গল্প | কামিনী কাঞ্চন | জয়া চক্রবর্তী সোমা




পোস্ট বার দেখা হয়েছে

                       অঙ্কন : পৌলমী গঙ্গোপাধ্যায়

কামিনী কাঞ্চন
জয়া চক্রবর্তী সোমা


কাঞ্চনকে আর সহ্য করা সম্ভব নয় কামিনীর পক্ষে। কোনদিনই ইনফ্যাক্ট সম্ভব ছিল না।বাবা যখন মা মরে যাবার পর কুন্তলা নামের ওই শয়তান মহিলাকে বিয়ে করে ঘরে আনল তখন যৌতুকে কাঞ্চনকে নিয়ে এসেছিলেন তিনি।কুন্তলার আগের পক্ষের মেয়ে।বিধবা মহিলা রূপের জালে বাবাকে ফাঁসিয়েছিল।হাঘরে ঘর।পেটে ভাত জুটত না।বাবার অফিসে সেক্রেটারি ছিল।বাবাও ছলনায় ভুলে রাক্ষসীটাকে নিয়ে এল।কামিনী ছিল এবাড়ির একমাত্র মেয়ে।সবার আদরের।বাবা ঠাকুমা ঠাকুরদা সবাই তার বায়না মেটাতে সদা তৎপর।মা মরা বলে তার জন্য সবার  কনসিডারেশন।কিন্তু কুন্তলা রক্ষিত নামের ওই মহিলা কাঞ্চন নামের মেয়েটাকে নিয়ে এবাড়িতে পা রাখার পর ধীরে ধীরে সব বদলে গেল।প্রথমে দাদু ঠাম্মি কেউ মেনে নেয় নি।অথচ আশ্চর্যের বিষয় দুদিন যেতে না যেতে ওরাই কুন্তলা কুন্তলা করে অস্থির।হবে নাই বা কেন? ডাইনী মন্ত্র জানত।সকাল সকাল প্রণাম করে,পায়ে তেল মালিশ করে,অষুধ খাইয়ে সেবার নাটক করে ওদের বশ করল।বাবা তো আগেই কাত হয়েছিল।কামিনীকেও তো বশ করার কম চেষ্টা করে নি।মা হতে এসেছিল শয়তানী। কোথা থেকে জেনেছিল কে জানে কামিনী কি কি ভালোবাসে।সে সব রেঁধে মা এর জায়গাটা নিতে চেয়েছিল।কিন্তু কামিনী আর সবার মত বোকা নয় যে চালাকী বুঝবে না।আসলে তো সম্পত্তি পাওয়ার ধান্দা।নিজের মেয়ের ভবিষ্যৎ পাকা করার ফিকির।কাঞ্চনকে বাবা বলেছিল দিদি ডাকতে।ইসসস!! কোথাকার কে।জাত জন্মের ঠিক নেই সে হবে কামিনীর দিদি।কামিনী কোনদিনই কাঞ্চনকে দিদি বলে নি।নাম ধরে ডাকে।আর কুন্তলার সাথে তো  নেহাত দরকার পরলে ভাববাচ্যে কথা।কাঞ্চনও ঠিক ওর মায়ের মত নাটুকে। দাদু দিদাকে হাত করতে সময় নেয় নি।ও নাকি ভদ্র বাধ্য। ও নাকি কামিনীকে বোনের মত ভালোবাসে। একদিনে বাবার সিদ্ধান্তের খেসারত দিতে গিয়ে কামিনী রায় বাড়ির একমাত্র মেয়ে থেকে হয়ে গেল রায়বাড়ির ছোটমেয়ে।বড়দিদিমনি আসতেই কামিনী হয়ে গেল ছোটদিদিমনি।কামিনীর এই ডাকটা শুনলে মনে হয় কাঞ্চনকে জাস্ট মেরে ফেলবে।কাঞ্চনকে বাবা অফিসিয়ালি দত্তক নিল যেদিন সেদিন বাড়িতে পার্টি দিয়েছিল।সেইদিন থেকে কামিনীর জীবনের এক এবং অন্যতম উদ্দেশ্য কাঞ্চনের ক্ষতিসাধন। সেদিন প্রথম কাঞ্চনের উপহারে পাওয়া টেডিটাকে কুচি কুচি করে ছিঁড়েছিল।বাবা সেই প্রথম গায়ে হাত তুলেছিল কামিনীর।কুন্তলা রক্ষিত বাবাকে আটকেছিল।না হলে বাবা হয়ত একটা চড়েই থামত না।কামিনী সারারাত কেঁদেছিল আর বুঝেগিয়েছিল কাঞ্চন তার জীবনের এক ও এক মাত্র শত্রু।কামিনী নামী ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে পড়ত।কাঞ্চন পড়ত ঐতিহ্যশালী এক বাংলা মিডিয়ামে। কামিনী পদে পদে এই নিয়ে অপদস্থ করতে চাইত।কিন্তু খুব একটা সম্ভব হত না। কারণ কাঞ্চন বাংলা মিডিয়ামের ছাত্রী হলেও ইংরাজী খারাপ জানত না।একদিন কামিনী ওর স্কুলের বন্ধুদের বাড়িতে নিমন্ত্রণ করে সেখানে কাঞ্চনকে ডাকল।তারপর বলল -"কাঞ্চন নাউ প্লিজ ইন্ট্রডিউস ইয়োর সেল্ফ।" কাঞ্চন হাসি হাসি লাজুক মুখে বলতে গেল-"আমি কাঞ্চন। কামিনীর.." 
কামিনী ওকে চুপ করিয়ে দেয়-"আ হা হা..মাই ফ্রেন্ড্রস আর কোয়াইট আনকমফর্টেবেল ইন বেঙ্গলী।উইল উই প্লিজ স্পীক ইন ইংলিশ?" কাঞ্চন একটু অপ্রতিভ হয়।তারপর ইংলিশে ব্যাকরণ সম্মত ভাবেই বলতে শুরু করে।কাঞ্চন বলতে শুরু করতেই হাসির রোল উঠল।জল ভরা চোখে মুখ নীচু করে নেয় কাঞ্চন।মনে মনে অপরিসীম শান্তি পেয়েছিল কামিনী।কিন্তু সেই শান্তি স্থায়ী হল না।কামিনীর বাবা এসে যান।তিনি কাঞ্চনের মাথায় হাত রাখেন।গা জ্বালা করে ওঠে কামিনীর।বাবা কামিনীকে বলে -"কাঞ্চনকে নিয়ে হাসছ কেন? ও ইংরাজী তোমাদের মত বিদেশী টানে বলে না বলে? আচ্ছা ইংলিশ তো বিজাতীয় ভাষা।তুমি বা তোমরা নিজের দেশীয় ভাষাটা ঠিক মত জানো?" কামিনী বুঝতে পারে না বাবা ঠিক কি বলতে চাইছে।বাবা হঠাৎ করে বলে - " জাস্ট সিম্পল একটা বানান বলতো।কুজ্ঝটিকা স্পেল কর।" কামিনী মুখ লাল করে ঘরে চলে গিয়েছিল।স্কুলের বন্ধুদের সামনে এই অপমান ওকে পাগল করে তুলেছিল।আর এই অপমানের কারণ ওই কাঞ্চন।প্রতি পদে পদে মনে হত মরে যাক মেয়েটা।কিন্তু এর পর থেকে কাঞ্চন ওর মা কুন্তলা রক্ষিতের ঘেরাটোপে থাকত।তাই হাজার চেয়েও কামিনী ওর ক্ষতি করার মত কাছে কিছুতেই পৌঁছাতে পারত না।অথচ মুখে কি ভাব ভালোবাসাই না দেখাত মা বেটি।সব বাবার চোখে  ধূলো দেবার জন্য।হাড়হাভাতে মেয়েটা যখন এ বাড়িতে এসেছিল হাড়গিলে চেহারা ছিল।বড়লোকের বাড়ির জল গায়ে পরতেই রূপ খুলে গেল।বছর পনের যখন বয়স তখন থেকেই "বাহ, ভারী সুন্দর দেখতে তো" শুনে শুনে কান পচে যাচ্ছিল কামিনীর। কামিনী কুচ্ছিত নয়।