দর্পণ || ১৭ তম সংখ্যা || চিঠিপত্র || গঙ্গোত্রী চ্যাটার্জী




পোস্ট বার দেখা হয়েছে

কলমে গঙ্গোত্রী চ্যাটার্জী

প্রিয় দর্পণ বন্ধু, 

অনেকদিন ধরে ভাবছি তোমাকে একটা চিঠি লিখি। চিঠি লেখার রোমাঞ্চটাই আলাদা !! কিন্তু এই অতিমারির অস্থিরতায় হয়ে ওঠেনি।যদিও এখন আর ডাক-বাক্স পিয়ন এই সব আমরা ভুলতে বসেছি মোবাইল ফোনের দৌরাত্যে কিন্তু কিছু কিছু  জিনিসকে লুপ্তন্রায় ভাবলেও তার নস্টালজিক মূল্য অসীম। আসলে আমি পুরনো আর আধুনিকের মিশেল ভাবাপন্ন, আমি ভুলতে পারি না অতীতের প্রভাতী আকাশবানীর দিন শুরু রবিশঙ্করের সেই বিখ্যাত সেতারের সুরকে  ঠিক তেমনি হলুদ পোস্ট কার্ডে  চিঠি লিখতে এবং কারু পাঠানো চিঠি পড়তে দুটোই খুব ভালোবাসি। সত্যি চিঠি লেখা আমার এক প্যাশন বা বলতে পারো নস্টালজিক অরা।যাই হোক দর্পণ তোমাকে বন্ধুত্বের অনুভূতিতে সেই হারিয়ে যাওয়া হলুদ পোস্ট কার্ডে আমার চিঠি লেখা।

বন্ধু দর্পণ , তোমার কি মনে আছে তোমার সঙ্গে আমার সখ্যতা বেশ কয়েক বছর হলো। কিভাবে কেমন করে তা তুমি বেশ ভালোই জানো তাই  সেই শুভদৃষ্টির উল্লেখ নাই বা করলাম । মোটামুটি প্রথম দেখা প্রথম জানার অনুভূতি কখনো হঠাৎ, আবার কখনো আকাঙ্খা বা স্বপ্নের চাহিদায়  হয় তাই  আগ্রহের উচ্ছাস মেনে নিয়ে শুধু  মনে করাতেই বলি, হঠাৎ তোমার সঙ্গে দেখা আমার  আজ থেকে প্রায় বছর ছয়েক আগে, মনে পড়ছে কি ? এরপর আমি সাধারণ কবিতা  আর কালে ভদ্রে গল্প লিখে সেগুলো সপ্তাহে একটি করে তোমাকে উৎসর্গ করতাম শুধু তোমাকে ভালোবেসে।  তুমি ও যথার্থ মূল্যায়ন করেছ  বা করছ এখনো । আজ বলতে দ্বিধা নেই প্রথম দেখাতেই ভালোবেসেছিলাম  তোমার  উষ্ণ অভ্যর্থনা, তোমার রুচি কাছে টানার পদ্ধতিতে ঠিক আমি যেন পূর্ণিমার চাঁদের আকর্ষনে জলের কোটাল।তোমার পাশে থাকার পরিবেশটাও বেশ ভালো লাগলো কারণ তোমার জন্মদাতা আর লালন পালনের মানুষগুলো বড় আদরে সম্মানে সহজেই আমাকে আপন করে নিল যে,-----আমি পেলাম এক সাহিত্যের উদার অঙ্গন যেখানে ধীরে ধীরে আমার সাহিত্য সাধনার  রঙ্গন ফুল ফুটলো আর আমিও বিস্মিত হলাম আমার সাহিত্য সাধনার শক্ত বেদি  হলে তুমি অবশেষে ।  আমি আমার সুখ দুঃখ আনন্দ আবেগের ছায়া রাখলাম সেই বেদিতে। যাই বলো তোমার যৌথ পরিবারে একসময় থেকে চিরতরে থাকবার বাসনা জন্মালো বিশেষতঃ উৎকর্ষতা আর চতুর্দিকের উন্মুখত্ত খোলা হাওয়ার দরুণ। সেখানে না আছে বিশেষ বিশেষ রং বা ধর্ম এককথায় বলতে গেলে তিন থাক কাঁটাতারের বন্ধনহীন শাশ্বতঃ অঙ্গীকার !!এখানে যদিও বেশীরভাগ সতেজ পূর্বালি বয় বারোমাস তবে সব ঋতুরাই কচ্ছপ পায়ে গুটি গুটি এইখানে আসে আর যায়ও বিলম্বিত লয়ে। সর্বদা কুর্ণিশ করি তোমার আতিথ্যেয়তাকে, হতবাক হই বারে বারে  তোমার পরিবারের মানুষগুলোকে যখনই দেখি মনে হয় কবেকার আলাপের সুর মাধুর্যে হাত ধরে বসার জায়গা দিলো নিজগুণে। 

