পোস্ট বার দেখা হয়েছে
সৃজণশীল সমস্ত মাধ্যমেই রবীন্দ্রনাথের ছোঁয়ায় সকল বিষয়গুলি শিখর সম উচ্চতায় নিয়ে গেছে তাঁর সৌকর্য্য, বিন্যাসে, প্রকাশভঙ্গি, এবং সর্বোপরি শৈল্পিক সত্তায়। তাঁর সংগীত, গীতিনাট্য, নৃত্যনাট্য, রূপক নাটক, উপন্যাস, প্রবন্ধ, এবং বিশেষ করে অজস্র কবিতার সমুদ্র ধারায় বিপুল ঐশ্বর্য্য দিয়ে সাজিয়ে তুলেছে বাংলার সাহিত্য ও সংস্কৃতি। কোনো বিশেষ মাধ্যম কেই শুধুমাত্র রবীন্দ্রনাথেকে সীমায় রাখা যায় না, এমনই তাঁর বিস্তৃতি। তবুও এই প্রবন্ধে আমরা শুধু আলোকপাত করবো তাঁর সংগীত রচনা এবং ভারতীয় রাগ সংগীতের অন্যতম প্রধান ঠাট রাগ ভৈরবীর এবং ঠাট রাগ ভৈরবের প্রভাবে তাঁর সংগীতে কতখানি উজ্জ্বলতম হয়ে উঠেছে সেই প্রসঙ্গ টি।রাগ ভৈরব রাগ পরিচয়অতি প্রাচীন এই রাগটি বিভিন্ন নামে প্রচলিত। কখনো ভইরো, অনেকে ভ্যাঁইরও, কেউ কেউ মানব ভৈরব ও বলে থাকেন ভৈরব রাগটিকে। এটি ভৈরব ঠাটের রাগ। জাতি- সম্পূর্ণ। রে, ধা কোমল, বাকি সকল স্বর শুদ্ধ। রাগটির প্রকাশের সময়কাল বিভিন্ন সংগীত শাস্ত্রে প্রাতঃ কালীন সন্ধি প্রকাশ রাগ। কোমল ধৈবতের আন্দোলনের ফলস্বরূপ কোমল নিসাদের ও ইষৎ প্রয়োগ হয়। 'রে' স্বরটি অতি কোমল ও অবরোহে বেশি প্রাধান্য পায়। এর সম প্রকৃতির রাগ গুলি হল কালেংড়া বা কলিংড়া এবং রামকেলি।এই রাগটির বাদী স্বর 'সা', সংবাদী স্বর কোমল 'রে'। রাগটি উত্তরাঙ্গ প্রধান। প্রকৃতি শান্ত, গম্ভীর। ন্যাস স্বর কোমল রে মা পা কোমল ধা।দক্ষিণ ভারতীয় সগীতে এর সম প্রকৃতি রাগ মায়া মানব গৌড়। " সংগীত পারিজাত " গ্রন্থে এই রাগে ঋষভ ও পঞ্চম বর্জিত। " রাগমালা " য় কোমল গান্ধার, কোমল নিষাদ প্রয়োগ উল্লেখিত। ভারতীয় রাগশাস্ত্রে এই রাগটিকে করুনা ও নৈরাশ্য এর প্রতীক হিসাবে কল্পিত। যদিও বর্তমানে এই রাগ পরিবেশনে গম্ভীরতা ও গভীর প্রশাস্তির ছায়া থাকে। এবার একটু পৌরাণিক আলোচনায় ভৈরব উৎপত্তির বিষয়ে একটু আলোকপাত করা যাক। যদিও সগীত আলোচনায় এর বিশেষ কোনো ভূমিকা নেই। কথিত আছে, পুরাকালে অন্ধকাসুরের সঙ্গে মহাদেবের ঘোরতর যুদ্ধ হয়। তখন অন্ধক অসুর মহাদেবের মস্তকে গদাঘাত করলে মহাদেবের মস্তক থেকে শোনিত ধারা চার ভাগে বিভক্ত হয়ে নির্গত হয়।