দর্পণ || বর্ষা সংখ্যা ২০২২ || পর্ব -১




পোস্ট বার দেখা হয়েছে

বৃষ্টি ভেজা দিন 

বৈশালী গাঙ্গুলী

                  

চারপাশের আঁধারের নগ্ন শরীর বৃষ্টির জল চুয়ে একটু, একটু করে আলো আকাশটাকে ফুটফুটে ফর্সা করছে, খুব মন্থর গতিতে পৃথিবী বুনে

নিচ্ছে নতুন ভোরের পাতায় আরো একটি নতুন আশা, স্বপ্নের খসড়া।


আর কিছুক্ষন পরেই মন্দিরের চৌতাল ধুয়ে জল গড়িয়ে যাবে গিরিজার রাস্তায় যার আষ্টেপৃষ্ঠে জড়ানো আছে আজানের শব্দ। ধর্মের মলাট জড়ানো ভিন্ন ঈশ্বর একই ব্রহ্মমুহূর্তে এইভাবে আড়মোড়া ভাঙ্গে বৃষ্টি ভেজা দিন। 

তবে এমন ভাবনা যে পরিষ্কার থাকবে সব ক্ষেত্রে, সেই অঙ্গীকারের হদিস পাওয়া খুব কঠিন।

 বোঝা যায় প্রকৃতি ধর্মের চেয়ে অনেক বেশী সাবলীল ও স্বাধীন। 

 

অসংখ্য অসমাপ্ত কাহিনীর প্রথম অধ্যায়ের প্রতিচ্ছবি স্পষ্ট হয়ে ধরা দেয়-এই বিশেষ মুহূর্তে জেগে থাকা চোখের তারায়; আরো চেতনা, বেদনা, অনুপ্রেরণায় আশায়। আরো, আরো শতাব্দী এমন

 করে প্রশ্ন খুঁজে বেড়াবে অসহায় মন।

প্রশ্ন ঘুরবে চারপাশে- যদি প্রেম দিলে না জীবনে,  তবে কেন আকাশ, বাতাস, নদী, পাথর, হিজল গাছে উঁকি দেওয়া শেষ জোছনার আলো মুছে দিয়ে যে আলো ফুটে উঠছে তা ধরা দেয় অ-প্রেমিকদের চোখের চারপাশে। হারিয়ে যায় কেন সবাই অণু পরমাণুর স্তরে, যেখানে শুধু 'আমি' বেঁচে থাকে ঝিঁঝিঁপোকার  নিস্তেজ ডাকে, যা দিনের প্রলাপ আর বুলি সর্বস্ব কথার ভীড়ে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করে।

অনুরাগী হৃদয় আঁধার প্রেমের সারমর্মের আঁচড়ে ক্ষতবিক্ষত হয়ে, দৃশ্যমান কাব্য রচনা করে প্রতি ভোরে- আর তারপর-

An usual day starts with all it's glory, glitter and lot of prices to pay... Nevertheless the emotion leaves behind the feelings of 'being human' far away. Romance, love,  emotion stays safe inside the pages of poetry...

We call it perfect Day... 

কবি প্রেরণা বলে-

 "জীবন মরণ সীমানা ছাড়িয়ে বন্ধু আছো দুবাহু বারায়ে।"

=====

স্পর্শময় ছন্দ খেলা

শংকর ব্রহ্ম


আমি নিশা খাতুন, থাকি চট্টগ্রামে । স্বামী কাতারে, এক কোম্পানীতে কাজ করে। বছরে একবার দেশে আসে, মাসখানেক থেকে আবার চলে যায়। যখন থাকে আনন্দের জোয়ারে ভাসি। চলে গেলেই জীবন শুষ্ক মরুভূমি।

     দু'তিন বছর এভাবে কাটার পর, সময় কাটাবার জন্য আমি এক ক্লাবের সদস্য হই । সেখানে আমার সাথে পরিচয় হয় বেলাল চৌধুরী নামে এক কবির সঙ্গে। মানুষটি ভদ্র, সুরসিক, মার্জিত, সুন্দর কথা বলে।

