গল্প || ।। পুতুল ।। তসলিম পাটোয়ারী




পোস্ট বার দেখা হয়েছে

দাপটগঞ্জ হাটটি চতুষ্পার্শ্বস্থ গ্রামগুলোর মধ্যস্থলে। রবিবারে ও বৃহস্পতিবারে বসে এই হাট। গ্রামবাসীরা তাদের ফসল, ফলফলাদি বেচাকেনা করেন হাটে। তারপর ঝলমলে রেস্টুরেন্ট 'উপহার' এ বসেন- গল্প করেন, আয়েশ করে চা খান, চা খেতে খেতে মেতে উঠেন- হরিষে বিষাদে, মীমাংসা করেন বিসংবাদিত বিষয়াদি, বিয়েশাদি, প্রভৃতি। 


বাউরি গ্রামের কফিল সাহেব চাকরি করেন এক্সওয়াই এয়ারপোর্টে। তার পরিবার পরিজন থাকে গ্রামে। প্রতি সপ্তায় তিনি আসেন, বউ-বাচ্চা, মা-বাবাকে দেখে যান, তাদের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনে দিয়ে যান হাট থেকে। দাপটগঞ্জ তার বাল্য স্মৃতিবিজড়িত হাট, তার সাথে সাথে বেড়ে উঠেছে; এখন অনেক বড়ো। তিনি ও তার বন্ধুরা হাটে আসেন প্রাণের টানে। হাটবাজার শেষে সবাই মিলে বসে পড়েন 'উপহার' এ। তাদের খেদমতে আসে ছলিম। 


ছলিম জানে কফিল আঙ্কেলরা আদর্শ। সে আঙ্কেলদেরকে সর্বোচ্চ তাজিম করে। আঙ্কেলরাও ছলিমের প্রতি সহানুভূতিশীল। ছলিম আঙ্কেলদের কাছে প্রায়ই তার দুঃখের কথা বলে। সেদিন গোল করে বটা পরোটা চায়ের কাপে ডুবিয়ে আতিক আঙ্কেল বলেন, পোলাডা ভালা রে কফিল, পাইল্লে অরে একটা চাকরি বাকরি লই দে- পিয়ন, গার্ড, যা পারছ, মা আর ছোডো ভাই অর, অয় কষ্ট করি সংসার চালায়, ভাইডারেও হড়ায়। 


কফিল বলেন, চাকরি বাকরি অন কঠিন রে, পিয়ন গার্ডের লাইও বিএ এমএ পাশেরা আবেদন করে। তয় দিলে একটা স্টলে দেওন যায়, পরিচিত একটা স্টল আছে এয়ারপোর্টে- হালকা নাস্তা; কোমল পানীয়; কফি আর শো-পিসের, কয়দিন আগেই মালিক একটা ভালা পোলা চাইছিল্ আঁর কাছে। তিনি ছলিমের দিকে চেয়ে বলেন, কফি বানান সোজা, বেচনও সোজা, তয় শো-পিস বেইচতে অইলে আরো স্মার্ট অন লাইগবো, দুই-চাইরডা ইংরাজি কন লাইগবো, পাইরবি? পাইল্লে ক, তইলে কতা কই চাই। 


ইকবাল আঙ্কেল বলেন, হাইরবো হাইরবো। তিনি ছলিমকে বলেন, কিরে পাইত্যি ন, তুই না নাইন পাশ, যা যা, ভালা অইবো, ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট, কতো হদের মানুষ দেইখবি, শহরে থাইকবি, মন বড়ো অই যাইবো, চেহারা সুরত খুলি যাইবো, একদিন আরব দেশেও যাইতি হাইরবি, ইংলিশ কোন ব্যাপার ন, ইংলিশ অন বুটবাদামঅলায়ও কয়, তুইও হাইরবি।

