দর্পণ || একাদশ সংখ্যা || সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় || কবিতাগুচ্ছ




পোস্ট বার দেখা হয়েছে

।। স্বরচিত কবিতা গুচ্ছ ।।

।। সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। ।


এই অন্ধকার থেকে 


অন্ধকারে থেমে গেছে ট্রেন

গন্তব্যের কতদূরে আছি কেউ ব'লবেন?

নির্বাক যামিনী ঘিরে আছে

হয়ত বা খুব কাছে

এসে গেছে বড় জংশন-

কামরায় সবাই কি ঘুমে অচেতন

কেউ কি জানেন কতখানি ব্যবধান

এই অন্ধকার থেকে শেষ ইস্টিশান?


অথবা কি গাড়ি আর যাবে না এ রাতে

নেমে গিয়ে নিঃসম্পাতে

এ ক্ষেত্রবসুধা পার হতে হবে পদব্রজে

যতক্ষণ না গন্তব্যের গান

বেজে ওঠে উষার ষড়জে।

একটি কবিতা


একদিন এত ক্লান্ত বোধ করবো যে

পপলারের পাশ দিয়ে সূর্যাস্ত হতে থাকবে

আমার দেখার ইচ্ছে থাকবেনা 

অবসাদ আমার চোখের পাতাকে ছুঁয়ে থাকবে ! 


উপত্যকার কোথাও আর বরফ নেই

ক'লক্ষ মানুষের পোড়াপেটে এখনও আগুনের দাগ লেগে আছে

বাঁকি জীবনটাও  থাকবে...

আখরোট উইলোর নীচে

আলো আর ছায়া দিয়ে পশমিনা তৈরী হচ্ছে

৩৬০ ডিগ্রীতেই দাম্ভিক পাহাড়

ভীষণ খাটনি নাবাল জমির কাদাছেনে বেহস্ত বানিয়ে যাচ্ছে

ভীষণ খাটুনি ষোল বছরের শিরদাঁড়াগুলিকে

পাকাপাকি বাঁকিয়ে দিচ্ছে ব'লে

খুব মোলায়েম স্বর্গীয় কার্পেট তৈরী হচ্ছে সন্ধ্যার কারখানায়

এ সমস্ত দৃশ্যের বর্ণনা করতেও একদিন ক্লান্ত বোধ করবো

চোখ বুজিয়ে নিতেই


সমস্ত কাগজে তাপপ্রবাহের হেডলাইন

ভারী তৃষ্ণা, কঠিন তৃষ্ণা

সবাই বুঝতে পেরে গেছে

গ্রীষ্ম, এক ঋতুমাত্র নয় 

আততায়ীর পোশাক প'রে জেনোসাইডে নেবেছে,

তবু চোখ বুঁজেই দেখতে পাচ্ছি

মহৎ শকুন গুলি উড়ছে 

ভূপৃষ্ঠ কে শবমুক্ত করার আকাঙ্ক্ষাগুলি

তামার তৈরী আকাশে উড়ে বেড়াচ্ছে 

বাজবরণ মাথা উঁচু ক'রে রেখেছে দেখতে পাচ্ছি

কিন্তু তার সহিষ্ণুতার কোন আওয়াজ নেই -- শুনতে পাচ্ছিনা 

ক্লান্ত চোখে এ ছবিও অবসাদের মধ্যে তলিয়ে যায়

পপলার পল্লবের বেশ কাছেই 

পিকচার পোস্টকার্ডের সূর্য্যটা ডুববে 

আমার দেখার ইচ্ছে থাকবে না 

একদিন এত ক্লান্ত বোধ করবো

একদিন খুব ক্লান্ত বোধ করবো !