এই শোনিত ধারা থেকেই ভৈরব গণের উৎপত্তি। পূর্বদিকের ধারা হুতাশুন সদৃশ চন্দ্রহারের আকারে গজদন্ত বিদ্যারাজ নামে এক ভৈরব উত্থিত হয়। পশ্চিম ধারা থেকে উদ্ভুত হয় পত্রভূষিত ভৈরব যার নাম স্বচ্ছন্দ রাম। দক্ষিণ ধারা থেকে উৎপত্তি হইকামরাজ নামে প্রেত মন্ডিত অঞ্জন সদৃশ কৃষ্ণ বর্ণ, নাম নাগরাজ। আর উত্তর ধারা থেকে সমুদ্ভুত হয়েছিল শূল ধারী ভৈরব। এবং মহাদেবের ক্ষত সমগ্র রুধির থেকে ফল ভূষিত ভৈরবের নাম লম্বিত রাজ। এ তো গেলো পঞ্চ ভৈরবের উৎপত্তির কাহিনী। এই পর্যায় ক্রম উল্লেখ করার কারন এই যে, ভৈরব হলেন জগতের সমস্ত সৃষ্টির উৎসমুখ। সেখানে তিনি আপন আনন্দে বিরাজমান কখনো মহাভৈরব রূপে কখনো কালভৈরব সাজে কখনো রুদ্রভৈরব তেজে মহা জগতের সৃষ্টি স্থিতি লয়ের এক মহিমান্বিত চরিত্র। রাগের রূপকল্পেও এই অসীম আধারের সুরবিন্যাস। "জাগো মোহন প্যারে " বন্দিশ টি অতি বিখ্যাত একটি হিন্দি খেয়ালের রচনা, এছাড়া আরো অনেক খেয়ালের বন্দিশ রচনা পাওয়া যায়, যে সুরবন্ধ কাল থেকে কালান্তরে আমাদের সংস্কৃতির সুরপ্রবাহে বয়ে চলেছে।বাংলা ভাষায় কিছু ভৈরব রাগের রচনা পাওয়া যায়, যদি ও প্রচারের অভাবে সে রচনা অল্পশ্রুত রয়ে গেছে।বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ এই রাগটিকে নিয়ে অনেক বিখ্যাত এবং শ্রুতিমধুর রচনা করেছেন যা কালোত্তীর্ন হয়ে আছে।কয়েকটি গান উদ্ধৃতি করা যেতে পারে।
১. সবারে করি আহ্বান
২. ধরা দিয়েছি গো আমি আকাশের পাখি।
৩. গাও বীনা, বীনা গাওরে।
৪. পেয়েছি অভয়পদ
৫. প্রাণে খুশির তুফান উঠেছে।৬. নয়ন তোমারে পায় যে দেখিতে, রয়েছো নয়নে নয়নে।
৭. ও মা বাণী বীণাপানি, করুণাময়ী।
৮. পেয়েছি ছুটি বিদায় দেহো ভাই, সবারে আমি প্রণাম করে যাই।
৯. জননী তোমার করুন চরণ খানি।
১০. তুমি নব নব রূপে
১১. নব আনন্দে জাগো।
১২. মোর প্রভাতের এই
১৩. মন জাগো মঙ্গলালোকে।১৪. পাখি বলে চাঁপা। ইত্যাদি ইত্যাদি।রবীন্দ্র নাথের গানে সুর একটি মাধ্যম হলেও তাঁর সংগীতের প্রাণ নিহিত আছে বাণী বা কথা ও শব্দচয়নের গভীর তম তাৎপর্যে। এজন্যই তথাকথিত বন্দিশ হিসাবে হয়তো পরিগণিত করা যাবে না, কিন্তু বাংলা গানে খেয়াল রচনা নিয়ে যে ছুত মার্গীতা উচ্চাঙ্গ সংগীতের প্রবর গুণীদের মধ্যে বর্তমান, সেটি অনেক অংশেই ভিত্তিহীন, সঠিক প্রচেষ্টা, প্রতিভা, প্রয়োগ কুশলতার এবং চিরাচরিত বদ্ধমূল ধারণা জালে নিজেদের আটকে রাখার প্রয়াস। আমার কাছে রবীন্দ্র নাথ হলেন এই সমস্ত