কফিল সাহেব প্রতি বৃহষ্পতিবার বিকেলের ট্রেনে বাড়ি আসেন, শুক্রবার বিকেলের ট্রেনে ফিরে যান। পরের সপ্তায়ই তিনি ছলিমকে সাথে করে নিয়ে যান। তিনি স্টেশনে নেমে ছলিমকে বলেন, চল তোরে আগে মালিকের কাছে লই যাই। সন্ধ্যায়ই তারা এয়ারপোর্টে পৌঁছে যান। একে একে তখন জ্বলে উঠছিলো টার্মিনালের লাইটগুলো। আলোয় আলোয় ছলিমের চোখ ধাঁধিয়ে যায়। এতোদিন তার কাছে 'উপহার' এর আলো ছিলো সূর্যকর, কিন্তু এয়ারপোর্টের আলোর কাছে তা এখন নষ্টচন্দ্রপ্রহর। 


মালিক ছলিমের আপাদমস্তক দেখে বলেন, চলবে, কিন্তু পোশাকআশাক চলবে না। সাক্ষাৎকার শেষে আঙ্কেল ছলিমকে লাউঞ্জ, ইমিগ্রেশন; ভিসা; পাসপোর্ট; লাগেজ; সিকিউরিটি ইত্যাদি চেকিং, ডোমেস্টিক ও ইন্টারন্যাশনাল ফ্লাইটের যাত্রীদের এন্ট্রি-এক্সিট, এটাসেটা দেখান। কিন্তু ছলিমের সে দিকে মন নেই। তার মনমরা মুখ। সেমুখ দেখে আঙ্কেল বলেন, চল্ তোরে প্যান্ট শার্ট জুতা কিনি দেই, বেতন পাইলে শোধ করি দিবি। ছলিম হেসে বলে, থাইক্কুম কোনাই? আঙ্কেল বলেন, মেসে অন্ আঁর লগেই ডাব্লিং কইরবি, পরে রুম লই লবি। 


ছোট একখানা স্টল। বাইরে পাহাড়ি বেতের চমৎকার ডিজাইনের গোটা পাঁচেক মোড়া- কাস্টমার বসার জন্য, ভেতরে একটা চেয়ার- দণ্ড দন্ড দাঁড়িয়ে প্রচন্ড পণ্ডশ্রমে পা ব্যথা করে উঠলে দুদন্ড বসার জন্য বা তার উপর দাঁড়িয়ে উপরের তাকের পণ্য নামানোর জন্য। চেয়ারের সামনে টেবিলে বড়ো কফির ফ্লাক্স, পানির জার, ওয়ানটাইম গ্লাস, ওয়ানটাইম কাপ, কোমল পানীয়, দু-একটি বিয়ারের ক্যান। দক্ষিণ ও পশ্চিম দিকের দেয়াল টিকেট কাউন্টারের মতো কিয়দংশ করে খোলা- কাস্টমার সার্ভিসের জন্য। নিচের দিকের কয়েকটি তাকে ফাস্টফুড ও মিনিপ্যাক বিস্কিট। উপরের তাকগুলোয় শো-পিস। মাটি, সিরামিক, মেটাল, কাঁচ; ক্রিস্টল, কাষ্ঠ, তামা; কাঁসা; পিতল; ব্রোঞ্জ, রূপা বিবিধ ধাতু বা ধাতুসংকরে গড়া- বিষ্ণু, শিব, রাধাকৃষ্ণ, কাবাঘর, বুদ্ধ, যীশু, আল্লাহু-মোহাম্মদ, পঙ্খীরাজ, ডানাওয়ালা পরি, হংসমিথুন, লাভ চিহ্ন, নর-নারীর এক্সট্রিম লাভ, আলাদিনের চেরাগ, ফুল, পুতুল ইত্যাদি শো-পিস। আছে কালারের বাহারও- গোল্ডেন, সিলভার, ব্লু, পিংক, এন্টিক নানান কালার। দু-তিন পিস করে সেম্পল তাকে, আর স্তুপ স্তুপ নিচে। ছলিমকে পণ্য ও দাম বুঝিয়ে দেন মালিক। বলেন, মনে করবা দোকান তোমারই, তুমিই চালাইবা। 


মাস দুয়েকের মধ্যেই ছলিম মালিকের মনে স্থান পায়। মালিক বলেন, তুমি চাইলে আমার বাড়ির ছাঁদে পানির ট্যাংকের পাশের ছোট্ট রুমটাতে থাকতে পারো, কতোক্ষণই বা ঘুমাবা, সারাক্ষণ তো দোকানেই যায়। ছলিম আঙ্কেলকে তা জানায়। আঙ্কেল বলেন, মন্দ কী, ভাড়া বাচি যাইবো, খাওয়া দাওয়াও হয়তো পাই যাবি, তাছাড়া তুই অন মালিকের লোক, মালিকের ইচ্ছামতোই চইলবি, তয় সাবধানে বাপু। 