কিছুদিন ক্লাবে মেলা-মেশার পর তার সাথে আমার হৃদ্যতা বেড়ে ওঠে ,তার উপর আমার  বিশ্বাস জন্মায়। এরপর আমি তাকে একদিন আমাদের বাড়িতে আসতে বলি।

      সেদিন সকাল থেকেই বৃষ্টি , বেলা বাড়ার সঙ্গে বৃষ্টির দাপট বাড়ে। সন্ধ্যায় যখন তার আসার কথা, শহর প্রায় জলমগ্ন। ভাবি সে বুঝি আর এলো না। বৃষ্টির উপর আমার খুব রাগ হয় । তার প্রত্যাশা যখন ছেড়ে দিয়েছি, ঠিক সে'সময় কলিং বেলটা বেজে উঠল। ভাবলাম, কে এলো আবার এ'সময়ে।

     দরোজা খুলে আমি তাকে দেখে আনন্দে আত্মহারা হয়ে যাই।

     এসো এসো বলে আমি তাকে ঘরে এনে বসাই। দেখি তার জামা প্যান্ট সব ভিজে গেছে। আলমারি খুলে স্বামীর একসেট জামা কাপড় পরার জন্য তাকে বের করে দিই। বাথরুম থেকে শুকনো জামা কাপড় পরে সে যখন বেরিয়ে আসে আমি তাকে দেখে অবাক হয়ে যাই। দেখে মনেহয় ঠিক যেন আমার স্বামীই। পোষাক মানুষকে কতটা বদলে দেয়।  

      কিছু খাবার আর ড্রিংস নিয়ে বসি আমরা। দু'পেগ খাবার পরই কবি বলে ওঠে, চলো আজ ছাদে গিয়ে আমরা দু'জনে একসঙ্গে ভিজবো।

আমার সর্দির ধাত বলে, আমি না না করি। কবি আমার বারণ উপেক্ষা করে, প্রায় জোর করেই আমাকে ছাদে নিয়ে যায়।

সে আবেগে গান ধরে, 

' আজি ঝর ঝর মুখর বাদল দিনে,

জানিনে, আমি জানিনে 

নিশা ছাড়া আর কিছু জানিনে

আজি ঝর ঝর মুখরও বাদল দিনে.......'


   গান করতে করতেই আচমকা সে আমার কাছে এসে, আমাকে টেনে নেয় বুকে। আমি তার জন্য মোটেও প্রস্তুত ছিলাম না। আমি আপত্তি করি,

এ কি করছেন কবি?

সে হেসে বলে,আমি কিছুই করছি না বন্ধু। যা করার তা করছে এই প্রকৃতি ও পরিবেশ। এতে আমার কোন দোষ নেই।

তার কথা আমাকে স্পর্শ করে। আমাকে ভিতরে ভিতরে আলোড়িত করে। আমি আর নিজেকে ধরে রাখতে পারি না। আমিও একান্ত ভাবে নিজেকে সঁপে দিই বৃষ্টি মুখর সন্ধ্যার কাছে। তখন মনেহয়, যৌনতা শৃঙ্গার রসের এক স্পর্শময় ছন্দ খেলা ছাড়া আর কিছুই নয়।

  তারপর সে কখন আমাকে ঘরে পৌঁছে দিয়ে চলে গেছে আমি টের পাইনি। সকালে ঘুম ভাঙতেই দেখি টেবিলের উপর আমার স্বামীর জামা প্যান্টটা পড়ে আছে।

====

অভিসার 

সোমা মুখার্জী


পূর্ব দিগন্ত পেরিয়ে কালো মেঘের ভেলায় চড়ে সে এসে নাড়া দিল হৃদয়ের দরজায় । অঙ্গে তার জল ভারে অবনত কালো মেঘের সাজ। সারা আকাশব্যেপে ছড়িয়ে দিয়েছে আলুলায়িত কুন্তল।


