প্রবন্ধ - শতবর্ষে কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য || মৃদুলা গরাং ( সমাপ্তিকা)




পোস্ট বার দেখা হয়েছে

মাত্র ২১ বছরের এক সংক্ষিপ্ত সাহিত্যজীবন যখন আখ্যায়িত হয় 'কিশোরকবি' বা 'গণমানুষের কবি' নামে 

তখন  একথা নির্দ্বিধায় বলা যায়, কবির লেখনীময় ছিল সময়ের সঙ্গে বা সময়ের বিরুদ্ধে এক দুর্দান্ত সম্মুখ সমর।

হ্যাঁ, বলছি কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের কথা। যিনি ১৯২৬ সালের ১৫ ই আগস্ট জন্মগ্রহণ করেন, মূলতঃ ৪০ এর দশকজুড়ে শোষন ও বঞ্চনার বিরুদ্ধে এবং নতুন যৌবনের উদ্দেশ্যে একের পর এক দুরন্ত সাহিত্য সৃষ্টি করেন এবং মাত্র ২০ বছর ৯ মাস বয়সে, ক্ষয় রোগে যাঁর জীবনাবসান হয়। ২০২৬ সালে তাঁর জন্মের শতবর্ষ উদযাপন করছি আমরা। কিন্তু তাঁর সৃষ্টি শুধুই উদযাপনের বিষয় নয়, তা চিরকালীন সত্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত।

তাঁর মত করে কে ভাবতে পেরেছিল ক্ষুধার মত ব্যক্তিগত অনুভূতি একটা ঝলসানো রুটি পেতে, সৌরজগতের সবথেকে সুন্দর উপগ্রহ চাঁদের পায়ে পড়বে !

তাঁর জন্মশতবর্ষের চৌকাঠে দাঁড়িয়েও আমরা আগামীর শিশুর জন্য এ পৃথিবী বাসযোগ্য করে যাবো, একথা একবারও বলতে পারছিনা উদাত্ত ঘোষনায়।

সময়ের থেকে কয়েক ধাপ এগিয়ে না থাকলে তা কখনোই বলা সম্ভব নয়।

ভারতবর্ষ আজ দাঁড়িয়ে তার স্বাধীনতার আশিতম বর্ষে। তবু  ক্ষুদিরাম বসুর মত করে আজও আমরা আঠারো বছর বয়সের বুকে আগুন জ্বালিয়ে সত্য মিথ্যা পরখ করতে সাহস যোগতে পারিনি এ প্রজন্মের বুকে । যা পেরেছিলেন কিশোর কবি  তাঁর লেখনীর মাধ্যমে,   রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও রবীন্দ্র সাহিত্যের প্রতি গভীর শ্রদ্ধাও তাঁকে  রবীন্দ্র অনুসারী করে তুলতে পারেনি সাহিত্য নির্মানে। নিজস্বতার নিনাদ ছিল তাঁর প্রতিটি প্রতিবাদী সৃজনে। নিজের সময়ের জন্য বলা যায় নিজের এক অনন্য ভাষাজগৎ তৈরী করেছিলেন সুকান্ত ভট্টাচার্য। তবুও নিতান্তই তাঁর বিরুদ্ধাচরণ করতে গিয়ে তাঁকে শুধুমাত্র রাজনৈতিক মতাদর্শের কবি হিসাবে গণ্য করলে, চরম উপেক্ষিত হয় তাঁর কল্পনাশক্তি, মানবিকতা ও কবিতা সম্বন্ধে নিগুঢ় শিল্পবোধ।

তিনি রোমান্টিক সৌন্দর্য্যের চেয়ে সাম্যবাদ ও শ্রমজীবী মানুষের দারিদ্র্য, ক্ষুধা ও সামাজিক বৈষম্যকে অধিক গুরুত্ব দিয়েছিলেন কবিতা নির্মাণে।

স্বল্প আয়ুষ্কাল হলেও বাংলা সাহিত্যাকাশে তিনি এক উজ্জ্বল জ্যোতিষ্ক, স্বতন্ত্র কন্ঠস্বর। কারণ মাটির কাছে থাকা জীবনের প্রতি তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি ছিল অত্যন্ত পরিণত ও বাস্তবিক।

তিনি  আমাদের দেখাতে পেরেছেন যে, কবিতা কেবল সৌন্দর্যের কথা বলবে না, মানুষের জীবনের অসম লড়াইয়ের কথাও বলবে  'দুর্মর' 'একটি মোরগের কাহিনী ' , 'হে মহাজীবন' , 'রানার' , 'বোধন'  , ' দেশলাই কাঠি ' , 'কৃষকের গান' ইত্যাদি ও আরো স্মরণীয় কবিতার মধ্যে দিয়ে। আবার ' এই নিবিড় বাদল দিনে ' , ' ওগো কবি তুমি আপন ভোলা' প্রভৃতি কবিতায় তিনি নরম সুর তুলে ধরেছেন জীবনের। যা তাঁর সহজাত প্রতিববাদী কলমের বাইরের কবি সত্তাকে চেনায়।

আজকে তাঁর জন্মের শতবর্ষে পদার্পন করে আমরা যেন ভুলে না যাই তাঁর কবিতাগুলি কেবল পাঠ বা আবৃত্তির বিষয় নয়, তা আমাদের চেতনার শেকড়ে নাড়া দেয় সমূলে। আমরা যেন প্রতিটি জীবনকে আঁকতে পারি এই কবিতাগুলোর অন্তর্নিহিত তাৎপর্যকে সামনে রেখে।

কেবল মালা দিয়ে শ্রদ্ধাজ্ঞাপন করা নয় সুকান্ত যেন কবিসত্তা পেরিয়ে দর্শন হয়ে থাকেন আমাদের জীবনের।

এক অনন্য স্বল্প জীবনকাল যে চিফ রেখে গেছে নিজের, মহাকালের নিকট তা শতবর্ষ নয় কেবল, কয়েক শত বর্ষের জন্য, আগামী কয়েক প্রজন্মের জন্য, বাংলা সাহিত্যের কল্যাণের জন্য যেন বেঁধে রাখতে পারি আমরা কালোত্তীর্ণ মলাটে। তবেই এর সার্থকতা।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