তোমার শতেক কর্মকান্ডে আমি মুগ্ধ আবার বিস্মিতও। সেই মুগ্ধতা আর বিস্মিতের রেশে ঘোর লাগে যখন তুমি মানবতার দায়ে নিজেকে মগ্ন রাখো  সেই সব মানুষদের হাহাকারের পাশে যার পরিণতি  আনন্দ খুশীর হাসি ফোটাও সেই সব সর্বহারা দুর্গত হতদরিদ্রের মুখে। ঐ সব সর্বহারা মানুষদের পাশে থেকে  নিরলস পরিশ্রমে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দাও তখন মনে হয়  তুমি পরিস্থিতির সেই বটবৃক্ষ। আমি লক্ষ্য করেছি  চুপিসাড়ে তোমার টুপিতে এক এক করে অনেক পালক লেগেছে বন্ধু, তুমি তার খেয়াল রাখ না !! আমি অনেক দূর থেকে সেই হরেক রঙীন পালকদের বসন্ত হাওয়ায় তির তির কাঁপন দেখতে পাই। বিশ্বাস করো মনের ভেতর এক পরিতৃপ্তির ঢেঁক ওঠে তোমার ঐ টুপির রঙীন পালকদের ইতিহাস জেনে-----যেমন ধর বিচ্ছিন্ন ভারতকে একত্রিত করেছ সাহিত্য আর মানবিকতার মোড়কে তখন মনে হয়েছিল তোমার হৃদয়ে মাটির শেকড়ের টান কোথায় যেন ছিল তা বার হয়ে এলো তোমার নানান কর্মসূচিতে । দেশে বা পৃথিবীর যে কোণায়  যখনই কোনো বিপদের কালো মেঘ ধেয়ে  আসে  দর্পণ তোমাতে তার প্রতিচ্ছায়া পড়ে আর  তুমি  তোমার পরিবার নিয়ে সেই বিপদের মোকাবিলার ঝাঁপ দাও তখন  আমার গর্বে বুকের ছাতি চওড়া হয়। 

আমি এ ও তোমার মাঝে দেখি আর বেশ বুঝতে পারি তুমি শেকড়ের টানের আকর্ষণেকে অগ্রাহ্য করতে পারো না তাই বাংলা ভাষাকে দৃঢ় থেকে দৃঢ়তর করার লক্ষ্যে তোমার একনিষ্ঠ লড়াই ।আজ যখন বাঙালীরা বাংলা ভাষাকে দূরে সরিয়ে বিদেশী ভাষা রপ্ত করতে কাল ঘাম ছোটায় তুমি তখন সব্যসাচীর ন্যায় দুই বাংলার বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে বাংলা সাহিত্যের খুঁটিটাকে আরো শক্ত ও গভীরে গেঁথে দূর দূরান্তে ছড়িয়ে দিচ্ছ আপন অনুরাগে।