কিছু "না " এর বড় প্রতিবাদ। তিনি সকল পথ দেখিয়ে গেছেন আর অন্যান্য ভাষার রচনা বাণীর সঙ্গে রবীন্দ্র "গীতবিতান "আলোকবর্ষ দূরের তফাৎ। এ গৌরব বাংলা ভাষার। রবীন্দ্র নাথ তাঁর বিভিন্ন পর্যায়ের গীতি রচনায় ভৈরব এবং ভৈরবী রাগের ওপর অজস্র সৃষ্টির মধ্য দিয়ে যেমন তাঁর অতুলনীয় বাণী এবং রাগ দুটির মূল প্রাণ আহরণ করেছেন, তেমনি ভাবেই চিরা চরিত রাগসঙ্গীতের গঠন শৈলি র ভাঙা গড়ার খেলায় মেতেছিলেন, সেখানেই অনির্বচনীয় শিল্প সুষমায় উদ্ভাসিত হয়ে উঠেছে চিরন্তনী গীতিকাব্যের মহিমায়।
রাগ ভৈরবের ওপর আমার লেখা একটি বাংলা ভাষায় গীতিরূপ :
স্থায়ী অংশ : রুদ্র তপন জাগো, আলোর শোভায়,অভিমান দূর হোক আঁধার বিদায়।
অন্তরা অংশ :
সপ্তাশ্ব বাহন তুমি অরুন কিরণে, ফুল পাখি প্রাণ পায় তব বিকিরণে, কুমারীর উচ্ছাসে নদী সাগর ভাসে,আনন্দ তরঙ্গ সনে।বিভাসিত অরুন জাগে আলোর শোভায়।
সঞ্চারী :
জগৎ মাতিছে সুরে
ডানা মেলে আকাশে ওড়ে,মিলনের ডাকে সবে পৃথিবী মাতায়।
এসো সুন্দর প্রাণ,
এসো নব উল্লাসে,
ধরাকে সিক্ত করো
আলোর শোভায়।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সৃষ্টিকর্মে ভৈরবী রাগ প্রেম, বিরহ এবং গভীর অনুভূতির প্রতীক হিসেবে বারবার ফিরে এসেছে। তাঁর অনেক জনপ্রিয় রবীন্দ্রসংগীত, বিশেষ করে মানসী কাব্য গ্রন্থের "ওগো, কে তুমি বসিয়া" বা "আমার যাবার বেলায়" এর মতো গানগুলিতে ভৈরবী রাগের মূর্ছনা মিশে আছে । এই রাগটি কবিগুরুকে গভীর আবেগের প্রকাশে সিদ্ধি এনে দিয়েছিল। ভৈরবী রাগে রবীন্দ্রনাথের কাজের কিছু দিক:প্রেম ও বিরহ: রবীন্দ্রসংগীতে ভৈরবী রাগের ব্যবহার প্রেমের গভীরতা এবং বিরহের আবহ গড়ে দেয়।ভৈরবের মিশ্রণ: রবীন্দ্রনাথের সংগীতে ভৈরব ও ভৈরবীর মিশ্রনে এক নুতন মাত্রা এনে গীতি প্রকাশের অনিন্দ্য সুন্দর প্রকৃতির প্রয়োগ দেখা যায় ভৈরবী ওভৈরবের সুরবিহারে।রবীন্দ্রনাথের এই ভৈরবী নির্ভর গানগুলো বাংলা সংস্কৃতিতে অন্যতম সেরা রোমান্টিক এবং আবেগমথিত প্রাণের নিবিড় প্রকাশ পায় তাঁর কথা ও সুরের সাজুয্যে, অনন্ত কালের সংগীত হিসেবে গণ্য হয়।ভিন্ন ভিন্ন গানে ভৈরবীর অসাধারণ প্রয়োগ কুশলতায় এবং প্রকাশ নৈপুণ্য রবীন্দ্রনাথের সংগীতের রাগ প্রয়োগ প্রচলিত রাগসংগীত থেকে ভিন্ন আঙ্গিকে হলেও ভৈরবীর মূল রস তিনি আহরণ করে শ্রোতার হৃদয়ে পৌঁছে দিয়েছেন।