পোস্ট বার দেখা হয়েছে
কিছু মানুষ সময়ের ক্যালেন্ডারে আবদ্ধ থাকেন না— তাঁরা যুগের পর যুগ মানুষের বিবেক হয়ে অনির্বাণ থাকেন।
আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায় তেমনই এক আলোপুরুষ।
তাঁর কাছে রসায়ন শুধু পরীক্ষাগারের বিষয় ছিল না— তা হয়ে উঠেছিল দেশগঠনের অঙ্গীকার, মানবকল্যাণের এক সাধনা।
তিনি বিশ্বাস করতেন— যে জ্ঞান মানুষের কাজে লাগে না, সে জ্ঞান অসম্পূর্ণ। যে শিক্ষা মানুষের চরিত্র গড়ে না, সে শিক্ষা অপূর্ণ।
গবেষণাগারের নীরবতা থেকে তিনি একদিন পৌঁছে গিয়েছিলেন মানুষের ঘরে ঘরে।
মাত্র ষোলো টাকা পুঁজি নিয়ে তিনি গড়ে তুলেছিলেন বেঙ্গল কেমিক্যাল। এটি শুধুমাত্র একটি প্রতিষ্ঠান নয়, স্বনির্ভর ভারতের এক স্বপ্নের মাইলফলক।
তাঁর আবিষ্কৃত মারকিউরাস নাইট্রাইট বিশ্ববিজ্ঞানের দরবারে বাংলার নাম লিখেছিল গৌরবের অক্ষরে।
কিন্তু তাঁর সর্বশ্রেষ্ঠ আবিষ্কার কোনো রাসায়নিক যৌগ নয়— মানুষের চিন্তার স্বাধীনতা।
তিনি বলতেন— প্রশ্ন করো।
প্রমাণ ছাড়া কিছু বিশ্বাস কোরো না। ভয় নয়, যুক্তিই মানুষের প্রকৃত শক্তি।
চন্দ্রগ্রহণের অন্ধবিশ্বাস ভাঙাতে তিনি নিরলস শিক্ষা দিয়েছেন। তবু দেখেছেন— শিক্ষিত মানুষও কখনো কখনো ভয়ের কাছে আত্মসমর্পণ করেছে।
তখন তাঁর কণ্ঠে ধ্বনিত হয়েছিল সেই চিরস্মরণীয় আক্ষেপ—
"আমি ছাত্রদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা বুঝাইলাম যে চন্দ্রগ্রহণের সময় আহার করিলে দোষ নাই, কিন্তু গ্রহণ হইলেই তাহারা সব ভুলিয়া গেল।"
আজও তাঁর সেই কথার মধ্যে আমরা শুনতে পাই বিজ্ঞানমনস্ক ভারতের অসমাপ্ত আহ্বান।
তিনি ছিলেন একজন আদর্শ শিক্ষক।
দরিদ্র ছাত্রের হাতে নিজের অর্থে তুলে দিয়েছেন বই। দুর্ভিক্ষে, বন্যায় মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন নীরব সেবকের মতো।
তিনি প্রমাণ করেছিলেন— ল্যাবরেটরির সাদা অ্যাপ্রনের চেয়েও মানুষের চোখের জল মুছে দেওয়া অনেক বড় মানবিক বিজ্ঞান।
তাঁর জীবন যেন বলেছিল—
স্বদেশপ্রেম মানে শুধু আবেগ নয়, স্বদেশকে কর্মে শক্তিশালী করে তোলা।
আজ আমাদের রকেট গ্রহান্তরে পাড়ি দেয়, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বহুমুখী প্রয়োগ অসম্ভবকে সম্ভব করে তোলে।
এ সময় যদি কুসংস্কারের অন্ধকারে মনকে বন্দী রাখি, তবে আচার্যের শিক্ষা যে এখনও অসম্পূর্ণ রয়ে যায় .....
এসো, আমরা প্রশ্ন করতে শিখি। ভাবতে শিখি। পরীক্ষা করতে শিখি।
বিজ্ঞানকে করি মানবকল্যাণের শক্তি। জ্ঞানকে করি দেশসেবার অর্ঘ্য।
যুক্তির আলোয় গড়ে তুলি এক মানবিক, স্বনির্ভর, কুসংস্কারমুক্ত ভারতবর্ষ।
আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়—
তুমি শুধু এক নিবেদিতপ্রাণ বিজ্ঞান সাধক নও, তুমি যুক্তির দীপশিখা, স্বদেশচেতনার অগ্নিস্ফুলিঙ্গ, মানবসেবার এক অমলিন প্রতীক।
যতদিন প্রশ্ন জাগবে সচেতন মানুষের মনে, ততদিন তুমি বেঁচে থাকবে প্রবল ভাবে।
যতদিন যুক্তির দীপ জ্বলবে অন্ধকারের বিরুদ্ধে,
ততদিন তুমি আমাদের চিরন্তন প্রেরণা রূপে থাকবে অনির্বাণ।
তুমি বলেছিলে -
"জ্ঞান তখনই সত্য,
যখন তা মানুষের মুক্তির পথ দেখায়।"
আমাদের বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলি গ্রহণ করুন ভূমিলগ্ন মানুষ, নিমগ্ন বিজ্ঞানী, উদ্যোগপতি আচার্য।
----------------------------------
রচনা কাল- ০৩.০৮.২০২৬
কলকাতা

0 মন্তব্যসমূহ