কিন্তু কাঞ্চনের মত দুধে ধোয়া ফর্সা সে নয়।কামিনী ছিপছিপে।চোখ মুখ শার্প।একটা উগ্র রূপের ছটা আছে ওর মধ্যে।যেন কালো আগুণ।কাঞ্চন ঠিক উলটো।খুব ফর্সা,লাবণ্যময়ী, ভরন্ত চেহারা, সদা লাজুক ও সংকুচিত।অবশ্য কামিনী জানে এই ভয় লজ্জা সংকোচ আসলে লোক ভোলানো নাটক।কিন্তু কামিনী আর কাঞ্চন এক জায়গায় থাকলে কাঞ্চনের প্রশংসাটাই আগে উঠে আসে।অবশ্য যারা প্রশংসা করেন তাদের পরের কথাই হয় " সুবিমলের দুই মেয়েই সুন্দর"....কিন্তু এই দ্বিতীয় হয়ে থাকায় যেন হেরে যাওয়াটাই প্রকট মনে হয় কামিনীর।অথচ ফর্সা হবার জন্য সবচেয়ে দামী দামী ক্রিম ক্লিঞ্জার ফেসোয়াশ সে ব্যবহার করে।তবু হয় না...কিছুই উন্নতি হয় না।কামিনীর মনে হয় আয়না যেন ব্যঙ্গ করে। কামিনী খুব চেষ্টা করছিল এই সব থেকে দূরে স্টেটসে চলে যাবে। ওখানে হায়ার স্টাডি করে সেটেল হবে।অন্তত কাঞ্চন আর ওর মায়ের পাপী মুখ তো আর দেখতে হবে না।
অঙ্কন : পৌলমী গঙ্গোপাধ্যায়

কিন্তু কামিনীর যাওয়া হয় নি।কেন? কারণটা কামিনীর কাছেই বড় অদ্ভুত।এত অহংকারী ইগোইস্ট মেয়েটার জীবনে যে এমন একটা কারণ কখনও উদয় হতে পারে ভাবতেই পারে নি কামিনী।কারণটার নাম সুজয়।কামিনীরই কলেজে পড়ে।সারা পৃথিবীতে এই একজনই আছে যে কামিনীকে বোঝে।কামিনী নিজে থেকে যে ওর বন্ধু হয়েছিল তা নয়।কিন্তু প্রাণ খোলা ছেলেটা এক ঝলক বাতাসের মত।তাকে দূরে সরিয়ে রাখার ক্ষমতা কামিনীর ছিল না।জোর করেই সে ঢুকে পরেছিল।কামিনীর রাগ অহংকার অপমানকে তুচ্ছ করে।তারপর কখন এক সময় কামিনী নিজের অজান্তেই সুজয়ের উপর নির্ভর করতে শুরু করল তা তার মনে পরে না।কিন্তু এখন যখন ভাবে স্টেটস এ চলে গেলে সুজয়কে ছেড়ে যেতে হবে, যাওয়ার ইচ্ছেটা ভিতর থেকে জোর হারিয়ে ফেলে।সুজয় কামিনীকে এতটাই ভালো করে বোঝে যে কামিনীর এই ফিলিংসটাও ওর কাছে গোপন নেই।কামিনী মুখে না বললেও সে বোঝে কামিনীর কষ্ট, দু:খ, যন্ত্রণা একাকীত্ব। সুজয়ের বাবা রুলিং পার্টির একজন বড় নেতা।সুজয়কে তিনি রাজনীতিতে টানতে চেয়েছিলেন।কিন্তু সুজয়ের ওসব ভালো লাগে না।সে গিটার বাজায়।সুর বাঁধে।এই নিয়ে বাবার সঙ্গে নিত্যদিনের খিটিমিটি লেগেই থাকে তার।যখন ওর কিছু ভালো লাগে না তখন জোর করে কামিনীর হাত ধরে সামনে বসায়।আর নতুন সুর বানায়।বলে-"জানিস কামিনী, তুই সামনে বসলে নতুন করে গান তৈরী হয়।"কামিনী সুজয়ের হাত চেপে ধরে জলভরা চোখে।বলে-"আমায় কোনদিন একা ছেড়ে চলে যাবি না তো?" সুজয় ওর গাল টিপে দিয়ে বলে-"পাগলী একটা।" 
সুজয় জীবনে আসার পর কাঞ্চনের প্রতি সেই তীব্র বিদ্বেষটা নিয়ে বেশী মাথা ঘামানোর সময় পাচ্ছিল না কামিনী।কাঞ্চনকে নিয়ে ভাবার চেয়ে ঢের বেশী ইম্পর্ট্যন্ট কাজ আছে তার।কামিনীর ভিতরের ভালো লাগাটুকু ও একটুও নষ্ট হতে দিতে চায় নি অন্য কিছু ভেবে।কিন্তু কামিনীর কপালে তো এত সুখ স্বয়ং বিধাতাই লেখেন নি।না হলে কামিনী অসুস্থ হবেই বা কেন? আর সাতদিন কলেজ যেতে পারে নি বলে ওকে নোটস দিতে সুজয়ই বা ওদের বাড়ি আসবে কেন? না এলে তো আর ওই মায়াবিনীর সাথে দেখা হত না সুজয়ের।সুজয় কাঞ্চনের সাথে সবার সামনে খুব স্বাভাবিক ভাবেই কথা বলেছিল।বসার ঘরে বসে ওর চিরাচরিত ভঙ্গীতে কথা বলছিল কামিনীর সাথে।কাঞ্চনকেও ডেকে নিয়েছিল নিজেই।কাঞ্চন কিন্তু কিন্তু করছিল।কামিনীর মনে হচ্ছিল নাটক করে সুজয়কে দিয়ে অনুরোধ করাতেই চাইছে কাঞ্চন।সুজয় সাধাসিধে ছেলে।এসব কায়দা বুঝবে কি করে।সুজয় বলল-"আরে বোসো না।তুমি কামিনীর সিস্টার।কামিনী বলিস নি তো?ভেরী ব্যড।" কামিনী ঠান্ডা মুখে বলেছিল-"আমাদের বাড়ি তিন জন কাজের লোক দুজন মালি দুজন ড্রাইভার একজন রান্নার মাসি আর একটা প্রিয় কুকুর আছে আমার।এদের ব্যাপারেও জেনে রাখ।না হলে হয়ত পরে বলবি বলিনি তোকে।"কাঞ্চনের কান লাল হয়ে গিয়েছিল।সুজয় ব্যাপার বুঝে কথা ঘোরানোর জন্য বলল-"আমি কিন্তু একটা জিনিস দেখেই বলে দিতে পারি।এই ভদ্রমহিলা হেব্বি ক্লাসিক গান করেন।" এবার কাঞ্চন কামিনী কুন্তলাদেবী সবাই অবাক হয়ে গিয়েছিল।যাকে চেনে না তার সম্পর্কে কি করে জানল সুজয়। ওদের বিস্মিত ঈষৎ হাঁ করা মুখটা দেখে সুজয় ওর প্রাণ খোলা হাসিটা হেসে ওঠে।বলে-"আরে না না,এত অবাক হবার কিছু নেই।আমি এস্ট্রোলজারও নই আর ফেস রীড করতেও পারি না।চা দেওয়ার সময় ওনার আঙুলে দাগ দেখলাম যেটা সেতার বাজালে হয় সাধারণত। আমার মায়ের হাতেও ছিল।তাই আন্দাজে একটা ঢিল মারলাম।" কাঞ্চন এতক্ষণে আড়ষ্টতা কাটিয়ে হেসে ফেলল।সুজয়ই কথা জমিয়ে তুলল।কামিনীর কিছুই ভালো লাগছিল না। ও বলল-"আমার শরীরটা ভালো লাগছে না রে।ঘরে যাচ্ছি।" আশ্চর্য ধ্রুপদ ধামার নিয়ে আলোচনায় সুজয় তখন এতই ব্যস্ত যে এক কথায় বল্ল- "হ্যাঁ হ্যাঁ সরি,জ্বরে একে দুর্বল।