্রচার করতেন জনসাধারনের মধ্যে ৷ আবার তীব্র সাম্রাজ্যবাদী শাসক দ্বিতীয় ক্লডিয়াস তাঁর সাম্রাজ্য টিকিয়ে রাখার জন্য বিশাল সেনাবাহিনী গঠন করার প্রয়োজন অনুভব করেন । এই কারণে সেনাবাহিনীতে দেশের যুবকদের যোগদান বাধ্যতামূলক করেন এবং যুবকদের বিবাহের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেন । এর ফলে রোম জুড়ে তীব্র অসন্তোষের সৃষ্টি হয়, যদিও সম্রাটের ভয়ে কেউই এর প্রতিবাদ করতে সাহস করেনি ৷ একমাত্র সেন্ট ভ্যালেন্টাইন সম্রাটের আদেশ অগ্রাহ্য করে যুবক-যুবতীদের পাশে দাঁড়ান ৷ গোপনে তাদের বিবাহের বন্দোবস্তও করতে থাকেন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ৷ এজন্য তিনি পরিচিতি পান ভালোবাসার বন্ধু বা Friend of Lovers নামে ।


এই দুঃসাহসিকতার অবশ্যম্ভাবী পরিণতি যা হবার তা হয় ৷ সম্রাট দ্বিতীয় ক্লডিয়াসের কানে এ সংবাদ এসে পৌঁছালে কারারূদ্ধ করা হয় সেই সেন্ট ভ্যালেন্টাইনকে ৷ সম্রাট অবশ্য তাঁকে একবার সুযোগ দিয়েছিলেন যে তিনি যদি খ্রিষ্টধর্ম ত্যাগ করে পেগান ধর্মে ফিরে আসেন এবং সম্রাটের আদেশ মেনে চলতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হন, তবে তাঁকে মুক্তি দেওয়া হবে ৷ বলাই বাহুল্য তিনি তা অস্বীকার করেন ৷ ইতিমধ্যে দেশের যুবক-যুবতীদের মধ্যে তাঁর জনপ্রিয়তা ও সুনাম বৃদ্ধি পাওয়ায় দলে দলে যুবক-যুবতীরা জেলে তাঁর সঙ্গে দেখা করতে আসতে থাকে ৷ অন্যদিকে শোনা যায় ওই কারাগারের জনৈক কারারক্ষীর অন্ধ কিশোরী কন্যা তাঁর চিকিৎসায় দৃষ্টিশক্তি ফিরে পায় ৷ ফলে তাঁর জনপ্রিয়তা বৃদ্ধির পাশাপাশি তাঁর অলৌকিক ক্ষমতা রয়েছে, এমন একটি কথাও প্রচারিত হয় ৷ রোমের জনসাধারনের একাংশ তাঁর মুক্তির দাবিতে সোচ্চার হয়ে ওঠে ৷ গণবিদ্রোহের আশঙ্কায় সম্রাট দ্বিতীয় ক্লডিয়াস তাঁর মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেন ৷ যেদিন তাঁর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়, সেই তারিখটা ছিল ১৪ই ফেব্রুয়ারি ।


যদিও খ্রিষ্টধর্ম মতে সন্ত অর্থাৎ সাধকদের প্রেম-ভালবাসা-বিবাহ নিষিদ্ধ, তবু তিনি হৃদয়ের আবেদন উপেক্ষা করতে পারেননি ৷ সম্ভবতঃ তিনি ভালোবেসেছিলেন কারারক্ষীর অন্ধ কিশোরী মেয়েটিকে, যার দৃষ্টিশক্তি তিনি ফিরিয়ে দিতে পেরেছিলেন ৷ তাঁর মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঠিক আগে ওই মেয়েটিকে একটি চিঠি দিয়েছিলেন, যার তলায় লেখা ছিলো ".....love from your Valentine".


শুধুমাত্র ভালোবাসার জন্য সেন্ট ভ্যালেন্টাইনের এই মহান আত্মত্যাগের ২২৭-২২৮ বছর পর ৪৯৬ খ্রিস্টাব্দে পোপ জেলাসিয়াস সেন্ট ভ্যালেন্টাইনের সম্মানে ভালোবাসার জন্য তাঁর আত্মবলিদানের দিনটাকে স্মরণ করে প্রতি বছর ১৪ ফেব্রুয়ারি তারিখটিকে ভালোবাসার দিন হিসাবে নির্ধারিত করেন এবং পরবর্তীকালে তাঁর নামানুসারেই "ভ্যালেন্টাইন্স ডে" নামে সারা বিশ্বে স্বীকৃতি লাভ করে ।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