পোস্ট বার দেখা হয়েছে
মা
সঞ্জীব সাহা
খুব ছোট থেকেই দেখেছি, মা আমার খুবই সংস্কৃতি মনস্ক। শুধু সংস্কৃতি মনস্কই নন, বলা যায় একটু বাম মনস্ক। বামধারার মানুষ, প্রগতিবাদী। কথা বলেন বেশ জোরের সঙ্গে। পাড়ার বিভিন্ন অনুষ্ঠানে বক্তৃতা করেন। অন্যধারার নাটক দেখতে ভালবাসেন। পত্রপত্রিকায় লেখালেখিও করেন । কারো সুবিধা অসুবিধায় ঝাঁপিয়ে পড়েন। আমার কাছে মা একজন আদর্শ মা। আসলে ওঁর ব্যক্তিত্বই আকর্ষণীয়।
ছোট থেকেই বলা চলে বাবার দেখা পাই নি, সাহচর্য পাই নি। আমার কাছে মা - বাবা সবই একজন, তিনি হলেন আমার মা। মা বাবার ডিভোর্স আমার জন্মের পর পরই হয়ে গিয়েছিল। সবে তখন স্কুলে যাওয়া শুরু করেছিলাম অন্য মেয়েদের মতো, তখন বাবার জন্য কান্নাকাটি করতাম অন্যদের দেখে। আস্তে আস্তে কবে যে সেসব ভুলে গেলাম, মনে পড়ে না। একটু বড় হতে অবশ্য মা বাবার সম্পর্কের মধ্যে নিজে ঢুকি নি, মাথাও ঘামায় নি।
মা যখন প্রথম থেকেই অভ্যাস, তখন বাবার আবার প্রয়োজন কী?
বড় হতে হতে কত সময় কত কি মনে হয়েছে, কিন্তু পাত্তা দিই নি। পাখির চোখ রেখেছি লেখা পড়ায়। ফলও পেয়েছি। মেডেল টেডেল পেলে মা'র চোখের চিকচিকানি দেখে হয়তো মাকে একটু স্পর্শ করতে ইচ্ছে করতো। তবে আবেগকে আমি প্রশ্রয় দিই না। যদিও মা'র ব্যাপারে সবসময়ই একটু আলাদা হয়।
মা মাঝে মাঝে বলেন, কী রে এবার ভবিষ্যতের কথা একটু ভাব।
তাই তো ভাবছি মা। আপ্রাণ চেষ্টা করছি।
- না না, এবার তো একটু ঘর সংসারের কথা ভাবতে হবে। আমার বয়স হচ্ছে, আর কতদিন ...!
কথা শেষ হয় না।
আমিও কোনো কথা বলি না। কথা বলতে ইচ্ছে করে না। বুকে কোথায় যেন একটা উত্তু্রে হাওয়া ছুঁয়ে যায়।
মা আবার কথা বলেন, কীরে কথা বলিস না কেন?
- আমার বড় ভয় করে মা।
- কীসের ভয়?
- প্রজন্মের ভয়।
মা হয়তোবা চমকে ওঠেন হঠাৎ।
আমার হাতটা শক্ত করে চেপে ধরেন। মুষ্টিটা যেন কিছুতেই আলগা না হয়, তাই প্রাণপনে মুঠো করে ধরেন।
আজ আমি প্রিন্সটন ইউনিভার্সিটিতে চলে যাচ্ছি। একটু এক্সাইটেড। আইনষ্টাইনের ইউনিভার্সিটি। একবার নিউ জার্সিতে ওর বাড়িতে যেতে হবে। আমার তীর্থক্ষেত্র।
এখুনি এয়ার পোর্টে ঢুকতে হবে। দেরি করা যাবে না। প্রথম এত দূরের জার্নি। মা সঙ্গে এসেছেন।
মাকে আমি কোনদিন প্রণাম করি নি। মা মজা করে বলতেন, কীরে, বিজয়ায় আমাকে প্রণাম করলি না।?
আমি মুখ ঘুরিয়ে বলতাম, ইশ, প্রণাম ! মানুষ কি নিজেকে নিজে প্রণাম করে নাকি ?
মা'র চোখ মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠতো।
আজ এয়ারপোর্টে ঢোকার আগে মাকে জড়িয়ে ধরলাম, জোরে। মা-ও।
হঠাৎ কেন যেন ঝুঁকে পড়ে জীবনে প্রথম বার মা'র পায়ে হাত দিতে গেলাম,মা খপ করে আমার হাতটা ধরে নিয়ে জল ছোঁয়া চোখে হাসির রেখা টেনে বললেন, উঁহু, মানুষ কি নিজেকে নিজে প্রণাম করে নাকি!