তুই বরং রেস্ট নে।" তারপর আবার কাঞ্চনের সাথে গান নিয়ে মেতে উঠল।চোখ ফেটে জল আসছিল কামিনীর।ভিতরে ভিতরে ছটফট করছিল।দারুণ একটা ইনসিকিওরড ফিলিং ওকে ভয় পাইয়ে দিচ্ছিল।ঘরে বিছানায় শুয়ে কানে আসছিল সুজয়ের হা হা হাসি।উচ্ছ্বসিত কথা। আধ ঘন্টা পর সুজয় কামিনীর ঘরের দরজা নক করল-"এই কামিনী আসছি রে।দারুণ লাগল আজ তোদের বাড়ি এসে।বারবার আসতে হবে দেখছি।কাঞ্চন যে আদিত্যজীর স্টুডেন্ট শুনেই তো আমি ক্লীন বোল্ড।মায়েরও গুরুজী ছিলেন আদিত্যজী।খুব ভালো স্টুডেন্ট না হলে আজকাল শেখান না।কাঞ্চনকে নিয়ে একটা ফিউশান কনসার্টের প্ল্যান করছি।কিছুতেই রাজী হচ্ছে না।তুই বল তো।কী দারুণ হবে বল  তো যখন গিটার আর সেতারের গাঁটছড়া বাঁধা হবে?" গাঁটছড়া শব্দটা যেন স্নায়ুতে আঘাত করে কামিনীর।কাঞ্চন চোর চোর মুখে আমতা আমতা করে বলে-"আমি বার বার বলছি ওনাকে.. ইয়ে মানে আমি খুব নার্ভাস..এসব..মানে আমি.." কামিনী বাঁকা হেসে বলে- "এত কিন্তু কিন্তুর কি আছে কাঞ্চন, সুজয়কে যখন ইম্প্রেশ করতে পেরেছ তখন কনসার্টেও পারবে।"
সেদিন সারারাত এক অসহ্য যন্ত্রণায় ঘুমাতে পারে না কামিনী।ভয় ভয়..ভীষণ ভয়..কাঞ্চনের মা কামিনীর বাবাকে কেড়ে নিয়েছে।কাঞ্চন যদি সুজয়কে...না না এটা হতে পারে না।জোর করে নিজের মনকে শক্ত করার চেষ্টা করে কামিনী।কিন্তু ঘটনা পরিস্থিতি তাকে শক্ত থাকতে দেয় না।
সুজয় সত্যি সত্যি কনসার্ট নিয়ে উৎসাহী হয়ে ওঠে।হঠাৎ করেই রবিবার ওর এক মিউজিশিয়ান বন্ধুকে নিয়ে চলে আসে কামিনীর বাড়ি। কাঞ্চন তো অপ্রস্তুতের এক শেষ।ছুটির দিন বলে বাবা বাড়ি ছিলেন। সব শুনে বাবা বেশ উৎসাহিতই হলেন।বাড়িতে একটা উৎসব উৎসব ওয়েদার তৈরী হল।সুজয় যেখানে যায় ও সেখানেই উৎসব তৈরী করে নেয় এটা কামিনী জানে।কিন্তু আজ কিছুতেই সে এই উৎসবের ভাগীদার হতে পারল না।
এর পর রবিবারগুলো অসহ্য হয়ে উঠল।প্রতি রবিবার রিহের্সাল বাড়িতে।কাঞ্চনের লাজুক লাজুক নাটকটা গেছে।দিব্যি হাসছে গল্প করছে গানের ফাঁকে ফাঁকে।দোতলার বারন্দা থেকে সবই নজরে পরে কামিনীর।সুজয় কামিনীকে ডাকে।কিন্তু কামিনীর এই আসরে নিজেকে ভীষণ বোকা বোকা লাগে।কাঞ্চনের কাছে হেরে যেতে যেতে ক্লান্ত কামিনী আর নিজেকে খোরাক করতে চায় না।তাই নিজের ঘরে জোর ভয়লুমে গান চালিয়ে হেডফোন গুঁজে শুয়ে থাকে।নীচে তার সুজয়। যে  বলত কামিনী সামনে বসলেই সে নতুন সুর বাঁধতে পারে, সে একের পর এক নতুন সুর বেঁধে চলে কাঞ্চনের সাথে।ভাবতেই চোখের কোল বেয়ে গরম জল গড়িয়ে পরে।কামিনী যেন অনুভব করতে পারে সুজয় তার থেকে দূরে সরে যাচ্ছে।
কলেজে সুজয়ের থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে রাখছিল কামিনী।একটা অবরুদ্ধ অভিমানেই।সুজয় সেটা বুঝতে পেরেছিল।কারণটা না বুঝলেও এটা বুঝেছিল কোন কারণে কামিনী কষ্ট পাচ্ছে।সেদিন ক্যান্টিনে কামিনী একাই বসে কফি খাচ্ছিল।সুজয় এসে চেয়ারটা উলটো করে বসে পরল।তারপর বলল-"এই কামিনী কি হয়েছে বলত তোর? শালা পাত্তাই দিচ্ছিস না।" কামিনী বাঁকা হেসে বলল-"তাই..আমি তো ভাবলাম তুই এত বিজি।তোকে ডিস্টার্ব করে তোর কনসার্টের ক্ষতি করতে চাই না রে।" সুজয় হাসে।তারপর বলে-"তুই আমার মিউজিকের ক্ষতি করবি পাগলী?তুই তো আমার প্রেরণা। আমার মিউজ। তোর কি মনে হয় রিহের্সালটা রবিবার করে কেন করি আমি।ওই একটা ছুটির দিন, কলেজ থাকে না।আর তোকে দেখতে পাই না।তাই ওইদিন তোর বাড়ি পৌঁছে যাই সকাল সকাল তোকে দেখার লোভে।অথচ লাস্ট দু সপ্তাহ নামলিই না নীচে।একবার বারন্দাতেও এলি না।" সুজয়ের চোখে স্পষ্ট অভিমান দেখে কামিনী।হঠাৎ ঝরঝর করে কেঁদে ফেলে।সুজয় ওকে কাছে টেনে নেয়।
সেদিন বাড়ি ফিরে মনের মেঘ অনেকটা কেটে গিয়েছিল।কামিনীর সাজতে ইচ্ছে হল, সুন্দর করে সাজল।আয়নার সামনে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে নিজেকে দেখল।কি যেন একটা কম কম লাগছে। হ্যাঁ, বুঝতে পেরেছে একটা ছোট্ট কালো টিপ চাই।কিন্তু আজ অবধি কামিনী তো কখনও টিপ পরে নি।কাঞ্চন পরে।কামিনীর কি যেন মনে হল।কামিনী কাঞ্চনের ঘরে গেল।কাঞ্চন খাটে উপুড় হয়ে শুয়ে কি একটা বই পড়ছিল।কামিনী বলল-"এই শোনো তোমার কাছে কালো টিপ আছে?" কাঞ্চন ধড়মড় করে উঠে বসে।অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকে।তারপর খাট থেকে নেমে এসে বলে -"এসো না এসো এসো।এই তো এখানে সব আছে।তোমার যখন যা লাগবে.. " কামিনী দুচারটে জিনিষ নেড়ে চেড়ে দেখল।কমদামী ব্রান্ড।স্ট্যান্ডার্ড না থাকলে যা হয়।কিন্তু আজ আর সেটা কামিনীর বলতে ইচ্ছে করে না।একটা টিপের পাতা থেকে কালো টিপ বার করে পরে।নিজেকেই কেমন অচেনা লাগে আয়নায়।বেশ ভালো লাগে।ছোট্ট করে বলে -"থ্যাংক ইউ"। অভিভূত  কাঞ্চন আর কিছু বলতে পারে না।কামিনী কাঞ্চনের ঘর থেকে বেরিয়ে নিজের ঘরের দিকে পা বাড়ায়।