ফ্লাইট যায়, ফ্লাইট আসে। কতো কিসিমের মানুষ যায় আসে। বিদেশগামী ওয়েজ আর্নারদের দেখলেই চেনা যায়। তারা বাউরি গ্রামের মানুষের মতোই; ছলিমের মতোই- শ্যামল কালো। তাদের দু’চোখে স্বপ্ন- মা-বাবা, ভাই-বোন, বউ-বাচ্চার মুখে হাসি ফোটানোর। সহজসরল মানুষগুলো ফ্লাইটের জন্য অপেক্ষা করে, ঘুরতে ঘুরতে আসে স্টলের সামনে। তারা স্টলের চাকচিক্য দেখে ভড়কে যায়। ছলিম মুখ বাড়িয়ে বলে, কিছু লাগবে। ওরা সাহস করে বলে, চা দেন। ছলিম জানে গ্রামের মানুষগুলো চা খেয়েই অভ্যস্ত। কিন্তু দোকানে চা নেই, আছে কফি। এক কাপ কফি বিশ টাকা, অসম্ভব দাম। 'উপহার' এর বিশ কাপ চায়ের সমান। সে নিজেও খেতো না এতো দাম দিয়ে। তবুও চাকরি তার, সে বলে, ভাই চা নাই, আছে কফি, এক কাপ বিশ টাকা, দেবো। অগত্যা মানুষ বিমানে ওঠার আগে কফি খেতে খেতে স্বজনের সাথে আরেকটু আবেগি সময় কাটায়। 


অনেক কাস্টমার কফি খেতে খেতে শো-পিসগুলোর দিকে চায়। কিছু শো-পিস তাদের পছন্দ হয়। কিন্তু পুতুল দেখে তারা হাসে। ছলিমও ভাবে, দামী দামী শো-পিস থাকতে সামান্য মাটির পুতুল রাখা কেনো? গ্রামে বৈশাখী মেলায় এসবের ছড়াছড়ি, টাকায় একটা। এসব পুতুল কে চায়? এসব নিয়ে বিদেশে যায় কেউ? নাকি বিদেশ করে এসে এসব নিয়ে ঘরে ফিরে কেউ? সে মালিককে বলে, স্যার, কতো শো-পিস বেচলাম, কিন্তু একটা পুতুলও বেচতে পারলাম না, কেউ চাইলোও না। মালিক বলেন, চায় হঠাৎ হঠাৎ, তুমি কিন্তু প্রতিদিন পুতুলগুলা ঝাইড়া মুইছা রাখবা। যখনই কাস্টমার হাত দেয়, তার হাতে যেনো ময়লা না লাগে। 


ছলিম পাকা বিক্রেতা। চিনে গেছে দেশি কাস্টমার, বিদেশি কাস্টমার। দেশিরা অনেকে মোটা তাজা হয়ে ফিরে, ঠাঁট মেরে বলে, এই, কফি দাও। বলার ভঙ্গিমা ছলিমের ভালো লাগেনা, তবুও সে মুখ কালো করে তাদেরকে কফি দেয়। কিন্তু ফরেনাররা সুন্দর করে বলে, কফি প্লিজ, ছলিমও বলে, ইয়েছ প্লিজ, প্লিজ ওয়েট এ বিট, হেভ দা সিট। কাস্টমার বেশি হয়ে গেলে ছলিম বাংলা- ইংরেজি পেপার ম্যাগাজিন এগিয়ে দেয়। 


কফিল আঙ্কেল মাঝেমধ্যে ঘুরে যান স্টল। ছলিম ওনাকে সম্ভাষণ জানায়; কফি খেতে দেয়। ছলিম জানায় সে বাড়িতে আসা যাওয়া করে, তবে মালিক তাকে লম্বা ছুটি দেয়না বলে সে দু'চার ঘন্টার বেশি বাড়ি থাকতে পারে না, কারো সাথে দেখাও করতে পারেনা, এমনকি প্রথম অন্নদাতা রেস্টুরেন্টেও যেতে পারে না। আঙ্কেল বলেন, ঠিকই আছে, অযথা সময় নষ্ট করবি কিল্লাই, আগে কর্ম। তিনি ছলিমের পিঠ চাপড়ে চলে যান, যেতে যেতে প্রফুল্ল হন- ছলিম স্মার্ট হয়েছে, খোলতাই হচ্ছে, শুদ্ধ ভাষায় কথা বলছে, বিদেশিদের সাথে ইংলিশ বলছে। 