----------------------------------
প্রকৃত শিক্ষক
অনিরুদ্ধ দত্ত
'কিরে প্রাইজটা দে' ফিসফিসিয়ে বলে উঠলো হরিহরপুর হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক সন্ময় দে; কথাটা শুনে হঠাৎ সম্বিত ফিরে পেল প্রখ্যাত জেলাশাসক অমলকান্তি দে।আসলে স্মৃতির অতল গহ্বরে তলিয়ে গিয়েছিল সে। আজ থেকে প্রায় ২৫ বছর আগে বিদ্যালয়ের পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানের জোর প্রস্তুতি চলছে;কেমন আনমনা হয় ইস্কুলের বড় অশ্বত্থ গাছটার দিকে সে তাকিয়ে আছে, একটা হতাশা তাকে ক্রমে গ্ৰাস করছিলো। উপর থেকে রিহার্সাল এর গানের সুর ভেসে আসছিলো; সে গান জানে না, আবৃত্তিও পারে না, ভালো খেলতেও পারে না। কিন্তু সে তো চেষ্টা করে, তার চেষ্টার কি কোনো ফাঁক থাকে? কী জানি! সে বুঝতে পারে না, এতো চেষ্টা করেও শুধু মাত্র দু'নম্বরের জন্য এবারেও সে প্রাইজ পাবে না। ৯০% নম্বর পেয়েও সে চতুর্থ। ক্লাস নাইনে উঠে গেল সে, আর কবে পাবে সে প্রাইজ?কি করতে স্কুলে আসবে সে কাল? তার কন্ঠের কাছে এক দলা পাকানো কান্নার অনুভূতি আটকে গেল! 'কিরে রিহার্সাল দেখতে যাবি না? কি ভাবছিস
এতো?'সম্বিত ফিরে পেল সে ক্লাসের ফার্স্ট বয় সন্ময়ের কথায়;এই সন্ময় কাল কতো প্রাইজ পাবে, কতো মান্যগণ্য লোকের কাছ থেকে।'নারে যাব না, তুই যা।'স্কুল ছুটির পর বাড়ি চলে এলো সে।মনটা তার ভালো নেই, সন্ধ্যাবেলায় পড়তে বসে সে হঠাৎ মাকে বলে বসলো, 'মা,কাল আর স্কুল যাব না।' 'কেন রে? কাল তোদের স্কুলের অনুষ্ঠান না? কতো মান্যগন্য লোকেরা আসবে; নাচ-গান,আবৃত্তি কতো অনুষ্ঠান হবে, খাওয়াবে,আর তুই স্কুল যাবি না! কেন বাবা?' 'না মা,আমি তো প্রাইজ পাবো না মা; ওই সন্ময়, রণেন, সৌম্য, বিশাল কত কত প্রাইজ পাবে।জানো মা,-- ওরা না অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণও করেছে। আমি, আমি তো কিছু পারি না মা,--' বলতে বলতে কন্ঠ রুদ্ধ হয়ে এলো অমলের; মাকে জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়লো সে। ছেলেকে জড়িয়ে ধরলেন চিন্ময়ী দেবী;একটা চাপা কষ্ট তাকেও গ্রাস করলো, পরক্ষণেই নিজেকে সামলে নিয়ে বললেন,'ছিঃ! বাবা, ওরকম ভাবতে নেই; বন্ধুদের ঈর্ষা করতে নেই, তুই তো চেষ্টা করছিস। তোর এই যে অনুভূতি, তোর এই যে চেষ্টা,--একদিন তোকে ঠিক বড় করবে,--দেখবি বাবা;-- প্রাইজ পাওয়াটাই জীবনের সবকিছু নয় রে, চেষ্টা করে যা, দেখবি তুইও একদিন অনেক অনেক কিছু পাবি।' মায়ের কথায় হঠাৎ সমগ্ৰ শরীরে একটা প্রচন্ড কম্পন অনুভব করলো অমল!সমস্ত স্নায়ুতন্ত্রে একটা আলোড়ন খেলে গেল!সমস্ত ধমনী, শিরা- উপশিরার মধ্য দিয়ে দ্রুত রক্ত প্রবাহিত হতে লাগলো,কেমন যেন একটা তীব্র আগ্রাসী উদ্যম তার সব কষ্টকে ঢেকে দিল।সে বললো, 'আমি ঠিক পারব তো মা? বলো মা, আমি ঠিক পারব তো?'তার মা বললো,'হ্যাঁ বাবা; অবশ্যই পারবি, কেন পারবি না বাবা?কাল তুই স্কুলে যা বাবা।' 'ঠিক আছে মা, তাহলে কাল স্কুলে যাব।' তারপর,--তারপর আর ফিরে তাকাতে হয়নি অমলকে।একে একে অনেক গণ্ডি সাফল্যের সঙ্গে পেরিয়ে আজ সে প্রাপ্তির সর্বোচ্চ চূড়ায়!'কিরে প্রাইজ টা দে, কি ভাবছিস এতো?' ফিসফিসিয়ে বলে উঠলো, স্কুলের বাল্যবন্ধু প্রধান শিক্ষক সন্ময় দে;প্রাইজ দিতে উঠলো অমলকান্তি,-- জেলাশাসক অমলকান্তি! আর অমলকান্তির মা তখন সুদূর নক্ষত্র লোক থেকে দুচোখ ভরে দেখছেন তার অমলকে। ঘোষকের কন্ঠে তখন উচ্চারিত হচ্ছে, 'এবছর উচ্চমাধ্যমিকে,আমাদের বিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ নম্বর প্রাপক শ্রী তন্ময় চ্যাটার্জিকে এখন পুরস্কার দিচ্ছেন আমাদেরই বিদ্যালয়ের অত্যন্ত কৃতী ছাত্র আমাদের জেলাশাসক মাননীয় অমলকান্তি দে মহাশয়।'

0 মন্তব্যসমূহ