কানে আসে পাশে বাবার ঘর থেকে বাবা আর কুন্তলা রক্ষিত কথা বলছে।কুন্তলা বলছে-" কাঞ্চন বেশ পছন্দই করে সুজয়কে।ফ্যামিলি ব্যাকগ্রাউন্ডও ভালো।সুজয়েরও পছন্দ।কথাটা বলে রাখতে পারো।" বাবা বলছে-"কতই বা বয়েস।এখন অনেক সময় আছে।এত তাড়াহুড়ো করছ কেন?" কুন্তলা বলেন-"দেখ যুগকাল ভালো নয়।এখুনি তো বিয়ের প্রশ্ন উঠছে না। বাগদত্তা হয়ে থাকলে কি ক্ষতি।" কামিনী আর দাঁড়াতে পারে না।প্রায় ছুটে চলে আসে নিজের ঘরে।তার অনুমান তবে ভুল নয়।কাল নাগিনী নিজের খেলা শুরু করেছে।কিন্তু না,কামিনী আর নিজের জীবন থেকে কিচ্ছু হারিয়ে যেতে দেবে না।কিচ্ছু না।পরশু ভ্যালেন্টাইনস ডে।কামিনী জানে সুজয় বোঝে কামিনীর ফিলিংস।কিন্তু কামিনী তো ওকে কোনদিনও নিজে মুখে সে কথা বলে নি।কামিনী আর দেরী করতে চায় না।সুজয়কে সরাসরি নিজের ভালোবাসার কথা বলে চিরতরে ওকে নিজের কাছে আটকে রাখবে কামিনী।কিছুতেই হারিয়ে যেতে দেবে না।
                                   অঙ্কন : পৌলমী গঙ্গোপাধ্যায়

পরেরদিন কামিনী অনেক ভেবে একটা বিখ্যাত গয়নার দোকানে গেল।একটা হার্ট সেপড পেন্ডেন্ট ও আগেই নেট সার্ফ করে পছন্দ করেছিল।পেন্ডেন্টটার বৈশিষ্ট্য সেটা দুটুকরোতে ভাঙা যায়।একটা টুকরো ইয়োলো গোল্ড আর একটা টুকরো হোয়াইট গোল্ড এ।দুটো টুকরো আলাদা ভাবে দুটো পেন্ডেন্ট।কামিনী ঠিক করে একটা টুকরো সে পরবে আর অন্যটা পরাবে সুজয়কে।গয়নার দোকানে বসে পেন্ডন্ট টা একবার পরে আয়নায় দেখে সে।আর ঠিক সেই সময় আয়নায় দেখতে পায় গয়নার দোকানের ঠিক উলটো দিকের নামী গিফটের দোকানে সুজয় আর কাঞ্চন।কাঞ্চনের হাতে একটা ভ্যালেন্টাইন টেডি।সুজয় একটা লেডিস পারফিউম নিজের হাতের উলটো দিকে স্প্রে করে কাঞ্চনের নাকের কাছে ধরল।কাঞ্চন হেসে বাতিল করল।কামিনী গয়নার দোকান থেকে বেরিয়ে এল।স্কার্ফ দিয়ে মাথা ঢেকে চোখে সানগ্লাসটা পরে চোখ বাঁচিয়ে ঢুকে পরল গিফট কাম কসমেটিক্স সেন্টারটায়।কাঞ্চন আর সুজয় নিজেদের নিয়ে এতই মসগুল যে খেয়ালও করল না ওকে।এবার কামিনী স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে ওদের।কাঞ্চন অনেকগুলো ব্রান্ডেড কসমেটিক্স কিনছে।সুজয়ের পয়সায় বলেই হয়ত এত দামী ব্রান্ড বেছে নিয়েছে।ক্লিনজার, নাইটক্রিম,হোয়াইট ক্রিম সানস্ক্রিন, মেকাপ রিমুভার,লিপ্সটিক লাইনার এর একটা গোটা প্যাক কিনল।সুজয় ওর কানের কাছে মুখ এনে কিছু বলল।হেসে গড়িয়ে পরল কাঞ্চন।কামিনীর মাথায় আগুণ জ্বলছে।আর দাঁড়াতে পারছে না ও।কোন রকমে পার্কিং থেকে গাড়িতে উঠে বাড়ি ফিরল।
কাঞ্চনকে আর সহ্য করা সম্ভব নয় কামিনীর পক্ষে।কাঞ্চনকে মৃত্যুর চেয়েও খারাপ শাস্তি দিতে চায় কামিনী।যে ভাবে সেই ছোট্টবেলা থেকে কাঞ্চন একটু একটু করে দগ্ধে মেরেছে কামিনীকে।একটু একটু করে সব কেড়ে নিয়েছে ওর থেকে।কামিনীও ঠিক সেই সেই ভাবে একটু একটু করে দগ্ধে দগ্ধে মারতে চায় কাঞ্চনকে।ওই সরল সুন্দর মুখের মুখোশ পরেই কাঞ্চন ভুলিয়েছে সুজয়কে। কেড়ে নিয়েছে তার থেকে।ওই মুখোশটাই টেনে ছিঁড়ে বিভৎস করে দেবে কামিনী।একটা ক্রুর জিঘাংসায় বিকৃত হয়ে ওঠে তার মুখ।মোবাইলটা হাতে তুলে নিয়ে ফোন করে-"সমীর...শোন না একটা হেল্প লাগবে ভাই। আমাকে হাইড্রোক্লোরিক এসিড জোগাড় করে দিতে পারবি?... না কাল নয়...এক্ষুনি..হ্যাঁ হ্যাঁ জাস্ট এক্ষুনি মানে এক্ষুনি।কি করব?একটা এক্স পেরিমেন্ট।...তুই জেনে কি করবি? ভেবে দেখ, এই হেল্পটা করলে কিন্তু আদতে তোরই লাভ।কাঞ্চনের সঙ্গে যে প্রায় ছয়মাস ধরে লাইন করতে চাইছিস আর কাঞ্চন তোকে পাত্তা দিচ্ছে না সেটা আমি কিন্তু জানি।দেখ কাঞ্চন আমার কথা কখনও ফেলে না, আমি চাইলেই কাল তোর প্রবলেম সলভ করে দিতে পারি।কাল কিন্তু ভ্যালেন্টাইনস ডে।...দ্যাটস লাইক এ গুড বয়।জিনিষটা নিয়ে সোজা বাড়ি চলে আয়।এখানে এসে বলবি নোটস নিতে এসেছিস।..না না কাউকে কিচ্ছু বলবি না।...ওরে বাবা জানিস তো আমার ফ্যামিলি আমার কোন ইচ্ছা চেষ্টা কিছুকেই সাপোর্ট করে না।কিন্তু এই এক্সপেরিমেন্টটা যদি সাক্সেস্ফুল হয় চারদিকে হৈ হৈ পরে যাবে।আর তোর নামও কিন্তু পেপারে আসতে পারে।প্লিজ এত কথা না বলে হেল্প মী ব্রো।সব ঠিকঠাক হলে তুই নিজেই জানতে পারবি সব।"