মেঘ থেকে ঝরে পড়া বৃষ্টির ফোঁটা ভিজিয়ে দিল ঘরের আঙন, ভিজিয়ে দিল মাটি দিয়ে নিকোনো উঠোন, নিবিয়ে দিল সন্ধ্যায় জ্বালানো তুলসীতলার প্রদীপ,  মাঝে মাঝে আকাশের বুক চিরে  বিদ্যুতের ঝলক আলোয় উদ্ভাসিত করে তোলে অন্ধকার রাত।


হাওয়ায় হাওয়ায় পথ হারানো সুরে বাঁশি বাজে অরণ্যে 

প্রান্তরে।

মনের গহনে অজানা ব্যথায় দরবারী কানাড়ায় সুর তোলে সে কোন বিরহী চিত্ত।

বর্ষণমুখর এই গভীর রাত্রে মেঘমন্দ্রিত আকাশ নিজেকে নিঃশেষে সমর্পণ করে  তার চিরজনমের  প্রিয়া পৃথিবীর বুকে।

ঝর ঝর বর্ষণে অশ্রু হয়ে ঝরে পড়ে তার আজন্ম

 সঞ্চিত বিচ্ছেদ বেদনা।

সেই তো সীমার সঙ্গে অসীমের মিলনের পরম লগ্ন।

====

 আমার বর্ষা 

 সুজিত চক্রবর্তী 


                বৃষ্টি নিয়ে কিছু বলতে গেলে আমার প্রথমেই মনে পড়ে রবীন্দ্রনাথকে। বর্ষা এবং মেঘকে কত বিচিত্র রূপে কবি দেখেছেন সেকথা সর্বজনবিদিত । মনে পড়ে যায় এক মেঘলা দিনে ময়নাপাড়ার মাঠে হঠাৎ কালো মেয়ের কালো-হরিণ চোখ দেখে বিস্মিত কবি বলেছেন , 

 " এমনি করে কালো কোমল ছায়া 

 আষাঢ় মাসে নামে তমাল-বনে। "  


           নাহ্ , কিছু বলার নেই ! কালো মেয়ে কোথায় যে  গেছে সে হয়তো কবি ছাড়া অন্য কেউ জানে না। বিস্ময় পরের লাইনেও , 

      " এমনি করে শ্রাবণ রজনীতে   হঠাৎ খুশি ঘনিয়ে আসে চিতে । " 


         হয়তো বোঝা গেল , আষাঢ়ের প্রথম দিকের বৃষ্টির সাথে শ্রাবণের ঘন বর্ষার মধ্যে কিছু পার্থক্য বিদ্যমান। আর খুশি ? তার ব্যাখ্যা দেওয়া আমার কম্ম নয় । তবে রবীন্দ্রনাথ শ্রীনিকেতনে হলকর্ষণ উৎসবে মেতে উঠেছেন , এই দৃশ্য কল্পনা করতে করতে আজও আমি রোমাঞ্চিত হয়ে যাই নেহাতই অকারণে।  সেইসঙ্গে এসে পড়ে অর্থনীতি , জীবনের আদিরস যে অন্নরস , তার কাহিনীও ।  


            এ তো গেল মনীষীদের কথা। এবার আমার কথা বলি । আমার চোখে গ্রামাঞ্চলের বৃষ্টি আর শহুরে বৃষ্টির অনুভবে কিছু পার্থক্য আছে। এই পার্থক্য অবশ্য তৈরি হয়েছে আমার অল্প বয়সের অনুভূতি ও চেতনার মিশ্রণে , যার কিছু পরিবর্তন পরবর্তী সময়ে হয়েছে কিন্তু সে অন্য প্রসঙ্গ । 


             ছোটবেলা থেকে মনে হতো শহর থেকে দূরে প্রকৃতির কোলে চলে যাব যেখানে দূষণের কালো ধোঁয়া মেঘ হয়ে নেমে আসে সবুজ ধান ক্ষেতে অথবা সেই গহীন অরণ্যভূমিতে , যেখানে সূর্যালোক কখনও তেমন করে মাটি স্পর্শ করতে পারে না। বর্ষার আগমনে যেখানে বসুমতী কবিতা-সম্ভবা হয়ে ওঠে অনায়াসে।  


