দর্পণ || সাধারণ তন্ত্র দিবস || পর্ব -৪




পোস্ট বার দেখা হয়েছে

প্রজাতন্ত্র দিবস ও কিছু কথা

কে দেব দাস


২৬ জানুয়ারি, প্রজাতন্ত্র দিবস সন্মন্ধে কিছু লিখতে গেলে সর্বাগ্ৰে যে কথাটি আমাদের মাথায় আসে :

" SOVERIGN  DEMOCRATIC REPUBLIC"  JUSTICE, LIBERTY, EQUALITY & FRATERNITY, which we received from British Raj. 

১৫ অগাষ্ট, ১৯৪৭ আমারা স্বাধীনতা অর্জন করেছিলাম এবং ২৬ জানুয়ারি ১৯৫০ ব্রিটিশ রাজ থেকে আমারা স্বাধীন প্রজাতন্ত্র দিবসের স্বীকৃতি পেয়েছিলাম।


সেই দিক থেকে সর্বাগ্ৰে যাকে স্মরণ করা উচিত তিনি হলেন ভারতের সংবিধানের রচয়িতা বাবা সাহেব ভীমরাও আম্ভেদকর। 

তাঁর কৃতিত্ব অনস্বীকার্য। উনার সন্মন্ধে দু'চারটে কথা না লিখলে ২৬ জানুয়ারীর মাহাত্ম অপূর্ণ থেকে যায়। 


মাহার কূলে জন্মেছিলেন বলে উনাকে অচ্ছুত্ হিসেবে তকমা দেওয়া হয়েছিল, যেটা আমাদের দেশের একটা কলংকিত অধ্যায়।


উণার পূর্বসূরি স্বামী বিবেকানন্দ বলেছিলেন মূর্খ, দরিদ্র, চন্ডাল, ম্লেচ্ছ, অস্পৃশ্য, মুছি, মেথর সবাই আমার ভাই।

সত্যি কি আমরা আজও জাত পাত, ছোঁয়া ছুত, ভেদাভেদের উর্দ্ধে উঠতে পেরেছি......? উত্তর টা সহজ। বোধ হয় না।


"যেখানে ভ্রুণের কোন জাত নেই, কিংবা রক্তের কোন জাত নেই,

আবার, জন্মলগ্নে সব জাতের ই মাতৃগর্ভেই ধারণ"

তবে কেন, মানুষ রূপে জন্ম নিলে করে বিভাজন?


যদি এটা সর্বৈব সত্য হয়, তবে কেন মাহার কূলে জন্ম নিলে অচ্ছুত বলা হয়।

কে দেবে তার ব্যাখা-----?  স্বয়ং ঈশ্বর----? নাকি ভন্ড ধার্মিক ব্যবস্থা -----?


তিনি ছিলেন একাধারে বিশিষ্ট পন্ডিত, রাজনীতি বিদ, দার্শনিক, অর্থনৈতিক বিদ, সমাজ সংস্কারক, ঐতিহাসিক, সুবক্তা, এ ছাড়া ও নানাবিধ ভূষণে ভূষিত ছিলেন তিনি।

যে সমস্ত প্রতিষ্ঠানে উনি শিক্ষা গ্ৰহন করেছিলেন:

Elphinstone High School, Columbia University, London School of Economics, Gray's inn, (Barrister)

উণার সমসাময়ীক কালের ব্যক্তিত্বদের থেকে উনি কোন অংশে কম ছিলেন না।

তবু ও এ হেন ব্যক্তিকে  অস্পৃশ্যতার স্বীকার হতে হয়েছিল, লাঞ্ছিত হতে হয়েছিল প্রতিটি পদে পদে।


স্কুলের সহপাঠীদের সাথে এক বেঞ্চে বসবার অধিকার ছিলনা উনার।

শেষে যদি উনার ছৌঁয়ায় উচ্চবর্ণের সন্তানরা অসুস্থ হয়ে পড়ে!

তাই তাঁর ঠাঁই হয়েছিল ক্লাসের একটি কোণে বস্তা পেতে নিচে বসবার।

ব্ল্যাকর্বোডে উনার লেখার অধিকার ছিলনা, কারণ ব্ল্যাকর্বোডের  সন্নিকটে উচ্চবর্ণের সন্তানদের টিফিন বক্স রাখা থাকতো।

শেষে যদি উচ্চবর্ণের সন্তানদের খাবারে উনার স্পর্শে  বিষক্রিয়া হয়ে যায়!