ফোনটা রেখে কুটিল বাঁকা হাসি খেলে যায় কামিনীর মুখে।বাইরে শব্দ পায় গাড়ি থামার।তারপর সুজয় আর কাঞ্চনের গলা।কামিনী গিয়ে দাঁড়ায়।সুজয় নিজে থেকেই বলে-"আজ মিউজিকের সাথে ফাইনাল স্টেজ রিহের্সাল করে এলাম।কালকের অনুষ্ঠান ফাটাফাটি হচ্ছেই।৯০% টিকিট অলরেডি সোল্ড। এই পুরো টাকাটা চ্যারিটেবল ফান্ডে যাবে।" কামিনী যা কখনও করে নি আজ তাই করল।সুনিপুণ অভিনয়ে উচ্ছ্বসিত হয়ে বলল-"আরিব্বাস গ্রেট তো।তা এই ঢাউসে প্যাকেটটায় কি আছে শুনি?" সুজয় আর কাঞ্চন সেকেন্ডের ভগ্নাংশে চোখ তাকাতাকি করল।তারপর সুজয়ই বলল-"কিছু না।কালকের অনুষ্ঠানের কিছু দরকারী জিনিষপত্র।" কামিনী শুধূ -"ও " বলে চুপ করে গেল।সুজয় বেশীক্ষণ থাকল না।কালকের কিছু প্রস্তুতি পর্ব এখনও বাকী বলে চলে গেল।খুশী খুশী কাঞ্চন গুণ গুণ করে গান গাইতে গাইতে চলে গেল নিজের ঘরে।একটু পরেই সমীর এল।সমীরকে সরাসরি কামিনী নিজের ঘরে নিয়ে এল।তারপর বলল-"কি রে দে।" সমীর খবরের কাগজে মোড়া শিশিটা এগিয়ে দিতে দিতে বলল-"কি করতে চাইছিস বলত মাইরি? বাড়িতে বসে কি এক্সপেরিমেন্ট করবি?" কামিনী বলে-"আছে আছে।ক্রমশ প্রকাশ্য।" সমীর ওর মুখের দিকে তাকিয়ে কি ভেবে ওর হাত চেপে ধরে।তারপর বলে-"দ্যাখ ভাই, কোন লোচা নেই তো?" কামিনী বিরক্ত হয়ে বলে -"হ্যাঁ রে এটা দিয়ে সরবত বানিয়ে তোকে খাওয়াবো ভাবছি।আঁতেল কোথাকার।যা ফোট এখন।" সমীর একটা ঢোঁক গিলে বলে-"ইয়ে কালকের ওই কেসটা, মানে কাঞ্চনের ব্যাপারটা একটু দেখিস ভাই।" কামিনী অন্যমনস্ক ভাবে শিশিটা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখতে দেখতে বলে-"হুম দেখবো তো।নিশ্চয় দেখব।" সমীর তাও একটু দাঁড়িয়ে থাকে।তারপর বলে-"এখন একবার.." বিরক্ত হয়ে কামিনী ঝাঁঝিয়ে ওঠে-"এই তুই যা তো।কাল দেখব সব।" সমীর হতাশ হয়ে বেরিয়ে যায়।কামিনী বিড়বিড় করে বলে-"চিপকু শালা।" 
রাত বাড়ে।নীচে ডিনারের ডাক পরে।কামিনী বলে পাঠায় তার কিসব প্রোজেক্ট আছে।খাবার যেন ঘরে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।কাঞ্চন নীচে বাবা আর ওর মায়ের সাথে খেতে যায়।বেশ খুশি খুশি গলায় কালকের অনুষ্ঠান নিয়ে কিছু বলছে কাঞ্চন।কিন্তু কামিনীর ও সব শোনার সময় নেই।কামিনী ধীরে ধীরে কাঞ্চনের ঘরে যায়।আয়নার পাশের কৌচটাতেই বড় প্যাকেটটা রাখা।কামিনী খুব সন্তর্পণে ওটা খুলে ফেলে।টেডিটা বের করে।বুকে লেখা "এভরি থিং ইস ফেয়ার ইন লাভ এন্ড ওয়্যার।" কথাগুলো বিড়বিড় করে কামিনী।ছুঁড়ে কৌচের উপর ফেলে ওটাকে।কাত হয়ে পরে ওটা।হাতলে ধাক্কা খেয়ে গলার ঘন্টাটা বেজে ওঠে।সজাগ হয় কামিনী। নিজের ইমোশান কন্ট্রোল করতে হবে।কাঞ্চনের কানে গেলেই বিপদ।তারপর সন্তর্পণে মেকাপ কিটটা বের করে।কায়দা করে খুলে বার করে মেকাপ রিমুভারের স্প্রে বোতলটা।এটাচ বাথে নিয়ে গিয়ে কোমডে সবটা তরল ফেলে দেয়।তারপর খুব সন্তর্পণে ফোঁটা ফোঁটা করে এসিডের বোতল থেকে তরলটা ভরে দেয় স্প্রে বোতলটায়।অন্য বোতলগুলো প্লাস্টিকের।গলে যাবে এসিড ঢাললে।একমাত্র এই আয়ুর্বেদিক মেকাপ রিমুভারের স্প্রে বোতলটাই কাঁচের।বোঝার উপায় নেই যে ভিতরের তরলটা এসিড।আবার সবকিছু নিপুণ দক্ষতায় আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনে কামিনী। না বোঝার কোন উপায় নেই।কিন্তু করিডোরে পায়ের শব্দ কানে আসে।কাঞ্চন আসছে।বুকের ভিতর হাতুড়ি পিটছে কামিনীর।কাঞ্চন ঘরে ঢুকে কামিনীকে দেখে অবাক হয়।তাড়াতাড়ি চোখ যায় ঢাউস প্যাকেটটার দিকে।সেটা একইরকম আছে দেখে নিশ্চিন্ত হয় বোঝা যায়।বলে-"কি হয়েছে কামিনী? কিছু লাগবে?" কামিনী পরস্থিতি সামলে নেয়।বলে-"কালো টিপ।কাল তোমাদের অনুষ্ঠানে পরব।" কাঞ্চন হেসে পুরো পাতাটাই ওর হাতে দিয়ে বলে -"রাখো তোমার কাছে।ইচ্ছে মত পোরো।" হাসে কামিনী।বলে-"থ্যাংকস..থ্যাংকস ফর এভরি থিং।"
কামিনী নিজের ঘরে এসে বালিশে উপুড় হয়ে শুয়ে এতক্ষণে কান্নায় ভেঙে পরে।সেই দুপুর থেকে যে লড়াইটা সে লড়ে যাচ্ছে নিজের সাথে,এতক্ষণে সম্ভবত সেটায় পুরোপুরি পরাজিত হয় সে।

কামিনী চলে যাবার পর কাঞ্চনের মুখে হাসির রেখা ফুটে ওঠে।ইদানীং কামিনীর মধ্যে একটা পরিবর্তন সে লক্ষ্য করছে সে।কাঞ্চনের প্রতি তার বিদ্বেষ যেন আজকাল অনেক কম মনে হয় কাঞ্চনের।মনটা ভালো হয়ে যায়।কামিনীর জন্য তার নিজেকে ভীষণ অপরাধী মনে হয়।সে তো সত্যিই এবাড়ির কেউ নয়।সে এসে কামিনীর ভাগে ভাগ বসিয়েছে।কামিনীর বাড়ি কামিনীর বাবা কামিনীর দাদু ঠাকুমা..এই পরিবার এই ঐশ্বর্যে সত্যি কি তার কোন অধিকার ছিল।কামিনীর ঘেন্নাটাকে তাই আগাগোড়াই তার মনে হয়ে এসেছে প্রাপ্য।আজ যখন কামিনী একটু স্বাভাবিক ব্যবহার করছে মনটা কি ভীষণ এক তৃপ্তিতে ভরে যায় কাঞ্চনের।

পরেরদিন সুজয় হৈ হৈ করে আসে কাঞ্চনকে নিয়ে যেতে।আগে এ বাড়ি এলে প্রথমেই কামিনীকে ডাকাডাকি করত।আজ সুজয়ের মুখে একটাই নাম -"কাঞ্চন.. কাঞ্চন"...অবাধে চলে যায় কাঞ্চনের ঘরে।বুকের ভিতরটা খাঁ খাঁ করে কামিনীর।ভ্যালেন্টাইনস ডের দির নিশ্চয় নিজের প্রিয়তমাকে কাছে টেনে নিচ্ছে সুজয় বন্ধ ঘরে।নিশ্চয় চুমুতে চুমুতে...উফ পাগল পাগল লাগে কামিনীর কাঞ্চনের ঘরের বন্ধ দরজাটার দিকে তাকিয়ে। "কেন সুজয়?  কেন? তুই কি বুঝতিস না  আমার ভালোবাসার কথা?" চোখে জল এসে যায় কামিনীর।মনে মনে বলে-"সাদা চামড়ার অনেক দাম তাই না? আর পোড়া চামড়ার?"