            চাইলেই তো সবকিছু পাওয়া যায় না। আমাদের বাস ছিল উত্তর কলকাতার এক ঘিঞ্জি এলাকায় । সঙ্গে ছিল জীবনের প্রতিযোগিতায় অংশ নেবার তাগিদ। সত্যি বলতে কি মনে হতো শহরে বৃষ্টি হবার কিছুমাত্র প্রয়োজন নেই , বরং মেঘেরা সব গ্রামের দিকে গেলেই মঙ্গল । আরও মনে হতো , শহরটাকে যদি কোনও আচ্ছাদনে সম্পূর্ণ ঢেকে দেওয়া যেত তাহলে বেশ হতো । আমরা শান্তিতে যে যার নিজস্ব কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকতে পারতাম।  যদিও বর্ষা না এলে অন্য ঋতুর আগমন অনিশ্চিত হয়ে যায় এ তথ্য  তখনই আমাদের জানা ছিল ভালো করেই , তবু আমরা বর্ষা চাইতাম না।  

            খুব ছোট বেলাতেই দেখেছি আমাদের গ্রামের বাড়িতে যাবার পথে রেল স্টেশনে নেমে সাইকেল রিক্সায় উঠে রিক্সা চালককে বাবা প্রশ্ন  করতেন "এ বছর জল কেমন হলো ? " এটা অবশ্য বর্ষার  শেষে পুজোর আগে যখন যাওয়া হতো তখনই জিজ্ঞেস করতেন বাবা। এটা শুনে হয়তো আমার মনে এই ধারণা  আরও বদ্ধমূল হয়েছিল যে বৃষ্টি কেবলমাত্র গ্রামাঞ্চলেই প্রয়োজনীয় , শহরে নয় । 


            এরপর কর্মজীবনে প্রবেশ করে বিভিন্ন জায়গায় বসবাসের অভিজ্ঞতা হলো। তার মধ্যে পশ্চিমবঙ্গের দুই জায়গার কথা বর্ষা প্রসঙ্গে বলতে হয় । প্রথমে ছিলাম দক্ষিণবঙ্গের খড়্গপুরে । এখানে গ্রীষ্মকালের শুরুতেই 

পাতকুয়োর জল শুকিয়ে গেলে বালতি আটকে যেত পাথরকুচি আর কাঁকরের ফাঁদে । অতএব  মানুষকে বর্ষাকালের অপেক্ষায় থাকতেই হতো। লোকে নীচু এলাকায় বাড়ি ভাড়া নেওয়ার পরামর্শ দিত এই মালভূমি অঞ্চলের রেল শহরে । 

              

          এরপর বদলি হয়ে এলাম উত্তরবঙ্গে , জলপাইগুড়িতে। এখানে অবশ্যই উঁচু এলাকায় বাড়ি ভাড়া নেওয়ার পরামর্শ দিলেন সবাই। হিমালয়ের কোলে এই অঞ্চলে বৃষ্টি লেগেই আছে। 

' বৃষ্টি পড়ে এখানে বারোমাস '  কবি যেন উত্তরবঙ্গে  বসেই  লিখেছিলেন মনে হলো। হলে কি হবে , আবিষ্কার করলাম এখানে প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ প্রথম বর্ষায় স্বেচ্ছায় বেশ আনন্দ সহকারে ভেজে । পরবর্তীতে এই আনন্দ আমিও নিয়েছি বহুবার । আবার অনিচ্ছুক হয়েও ভিজতে হয়েছে অনেক। অফিস থেকে ফেরার পথে কাঁধে অফিস ব্যাগ আর জুতো জোড়া মাথার ওপর হাতে তুলে নিয়ে বুক অবধি জলের ঢেউ ঠেলে আসার স্মৃতি আজও মনের গভীরে অমলিন । জমা জলে আটক শহরের একতলার ঘরে গভীর রাতে অচেনা শব্দে জেগে উঠে সাপের ভয়ে জড়সড় হয়ে দেখতে গিয়ে শেষ পর্যন্ত আবিষ্কার করেছি জলের স্রোতে মাছ এসে পড়েছে আমাদের বাসায় । বর্ষাকালে মাঝে মাঝে লাগাতার বৃষ্টির মধ্যে অনেকে  চলে যেতেন তিস্তার জল কতটা বেড়েছে তা দেখার জন্য । বয়স্কদের মধ্যে সেসময় আলোচনা চলতো আটষট্টি সালে জলপাইগুড়ির ভয়াবহ বন্যার স্মৃতি নিয়ে। শুনেছি , এই ভয়ংকর বন্যায় ক্ষতিগ্রস্থ হওয়ার পরে আর কখনোই জলপাইগুড়ি বন্যার আগের অবস্থানে ফিরে যেতে পারে নি । তার অগ্রগতি চিরদিনের মতো স্তব্ধ হয়ে গেছে এই বন্যার ফলে। 