সেদিন রাতে একটি বিমান নেমে তীব্র কিরণ বিচ্ছুরণ করে রানওয়ে ধরে দৌড়ে আসছিল তার দৌড় পর্যন্ত। সেই কিরণে চকচক করে উঠলো স্টলের ক্রিস্টল পিসগুলো। এক বিদেশি কফি খেতে খেতে শো-পিসের দিকে চেয়ে রইলেন। ছলিম বুঝলো লোকটি এখনই চাইবেন যে কোনো একটি ক্রিস্টল পিস। কিন্তু না, তিনি চাইলেন মাটির পুতুল। পুতুলটি নেড়েচেড়ে বললেন, নাইচ, হাউ মাচ? ছলিম একবার লোকটির দিকে চায়, একবার পুতুলের দিকে চায়। দূর হতে মালিক তা দেখে চলে আসেন। ছলিম বলে, প্লিজ টক টু হিম, হি ইজ মাই বচ। লোকটিকে দু'পা সামনে নিয়ে যান মালিক। তাদের কথা কম বুঝা যাচ্ছিলো, তবুও ছলিমের কানে এলো টু হান্ড্রেড থাউজ্যান্ড ডলারস। ছলিম কনভার্ট করে দেখলো এক কোটি টাকা। সে আর কান লাগায় নি। অতো দাম কী আর মাটি পোড়ানো পুতুলের, নিশ্চয় অন্য কিছুর আলাপ। ছলিম দেখলো মালিক ফরেনারকে খুব সন্মান করে বহিঃ ফটক পর্যন্ত এগিয়ে দিলেন, তারপর মালিকও মিশে গেলেন লাউঞ্জে। 


পরদিন সকালে গাড়ি অন্যপথে ছুটছে দেখে ছলিম মনে করলো, আজও বোধহয় মালিক লংড্রাইভ করে স্টলে পৌঁছবেন। তিনি ড্রাইভ করতে করতে একেকদিন একেকটি স্কুলের সামনে দাঁড়িয়ে যান, বাচ্চাদের এসেম্বলি দেখেন। ছলিম বুঝতে পারে স্যারের কষ্ট, বাড়ি গাড়ি সবই আছে স্যারের, আহা, নেই শুধু সন্তান। অথচ মা-বাবার কাছে সন্তানই বড়ো ধন। ছলিমের মনে পড়ে যায়, মা তার মাথায় হাত বুলিয়ে ছড়া বলতেন; ধন ধন ধন বাড়িতে ফুলের বন / এই ধন যার ঘরে নাই তার বৃথাই জীবন। স্যারের জীবনটা আজ যেনো বৃথাই। 


কিন্তু মালিক অখ্যাত একটি হোটেলের সামনে দাঁড়িয়ে যান এবং ছলিমকে গাড়ির বুটে রাখা ট্র্যাভেল ব্যাগটি আনতে বলেন। ছলিম ব্যাগটি নিয়ে এলে মালিক বলেন, কালকের ঐ বিদেশি লোকটা পঁচিশ নম্বর রুমে আছেন, ওনাকে ব্যাগটা দিয়া আসো। ব্যাগটা বড়ো এবং ভারী। ছলিম বুঝলো ব্যাগে অনেক পুতুল। সে ভাবলো, আহা বিদেশিদের খেয়াল, পুতুলের খেয়াল জেগেছে, তাই অনেক পুতুল নিচ্ছে। 