নিজের ঘরে আহত বাঘিনীর মত ছটফট করতে থাকে কামিনী।একটু পরে সুজয় আসে।কামিনী বাঁকা হেসে বলে -"কি রে সুজয়,কাঞ্চনের সাথে গোপন বৈঠক হল।বাড়িতে ঢুকেই সোজা ওর ঘরে চলে গেলি।" সুজয় একটু অপ্রস্তুত হেসে বলে-"না ওই লাস্ট মিনিট কতগুলো ব্যাপার ডিস্কাস করার ছিল।"তারপর বলে-"বাদ দে,তোকে আমার অন্য কিছু বলার আছে।" কামিনী ভ্রু তুলে কৌতুহলী তাকায়।সুজয় একটু আমতা আমতা করে বলে-" ইয়ে,আই এম ইন লাভ.." কামিনীর বুকটা ধক করে ওঠে।কাঞ্চনকে ভালোবাসার কথাই তবে স্বীকার করতে এসেছে সুজয়।এই যন্ত্রণাটা দেওয়াই বাকী ছিল তবে।সুজয় বলে-"তুই চিনিস..রোজ দেখিস।" কামিনী বলে-"ও"।অসহিষ্ণু সুজয় বলে-"ধুর জিজ্ঞাসা তো কর
কে সেই ভাগ্যবতী?" কামিনী একটু হেসে বলে-"ভাগ্যবতী! রিয়েলি।ওকে বল কে?"সুজয় বলে-"উঁ হু এভাবে না।ক্লোজ ইয়োর আইস।"কামিনী বিরক্ত হয়ে বলল-"ন্যাকামি না করে যা বলবি বল।" সুজয় একটু অবাক হয়ে বলে-"কি হয়েছে বল তো তোর?" কামিনী ঠান্ডা গলায় বলে-"আমার মনে হয় তোর অনুষ্ঠানের দেরী হয়ে যাচ্ছে।"সুজয় একটু অবাক তাকায়।তারপর গভীর স্বরে বলে-" কামিনী আমি মজা করছি না। এটা আমার জীবনের একটা অনেক বড় কথা। আই লাভ ইউ কামিনী।কান্ট লিভ উইথ আউট ইউ।" 
মাথায় আগুণ জ্বলে ওঠে কামিনীর।সুজয় বোকা বানাচ্ছে কামিনীকে।ডবল গেম খেলছে।কামিনী আর কাঞ্চন দুটোই চাই ওর।আর সেটাই তো স্বাভাবিক। কাঞ্চনের মত মেয়েরা তো এভাবে প্রেম প্রেম খেলাতেও ব্যকডোর এন্ট্রিই নিতে পারে।ওর মায়ের মত ও-ও প্রকাশ্য সুস্থ সম্পর্ক তৈরী করতে পারে না।অন্যের জিনিষ কেড়ে নেওয়াই ওদের মা বেটির স্বভাব চরিত্র।কামিনী নিজেকে যেন সামলাতে পারছে না।ইচ্ছে করছে বিস্ফোরণে ফেটে পরতে। কিন্তু না।নিজেকে ঠান্ডা রাখতেই হবে।কষ্ট করে মুখে হাসি টেনে আনে।তারপর যতটা সম্ভব নিজেকে স্বাভাবিক রেখে বলার চেষ্টা করে-"আচ্ছা আচ্ছা খুব হয়েছে।আগে আজকের অনুষ্ঠানটা ভালো করে কর।" সুজয় তবু বলে-"তোর কি হয়েছে কামিনী।কোথায় যেন মনে হচ্ছে তুই ভালো নেই।আমাকে বলবি না বাবু?"কামিনী বলে -"কিচ্ছু না রে।কিছুই না। আমি ভালো আছি আর থাকবোও।এবার তুই যা।" সুজয় চলে যেতে যায়। দরজা অবধি গিয়ে ঘুরে দাঁড়িয়ে বলে-"যা: শালা,এটা তো নিয়েই চলে যাচ্ছি। " হাতের প্যাকেটটা এগিয়ে দেয় কামিনীর দিকে।"হ্যাপি ভ্যালেন্টাইনস ডে সোনা।"
কামিনী চমকায়। সেম কাঞ্চনের মেকাপ সেটটার মত একটা সেট। সুজয় একই জিনিষ ওর দুই প্রেমিকাকে দিচ্ছে।কাঞ্চনের জন্য লাল টেডিটা এক্সট্রা।ওটা কামিনীর জন্য আনে নি।কামিনী কৃত্রিম বিস্ময় প্রকাশ করে বলল-"তুই কি করে জানলি এই ব্রান্ডটা আমার ফেভারিট....এসব বুঝিস তুই?" সুজয় হেসে বলল-"গিফট সেন্টারের মেয়েটিকে বেছে দিতে বললাম। ওই দিল।জানি তো আমার কামিনী সাজুনি দি গ্রেট।এটা তোর পছন্দ হবেই। নে নে আজ এটা দিয়েই সেজে গুজে রেডি হ।এক্ষুনি বেরোবো তো।" কামিনী বলে-"আমি??!!আমি গিয়ে কি করব? " সুজয় বলে-" কিচ্ছু শুনছি না। তুই প্রথম সারির চেয়ার দখল না করলে আমার অনুষ্ঠান ফ্লপ।"
 অনুষ্ঠানে বেরোনোর সময় কাঞ্চন নিজের স্বভাবসিদ্ধ খুব হালকা মেকাপ করেই বেরোতে যাচ্ছিল।কামিনী এসে বলল-"ইস, কাঞ্চন।তুমি রায়বাড়ি থেকে যাচ্ছ।রায় বাড়িকেই রিপ্রেসেন্ট করছ।এটা কেমন সেজেছ।স্টেজের আলোতে তো চোখেই পরবে না।এস আমি তোমায় সাজিয়ে দিই বরং।" মনে মনে কামিনী হাসে।চড়া মেকাপ না হলে যে মেকাপ রিমুভারের প্রয়োজনটাই পরবে না।কাঞ্চন বিহ্বল চোখে তাকিয়ে রইল।তারপর বলল-"হ্যাঁ সাজিয়ে দাও।" কামিনী কাঞ্চনকে নিয়ে ড্রেসিং টেবিলের দিকে এগোতে যায়।এমন সময় দরজায় নক করে কেউ।কামিনী জানে কে? সমীর শিওর।সকালে ওকে ফোন করে একটা মেকাপ কিট নিয়ে কামিনী আসতে বলেছে কাঞ্চনকে প্রপোজ করার জন্য।কামিনীর এই দাবা খেলাটায় সমীর বোরে।সমীর হাবা হাবা ছেলে।বেশী ভাবার মত ক্ষমতা ওর নেই।কাঞ্চন আর ও যে চাঁদ আর বামন সেটা ও বোঝে না।আজ সমীর ওকে প্রপোজ করলে কাঞ্চন শিওর রিফিউজ করবেই।আর পরে কাঞ্চনের মুখের ছাল চামড়া গুটিয়ে যাবার পর এটা প্রমাণ করা সহজ হবে যে প্রেমে প্রত্যাখ্যাত হয়ে সমীরই এ কাজ করেছে।বিশেষত গতকাল এসিড টাও তো ওই কিনেছে।সমীর একটা ফুলের তোড়া আর মেকাপ কিট নিয়ে আসে।কাঞ্চনকে দেখে যেন বাকশক্তি হারিয়ে ফেলে।তারপর হঠাৎ করেই কাঞ্চনের হাত ধরে হাঁটু মুড়ে বসে বলে-"কাঞ্চন আই লাভ ইউ।"কাঞ্চনের মুখ কঠিন হয়ে ওঠে।হাত ছাড়িয়ে নেয়।চোখে চোখ রেখে বলে-"সমীর প্লিজ।এসবের মানে কি।তুমি আমার ভালো বন্ধু ঠিক আছে।কিন্তু তার মানে এই নয় যে..." সমীর ভ্যাবাচেকা খেয়ে কামিনীর দিকে তাকায়।