ঠিক, এই ভাবেই উনাকে ছাত্রাবস্থা থেকেই চরম হেনস্তার স্বীকার হতে হয়েছিল প্রতিনিয়ত।

উচ্চবর্ণের দাম্ভিকতা, ঊন্নাসিকতা, আম্ভেদকর কে শৈশবেই মরমে মরমে ধ্বংসে ছিল যত, প্রকাশ করিতে পারেনি তত। সে শুধু সমুদ্রের অতলে ডুবেছিল ডুবন্ত জাহাজের মত। 

সমুদ্রের সেই অতল গহবর থেকে ফিরে আসা কতটা দূরহ ছিল, ভাবলে শিহরিত হতে হয়।


কিন্তু তাঁর অদম্য ইচ্ছা শক্তি তাকে পরাভূত করতে পারেনি। অতি সাধারণ ব্যক্তি হলে হয়তো বা অপমানের জ্বালায় আত্মহননের পথ বেছে নিতেন। কিন্তু তিনি যে অপরাজেয়।

সমসাময়িক কালের তিনিই শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিত্ব হিসেবে পরিচিত, পরিগণিত।

এ হেন ব্যক্তির কর্ম নৈপুণ্যে  জহরলাল নেহরুর মন্ত্রীসভা উনাকে ভারতবর্ষের সংবিধান রচনার গুরুদায়িত্ব অর্পন করেছিলেন।


হে কর্মবীর, তোমাকে  যারা পদদলিত করেছিল তাঁদের লজ্জিত হবার কথা।

কিন্তু না----?  তুমি যে অস্পৃশ্য। শেষ জীবন পর্যন্ত তোমাকে বৈশম্যের  স্বীকার হতে হয়েছিল। শ্রেণী বিভাজন বিরোধী ছিলেন বলে তিনি কখনও মনুস্মৃতি মেনে নিতে পারেন নি।


রাজা রামমোহন রায় যেমন সতিদাহ প্রথা রদ করেছিলেন, 

ঈশ্বরচন্দ্র যেমন বিধবা বিবাহ প্রচলন করেছিলেন,

তুমি ও তেমনি দলিত সম্প্রদায়ের উত্থান প্রণয়ন করেছিলে।


তুমি দলিত সম্প্রদায়ের হয়ে ও সেই সময়কার উচ্চ বর্ণের শিক্ষিত ব্যক্তিদের থেকে কম মেধা সম্পন্ন ছিলেনা।

তবু ও উচ্চ বর্ণের লোকেরা তোমায় একাসনে ঠাঁই দিতে পারে নি, শুধু ধর্মের, জাতের গোড়ামীর জন্য।


তুমি বাধ্য হয়েছিলে হিন্দু ধর্ম ত্যাগ করে বৌদ্ধধর্ম গ্ৰহন করতে। তুমি সমাজে বৈষম্যের বিড়াম্বনা অনুধাবন করতে পেরেছিলে প্রতিটি পদে পদে। 

তাই দলিত সম্প্রদায়ের উন্নতিকল্পে সংরক্ষণ ব্যবস্থার প্রবর্তন করেছিলে।

হে কর্মবীর, সমাজ সংস্কারক, হে দলিতদের মসিহা,  বাবা সাহেব "ভীমরাও আম্ভেদকর" তোমায় শত শত নমন।


দেরিতে হলেও ভারতরত্ন পুরস্কার দিয়ে তোমায় যথাযোগ্য সম্মান প্রদর্শন করা হয়েছে।

তোমার আজীবন সমতার লড়াইকে সন্মান জানিয়ে তোমার জন্মদিন কে আমরা স্মরণ করি "Equality Day" and National Holiday হিসাবে।

আবার তোমার মৃত্যু দিন কে আমরা স্মরণ করি মহাপরিনির্বাণ দিবস উদযাপনের মধ্য দিয়ে।

হে কর্মযোগী, তোমায় শত শত নমন,"জয় ভীম "


*********************

পিছাবনি

অয়ন দাস


চন্দ্রবোড়া সাপটি ক্রুদ্ধ হয়ে হিসসসস করে একটানা এমন এক হিংস্র শব্দ করতে লাগল যে ঠিক মনে হতে লাগল যেন প্রেশারকুকারে সিটি দেওয়া হচ্ছে।

সাপুড়ে আমাদের দিকে তাকিয়ে হাসতে হাসতে বলল,ঘুম ভাঙালাম তো,তাই বাবু'র খুব গোঁসা হয়েছে।এবার সে সন্তর্পণে ঢাকনা খুলতেই একটা হলুদ আগুন যেন লকলকিয়ে উপরের দিকে উঠে গেল.. আমরা ভয়ে ছিটকে সরে এলাম।