ছলিম কড়া নাড়তেই দরজা খোলেন বিদেশি, হেসে বলেন, কাম অন। লোকটি ব্যাগের চেইন খুললে ছলিম মাথা উঁচিয়ে দেখলো একটি কালো পুতুল। ছলিম অবাক হয়, এতো বড়ো আর এতো কালো পুতুল তো স্টলে নাই! স্টকেও নাই! এলো কোত্থেকে! যা হোক, লোকটি হেসে বললো, ও কে, যেটে পারো। বিদেশির মুখে বিদখুটে বাংলা! ছলিম আরো অবাক। সে ফিরে এসে বললো, স্যার লোকটা বাংলাও জানে। মালিক বলেন, শুধু বাংলা না, ওরা আমার তোমার বাথরুমের খবরও জানে। ছলিম বলে, একজন বিদেশি এতো কমদামী হোটেলে থাকে? মালিক বলেন, ওরা ট্যুরিস্ট; আনাচেকানাচে ঘুরে বেড়ায় তো, তখন খরচ বেশি হয়, তাই হোটেল মোটেলে বেশি খরচ করতে চায় না। 


সপ্তাখানেক পরে লোকটি চলে যাওয়ার সময় শেষ এক কাপ কফি খেতে আসে। লোকটি থ্যাঙ্ক ইউ ছলিম বলে মালিকের সাথে হ্যান্ডশেক করে চলে যায়। ছ'মাস পর অন্য এক বিদেশিও এসে অনুরূপ পুতুল চায়, ছলিম অনুরূপভাবে মালিকের সাথে থাকে এবং একই কায়দায় তাকেও পুতুল পৌঁছে দেয়। এবার ছলিম ধন্দে পড়ে যায়। এমন করে কালো মাটির পুতুল বিদেশিকে নিরবে নিভৃতে হোটেলে পৌঁছে দিতে হবে কেনো! এ আবার কেমন ব্যবসা! 


ক'দিন পরে ভর দুপুরে লাঞ্চ সেরে ছলিম পত্রিকা দেখছিলো। তার চোখে পড়লো সংবাদ- 'কয়েক কোটি টাকা মূল্যের কষ্টিপাথরের বিষ্ণুমূর্তি পাচারকালে কয়েকজন ধৃত'। সংবাদটি সে মনোযোগ দিয়ে পড়লো এবং নড়েচড়ে বসলো। সে ভাবতে শুরু করলো, তাহলে কী তারা কষ্টিপাথরের মূর্তি পাচার করেছে বিদেশিদের কাছে! মালিক কী পাচারকারী! এভাবেই কী তিনি বিত্তবান, দোকান ও শো-পিস কী কেবলই শো! পুতুলগুলো কী রেপ্লিকা!


ট্রেড ইউনিয়ন লিডার কফি খেতে আসেন স্টলে। তিনি পেপারটা পড়তে পড়তে বলেন, শালা পাচারকারীরা দেশটা খালি কইরা দিতেছে,

শালাদের শূলে চড়ানো উচিত। ছলিম বললো, স্যার এইসব মূর্তির এতো দাম? লিডার বলেন, এগুলি আগ্নেয়গিরির লাভা, কালো কালো পাত্থর হয়া পইড়া থাকতো। কিন্তু মানুষ যহন বুঝলো এই পাথর দিয়া সোনারূপা যাচাই হয়, অমনি এর দাম বাইড়া গেলো। তবে আসল দাম হইলো হেরিটেজের, এই সবের গায় যখন হেরিটেজ খোদাই থাকে তখনই দাম হয় খুব। উপমহাদেশের অনেক হেরিটেজ আছে কষ্টিপাথরের গায়। হেরিটেজ কখনো মূল্য দিয়া কিনা যায় না, পাচারকারীরা দুই-চার-দশ কোটি টাকা যা পায় তাই তাদের লাভ, ঐতিহ্যের মূল্য তাদের কাছে নাই। খবরে দেখোনা, বিদেশের বড়ো বড়ো মিউজিয়াম ভরা আমাদের প্রত্নসম্পদে। যায় কেমনে? পাচার হইয়াই। কারা পাচার করে? নামগুলি পইড়া দেখো;  সব ধর্মের লোক আছে। লুটেরা দেশগুলির তবুও একটা গুণ আছে, ওরা এসবের কদর জানে, আমরা জানি চুরি ডাকাতি পাচার, আমরা পারলে দেশটাই পাচার কইরা দেই। 


