পোস্ট বার দেখা হয়েছে
মেটামরফোসিস -১
খুব ছোটবেলা থেকেই দেখেছি , সকাল হলেই আমার বাবা বাজারের থলি নিয়ে বেরিয়ে পড়তেন ! তারপর যখন বড়ো হলাম , আমার দাদা বাজার থেকে একটা দেশ কিনে এনে ছিলো ! আমার মা কোনোদিনও বাজারে যায়নি , তার কাছে একটা দেশ মানে ছিলো শুধু আমাদের ২৭ নম্বর বাড়িটা ! আমার বাবা আর আমার দাদার মধ্যে কোনো মিল আমি কোনোদিন খুঁজে পাইনি ! মায়ের হাতে রান্না করা মাংসের ঝোলে আমি মানুষের গন্ধ পেতাম ! আজকাল দেশ বলতে বুঝি শুধু কয়েকটা মানুষ ! দেশের নাম জানি না ! কেবল চৈত্রের নিঃশ্বাসে আমি নরকের গন্ধ পাই ! দুপুরের রোদে পুড়ে যাওয়া মানচিত্রে আমি দেখি ۔۔۔আমার সন্তান বাজারের দিকে এগিয়ে চলেছে ! আমি ভাতের থালা নিয়ে অপেক্ষা করছি ۔۔۔۔۔۔۔۔۔
====
মেটামরফোসিস ২
যে ছেলেটা গতকাল থেকে বাড়ি ফেরেনি তাকে আমি কোনোদিন দেখিনি ! শুধু জানতাম ছেলেটার কোনো নাম নেই ! অথচ সে রোজ আমার বাড়ির সামনে দিয়েই যেতো ! আজ ছেলেটাকে আবারও দেখলাম হো চি মিন সরণির লাল বাড়িটা থেকে ঝাঁপ দিতে ! খুব ইচ্ছে ছিলো ওই ছেলেটার মতো আমিও ঝাঁপ দেবো ! কিন্তু আমার তো নাম আছে ! তাই আর ঝাঁপ দেওয়া হয় না ! আমি কেবল জানি ۔۔۔ছেলেটা আজও বাড়ি ফিরবে না ! খবরের কাগজে শুধু ছাপা হয়েছে ۔۔۔নিরুদ্দেশ সম্পর্কে ঘোষণা ! অথচ ছেলেটাকে কেউ কোনোদিন খুঁজে পাবে না ! আমি কি খুঁজে পাবো নিজেকে ?
====
মেটামরফোসিস ৩
"ডু নট ডিস্টার্ব"---বোর্ড ঝুলে থাকা সংসারে মেয়েটার জন্ম হয়নি এখনো ! কামিনী চালের গন্ধে ভেসে যাওয়া জন্মদিনগুলোতে মেয়েটাকে আমরা সবাই কোথাও না কোথাও দেখেছি ! যখন রোজ নিজের সন্তানকে দেখি , মেয়েটার কথা ভাবি !রোদেলা জানালার শিক ধরে দাঁড়িয়ে থাকে জবা গাছটা ! মোমবাতির আলোয় নিভে যাচ্ছে মেয়েটার ঘর ! সেটা ছিলো ম্যাডক্স স্কোয়ারের উৎসব! ইচ্ছে ছিলো মেয়েটাকে চার নম্বর ঘর পর্যন্ত নিয়ে আসি , কিন্তু দেখলাম তার শরীরে তারা বুনছে উত্তরফাল্গুনী , সামুদ্রিক গন্ধে ভেসে যাচ্ছে মেয়েটার শরীর ! ঠিক তখনই আমার সন্তান ছুটে এলো আমার কোলের কাছে ! গতকালই ছিলো তার জন্মদিন অথচ আমি বিরক্ত হইনি! আসলে আমরা কেউই নিজের উপস্থিতিতে বিরক্ত হই না !
====
মেটামরফোসিস ৪
"দাদা , ধর্মতলা যাবেন ?" বলা সেই লোকটা কে দেখলে আমার বাবার কথা মনে পড়ে ! আমার বাবাও প্রতিদিন সকাল হলেই ধর্মতলা যেতেন ! তখন ধর্মতলাকে এসপ্ল্যানেড বলা হতো না ! এখন আমি রোজ ধর্মতলা না গিয়ে ভুল করে এসপ্ল্যানেড চলে যাই ! রোজই একই ভুল ! অথচ গাছেরা কোনো ভুল করে না ! ওরা একই পথ ধরে প্রতিদিনই এগিয়ে যায় ! ওদের দেখলে কেউ বিরক্ত হয় না , কিন্তু আমাকে দ্যাখা মাত্রই এই শহরটা বিরক্ত হয় ! আমি ভয়ে বাড়ি ফিরে এসে দেখি ۔۔۔আস্ত ধর্মতলা উঠে এসেছে আমার ঘর পর্যন্ত ! আমার বাবা তখন চশমার ফাঁক দিয়ে দেখছে ۔۔۔ওই গাছগুলোকে , ওই লোকটাকে আর ধর্মতলার রাস্তাদেরকে ! বাবার এখন সত্তর আর আমি পঁয়ত্রিশ ! গাছগুলো এখনো একুশ !বাবাকে দেখলে মনে হয় ۔۔আর কোনোদিনও আমি ধর্মতলা যাবো না !ঘরের ভেতরেই কী লুকিয়ে থাকবো আমি ?

1 মন্তব্যসমূহ
সায়ন্তিকা দিদির লেখা বরাবরই ভালো লাগে।তার ভাবনার গভীরতা অনেক বেশি। শুভকামনা সবসময়।
উত্তরমুছুন