সাপুড়ে আমাদের দিকে তাকিয়ে হাসতে হাসতে বলল,ভয় নাই বাবু,এর বিষদাঁত ভাঙা আছে।এ শুধু ওই ফোঁস ফোঁসই করতে পারে।


জায়গাটির নাম পিছাবনি।আমরা বেড়াতে এসেছি তাজপুর।সেখান থেকেই ঘুরতে ঘুরতে চলে এসেছি পূর্ব মেদিনীপুর জেলার এই পিছাবনি গ্রামে।

এই পিছাবনি গ্রামের নামকরণের একটি তাৎপর্য আছে।পিছাবনি শব্দের অর্থ হল আমরা পিছিয়ে যাব না।

নিস্তব্ধ গ্রামটিতে ঘুরতে ঘুরতে আমি ইতিহাসের পাতায় পৌঁছে যেতে লাগলাম।


১৯৩০ সাল।দেশ জুড়ে গান্ধীজী'র নেতৃত্বে শুরু হয়েছে সত্যাগ্রহ আন্দোলন। কাঁথিতে প্রথম গুলি চালাল পুলিশ।শহিদ হলেন দুই তরুণ।  আন্দোলন ছড়িয়ে পড়তে লাগল বিদ্যুৎ গতিতে।পিছাবনি গ্রামের বহু স্বেচ্ছাসেবক কে পুলিশ গ্রেপ্তার করলে আন্দোলন তীব্রতর হয়ে উঠল।এবার শুরু হল নির্দয় দমন।গ্রামে ঢুকে পুরুষ ও মহিলাদের নগ্ন করে পুকুরে ফেলে দিল পুলিশ, মহিলাদের নগ্ন করে রেখে আসা হল জঙ্গলে।শিশুরাও অত্যাচার থেকে রেহাই পায়নি।সব শেষে বাড়িতে আগুন লাগিয়ে দিত পুলিশ।

আন্দোলনকারী দের উপর অকথ্য অত্যাচার করা হত বলে মেদিনীপুর কেন্দ্রিয় কারাগারকে বলা হত বাংলার বাস্তিল।


ওই হাঁড়িতে কি আছে গো? জিজ্ঞাসা করলাম আমি।

সাপুড়ে এবার তার পান খাওয়া দাঁত বের করে হাসল।তার চোখে এক অদ্ভুত আলো আঁধারি আছে।কেমন একটা অপ্রাকৃত চাহনি।

সে হেসে বলল,ওর মধ্যে এক কালকেউটে কে রেখেছি বাবু,এখনো বিষদাঁত ভাঙা হয়নি।

আস্তে আস্তে মানুষ জন ফাঁকা হয়ে গেছে,আমিই দাঁড়িয়ে রয়েছি।জায়গাটি নির্জন, সামনে একটি প্রাচীন ভাঙা শিবমন্দির।একটি মস্ত প্রাচীন অশ্বত্থ গাছের ছায়ায় দাঁড়িয়ে আছি আমরা।

লোকটি একটি বিড়ি আমার দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল, সাহেবের চলে নাকি?

হাঁড়ির ভিতর একটি বিষধর কালকেউটে সাপ।সাপটি আমায় যেন আকর্ষণ করতে লাগল।লোকটির কাছ থেকে বিড়ি নিয়ে আমি বললাম,সাপটাকে একবার দেখা যায়?


১৯৪২ সাল।দেশ জুড়ে শুরু হয়েছে ভারত ছাড়ো আন্দোলন। গতকাল মিটিং এ ঠিক হয়েছে মেদিনীপুর জেলার সকল থানা ও অন্যান্য সরকারি কার্যালয় দখল করে নেওয়া  হবে।যেভাবেই হোক মেদিনীপুর জেলাকে পরিণত করতে হবে মুক্তাঞ্চলে,উৎখাত করতে হবে বৃটিশ দের।


 ছয় হাজার স্বেচ্ছাসেবক সহ একটি দল তমলুক থানা দখলের উদ্দেশ্যে একটি মিছিল বের করল।মিছিলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন এক তিয়াত্তর বছর বয়সী বৃদ্ধা। নাম মাতঙ্গিনী হাজরা।মাতঙ্গিনী ১৯৩২ সালে আইন অমান্য আন্দোলনের সময় প্রথম গ্রেপ্তার বরণ করেছিলেন।আজ মাতঙ্গিনী মেদিনীপুর জেলার মুখ।

ফৌজদারি আদালত ভবনের উত্তর দিক থেকে তমলুক থানার দিকে এগিয়ে আসছে এক বিশাল মিছিল।একেবারে সামনে পতাকা  হাতে মাতঙ্গিনী হাজরা।