কামিনী চোখের ইশারায় ওকে চুপ করতে বলে বলে-" সমীর কাঞ্চনের তাড়া আছে।এখন তুই যা।" সমীর জিনিষগুলো নিয়ে পিছন ফিরে চলে যায় দরজা অবধি।কামিনী প্রমাদ গোনে।ও কি মেকাপ কিট টা নিয়ে চলে যাবে নাকি? কিন্তু দরজার কাছে গিয়ে পিছন ঘোরে সমীর।অপ্রতিভ মুখে বলে-"এগুলো?" কামিনী কাঞ্চন কিছু বলার আগেই বলে-"কাঞ্চনের ঘরে রেখে চলে যা।" কাঞ্চন প্রতিবাদ করতে যায়।কিন্তু কামিনী হাতে চাপ দিয়ে চুপ করিয়ে দেয়।সমীর খুশি খুশি মুখে চলে যায়।সমীর চলে যেতে কামিনীকে কাঞ্চন বলে-"তুমি ওকে রেখে যেতে কেন বললে? ও ভুল মানে করবে তো।" কামিনী বলে-"ছাড়ো তো।এখন না করলে হেজিয়ে হেজিয়ে লেট করিয়ে দিত।চল তোমায় চটপট রেডি করি।" কাঞ্চনের অস্বস্তি হলেও কিছু বলে না।কামিনীর এই ভালো ব্যবহারটুকু তার কাছে অপ্রত্যাশিত। এটা কোন তর্কে গিয়ে সে নষ্ট করতে চায় না।
অনুষ্ঠানে যাবার সময় সুজয়ের গাড়িতে কাঞ্চন আর মিউজিশিয়ান দুজন উঠল।কামিনী চলল বাবা আর কুন্তলা রক্ষিতের সাথে এক গাড়িতে।ওঠার সময় নজরে পরল সুজয়ের গাড়ির পিছনে কাত হয়ে লাল মত কি যেন।না দেখার ভুল নয় টেডিটা।কাঞ্চন তার প্রেমের উপহার ছেড়ে এক পাও যেতে রাজী নয়।


দর্শকের আসনে বসে কিছুতেই স্থির থাকতে পারে না কামিনী।ভীষণ অস্থির লাগতে থাকে সারাক্ষণ।অনবদ্য অনুষ্ঠানের যুগলবন্দীতে হল হাততালিতে ফেটে পরছিল। কিন্তু কামিনীর যেন কিছুই কানে পৌঁছায় না।অনুষ্ঠানের শেষে অপেক্ষা করতে থাকে কখন বাড়ি ফিরবে কাঞ্চন।কিন্তু কামিনীকে অবাক করে দিয়ে কাঞ্চন বলে-"তোমরা বাড়ি যাও।আমার আর সুজয়ের একটা ছোট্ট কাজ আছে।সেটা সেরে ফিরছি। " সুজয় তাড়াতাড়ি যোগ করে-"ওই অনুষ্ঠান পরবর্তী কিছু ফরম্যালিটি থাকে তো। " বাবা একটু কিন্তু কিন্তু করে বলতে যাচ্ছিল -"আমরা কি তাহলে অপেক্ষা করব?" কুন্তলা রক্ষিত বলে-"না না অপেক্ষা করার কি আছে।সুজয় ওকে পৌঁছে দেবে বরং।আমরা চলে যাই।" কামিনী নিজেকে কোনমতে সামলে রেখেছে।কিচ্ছু প্রকাশ করতে চায় না সে।গাড়িতে ওঠার মুখে সুজয় কামিনীর কানের কাছে মুখ এনে বলে-"বাড়ি গিয়ে খেয়ে দেয়ে ঘুমিয়ে পরিস না যেন।আমি আসব।একটা ছোট্ট সারপ্রাইজ আছে তোর জন্য।আর তাছাড়াও এই মুখ না দেখে আজ রাতে ঘুম আসবে না আমার।সত্যি কামিনী তোকে কখন এমন কাজল শাড়ী টিপে তো দেখ নি, না হলে অনেক আগেই প্রপোজ করে ফেলতাম।" অদ্ভুত চোখে তাকায় কামিনী।মানুষ কতটা নির্লজ্জ কতটা মুখোশধারী হয়, সুজয়কে না দেখলে সত্যিই বিশ্বাস হত না কামিনীর।কামিনীরা চলে যায়।

সুজয় বুকের বাঁ দিকে হাত দিয়ে নাটুকে ভাবে বলে-"হায়.." কাঞ্চন এসে ওর মাথায় চাঁটি মারে।বলে-"হয়েছে মশাই হয়েছে।এবার কি যাবেন? গিফট সেন্টার যে এরপর বন্ধ হয়ে যাবে।টেডিটা বদল করতে হবে তো নাকি?" সুজয় বলে -"হ্যাঁ হ্যাঁ চল।কিন্তু কাল কেনার সময়ও দেখিনি যে গলার ঘন্টাটা ভাঙা।কি বিচ্ছিরি হত ওই ভাবেই যদি না দেখে কামিনীকে দিয়ে দিতাম।" কাঞ্চন বলে-"সত্যি কি করে যে ভাঙলো।কৌচের হাতলের নীচে দেখি ঘন্টার ভাঙা টুকরোটা পরে।" কাঞ্চনের মনটা আজ ভীষণ খুশী। তার জীবনে গত কয়েক সপ্তাহ ধরে সব কিছু খুব ভালো হচ্ছে।আর সেটা সুজয়ের জন্যই।সুজয়ের ব্যাপারে তার প্রথমদিকে একটা আড়ষ্ঠতা ছিল।কিন্তু রবিবারের দুটো রিহের্সালের পরেই কাঞ্চন টের পায় সুজয় গিটার বাজিয়ে গানটা একতলায় বসে গাইলেও সে গানের সুর দিয়ে দোতলাবাসিনী কামিনীকে ছোঁয়াই তার উদ্দেশ্য।একদিন সরাসরি প্রশ্ন করে বসে-"আচ্ছা সুজয়,এই রবিবারের রিহের্সালগুলো কি শুধুই কনসার্টের জন্য নাকি..." সুজয় হেসে ফেলে।স্বীকার করে কামিনীর জন্যই এভাবে সে ছুটে আসে।মজা পেয়ে যায় কাঞ্চন।কেমন শ্যালিকা শ্যালিকা ফিল হয়।অনেক সহজ হয়ে যায় সুজয়ের সঙ্গে। অন্যদিকে কামিনীকেও বোধহয় ভালোবাসা নমনীয় করে তুলছিল।না হলে সে কাঞ্চনের সাথে আর তো তেমন বিদ্বেষপূর্ণ ব্যবহার করছিল না।তারপর সুজয় বলল এই ভ্যালেন্টাইনস সারপ্রাইজটার কথা।কামিনীকে আনুষ্ঠানিক প্রপোজ করবে সে।কিন্তু কি দেবে কিছুই মাথায় আসে না।সে কাঞ্চনের শরণাপন্ন হয়।কাঞ্চন জানে কামিনী সাজতে খুব ভালোবাসে।মেকাপকিট কেনার প্ল্যানটা ওই দেয়। সঙ্গে এই টেডিটা।স্টেজ রিহের্সাল শেষ করে ওরাই গিফট সেন্টার থেকে গতকাল এগুলো কেনে।কিন্তু সুজয়ের সঙ্গে ওর বাবার খিটিমিটি লেগেই থাকে গান নিয়ে  আর সুজয়ের পলিটিক্স এ না আসা নিয়ে।তাই জিনিষগুলো ও বাড়ি নিয়ে যেতে চায় নি।বাবা দেখলে হাজারটা প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হবে।তাছাড়া কাঞ্চনই বলে রাতে সবাই ঘুমিয়ে পরার পর ও গিফট র‍্যাপ করে দেবে সুন্দর করে।