পোস্ট বার দেখা হয়েছে
মৃত্যুর মুখোমুখি রবীন্দ্রনাথ
মৃত্যু নিয়ে ভাবতে বসলে আমার বারবার রবীন্দ্রনাথের কথাই মনে পড়ে। এমন নয় যে বাংলা সাহিত্যে আর কেউ মৃত্যুচিন্তা নিয়ে লেখেননি—কিন্তু রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুচিন্তার মধ্যে একটা আশ্চর্য প্রশান্তি ছিল, যা অন্য কারো লেখায় সেভাবে খুঁজে পাওয়া যায় না। মনে হয়, তিনি মৃত্যুকে ভয় পাননি কখনো, বরং তার দিকে তাকিয়েছেন এমন এক পুরনো বন্ধুর মতো, যার সঙ্গে দেখা হবেই, কোনো একদিন।
এই প্রশান্তি অবশ্য এমনি এমনি আসেনি। রবীন্দ্রনাথের জীবনে মৃত্যু এসেছিল বারবার, নির্মমভাবে, একের পর এক আপনজনকে কেড়ে নিয়ে। কাদম্বরী দেবীর আত্মহত্যা, যখন তিনি নিজে সবে তেইশ বছরের যুবক—সেই ধাক্কা তাঁর ভেতরে চিরকালের একটা ক্ষত রেখে গিয়েছিল বলে অনেকে মনে করেন। তারপর একে একে স্ত্রী মৃণালিনী দেবী, কন্যা রেণুকা, পুত্র শমীন্দ্রনাথ, আরেক কন্যা মাধুরীলতা—জীবনের মধ্যবয়সে এসে তিনি প্রায় নিঃস্ব হয়ে গিয়েছিলেন প্রিয়জন হারানোর শোকে। একজন মানুষ যিনি এত মৃত্যু দেখেছেন এত কাছ থেকে, তাঁর কলমে মৃত্যুচিন্তা যে গভীর হবে, তাতে আশ্চর্য কী।
কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় এটাই যে, এত শোকের মধ্যেও রবীন্দ্রনাথ মৃত্যুকে কখনো অভিশাপ হিসেবে দেখেননি। "গীতাঞ্জলি"-র পাতায় পাতায় মৃত্যুকে তিনি ডেকেছেন প্রায় প্রেমিকের মতো করে, যেন মৃত্যু কোনো শত্রু নয়, বরং জীবনেরই একটা পরিপূরক অংশ, যাকে ছাড়া জীবনের কোনো পূর্ণতা নেই। মৃত্যুকে তিনি দেখেছেন একটা দরজা হিসেবে, যা বন্ধ হয়ে যাওয়া নয়, বরং খুলে যাওয়া—এক অসীমের দিকে, এক অজানা আনন্দলোকের দিকে।
এই দর্শনটা বোঝার জন্য একটু পেছনে ফিরে তাকাতে হয়। রবীন্দ্রনাথের পারিবারিক পরিবেশে উপনিষদের প্রভাব ছিল গভীর। ব্রাহ্মধর্মের যে ঐতিহ্যে তিনি বেড়ে উঠেছিলেন, তাতে আত্মার অবিনশ্বরতার ধারণাটা প্রবলভাবে উপস্থিত ছিল। দেহের মৃত্যু হলেও আত্মা যে থেকে যায়, বৃহত্তর কোনো সত্তার সঙ্গে মিলিত হয়—এই বিশ্বাস তাঁর মধ্যে গভীরভাবে প্রোথিত ছিল ছেলেবেলা থেকেই। কিন্তু নিছক ধর্মীয় বিশ্বাস দিয়ে তাঁর মৃত্যুচিন্তাকে ব্যাখ্যা করলে ভুল হবে। রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুচিন্তা ছিল অনেক বেশি ব্যক্তিগত, অনেক বেশি অনুভবের জিনিস, কোনো সংগঠিত ধর্মের গণ্ডিতে বাঁধা নয়।