               এরপরে এলাম আরব সাগরের তীরে মায়ানগরী মুম্বইতে। মুম্বই -এর বৃষ্টি নিয়ে অনেক কাব্য আছে । আমাদের বাংলার সাথে বৃষ্টি এখানকার বৃষ্টির তফাৎ হচ্ছে জুনে শুরু হয়ে প্রায় একটানা বৃষ্টি চলে গণেশ পুজোর সময় পর্যন্ত , অন্য সময় বৃষ্টির নামগন্ধ থাকে না , যদিও ইদানিং এরপরেও কিছু বৃষ্টি হচ্ছে

দেখছি। অনেকে বলেন এখানে বৃষ্টি বেশ প্রফেশনাল । শনি রবিবার একটু বেশি হয় । এই সময় মুম্বই-এর বাসিন্দারা বেরিয়ে পড়তে বড় ভালোবাসেন । লোনাভেলার পাহাড়ি এলাকায় , আলিবাগে সমুদ্র সৈকতে , সিলভাসার অরণ্যে অথবা মালসেজ় ঘাটে ভীড় করে তারা।  চলে যায় রেইন ড্যান্সে অথবা রেইনি পিকনিকে । পাহাড়ি রাস্তায় অজস্র ঝর্ণা নামে এই সময়। আমার কর্মস্থল ছিল জওহরলাল নেহরু পোর্ট এলাকায়। আমাদের অফিস যাওয়া আসার রাস্তার পাশে সবুজে সাজানো পাহাড়ের গায়ে বর্ষাকালে জলের ধারা কবিতার মতো নেমে আসে। আমরা বলাবলি করতাম এত বছর ধরে একই রাস্তায় যাতায়াত করলেও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে পরিপূর্ণ এই যাত্রাপথে একঘেয়েমির শিকার হই নি কোনও দিন । ট্রাফিক জ্যামে আটকে পড়ে কখনও বিরক্ত হয়েছি ঠিকই কিন্তু সেই জ্যামের কারণ বৃষ্টি অথবা প্রাকৃতিক দুর্যোগ ছিল না কখনও। উপরন্তু নবি মুম্বই অঞ্চলে জল জমার সমস্যাও নেই। কতবার অফিসে নিজের সিটে বসে কাজ করতে করতে দৃষ্টি চলে গেছে জানলার বাইরে , যেখানে সবুজ পাহাড়ের চূড়ায় এলিয়ে পড়েছে বর্ষার মেঘ । দেখে যেন মনে হয় পাহাড় বুঝি গলে যাচ্ছে ! তার সাথে রিমঝিম গিরে শাওনের ধারা , কখনও টানা চারদিন , কখনও এক সপ্তাহ , কখনও আরও বেশি। 