বন্ধু দর্পণ,  বলতেই হয়  তোমার  চোখে পৃথিবীর খুঁটিনাটি থেকে বৃহৎ সব ভালো-মন্দের দৃষ্টিপাত ঘটে তাই বোধহয়  তুমি সময়ের সঙ্গে এত সুন্দর তাল মিলিয়ে চলতে পারো। আধুনিক টেকনোলজির বদান্যতায় ই-ম্যাগাজিন সম্প্রচারের এক বিরাট ভূমিকা তুমি নিয়েছ যার ফলে  সারা পৃথিবীর দরবারে তোমার কর্মপদ্ধতি  পৌঁছে যাচ্ছে।  আমার মনে হয়  তুমি  এক লহমায় বিশ্ব অগ্রগতিকে অগ্রাহ্য না করে তোমার সৃষ্টিশীল কাজের পরিচিতিতে ভাস্বর ।   

তোমার কর্মকান্ড দেখি আর ভাবি চাইলে সব করা যায় ব্যস্ততা কেবলমাত্র এক অজুহাত বা নাকাব বিশেষ।

বন্ধু দর্পণ আমি গর্বিত বোধ করি তোমার প্রতিটি পদক্ষেপ দেখে। বিশ্বাস কর এমন কোন যন্ত্র পাই না সেই পদছাপগুলি মাপার।  তুমি বোধহয় জানো না আমার পাহাড় প্রমাণ ঋণ জমেছে তোমার কাছে। আমার   ভালোবাসার লেখাগুলো তোমাকে উৎসর্গ করা মাত্রই তুমি তা দরাজ হাতে গ্রহণ করেছ কিন্তু কতটা খুঁত আর নিখুঁত তার মান গ্রহনযোগ্য কি না তা তুমি কখনোই আকার ইঙ্গিতে জানাওনি প্রথমে মনে খারাপ হলেও আজকাল আমি বুঝেছি ওটা তোমার নিঃশব্দ অনুপ্রেরনা। আরো শুনবে তোমার চোখের ভাষা আমি ও আজকাল পড়তে শিখেছি হয়তো তুমিই শিখিয়েছ  মানুষের চোখের জল  মোছানোর কায়দা রপ্ত করতে সব থেকে বড় কথা তোমার ভালোবাসার টানে আমি এক ছোট পরিধি থেকে বৃহৎতর পরিধির বাসিন্দায় রূপান্তরিত হয়েছি ভাবলে খুব ভালো লাগে। দর্পণ,  তোমার দিকে তাকালেই অনেক মুখের প্রতিচ্ছায়া আমি অন্ততঃ দেখতে পাই একসাথে একই সময়ে------ এ জীবনে এর থেকে আর বড় কিছু পাওনা কেউ কাউকে দিতে পারে না   এটা একমাত্র তোমারই মহত্ব আর উদারতা।  তোমার ভালোবাসার নরম চাদর জড়িয়ে আমি দর্পণ সোহাগী হয়েছি তাই এই ভাবে আমাকে ভালোবেসে জড়িয়ে আগলে রেখো চিরকাল। খুব খুব ভালো থেকো তার কারণ তুমি ভালো থাকলে আমার মত অনেক অনেক মানুষ ভালো থাকবে। তোমার সার্বিক উন্নতি সুদৃঢ় বন্ধন আর অনির্বান ভালোবাসার আশায় আজকের মত এই চিঠি শেষ করলাম । আমার হৃদয় উজার করা হার্দিক শুভেচ্ছা আর আগামীর শুভকামনা ঈশ্বরের কাছে  কামনা করি ।তোমার উত্তরোত্তর সার্বিক উন্নতি আমি নিজেও  প্রতিরোজ কামনা করি।খুব খুব ভালো থেকো আমার । প্রতিমুহূর্তের হৃৎপিন্ডের রক্ত সঞ্চালনের মত নির্মল পরিশ্রুত ভালোবাসা গ্রহণ কোরো প্রিয় দর্পণ বন্ধু।

ইতি

গঙ্গোত্রী চ্যাটার্জী

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

1 মন্তব্যসমূহ



  1. দিদি আমি বাকরুদ্ধ ! কি অসামান্য লিখলে ৷ তোমার আয়না দিয়ে আমি দর্পণকে দেখলাম ৷ এ বন্ধন অটুট থাকুক

    উত্তরমুছুন