ভৈরবী রাগে রবীন্দ্র সংগীত ভৈরবী রাগে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বেশ কিছু কালজয়ী রবীন্দ্রসংগীত রচনা করেছেন, যা মূলত পূজা ও প্রেম পর্যায়ের অন্তর্ভুক্ত। এই রাগের করুণ ও ভক্তিপূর্ণ সুর রবীন্দ্রনাথের গানে এক বিশেষ মাত্রা যোগ করেছে। জনপ্রিয় কিছু ভৈরবী রাগের রবীন্দ্রসংগীত হলো:
১.আমার রাত পোহালোশারদপ্রাতে,
২.আমি তোমার প্রেমে হবো কলঙ্কিনী
৩.অমল ধবল পালে ,
৪.যে ছিল আমার স্বপ্নচারিণীতারে চিনিতে পারিনি
৫.আমার এ পথতোমার পথের থেকে অনেক দূরে গেছে চলি
৬. অন্তর মম বিকশিত করো অন্তর তম হে।
৭. অনেক দিয়েছো নাথ।
৮. আমি চঞ্চল হে, আমি সুদূরের পিয়াসী।
৯. এতো দিন যে।
১০.উড়িয়ে ধ্বজা, অভ্রভেদি।১১. আলোকের এই ঝর্ণাধারায় ধুইয়ে দাও
১২. আরো একটু বসো তুমি
১৩. প্রাণ চায় চক্ষু না চায়
১৪. আমি যে আর সইতে পারি নে।
এ ছাড়াও আরো অনেক রবীন্দ্র সংগীতে ভৈরবী রাগের সরাসরি প্রয়োগ বা প্রভাব আছে।বৈশিষ্ট্য: রবীন্দ্রসঙ্গীতে ভৈরব ও ভৈরবী রাগের মিশ্রণ বা মিশ্র ভৈরবীও অনেক ক্ষেত্রে লক্ষ্য করা যায় ভৈরবী রাগের এই গানগুলো সাধারণত ভোরে বা প্রশান্ত পরিবেশে শোনার জন্য উপযো তাঁর গানের প্রধান এবং শেষতম সংকলন গীতবিতানে গানের নানা পর্ব-বিভাগ রয়েছে।ভৈরবী রাগ সম্ভবত আমাদের এই ভূখণ্ডের সবচেয়ে পরিচিত, মাঠে ময়দানে ছড়িয়ে থাকা রাগ। বাউলের গান থেকে শুরু করে নানা রকম কম্পোজিশন আছে ভৈরবী রাগে। ‘সকরুণ বেণু বাজায়ে কে যায়’… রবীন্দ্রসংগীতটি ভৈরবী রাগের একটি আদর্শ উদাহরণ হতে পারে।ভৈরবী রাগটি শাস্ত্রমতেও সকালেরই রাগ হিসাবে চিহিৃত। সকাল, কিন্তু ভোর নয়। সূর্যের উজ্জ্বল, সাদা আলোয় চারিদিক উদ্ভাসিত হয়েছে কিন্তু রোদ তখনো প্রখর হয়ে ওঠেনি – সেটাই হলো ভৈরবীর রূপ। কিন্তু তবু এটাই তার একমাত্র রূপ নয়। যে যেমন একটি আনন্দালোকিত সকালের রূপকেও প্রকাশ করে, তেমনি তার আরেক রূপে প্রকাশিত হয় হৃদয় বিদারক বিষণ্নতার ছবি। ভৈরবী রাগ প্রসঙ্গে যেটি প্রথমেই বলে নেওয়া ভালো যে এই রাগটি প্রভাতের সূর্যকিরণের মতোই পরিপূর্ণ এবং সুসংবদ্ধ রাগ, চিরাচরিত প্রথা মেনে সাধারণত এই রাগটি পরিবেশনের পর অন্য কোনো রাগ কণ্ঠ বা যন্ত্র সংগীতে পরিবেশিত হয় না। অনেক সংগীত সম্মেলনে ভৈরবীর ভজন অথবা ধুন বাজিয়ে সংগীত উৎসবের সমাপ্তি করা হয় সুরটির গভীর