সরকার থেকে জারি করা হয়েছে ১৪৪ ধারা।মিছিল ১৪৪ ধারা কে অমান্য করে এগিয়ে আসতে লাগল।

থানার সামনে রাইফেল হাতে পজিশন নিল সুসজ্জিত বৃটিশ পুলিশ বাহিনী। শুরু হল গুলি বর্ষণ।গুলি চলতে লাগল।আন্দোলনরত জনতা চিৎকার করে উঠল,পিছাবনি,আমরা পিছাবনি।

গুলি এসে লাগল মাতঙ্গিনী হাজরার হাতে।মাতঙ্গিনী তাঁর সহযোদ্ধাদের বললেন,তোমরা এগিয়ে যাও,দখল কর থানা।আরেকটি গুলি এসে ফুটো করে দিল কপাল।তবুও এগোতে থাকলেন তিনি।একসময় ঝাঁকে ঝাঁকে গুলি এসে ঝাঁঝরা করে দিল মাতঙ্গিনী হাজরার শরীর। একসময় রাস্তার উপর লুটিয়ে পড়লেন নিথর মাতঙ্গিনী,হাতে তখনও  ধরা রয়েছে পতাকা।


হাঁড়ির ঢাকনা খুলতেই একটা কালো রঙের আগুন যেন ফুঁসে উঠল। কালকেউটে সাপটি স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রয়েছে আমার দিকে।সাপুড়ের হাতে একটি গাছের ডাল।সেই ছোট ডালটি সাপের মাথায় ছোঁয়াতেই সাপটি হাঁড়ির ভিতর নেতিয়ে পড়ল।লোকটি বলল,বিষদাঁত ভাঙা হয় নাই বাবু,তাই একটু সাবধান হচ্ছি।


আপনি কতদিন ধরে সাপখেলা দেখান?


আমার বাবা ছিলেন সাপুড়ে।সেই ছোট থেকে সাপ ঘাঁটছি বাবু।দু এক বার কামড়ও খেয়েছি।এ আমাদের জাত ব্যবসা। মা মনসার দয়ায় বেঁচে আছি। লোকটি দুই হাত জড়ো করে কপালে ঠেকালো।

তারপর আরেকটা বিড়ি ধরিয়ে গভীর এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,আমফান ঝড় সব ওলোটপালোট করে দিল বাবু,আমরা এক্কেবারে শেষ হয়ে গেলাম।আমার বাড়ি, ঘর দোর,দোকান পাট সব ধ্বংস হয়ে গেল বাবু,সব ধ্বংস হয়ে গেল..ভগবানের মার দুনিয়ার বার।


আপনারা আমফানের পর কোনো সরকারি সাহায্য পাননি?জিজ্ঞাসা করলাম আমি।


আমার প্রশ্নের উত্তরে সাপুড়ে হাসতে লাগল।বলল,সরকারি সাহায্য টাহায্য সব এসেছিল শুনেছি,কিন্তু ওরা নিজেদের মধ্যেই সব ভাগ বাটোয়ারা করে নিয়ে নিল।আমাদের ভাগ্যে আর কিছু জুটলনা।


ওরা মানে?


পার্টি'র লোকজনরা বাবু।


থানায় জানিয়েছিলেন যে কিছু পাননি?


ওদের নামে বলে মার খাব নাকি?পুলিশ সব জানে বাবু।ওদের বিরুদ্ধে নালিশ করলে এলাকা ছেড়ে পালাতে হবে।আমরা কিচ্ছু পাইনি। যাদের তেমন ক্ষতি হয়নি তাদের কাছে রিলিফ গেছে,যাদের দরকার ছিল তারা কিছু পায়নি বাবু।

লোকটি আড়মোড়া ভেঙে বলল,পিছাবনি বাবু,পিছাবনি...ঠিক দুমুঠো অন্ন...  মা মনসা জুটিয়ে দেবেন।


আমার মনে হল,আমরা সবাই বিষদাঁত ভেঙে যাওয়া এক একটি সাপ,যারা শুধু মাঝেমাঝে ফোঁস করতেই পারি,আমরা সবাই এক অদৃশ্য সাপুড়ের হাতে বন্দি।


শহরের রাস্তায় রয়েছে রাজনৈতিক নেতা নেত্রী দের বিশাল বিশাল কাট আউট।কত হাজার হাজার টাকা এইসব কাট আউটের পিছনে খরচ করা হয় কে জানে!কিভাবে যোগাড় হয় এত টাকা!


সাপুড়ে রা জানে কিভাবে সাপদের বিষদাঁত ভেঙে দিয়ে তাদের পুতুল করে রাখতে হয়।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