২২ শে শ্রাবণ শ্রদ্ধাঞ্জলি || দেবাশীষ ভট্টাচার্য্য




পোস্ট বার দেখা হয়েছে


**❝...সত্যেরে সে পায়,

আপন আলোকে ধৌত অন্তরে অন্তরে।

কিছুতে পারে না তারে প্রবঞ্চিতে,

শেষ পুরস্কার নিয়ে যায় সে যে

আপন ভাণ্ডারে...❞**


শেষযাত্রার পূর্বক্ষণ

অন্তরের সেই সত্য নিয়েই হয়তো তিনি চলে গেছেন পৃথিবী ছেড়ে।

প্রয়াণের কিছুদিন আগে তিনি রচনা করেন তাঁর শেষ কবিতা—

"তোমার সৃষ্টির পথ রেখেছ আকীর্ণ করি,

বিচিত্র ছলনাজালে হে ছলনাময়ী..."

মৃত্যুকে তিনি বহুবার খুব কাছ থেকে দেখেছেন। একে একে হারিয়েছেন প্রিয়জনদের। বাইশে শ্রাবণ তাঁর জীবনেও একটি শোকের দিন—এই দিনেই তিনি পান প্রিয় দৌহিত্র নীতিন্দ্রনাথের মৃত্যুসংবাদ।

এরও আগে নতুন বৌঠান কাদম্বরী দেবীর আত্মহত্যা, স্ত্রী মৃণালিনী দেবীর অকালপ্রয়াণ, কন্যা বেলা ও রেণুকার মৃত্যু—সব মিলিয়ে ব্যক্তিজীবন ছিল গভীর বেদনাময়।

সৃষ্টির শেষ আলো

মৃত্যুর সাত দিন আগেও তিনি ছিলেন সৃষ্টিশীল। লিখেছিলেন—

"তোমার সৃষ্টির পথ রেখেছো আকীর্ণ করি..."

অসংখ্য শারীরিক যন্ত্রণা সত্ত্বেও তাঁর সৃষ্টিশক্তি কখনও থেমে যায়নি।

শিক্ষার স্বপ্ন : বিশ্বভারতী

রবীন্দ্রনাথের রাজনৈতিক ও সামাজিক চিন্তার অন্যতম ভিত্তি ছিল শিক্ষার সংস্কার।

১৯১৮ সালে তিনি বিশ্বভারতী প্রতিষ্ঠার কাজ শুরু করেন। অর্থসংকটে নোবেল পুরস্কারের সম্পূর্ণ অর্থ বিদ্যালয়ের জন্য দান করেন। এমনকি স্ত্রী মৃণালিনী দেবীর অলংকারও বিক্রি করতে হয়েছিল। বিদ্যালয়ের জন্য অর্থ সংগ্রহে ইউরোপ ও আমেরিকা সফরও করেন।

ব্যক্তিজীবনের শোকগাথা

১৯০২ সালে মৃণালিনী দেবীর মৃত্যু।

১৯০৩ সালে কন্যা রেণুকার মৃত্যু।

অসুস্থ রেণুর শিয়রে বসেই তিনি রচনা করেন অমর গান—

"আজ জ্যোৎস্না রাতে সবাই গেছে বনে..."

রবীন্দ্রনাথ ও চলচ্চিত্র

• ১৯৩৭ সালে 'মুক্তি' চলচ্চিত্রে প্রথম রবীন্দ্রসংগীত ব্যবহৃত হয়।

• সংগীত পরিচালনায় ছিলেন পঙ্কজ কুমার মল্লিক।

• রবীন্দ্রনাথ পরিচালিত একমাত্র চলচ্চিত্র "নটীর পূজা"।

• ১৯২৯ সালে "তপতী" চলচ্চিত্রে তিনি নিজেও অভিনয় করেছিলেন।

শেষ অধ্যায়

মূত্রনালীর জটিল অসুস্থতায় আক্রান্ত কবির জোড়াসাঁকোর বাড়িতেই অস্ত্রোপচার করা হয়। অ্যানেস্থেসিয়া ছাড়াই সেই অপারেশন হয়েছিল। পরে সংক্রমণ দেখা দেয় এবং অসহনীয় যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে তিনি ২২ শ্রাবণ, ১৩৪৮ বঙ্গাব্দ (৭ আগস্ট ১৯৪১)-এ পরলোকগমন করেন।

শেষ উচ্চারণ

"অনায়াসে যে পেরেছে ছলনা সহিতে,

সে পায় তোমার হাতে

শান্তির অক্ষয় অধিকার..."

নজরুলের শ্রদ্ধাঞ্জলি

"দুপুরের রবি পড়িয়াছে ঢলে অস্তপারে কোলে,

বাংলার কবি, শ্যাম বাংলার হৃদয়ের ছবি,

তুমি চলে যাবে বলে

শ্রাবণের মেঘ ছুটে এলো দলে দলে।"

— কাজী নজরুল ইসলাম

বৃক্ষরোপণ উৎসব

১৩৪৯ বঙ্গাব্দ থেকে শান্তিনিকেতনে ২২ শ্রাবণ পালন করা হয় বৃক্ষরোপণ উৎসব হিসেবে।

নিজের জীবনকালেই রবীন্দ্রনাথ বৃক্ষরোপণকে উৎসবে পরিণত করেছিলেন। ১৩৩২ বঙ্গাব্দের ২৫ বৈশাখ তিনি নিজ হাতে পঞ্চবটী প্রতিষ্ঠা করেন।

মানবতার কবি

প্লেগ, ম্যালেরিয়া ও দুর্ভিক্ষের সময় তিনি শুধু লিখেই থেমে থাকেননি; হাসপাতাল নির্মাণ, জনসচেতনতা এবং কৃষকের কল্যাণে কৃষি সমবায় ব্যাংক প্রতিষ্ঠায় সক্রিয় ভূমিকা নিয়েছিলেন।

তিনি লিখেছিলেন—

"ম্যালেরিয়া-প্লেগ-দুর্ভিক্ষ কেবল উপলক্ষমাত্র... মূল ব্যাধি দেশের মজ্জার মধ্যে প্রবেশ করিয়াছে।"

অমর বাণী

"মরণ রে, তুঁহু মম শ্যাম সমান..."

"আছে দুঃখ, আছে মৃত্যু বিরহদহন লাগে..."

"তোমার অসীমে প্রাণমন লয়ে..."

"যেতে যদি হয় হবে— যাব, যাব, যাব তবে..."

"শুধু যাওয়া আসা, শুধু স্রোতে ভাসা..."

সমাপ্তি

"আছে দুঃখ, আছে মৃত্যু বিরহদহন লাগে,

তবুও শান্তি, তবু আনন্দ, তবু অনন্ত জাগে..."

২২ শ্রাবণের শ্রদ্ধাঞ্জলি—

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের চিরন্তন স্মৃতির প্রতি বিনম্র প্রণাম।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