সংবেদন হৃদয়ে ধরে রাখার মানসে। যেমন ভারতরত্ন পণ্ডিত ভীমসেন জোশিজীর " যো ভজে হরিকো সদা.. " বা পণ্ডিত পারলুস্করের " রঘুপতি রাঘব রাজা রাম.. " ভজন টি এছাড়া ভৈরবী রাগের ওপর অজস্র সৃষ্টি ভারতীয় শাস্ত্রীয় ও উপশাস্ত্রীয় সংগ্রহশালাকে ঋদ্ধ করেছে, অতুলনীয় ঐশ্বর্য মন্ডিত করেছে। এ প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথের একটি কবিতার উদ্ধৃতি না করে পারলাম না।
ভৈরবী গান
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
ওগো, কে তুমি বসিয়া উদাসমুরতিবিষাদ শান্ত শোভাতে!ওই ভৈরবী আর গেয়ো নাকো এই প্রভাতে–মোর গৃহছাড়া এই পথিক-পরানতরুণ হৃদয় লোভাতে।ওই মন-উদাসীন ওই আশাহীনওই ভাষাহীন কাকলিদেয় ব্যাকুল পরশে সকল জীবন বিকলি।
দেয় চরণে বাঁধিয়া প্রেমবাহু-ঘেরাঅশ্রুকোমল শিকলি।
হায়, মিছে মনে হয়
জীবনের ব্রতমিছে
মনে হয় সকলি।
যারে ফেলিয়া এসেছি,
মনে করি, তারেফিরে দেখে আসি শেষ বার।
ওই কাঁদিছে সে যেন
এলায়ে আকুল কেশভার।
যারা গৃহছায়ে বসি সজলনয়নমুখ মনে পড়ে
সে সবার।এই সংকটময় কর্ম জীবন মনে হয় মরু সাহারা,দূরে মায়াময় পুরে দিতেছ দৈত্য পাহারা।
তবে ফিরে যাওয়া ভালো তাহাদের পাশেপথ চেয়ে আছে যাহারা।
সেই ছায়াতে বসিয়া সারা দিনমান তরুমর্মর পবনে,
সেই মুকুল-আকুল বকুলকুঞ্জ-ভবনে,
সেই কুহুকুহরিত বিরহ রোদন থেকে থেকে পশে শ্রবণে।
সেই চিরকলতান উদার গঙ্গাবহিছে আঁধারে আলোকে,সেই তীরে চিরদিন খেলিছে বালিকা-বালকে।ধীরে সারা দেহ যেন মুদিয়া আসিছেস্বপ্নপাখির পালকে।হায়, অতৃপ্ত যত মহৎ বাসনাগোপনমর্মদাহিনী,এই আপনা মাঝারে শুষ্ক জীবন- বাহিনী!ওই ভৈরবী দিয়া গাঁথিয়া গাঁথিয়াচরম নিরাশা কাহিনীসদা করুণ কন্ঠ কাঁদিয়া গাহিবে,–“হল না, কিছুই হবে না।এই মায়াময় ভবে চিরদিন কিছুরবে না।
কেহ জীবনের যত গুরুভার ব্রতধুলি হতে তুলি লবে না।“এই সংশয়মাঝে কোন্ পথে যাই,কার তরে মরি খাটিয়া?আমি কার মিছে দুখে মরিতেছি বুকফাটিয়া?
ভবে সত্য মিথ্যা কে করেছে ভাগ,কে রেখেছে মত আঁটিয়া?“যদি কাজ নিতে হয়, কত কাজ আছে,একা কি পারিব করিতে!কাঁদে শিশিরবিন্দু জগতের তৃষা হরিতে!কেন অকূল সাগরে জীবন সঁপিবএকেলা জীর্ণ তরীতে!“শেষে দেখিব, পড়িল সুখ যৌবন ফুলের মতন খসিয়া,হায় বসন্তবায়ু মিছে চলে গেল শ্বসিয়া,সেই যেখানে জগৎ ছিল এক কালে সেইখানে আছে বসিয়া!
