দর্পণ || বর্ষা সংখ্যা ২০২২ || পর্ব -৪




পোস্ট বার দেখা হয়েছে

মেঘ জমেছে

 মনোজ কুমার রথ (শ্রীমান অকুলীন) 


বৃষ্টি নামুক তোমার শহর জুড়ে,

ছাঁটটা লাগুক অগোছালো কেশে;

জানলা খুলে চোখ রেখেছি দূরে,

নামটি ধরে ডেকোই ভালবেসে।


এই যে ভূমি রুক্ষ বড়ই আজ,

কবে যে কখন কে এনেছে বান!

সে সব ভেবে আর কি বল কাজ?

প্রেম জীবিত- সে তো অনির্বাণ।


স্মৃতির ঘরে রং করি না আর,

ডাইরিটাতে জমছে জমুক ধূলো;

তোমার কাছে মেনেই নিলেম হার,

উড়িয়ে দিলেম জীর্ণ পাতা গুলো।


কাব্য লেখো-   পারলে উপন্যাস,

শব্দে ভরা তোমার শব্দকোষ;

মেঘ জমেছে-  কিসের সর্বনাশ,

আষাঢ় মাসও ভেবো সুখের পৌষ!


বৃষ্টি নামুক তোমার শহর জুড়ে,

যাক্ না ভিজে আমার পুরো গেরাম;

রিম্-ঝিম্-ঝিম্ টাপুর-টুপুর সুরে,

উঠুক নেচে শোণিত এবং সেরাম।


মিষ্টি কথায় পাঠিয়ে দিলেম চিঠি,

আজ বিকেলে মেঘ পিওনের হাতে;

মুচকি হেসে দেখো রেখেই দিঠি,

ভালো থেকো-  ছোট্ট কথা তাতে।


কামরাঙা রং ওই যে কোমল দেহ;

জড়িয়ে নিও ফলসা রঙের শাড়ি;

ঢেউয়ে পরে ঢেউয়ের খেলাগেহ,

সত্যি বল- আসছো কবে বাড়ি?


সত্যি সোনা - মেঘ জমেছে মনে,

ভাসবে বলে লালডুংরির মাঠ;

বকুল কদম কুড়িয়ে এনো বনে,

কি লিখেছি- শুনবে কাব্য পাঠ।

====                        

ব‍্যর্থতার ভেজা ইতিহাস 

মলয় দাস(পরিযায়ী)


বারান্দার তারে ক্লিপে মেলা অনেক ইতিহাসের স‍্যাঁতস‍্যাতে ছত্রাক বাসা বাধা সাইকোলজির ত্বকে যতই দর্শন তত্বের অ‍্যান্টি ভাইরাস,ব‍্যাকটেরিয়ার লোশনের প্রলেপ পড়ুক,সাইকোলজির ক্ষত ক্রমশ রূপান্তরিত ক‍্যানসার।।বর্ষার রিমঝিম রোমান্স, ক্লিপে আঁটা নস্টালজিক আবেগ,ভেঙে যাওয়া প্রেমে তারন‍্যের স্বপ্ন,মেঘের নিম্নচাপের রঙ যেন কতো শতাব্দীর মৃত্যু শোক বহন করে চলেছে ঝোড়ো বাতাস।।ধুলোর মতো জমা নিকোটিনের স্বেচ্ছাচারিতার দুঃখে দম বন্ধ হয়ে আসে।।বর্ষার বারান্দায় মেলে দেওয়া তারে সমস্ত আবেগ,প্রেম, ভালোবাসা,দুঃখ,কষ্ট, যন্ত্রনা, ক্লিপে কালো ব‍্যাজ পরে ঝুলতে থাকে যতোক্ষন না ভালোবাসার রোদ্দুর শুকনো করে ব‍্যর্থতার ভিজে ইতিহাস ।।

=====

বর্ষার জল

মুরশাদ সুবহানী


বর্ষায় নদীর জলের উপর


বৃষ্টি নাচছে   নূপুর পায়ে


মন নাচছে তাই।


 তাই না দেখে,


গাছের ডালে পাখি গাইছে গান। 


তাই  দেখে, ব্যাঙের  হ’ল বেজায় রাগ


শুরু করলো, বেসুরে ঘ্যাঙর ঘ্যাঙ গান।


বৃষ্টির রেগে বলল,  ব্যাঙ এবার থাম,


নইলে নাচ থামিয়ে চলে যাবো;