                 ছোট বেলা থেকেই  জানতাম যে কলকাতায় বৃষ্টির তেমন দরকার না থাকলেও মুম্বইতে আছে। কারণ , এই শহর জলের জন্য পুরোপুরি বৃষ্টির ওপর নির্ভরশীল । বর্ষাকালে বৃষ্টির জলে লেক ভরে ওঠে, সেখান থেকেই পরের বছরের জল সরবরাহ করা হয়। তাই কোনও বছরে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ কম হলে তা দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়ায় এই শহরে। অনবরত হিসেব চলে , লেকের সঞ্চিত জলে আর কতদিন মিটিয়ে দেওয়া যাবে দেশের সর্বাধিক জনবসতি সম্পন্ন এই শহরের চাহিদা ! দক্ষিণ ভারতীয়দের মধ্যে বৃষ্টির প্রার্থনায় ব্যাঙের বিয়ে দেবার প্রথা চালু আছে। আবার কখনও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে কৃত্রিম বৃষ্টিপাতের প্রয়াসও চলেছে মহারাষ্ট্রে । 


            অনেক আগে দেখেছি তেমন খরা হলে শহর খালি করে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়ার কথাও প্রশাসনকে ভাবতে হয়েছে।  ইদানিং অবশ্য লেকের সংখ্যা বৃদ্ধি করা হয়েছে, যদিও জনসংখ্যা ও হাইরাইজের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে সমান তালে। তাই মনে পড়ে যায় প্রয়াত প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারী বাজপেয়ীর কথা : মুম্বইবাসীর উচিৎ ছাতা উল্টো করে ধরা , যাতে অন্তত কিছুটা  বৃষ্টির জল ধরে রাখতে পারে । আর, নতুন হাউজিং সোসাইটির অনুমতি তখনই দেওয়া উচিৎ যখন নিজেদের প্রয়োজনীয় জলের ব্যবস্থা তারা নিজেরাই করতে পারবে । 

         লেক যখন জলে ভরে ওঠে তখন  উৎসবের মেজাজ। মেয়েরা শঙ্খধ্বনিতে ধন্যবাদ জানায় ঈশ্বরকে । মনে করা হয় তাঁর আশীর্বাদে আগামী বছরের জীবন সুনিশ্চিত হয়ে গেল এই শহরের নাগরিকদের। 

           পাশাপাশি এটাও ঠিক বর্ষাকালে জল জমে যায় পুরনো 'বোম্বাই '-এর অনেক রাস্তায়।বর্ষাকালে রেললাইন জলে ডুবে যাওয়া ও ট্রেন চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঘটনাও খুব স্বাভাবিক শহরে। মিঠি নদীর জলে ভেসে যাওয়া বিমানবন্দরে অবতরণ ও উড়ানও হয়তো বন্ধ হয়ে যায় কয়েকবার । কিন্তু এসবের পরেও এই শহরের বাসিন্দাদের কাজে যাওয়ার তাগিদে ভাটা পড়ে না কখনও । এটাই ' মুম্বই স্পিরিট ' ।


             তবে এই ' মুম্বই স্পিরিট ' এক বড়সড় পরীক্ষার মুখে পড়েছিল দুহাজার পাঁচ সালের ছাব্বিশে জুলাই । রিমঝিম বৃষ্টি তো জুলাই মাসে হয়েই থাকে , ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টিও হয় । কিন্তু, এই দিন বিকেলের পর হঠাৎ মেঘ ফেটে ( cloud burst  হয়ে ) আকাশ ফুটো হয়ে গেল। এরপর জল শুধু জল। পরিসংখ্যান অনুযায়ী চব্বিশ ঘন্টায় বৃষ্টি হয়েছিল ন'শো চুয়াল্লিশ মিলিমিটার। ফলে হড়পা বান । একহাজারের বেশি নাগরিকের মৃত্যুর সাক্ষী হয়ে রইল মুম্বই।  

             

     অফিস থেকে বাড়ি ফিরতে পারেন নি অনেকেই। আমিও পারি নি । একমাত্র রিলায়েন্স মোবাইল ছাড়া অন্য কোনও দূরভাষ পরিষেবা চালু ছিল না। পরদিন বেলা বারোটা নাগাদ বহু কষ্টে বাসে করে বাড়ির কাছাকাছি পৌঁছে বুঝতে পারলাম  আর এগোনো ঠিক হবে না। সামনের রাস্তায় বুক ওবধি জল । জলপাইগুড়ির কথা মনে পড়েছিল ঠিকই কিন্তু এখানে দেখে মনে হচ্ছিল জলের স্রোতে ভেসে যাব , তাই ও পথে যেতে আর মন চাইল না।  