শুধু আমারি জীবন মরিল ঝুরিয়া চিরজীবনের তিয়াষে।এই দগ্ধ হৃদয় এত দিন আছে কী আশে!সেই ডাগর নয়ন, সরস অধর গেল চলি কোথা দিয়া সে!”ওগো, থামো, যারে তুমি বিদায় দিয়েছতারে আর ফিরে চেয়ো না।ওই অশ্রুসজল ভৈরবী আর গেয়ো না।
আজি প্রথম প্রভাতে চলিবার পথ নয়নবাষ্পে ছেয়ো না।
ওই কুহকরাগিণী এখনি কেন গো পথিকের প্রাণ বিবশে!পথে এখনো উঠিবে প্রখর তপন দিবসে পথে রাক্ষসী সেই তিমির রজনী না জানি কোথায় নিবসে!থামো, শুধু এক বার ডাকি নাম তাঁরনবীন জীবন ভরিয়া–যাব যাঁর বল পেয়ে সংসার পথ তরিয়া,যত মানবের গুরু মহৎজনের চরণচিহ্ন ধরিয়া।যাও তাহাদের কাছে ঘরে যারা আছেপাষাণে পরান বাঁধিয়া,গাও তাদের জীবনে তাদের বেদনেকাঁদিয়া।তারা প’ড়ে ভূমিতলে ভাসে আঁখিজলে নিজ সাধে বাদ সাধিয়া।হায়, উঠিতে চাহিছে পরান, তবুওপারে না তাহারা উঠিতে।তারা পারে না ললিতলতার বাঁধনটুটিতে।তারা পথ জানিয়াছে, দিবানিশি তবুপথপাশে রহে লুটিতে!তারা অলস বেদন করিবে যাপনঅলস রাগিণী গাহিয়া,রবে দূর আলো-পানে আবিষ্ট তারা দিবসরজনী বাহিয়া।সেই আপনার গানে আপনি গলিয়া আপনারে তারা ভুলাবে,স্নেহে আপনার দেহে সকরুণ করবুলাবে।সুখ কোমল শয়নে রাখিয়া জীবনঘুমের দোলায় দোলাবে।ওগো, এর চেয়ে ভালো প্রখর দহন,নিঠুর আঘাত চরণে।যাব আজীবন কাল পাষাণ কঠিন সরণে।যদি মৃত্যুর মাঝে নিয়ে যায় পথ,সুখ আছে সেই মরণে।
এই কবিতাটির রচনাকাল
২৯ জ্যৈষ্ঠ, ১৮৮৮।
এবার ভারতীয় মার্গ সংগীতে ভৈরবী রাগটির কাঠামো গত বর্ণনা তুলে দিলাম আলোচনার প্রাসঙ্গিকতায়।ভৈরবী রাগ উত্তর ভারতীয় সঙ্গীত শাস্ত্রে বর্ণিত ঠাট ও রাগ বিশেষ। ভৈরবী রাগের জনক ভৈরবী ঠাট।আরোহণ: স ঋ জ্ঞ ম প দ ণ র্সঅবরোহণ : র্স ণ দ প ম জ্ঞ ঋ সঠাট : ভৈরবীজাতি : সম্পূর্ণ-সম্পূর্ণবাদীস্বর : ম (মতান্তরে প)সমবাদী স্বর : সঅঙ্গ : পূর্বাঙ্গ।সময় : সকালবেলা/যে কোন সময়পকড় : ঋ ণ্ দ্ স, জ্ঞ, স ঋ স ণ্ স
রাগ ভৈরবিতে আমার লেখা একটি গীতি :
স্থায়ী :
যোগনিশি ভোর হলো।
খোলো দ্বার,
রজনী নিলো বিদায়,
আঁধারে আলোর ধ্বনি
মিঠে সকাল এলো।
অন্তরা :
পাখির কুজন ধ্বনি
কুঞ্জ সাজায়,
সপ্তাশ্ব বাহন জাগে
অতুল শোভায়,
নিশি অবসানে
ভোর হলো খোলো দ্বার।
সঞ্চারী :
নুতন প্রভাতে রবি,
আঁকে মঙ্গল ছবি,
সুবচন গাহে কবি,
ভাঙে ঘুমঘোর।
এসো এসো হে প্রিয়ে
সাজায়ে আপন ভূষণ
প্রেমহেম কুসুমের পরান,
ভৈরবী গাও সুকোমল স্বরে।
রবীন্দ্র সৃষ্টি সমীক্ষা অন্তবিহীন এক পরিক্রমা। তাঁর কবিতার বিভিন্ন পর্যায়, যেমন পূজা, প্রেম, প্রকৃতি, আত্মসন্ধান, বিষণ্ণতা, স্বদেশপ্রেম, নৈর্বক্তিক মনন, লঘু ও হাস্যরস, নাট্যকাব্য, গীতিকাব্য, ইত্যাদি অজস্র পথের সৃজণশীলতা তাঁর রচনার মধ্যে প্রকাশ পেয়েছে অতীব উচ্চ মার্গের লেখনীতে। বাংলা সাহিত্য, সংস্কৃতি, নাটক, গান, সর্বোপরি সমাজসংস্কারমূলক শিক্ষা ভাবনার প্রচার ও প্রসার কল্পে শান্তিনিকেন ও শ্রীনিকেতনের স্থাপনার মধ্য দিয়ে ভারতীয় সংস্কৃতি ও গুরুগৃহে শিক্ষার যে প্রচেষ্টা সেটি অদ্যাবধি আমাদের গৌরব ও শ্লাঘার কারণ। আমরা চির ঋণী। অলমিতি বিস্তরেন।।

0 মন্তব্যসমূহ