বর্ষায় নদী আর খালে-বিলে


পাবি না  তো জল,


জল বিনে তোর হবে না স্নান।


এই  শুনে ব্যাঙ থামিয়ে দিল গান।


বর্ষায় নদীর জলের উপর


বৃষ্টি নাচছে   নূপুর পায়ে


মন নাচছে তাই।


  ময়না , বুলবুলি


আর দোয়েল তাল মিলিয়ে গাইছে গান।


বৃষ্টি নাচছে ছন্দ তালে,


 বর্ষায় নদীর জলে।


তাই   দেখে,   


কবির মনে জেগে উঠল


বর্ষায় জল  ছন্দের কবিতার  তাল।

====

"বিদেশ থেকে মেঘের চিঠি"

সাবিত্রী জানা ষন্নিগ্রহী


        বাংলায় বৈশাখ--জ‍্যৈষ্ঠের প্রখর তাপে পৃথিবীর দেহ জ্বলে পুড়ে যখন দারুণ কষ্ট পাচ্ছে তখনই বিদেশ থেকে মেঘ চিঠি লিখছে ভারতের  বর্ষাধারার উদ্দেশ্যে।---আমি গ্রীষ্মের প্রখর দাবদাহ থেকে চলে এসেছি সুদূর আমেরিকায়। তখন বাংলায় বর্ষা ঢুকতে একটু দেরী আছে। জুনমাসের দশ তারিখ নাগাদ ঢোকার কথা। তবে মনে হয় ঢোকেনি। বিদেশ থেকে আকাশে জমে থাকা মেঘ আমায় এক বার্তা দিয়েছিল---আমি ঔ বার্তা যেন আমার বাংলার মেঘের কাছে পৌঁছে দিই‌। বিদেশে জুনমাসের প্রথম সপ্তাহের শেষে মেঘ জমাট বেঁধে উপহার দিয়েছিল "শিলাবৃষ্টি"--কোনদিন নাকি আমেরিকার কোকভিলের মানুষেরা এই শিলাবৃষ্টি দেখেনি। নালাগুলো সশব্দে বহন করছিল খরস্রোতা জলের তরঙ্গ। তবে ঔ একদিন। তারপর ৩৮--৪০ ডিগ্রি তাপমাত্রা বিলিয়ে দিচ্ছিল সূর্যদেবতা। এখানকার মানুষগুলো বাইরে বেরিয়ে হাঁসফাঁস করছিল আর আকাশপানে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করছিল--মেঘবালিকা তুমি কবে প্রাপ্তবয়স্কা হবে? --মনে হয় উত্তর দিয়েছে--একটু অপেক্ষা করো তো !!! ম‍্যাগনোলিয়া বৃক্ষ তার ডালে ডালে শ্বেতপদ্ম ফুটিয়ে রেখেছে, বিলুপ্তপ্রায় গিংগো বাইলোবার ডালপালা কচি কচি ফলভারে মাটি ছুঁয়েছে, সবুজ ম‍্যাপল গাছে পাতার কক্ষে কক্ষে গোছা গোছা চ‍্যাপ্টা ফলের ডালি---সবাই পরিণত হলেই আসছি।-- --জারুল তার ডালে ডালে সাজিয়ে রেখেছে সাদা, রক্তরাঙা, কমলা, রাণী রঙের ফুলের ঝুড়ি।--কয়েকটা মেঘবালিকা মাঝে মাঝেই ঝরে পড়ছে--কিন্তু এখানে তো বর্ষা আসে জুলাই মাসে। এখন তো জুনমাসের শেষ--ঝরে পড়া মেঘবালিকার ছোঁয়ায় বিভিন্ন রঙবাহারি "গ্ল‍্যাডিওলাস"-এর আগা-সেজে উঠেছে উন্নত-দীর্ঘ ফুলের কোমল দেহ নিয়ে। এক একজনের সে কি রূপ--কেউ বা সাদা, কেউ বা কালো, কেউ বা লাল-কেউ বা হলুদ, কেউ বা গোলাপি-কেউ বা কমলা---আরো কত কত রঙ্ তাদের। ওদের কথা থাক্---বাড়ির লনগুলোতে অযত্নে ফুটে উঠেছে হলুদ স্টার, গোলাপী ক্লোভার, নীল পিটুনিয়া, শ্বেতকন্টিকরি, বুনোগাজরের সাদা ফুলের ছাতা, ---আমাদের বাংলায় ও এদের দেখা মেলে। এছাড়া আরো কত কত নাম না জানা গুল্ম লতার ফুল-ফল। ---এরা পরিনত হলেই বিদেশের মেঘবালিকারা একসাথে জড় হবে। ঝরিয়ে দেবে বৃষ্টিধারা--সে এখনো দেরী আছে।-- জুনমাসে এখানে আকাশে মেঘ ওঠার কয়েক মিনিট পরেই বৃষ্টি নেমে যায়। আবার কখনো টর্নেডো দাপিয়ে দিয়ে যায় তার রূপ--লন্ডভন্ড করে দিয়ে চলে যায় কাঠের তৈরি বাড়ির ছাদ, পাইন--ম‍্যাপলের বড় বড় ডালপালা--রাস্তায় রাস্তায় লুটিয়ে পড়ে পাইন--ম‍্যাগনোলিয়া-ম‍্যাপল-ওকের আগামী বংশধরের অপরিনত অঙ্গ। আর ছিন্নভিন্ন হয় বাগানের বাহারি "হাইড্রেনজিয়ার লাল--সাদা-বেগুনি ফুলের মুকুটগুলো, ফুটন্ত ক‍্যামেলিয়া, ফোল্কেস্, সদ‍্যফোটা গাঁদার কোমল পাঁপড়ি"।