পড়ন্ত ছায়ার মধ্যে 


পেছন থেকে কে চিৎকার করে উঠতেই

আমি দাঁড়িয়ে পড়লাম

ঝিলের মধ্যে আকাশ গা ডুবিয়ে রয়েছে

অতিকায় নিমবাস মেঘ

স্তম্ভিত প্রতিবিম্বে

বনপথে শরৎ ছিল বা

বিবিশ গন্ধের মধ্যে মনে পড়ে।

 কটা বাজে কে জানে

ঘড়ির একটা দাগও স্পষ্ট নেই এতদিনে

কোথায় কোথায় আয়েস পরিতৃপ্তি লিপ্সা ছিল

সব কটি দাগ মুছে গেছে

আন্দাজে কিছু বলা ঠিক হবে না তো,

কৈফিয়ত আফসোস

এই মুহূর্তে এসবের কোনো দাম নেই।

ভারী, দামী পাথরের টুকরোর মত সময়কে

ঢালু জমির ওপর গড়িয়ে যেতে দেখছি

জলের দিকে গড়িয়ে যাচ্ছে,

অনতিপ্রদোষের মধ্যে

সব ছবিগুলো ডুবে যাবে

ঝিল, জলের ভিতরে ছায়া আকাশনিমের।


কার মুখ দেখা যাবে

আততায়ী অত্যাচারী কিনা

এই সবই পড়ন্ত ছায়ার মধ্যে সন্ধান করেছিলাম

ল্যাংচাতে ল্যাংচাতে যে সামনে এসে দাঁড়াল

সে আমার এতগুলি বছরের নিঃসঙ্গতা

হাস্যকর ভাঁড়ের পোশাকে।

ব্যক্তিগত নক্ষত্রমালা


ভালোবাসা মানেই কেবলই যাওয়া

যেখানেই থাকি না কেন

উঠে পড়া

পেয়ে গেলে নিকটতম যান

কলকাতা কিছুতেই ফুরতে চায় না

কোনো রাস্তা ফরতে চায় না

কখনও তুমি মিনিবাস ধরে নেবে

আমি ঝংকার দেওয়া ট্রাম—

তারপর থেকে কেবলই যাওয়া

কাছ থেকে অনেক দূরে

কিংবা সময় ঠিক করা থাকলে কাছে আসা

ক্যাথিড্রালের দুর্লভ ঘণ্টা বাজছে

সখ্যতায় ভরে উঠেছে ময়দান

মাঘের বিকেলে।

এক চিলতে গলি তারই নাম সুখ

তারই অন্ধকারে

আমি স্পর্শ করেছিলাম তোমার দিব্য চিবুক—

সঙ্গে সঙ্গে শৈলসানু আঁধার হয়ে এল

গোলপাতা ছাউনির ঘর

শীতরাত্রির স্বপ্ন ক’টি মুড়িসুড়ি দিয়ে বসে গেছে

শীলাতল

ব্যগ্র হয়ে কেড়ে নিচ্ছে উত্তাপ কোমল

দু’জনের থেকে—

তোমার চিবুক স্পর্শ ক’রে কতদূর আমরা যেতে পারি

এক চিলতে গলি তারই নাম সুখ

তারই অন্ধকারে

স্বপ্ন থেকে স্বপ্নে প্রস্থান আলবৎ সম্ভব

অথবা দুঃখের ভিতর থেকে আরো দুঃখের ভিতর

নিয়ে যেতে পারে

ভালোবাসা

ভালোবাসা মানে কেবলই যাওয়া

কোলকাতা রোল করা গালিচার মত কেবলই খুলে

যাচ্ছে কেবলই

আমাদের পায়ের নিচে

ফুরোচ্ছে না।

তবু ভালোবাসা ফুরায়ে গেলে

আমি অপ্রেম থেকে চলে যাব ব’লে

অভিমানে বাসস্টপে এসে হাত নেড়ে ডাকি

ভালোবাসা কখনও কখনও চলে যাওয়া

ঘর গ’ড়ে ঘর ভেঙে ফেলা

তারপর উঠে পড়া

পেয়ে গেলে নিকটতম ট্রাম

পড়ে থাক রাজবংশ বৈভব যা কিছু

সব ছেড়ে চলে যেতে পারে শুধু ভালোবাসাই—

সেই কোনোদিন

ফিরে এসে তাকাতে পারে অকপটে অনিমেষ

ক্যাথিড্রালে ঘণ্টা বাজলেই

কিনতে থাকবে মুহূর্ত এন্তার

একরাশ ব্যক্তিগত নীল নক্ষত্রমালা।

ভালোবাসা বহুদিন আগে


ভালোবাসা বহুদিন আগেই

বাসে উঠে পড়তে না পেরে

দাঁড়িয়ে গেছে

হয়ত এখনও বাসস্টপে

মুখ তার

আঠারো বছরের শ্যামল ইস্পাত

হয়ে দাঁড়িয়ে আছে


এক একদিন ইচ্ছে করে

ফিরতি বাসে উঠে চলে যাই

দেখে আসি তাকে

এক একদিন আমার যাওয়ার সম্ভাবনায়


বৃষ্টি আসে

আকাশকে আষাঢ় ব’লে ডাকতে ইচ্ছে করে।

‘এই যে, এত দেরী করলে কেন’

ব’লে কেউ কব্জিটা শক্ত ক’রে

ধ’রে নামিয়ে নেবে


আঠারো বছরের মুখে কিছুটা ইস্পাত থাকে

এখন হাতে পিস্তল রাখা বারণ

তাই নীল ইস্পাতটুকু মুখে

ভালোবাসার কাছে কিছুই নেই এখন

কার্তুজ বন্ধুরা রাজনীতি

একটি বর্ষাতিও নয়


বরষায় তাকে খুব একা দেখব বোধহয়

যদি ফিরতি বাসে যাই।

সদরে শব্দ হ'লে


সদরে শব্দ হ'লে ছুটে আসি

      কে এল কে এল বা 

সুখের মুহূর্ত ক'টি, দারুণ দুঃখের দিনও হ'তে পারে

ভবঘুরে আহ্লাদ আছে এক

     কটা চুলে কবেকার উদাসীন জটা,

জোরে কেউ নাড়া দিলে কড়া

      আমাকে দাঁড়াতেই হবে সামনে এসে


               তাতে পুড়ে যাচ্ছে গা তার

ভীষণ অসুখ নিয়ে হয়ত এসেছে কোনো বেমারি সময়

হ'তে পারে আশ্বিন ঝিকিয়ে দুই চোখে

       মন্থর তৃপ্তির ক্ষণ

               অতিথির ছদ্মবেশে এসে দাঁড়াল

দরজায় টোকা পড়লে আমাকে যেতেই হবে ছুটে

     শীত শরতের বেলা হ'তে পারে

            অথবা বর্ষণ....

কে এল, ধুলোপায়ে শমন এল বা !

এক এক দিন


এক এক দিন

একটা নদী জেগে ওঠে এই দেহটার মধ্যে

কূল ভেঙে দেয়

নিরাপদ যা কিছু ছিল খরস্রোতে ভাসে

এক এক দিন

ভালোবাসার জন্যে মনে এত ঢেউ ওঠে

সেই সুনামিতে

হাট বাজার কাছারি দপ্তর সব ভেসে যায়

এক এক দিন

সুন্দরের জন্যে হাহাকার

আকাশ বাতাস বসন্তের গানে ভরিয়ে দেয়

এক এক দিন

নদী জেগে ওঠে ডমরু বাজিয়ে

তোমারও ঘুম ভাঙাতে চায়

বসন্তের গানও সেদিন বুঝি বলতে চায়

যেদিন থাকবো না সেদিনও ভালোবাসা

স্মৃতিও এক এক দিন সত্যি হয়ে ওঠে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

2 মন্তব্যসমূহ