লিডারের কথা শুনে ছলিমের যেনো দেশাত্মবোধ জেগে উঠে। সে কষ্টিপাথরের পুতুলের মতো অচল বাকরুদ্ধ হয়ে ফুঁসতে থাকে। চাকরির পরোয়া না করেই ছলিম মালিকের মুখোমুখি হয়। বলে, স্যার কষ্টিপাথরে ইতিহাস ও ঐতিহ্য আছে, এগুলি বেচাকেনা ঠিক না। মালিক বলেন, ঐতিহ্য ধুইয়া পানি খাইবা? চুপ থাকো। ছলিম মাথার চুল ছিঁড়ে আর ভাবে, বাড়ি চলে যাবে, দরকার হয় আবার উপহারে ঢুকবে, তবু দেশের সম্পদ পাচারের সাথে থাকবেনা। 


ক'দিন পর মালিক ছলিমকে ডেকে একটা ঠোঙা ধরিয়ে দিয়ে বলেন, ধরো, এগুলি তোমার। ছলিম ঠোঙাটি নিয়ে রুমে যায়। সে ঠোঙা খুলে তাজ্জব বনে যায়। টাকা আর টাকা। এতো টাকা সে জীবনেও দেখেনি। ভয়ে সে কেঁপে উঠে, তাকে কী চোর বা ডাকাত বলা হবে এরপর। তখনই তার কফিল আঙ্কেলের কথা মনে পড়ে, তিনি বোধহয় এইজন্যই তাকে সাবধান করেছিলেন! সারারাত ঘোরে কাটে ছলিমের। সকালে সে মালিকের ঘরে গিয়ে ধরা গলায় বলে, স্যার এতো টাকা। স্যার বলেন, হ্যা, রাইখা দাও। 


ছলিমের মনে পড়ে যায় উপহারে কফিল আঙ্কেলদের আড্ডা। তারা একদিন বলাবলি করছিলেন, সম্পদের পিছনে আছে চুরিচামারি, ঠকবাজি। রাজা বাদশারা ঐ 'আলিবাবা চল্লিশ চোর' গল্পের মতো চোর ডাকাতেরই গডফাদার। তারা জনতাকে লুটে সেই টাকায় মূল্যবান ধাতু সংগ্রহ করে তাতে নিজেদের প্রতিচ্ছবি খোদাই করিয়েছে, টোটেম টেবু কুঁদিয়েছে, অনুশাসন উৎকীর্ণ করেছে, দর্প জাহির করেছে। ছলিম মাথায় টোকা দিতে দিতে ভাবলো, তাহলে সেই লুট এখন হরিলুট করে প্রতিশোধ নিতে দোষ কী! গরিবের টাকা গরিবের কাছেই ফিরে এলো! 


টাকা দেখলে কাঠের মূর্তিও হা করে, শেষ পর্যন্ত ছলিমও হা করলো। এমনকি মালিকের ঘর থেকে বের করে কষ্টিপাথরের বাক্স এখন তার খাটের নিচে কিংবা পানির ট্যাংকের পাশে লুকিয়ে রাখতেও সে আপত্তি করলোনা। সে মালিকের মন্ত্রশিষ্য হয়ে গেলো। এমনি করে বছর সাতেক যায়। মালিক ও কর্মচারী টেকনিক পাল্টে পাল্টে হাজার বছরের প্রত্নসম্পদ কখনো কোনো হোটেলে, কখনো বাসার অদূরে পিক-আপে, ভ্যানে, তক্কেতক্কে দেশি-বিদেশি দুষ্কৃতকারীর শ্যেন পঞ্চনখে তুলে দেয়। ছলিম চুপচাপ থাকে আর বখরা নেয়। 