              হঠাৎ মনে পড়ে গেল কাছেই আছে এক সহকর্মীর ফ্ল্যাট। সেখানে হাজির হলাম আশ্রয় নিতে। ভাগ্যক্রমে তাকে বাড়িতে পাওয়াও গেল। গতকাল তার নাইট শিফ্টে ডিউটি ছিল , যেতে পারে নি। দু'চার কথার পর সে জিজ্ঞেস করল , " কি খাবে বলো ? ঘরে তেমন কিছু নেই। রুটি আর আচার দিলে চলবে ? " আমি বললাম,  " চলবে না , দৌড়বে। চব্বিশ ঘণ্টা হতে চলল প্রায় , পেটে তো কিছু পড়েই নি ! "   শুধু একটু আচার দিয়ে রুটি খেতে আমরা যদিও খুব অভ্যস্ত নয় তবু সেদিনের খাবারের অতুলনীয় স্বাদের কথা আজও উজ্জ্বল হয়ে আছে স্মৃতিতে।


               আরও অনেক কথা ও কাহিনিতে বর্ষা উজ্জ্বল হয়ে আছে আমার স্মৃতিতে , সন্দেহ নেই। তবু এখানেই ইতি টানতে হবে বর্ষার স্মৃতিচারণের এই মুক্তধারা। সত্যি বলতে কি এ কাহিনী শেষ হবার নয় । কারণ প্রতি বছরই বহু যুগের ও পার হতে আষাঢ় আদি কবির বার্তা নিয়ে ফিরে ফিরে আসে। তার ফলে শুধু যে প্রকৃতির শরীরে নতুন রঙের ছোঁয়া লাগে তাই নয় , সেই রঙ ছড়িয়ে পড়ে সবখানে। তখনই গেয়ে ওঠে আমাদের মন : 


   ' তোমার অঝোর ধারায় ভিজে 

        আমি নতুন হলাম নিজে ।' 


       এই নবীকরণের পালা চলতে থাকুক পৃথিবী জুড়ে। শত ফুল বিকশিত হোক। পুজো হোক। মালা বদলও হোক না  !

=====

ছলছবি

মেখলা ঘোষদস্তিদার 


অভিমান গলে জল হলে

জমা মেঘ ভাঙে ধীরে ধীরে 

ছলছবি রিমিঝিমি সুরে

ঝরে পড়ে শহরের ভীড়ে,


মেঘলায় টান টান ঝিম

চোখ জুড়ে ঘুম কথা বলে


আলো সব টিমটিম জ্বলে

ভিজে মন অবিরাম টলে,


ঠান্ডায় বাতাসের ছুট

বিকেলের সজনের ডালে

মাছরাঙা সুখ ডানা মেলে

রঙ লাগে হৃদয়ের ঢালে,


মনসুনে রোম্যান্স দোলে রুমঝুম পায়েলের তানে


ভাঁজ খোলে উচাটন তটে

মন্থনে আনন্দ ঘ্রাণে,


ইশারায় উত্তাল ক্ষণ

মৃদু ছোঁয়া কম্পিত স্বর


অস্থির নিশ্চুপ মুখ

ক্যান্টিনে ধোঁয়া ধোঁয়া ঘর,


থমথমে চুরমুর লন

ঝর্ঝর বানভাসি কূল


সবুজের জীবন্ত প্রেম

সেতুপথে নেই কোনো ভুল,


নীর ভাষা আদরের স্রোতে

হাসিরেখা ছড়িয়ে যে পড়ে


বেহিসেবী শব্দের তোড়ে

বৃষ্টি সে শূন্যতা ভরে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

1 মন্তব্যসমূহ

  1. প্রত্যেকটি লেখা অপূর্ব,খুব ভালো লাগলো বৃষ্টি কথার অংশ হতে পেরে ,অনেক অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা দর্পণকে💐💐

    উত্তরমুছুন