----------বাড়ির প্রত‍্যেক রুমের ভেতর রাখা ছোট্ট রেডিওগুলো মাঝে মাঝেই বার্তা শোনাচ্ছে--আকাশ থেকে কখন মেঘ তার ভারী দেহ মাটিতে ফেলবে--ঝরবে অঝোর ধারায় বৃষ্টি সুন্দরী--নাম হয়ে যাবে "বর্ষাএলো" -- খুশিতে মেতে উঠবে প্রতি বাড়ির লনের শুকনো ঘাস---জেগে উঠবে বনের ঝরে যাওয়া পাতার ডালপালাগুলো।---আর স্বস্তির শ্বাস ফেলবে উন্মুক্ত রোদে---লনের ঘাসকাটা, বাড়ি তৈরির সিমেন্টের কাজে ব‍্যস্ত মানুষগুলো। ----গত দু'দিন আকাশের মুখ গোমড়া---মেঘবালিকারা একসাথে জড় হয়েছে--পরিণত হয়েছে ওদের অবয়ব---ঝরিয়ে দেবে ঝরঝরিয়ে শ্বেত মুক্তাদানা---পথের উপর--ঘাসের উপর--ফুলের কলির উপর--কেউ হেসে উঠবে--কেউ কেঁদে কেঁদে মাথা লুটিয়ে দেবে ধরণী 'পরে। ----বাংলার মেঘ তুমি নিশ্চিতরূপে এখন মনের খুশিতে নেচে বেড়াচ্ছো। আমি বিদেশের মেঘ---আমাদের ও খুশির সীমা নেই---আমরা ও আসছি---সেজেগুজে--তবে আমাদের বিরতি বেশি---একটানা আমরা বাংলার মেঘেদের মতো নাচতে--গাইতে পারি না।---বাংলার মেঘ তোমরা ঝরে যাও---আমরা বিদেশের মেঘ তোমাদের নাচেগানে ---আমরা হাততালি দিয়ে তোমাদের অভ‍্যর্থনা জানাই। বিদেশের "বর্ষাকথা" কত না বলেই--বাংলার বর্ষার সাথে তো মেলে না আবার কখনো মেলে--সে কথা অজানা--তাই বাংলার বর্ষা তোমায় জানাতে পারলাম না--অনেক কিছু--আমি অপেক্ষা করছি---বাংলার বর্ষা তোমার না বলা কথাগুলো আমি কান পেতে শোনার অপেক্ষায়।------

=====

মেঘবেলা

কৃষ্ণা সিং বেরা


একটা মেঘলা দুপুর 

                      হঠাৎ বৃষ্টির ধারা                    

ব্যস্ত দিনের অভ্যাসে                      

                       ঘরছুটদের তাড়া

টুপটাপ চিন্তা বাড়ায়

                       ছাউনি ভেজা ছিটে

শীতল ছোঁয়ার গানে

                        মনের স্বপ্ন মিঠে

আলতো ছোঁয়া ঘাম

                         শহর ছাপানো ভিড়ে

নীলচে কথার সোহাগ 

                         ভাসমান নদীর তীরে 

 ইচ্ছেরা ছুটে চলে

                         খালি গায়ে শৈশবে

মনের বয়স ভারী

                          মলিনতা গেছে ডুবে।

আপশোস পুরানো দিন                           

                          ফিসফাস ব্যর্থ কথায় 

স্মৃতিতে জমেছে ধুলো

                         চেনা মুখ অস্পষ্টতায়।

নিজেরে গোছানো সুখ

                            নানান রঙের সম্ভারে

 বিষাদ লুকায় গোপনতায়                                                    

                           দূরে অশ্রাব্য চিৎকারে

মেঘের জমাট ভিড়ে

                            আজ অভিমানী রূপকথা

একলা মেয়ে জানে

                              মনের গহীন ব্যথা।

====

বৃষ্টি ঝরার কালে 

 নীলাঞ্জনা ভৌমিক


ভোরের আকাশ কেন সজল মেঘে ভরা !