এবার ছলিমের মা গো ধরে বসেন, বিয়ে করতে হবে ছলিমকে। শুরু হয় পাত্রী দেখা। ম্যাচমেকার ঢোলশহরত করে বেড়ান- ছলিম রূপে কালো কিন্তু গুণে আলো, সে গ্রামের বাড়িতে সেমিপাকা ঘর করেছে, অনেক ধানি জমি কিনেছে, শহরেও প্লট নিয়েছে, ভাই কে আরব দেশে পাঠিয়েছে। অনেক শিক্ষিত পিতা কন্যাদায়গ্রস্ত হলেও ছলিমের কোয়ালিফিকেশন ও সম্পদের কথা শুনে চুপ হয়ে যান। শেষে পাত্রী পাওয়া গেলো দূরে, বহুদূরে, উজ্জয়নীপুরে। রূপকথার শাহজাদীর মতো অপরূপা এক পাত্রী। বউ পেয়ে ছলিম গদোগদো। বিদ্যার ঠমক নেই, রূপের চমক তো আছে। আল্লা কাউকে বিদ্যা দেন, কাউকে রূপ দেন। তার জন্য রূপের পুতুলই ঠিক আছে। খাবে আর পাশে শোবে। এমন সুন্দরী বউয়ের জন্য দরকার পর্দাঘেরা যানবাহন। ছলিম রঙিন কাঁচে ঢাকা একটি মাইক্রোবাস ক্রয় করে। 


মাইক্রো হাঁকিয়ে ছলিম শশুরবাড়ি যায়, আসে। তার নাম হয় শশুরবাড়িতে- জামাই কালা, তো কী অইছে, যেই বেডাগো শইয্যবীয্য থাহে হেরা কালা ই অয়; জামাই অইলে এইরমই অওন। কিন্তু ছলিম কী, তা ছলিম জানে। একদিন বাড়ি ফিরার পথে তার সামনে পড়েন কফিল আঙ্কেল। আঙ্কেলকে দেখে তার অন্তরাত্মা কেঁপে উঠে। সে চাইলো গাড়ি থেকে নেমে রিটায়ার্ড মানুষটিকে সালাম করবে, তাকে লিফট দিবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত পারলোনা আদর্শের মুখোমুখি হতে, সে কষ্টিপাথরের মতো জমাট হয়ে গেলো। আঙ্কেলও দু'হাতে বাজার নিয়ে পথের পাশে দাঁড়িয়ে থাকলেন মাটির পুতুলের মতো। ড্রাইভার স্টিয়ারিং ঘুরিয়ে রাস্তার ধূলি উড়িয়ে চলে গেলো। অবশ্য কিছুদিন পরে ছলিমকে আর আঙ্কেলদের সামনেই পড়তে হলোনা, ততোদিনে শহরে তার চারতলা বাড়ি হয়ে গেছে। 


মালিক একদিন বলেন, ছলিম তোমার ম্যাডামকে নিয়ে বাইরে যাবো ভালো ডাক্তার দেখাতে, অনেক দিন থাকবো, তাই স্টলটাও ছাইড়া দিলাম, তবে তুমিও থাকতে পারবা। পরের মাসেই তিনি সস্ত্রীক চলে যান। পরে ছলিম জানতে পারে মালিক বাড়িটিও ছেড়ে দিয়েছেন। অতঃপর ছলিম মালিকের নিমকমহলটি ছাড়ে, নতুন মালিকের চাকরিও ছাড়ে এবং নিজে একখানা শাড়ীর দোকান শুরু করে। 


দোকানের লাইটগুলো জ্বলে উঠলে কোথাও এক তিল কালো থাকেনা, সব ধবধবে সাদা হয়ে যায়, সাদা হয়ে যায় ক্যাশবক্সের কালো টাকাগুলো। বউয়ের চাঁদমুখখানি তখন চকচক করে উঠে ম্যানিকুইন পুতুলগুলোর মুখে। ছলিম শ্বেতশুভ্র ডিভানে বসে অপলক চেয়ে থাকে পুতুলগুলোর দিকে। তবুও যখন কাস্টমার আসে কিংবা সে পলক ফিরায়, তখন তার আফসোস হয় মালিকের জন্য। শুধু শুধু মালিক চিকিৎসার নামে চলে গেলেন কোনো সেকেন্ড হোমে। এর কোনো দরকার ছিলোনা। এখানে কে কাকে ঘাঁটে; এখানে ঘাটে ঘাটে সবাই পুতুল; পুত্তলক। এই যে বঁধু বেশে পুতুলগুলো দাঁড়িয়ে আছে জামদানি বেনারসি পড়ে, কে খতায় তাদের? কে জানে, একদিন নিকষকালো কষ্টিপাথরের পুতুল ছিলো এরা? হাত ঘুরে ঘুরে ধোলাই হয়ে এখন এরা ধবলিত পুতুল!

--------

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