তাঁর কবিতায় বারবার একটা চিত্রকল্প ফিরে আসে—নদীর মতো জীবন, যা বয়ে চলে সমুদ্রের দিকে, আর মৃত্যু সেই সমুদ্রের সঙ্গে মিলনের মুহূর্ত। এই মিলনকে তিনি দেখেছেন যন্ত্রণা হিসেবে নয়, বরং একটা সম্পূর্ণতা হিসেবে। যেমন নদী সমুদ্রে মিশে গিয়ে নিজের পরিচয় হারায় না, বরং আরও বিশাল কিছুর অংশ হয়ে ওঠে, তেমনি মানুষও মৃত্যুর মধ্য দিয়ে বিলীন হয় না, বরং মিশে যায় সেই মহাজীবনের সঙ্গে, যা তার আগে ছিল, পরেও থাকবে।
শান্তিনিকেতনের আশ্রমজীবনে প্রকৃতির সঙ্গে নিবিড় সান্নিধ্যও তাঁর এই দর্শনকে গভীর করেছিল বলে মনে হয়। ঋতুচক্রের পালাবদল, পাতা ঝরা আর নতুন কুঁড়ি গজানো, একটা গাছের মরে যাওয়া আর তার বীজ থেকে নতুন গাছের জন্ম—এই প্রাকৃতিক চক্রের মধ্যে তিনি মৃত্যুর একটা যুক্তিসংগত, প্রায় সুন্দর রূপ খুঁজে পেয়েছিলেন। মৃত্যু তাঁর কাছে বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা ছিল না, বরং জীবনের বৃহত্তর ছন্দেরই একটা অনিবার্য অংশ।
তবে এই কথা বললে ভুল হবে যে রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুচিন্তায় কোনো বেদনা ছিল না। "স্মরণ" কাব্যগ্রন্থের কবিতাগুলি পড়লে বোঝা যায়, প্রিয়জন হারানোর যন্ত্রণা তাঁকে কতটা বিদ্ধ করেছিল। কিন্তু সেই বেদনার মধ্য দিয়েই তিনি পৌঁছেছিলেন একটা গভীরতর উপলব্ধিতে—যে শোক আর আনন্দ, জীবন আর মৃত্যু, আসলে একই সত্তার দুই দিক, একটাকে বাদ দিয়ে আরেকটাকে বোঝা যায় না। এই দ্বৈততার মধ্যেই তিনি খুঁজে পেয়েছিলেন এক অদ্ভুত সামঞ্জস্য।
শেষ জীবনে, যখন শরীর ভেঙে পড়েছে, বার্ধক্য আর অসুস্থতা তাঁকে গ্রাস করছে, তখনো তাঁর লেখায় মৃত্যুর প্রতি সেই পুরনো সহজ ভাবটাই ফিরে ফিরে এসেছে। মৃত্যুশয্যায় লেখা তাঁর শেষ কবিতাগুলিতে ভয়ের কোনো চিহ্ন নেই, আছে শুধু একটা শান্ত জিজ্ঞাসা, একটা প্রস্তুতি। যেন সারাজীবন ধরে তিনি এই শেষ যাত্রার জন্য নিজেকে তৈরি করে এসেছেন, আর এখন, যখন সময় এসেছে, তিনি প্রস্তুত, নির্ভার।
আজকের এই অস্থির সময়ে, যখন মৃত্যুকে আমরা এড়িয়ে চলতে চাই, তার কথা বলতেও দ্বিধা বোধ করি, তখন রবীন্দ্রনাথের এই মৃত্যুচিন্তা যেন এক আশ্চর্য প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে ফিরে আসে। তিনি আমাদের শিখিয়ে যান, মৃত্যুকে ভয় না পেয়ে তার দিকে তাকানো যায়, তাকে জীবনের শত্রু নয়, বরং সহচর হিসেবে গ্রহণ করা যায়। আর এই গ্রহণের মধ্যেই লুকিয়ে থাকে জীবনকে সম্পূর্ণভাবে বাঁচার এক গভীর শিক্ষা—কারণ যে মৃত্যুকে মেনে নিতে শেখে, সে-ই বোধহয় জীবনকেও সবচেয়ে ভালোভাবে বুঝতে পারে।
রবীন্দ্রনাথ চলে গেছেন আটাত্তর বছর হয়ে গেল প্রায়, কিন্তু তাঁর এই মৃত্যুচিন্তা আজও আমাদের সঙ্গী হয়ে আছে, একটা প্রদীপের মতো, যা অন্ধকারকে ভয় দেখায় না, বরং তাকে চিনতে শেখায়।

0 মন্তব্যসমূহ