সূর্য আজ পায় নি সময়,দেয়নি সে দেখা,

বাতাস কেন গাইছে গান মন উদাস করা!

বেদনা হয়ে ঝরবে! কোথায় আছে লেখা ?

অবাক চোখে তাকিয়ে আছে বিরহীনি পৃথা,

বলে - " কবে তুমি আসবে আমার কাছে ?"

আকাশ বলে মিষ্টি হেসে-" আসব তখন

মেঘ হয়ে জমবে যখন আমার বুকের মাঝে।

ঝরব আমি বৃষ্টি হয়ে দেখবে তখন তুমি 

ভিজবে তুমি,ভিজবে শুষ্ক- রিক্ত ধরা,

আনন্দে গাইবে গান চাষীরা সব মাঠে

ধানের চারা রোপন করবে এখন ওরা।"

পৃথা বলে-"রামধনু হয়ে দাওনা রাঙিয়ে!"

আকাশ হাসে - " আগে বৃষ্টি যাক থেমে।

রবির আলো ছড়িয়ে পড়ুক জলকণায়

সাতরঙে রঙিন হয়ে মুগ্ধ করবে তোমায়।

তুমি যখন পারি দেবে দূর অজানার দেশে ,

প্রেম হয়ে থাকব আমি তোমারই পাশে।"

====

বৃষ্টির কথা

অমরেশ বিশ্বাস


টাপুর টুপুর সারা দুপুর ভিজব সারা বেলা

আয় ভেসে যাই আমরা সবাই

ভাসিয়ে খুশির ভেলা।

বৃষ্টি এসে মন ভেজাল অনেক দিনের পর

সবুজ ঘাসে বুক ভরেছে

হলেও অনুর্বর।

সব হতাশা ধুয়ে দিল ঝাপিয়ে বৃষ্টি এসে

দিক্‌চক্রবালে বিদ্যুৎ 

উঠছে হেসে হেসে।

বিকেল এখন বড় মধুর আগুন ঝরা নয়

ঝগড়া ছেড়ে শালিক দুটো

মনের কথা কয়।

=====

 বৃষ্টির বাহার 

শুক্লা চ্যাটার্জি


আষাঢ় লগন মাসে বৃষ্টি দাগে মন, 

ঘোরতর কৃষ্ণকায় মেঘের আকাশ কাঁপিয়ে দাপাদাপি ।

চারিদিকে ঘন কালো মেঘ ছায়ে-- গুরু গুরু গম্ভীর নিনাদ সাথে নিয়ে বর্ষণে ঘনঘটা ।

পথ অন্ধকারে নিমজ্জিত, 

বায়ু শন্ শন্ বহে চলে যায় ।

হিমেল হাওয়ায় ছুঁয়ে অঝোরে ঝরে বারিধারা, 

হাই পথবাসী, হাই গৃহহীন! !!!

না জানি কত দূর্গতি ।

চারিপাশে বিদ্যুৎ চমকে উঠি, 

গর্জিছে বিষ নিশ্বাসে।

খোলা জানালার পাশে একই দৃষ্টিপাত. . . . . 

মনখারাপের অলস বেলা, 

প্রেম দহনে দারুণ জ্বালা ।

দুঃখ দুঃখ ছাপ  !!!!

আলিঙ্গন তীব্রতা দুচারটে পাতা ঝরে পড়ে, 

আকাশ ভেঙ্গে অশ্রুঝরায়. . . . . 

মুহূর্তে বাতাসে কম্পন প্রতিধ্বনি শোনা যায় ।

বৃষ্টির সমীকরণ অপর বিন্দুতে ছাপ , 

কেবলমাত্র ভালোবাসার টান।

 উদার আকাশটা দূর দূর লাগে, 

খাঁ খাঁ করে তোলে জীবনের শূণ্যতা ।

কবির ভাষাতে:----

" ছড়ায়ে বৃষ্টির বেলফুল 

দুলায়ে -

মেঘলা চাঁচর চুল,

চপল চোখে কাজল মেঘে আসিলে কে ?"

বৃষ্টি কামনার উৎসবের পদ্ধতি ----

একটা আবহগত মিল থেকেই যায়।।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

1 মন্তব্যসমূহ

  1. আমার লেখা বর্ষার জল প্রকাশিত হয়েছে, অবিরাম শুভেচ্ছা দর্পণের অগ্রযাত্রায়। অপর প্রিয় কবিদের লেখা চমৎকার হয়েছে। আবার সেই একটি স্লোগান কলম চলুক,এটি দর্পণের এই স্লোগানের সাথে যোগ করে দেই লেখা হোক উন্মুক্ত ,লিখুন নিরন্তর।

    উত্তরমুছুন