পরেরদিন সুজয় সকাল সকাল এসেই ছোটে কাঞ্চনের ঘরে।খুব খুশী হয় র‍্যাপিং দেখে।কিন্তু মুশকিল হয় যখন দেখে লাল টেডিটার গলার ঘন্টাটা ভাঙা।কাঞ্চনই বলে সকালে মেকাপকিটটা দিতে।আর রাতে অনুষ্ঠান শেষে টেডিটা পালটে এনে সারপ্রাইজ গিফট দিতে।সুজয় অবশ্য বলেছিল কামিনীকে বলবে যে কাঞ্চনই এই পুরো প্ল্যানটার মাস্টার মাইন্ড।সুজয় বলেছিল-"কামিনীর মনটা খুব ভালো জানো।ও আসলে খুব অভিমানী।তোমাদের দুই বোনের মধ্যে একটা অভিমানের বরফের পাহাড় জমে আছে।ভালোবাসার উত্তাপ পেলে সেটা গলে যাবে।সময় হয়ত লাগবে।ওকে জানতে দাও যে তুমি ওকে কতটা ভালোবাসো।" কিন্তু কাঞ্চন কিছুতেই বলতে দেয় নি।কাঞ্চন ভয় পেয়েছিল যদি কামিনী সব জানার পর ভয়ানক কিছু রিএক্ট করে।তাই বাধ্য হয়েই সুজয় চেপে গিয়েছিল।বলেছিল গিফট সেন্টারের মেয়েটার হেল্পে ও এসব কিনেছে।কাঞ্চন মনে মনে ভাবে একসময় হয়ত সত্যিই কামিনী বুঝবে আদতেই কাঞ্চন ওর খারাপ চায় না।
অঙ্কন : পৌলমী গঙ্গোপাধ্যায়


কামিনী টাওয়াল জড়িয়ে আয়নার সামনে বসে তাকিয়ে থাকে নিজের দিকে।কাঞ্চন আর সুজয় এখনো ফেরে নি।নিজেকে ভীষণ হেরে যাওয়া মনে হয় তার।আচ্ছা আজ রাতে ফিরে কাঞ্চন নিশ্চয় ওই রিমুভারটা মুখে স্প্রে করবে।আর তারপর চিরতরে পুড়ে ছাই হয়ে যাবে ওর মুখ।কিন্তু তাতে কামিনী কি পাবে? সুজয়ের প্রতারণা কি মুছে যাবে তাতে? প্রতিহিংসা হয়ত মিটবে।কিন্তু শান্তি! না কোন শান্তি নেই।তার হেরে যাওয়া তো এক চুলও কমে না এতে।কেমন কান্না পেয়ে যায় কামিনীর।গলার কাছে একটা যন্ত্রণা পাক দিয়ে ওঠে।খুব ইচ্ছে হয় যদি মায়ের কোলে মুখ গুঁজে দিতে পারত।হঠাৎ মোবাইল বেজে ওঠে।সমীর ফোন করছে।অবশ হাতে ফোন ধরে কামিনী।সমীর বলে চলে-"এই কামিনী।কি খবর ওদিকের।আমি কিন্তু তোর ভরসাতেই আছি ভাই।কি রে চুপ করে আছিস কেন? উত্তর দে.." কামিনী ফোনটা ডিসকানেক্ট করে।কেমন নিজেকে ছোট লাগে।সমীরের তো কোন দোষ নেই।ছি: ছি: সে কি করতে যাচ্ছে এসব।না ওই রিমুভারটা সে সরিয়েই নেবে।আর যত তাড়াতাড়ি পারে চলে যাবে স্টেটস এ।চটপট নিজের মেকাপ তুলে ঘরের পোশাক পরে যেতে হবে কাঞ্চনের ঘরে। নিজের মেকাপ তোলার জন্য সকালে সুজয়ের দেওয়া রিমুভারের স্প্রেটা হাতে তুলে নেয়। সুজয়ের দেওয়া গিফট।ঠোঁটে করুণ হাসি ফুটে ওঠে কামিনীর। স্প্রের ঢাকনাটা খুলে ফেলে।

গিফট সেন্টারে ঢোকার আগেই সুজয়ের ফোনে ফোনটা আসে।তারপর আর এক মুহুর্ত নষ্ট করে নি সুজয় আর কাঞ্চন।সোজা পৌঁছে গিয়েছিল নার্সিংহোমে।পাগলের মত কাঁদছিল কাঞ্চন।বিহ্বল সুজয় কিছুতেই বুঝতে পারছিল না কি করে তার দেওয়া রিমুভারের বোতলে এসিড থাকতে পারে।ওরা পৌঁছানোর মিনিট কুড়ির মধ্যেই পুলিশ পৌঁছে যায় নার্সিংহোমে।সুজয় আর কাঞ্চন যে এই মুহুর্তে সন্দেহের শীর্ষে তা বলে দিতে হয় না।সুজয় গিফট করেছিল।আর সারারাত র‍্যাপিং এর জন্য সেটা ছিল কাঞ্চনের ঘরে। কাঞ্চনই কি তবে সৎ বোনের প্রতি ঈর্ষায় অন্ধ হয়ে একাজ করেছে? পুলিশ কাঞ্চনকে কাস্টাডিতে নিতে চায়।পাগলের মত কেঁদে চলেন কুন্তলা।সুবিমলবাবু কি করবেন ভেবে পান না।এক মেয়ে নার্সিংহোমে। মুখের আশি শতাংশ পুড়ে বীভৎস হয়ে গেছে।আর অন্য মেয়েকে পুলিশ নিয়ে যেতে চাইছে।কাঞ্চন কাঁদতে কাঁদতে বলে-"বিশ্বাস করুন অফিসার আমি কিচ্ছু জানি না।"অফিসার বলেন -"সেটা না হয় পুলিশ স্টেশানে গিয়েই বুঝব।এখন চলুন।" মহিলা পুলিশ এগিয়ে আসেন কাঞ্চনকে নিতে।ঠিক সেই সময় একজন কনস্টেবল ছুটতে ছুটতে এসে বলে-"স্যার স্যার এখুনি চলুন।কামিনী দেবী কিছু বলতে চান আপনাকে।" অফিসার চলে যান।স্খলিত পদক্ষেপে কাঞ্চন এগিয়ে যায় পুলিশের জিপের দিকে।কাঁদার মত শক্তিটুকুও যেন সে পায় না।সুজয়কে বিভ্রান্ত মনে হয়।কাঞ্চন এ কাজ করেছে এ কথা তার মন স্বীকার করে না।অথচ অন্য কিছু খুঁজেও পায় না সে।গাড়িতে ওঠার মুখে কুন্তলা কাঞ্চনকে জড়িয়ে হাউহাউ করে কেঁদে ফেলে।কাঞ্চন মা'কে স্বান্তনা দেয়-"চুপ কর মা।আমি কিছু করি নি, তা ঈশ্বর জানেন।সব ঠিক হয়ে যাবে।" পিছন থেকে ইন্সপেক্টর এর ডাক শোনা যায়-"কাঞ্চন ম্যডামকে ছেড়ে দিন। উনি নির্দোষ। ভিক্টিমের বয়ান অনু্যায়ী কাঞ্চন কিছুই জানেন না।এখনই আমাদের একবার মি:সমীর সরকারকে ডাকতে হবে।ভিক্টিমের বয়ানটা ভেরিফাই করার জন্য।কামিনী বলেছেন এসিডটা কারণ না জানিয়ে কামিনীদেবী কাঞ্চনের উপর প্রতিহিংসা বশত সমীরকে দিয়েই আনিয়েছিলেন।"


হাসপাতালের বেডে শুয়ে শুয়ে জানলা দিয়ে একচিলতে আকাশ দেখে কামিনী।কতদিন কেটে গেছে এখানে হিসেব পায় না।মুখের ব্যণ্ডেজ কবে খুলবে কে জানে।তারপরই তো এই গলা পচা মুখটা সবার সামনে এসে যাবে। কামিনীর যেন আজকাল তেমন দু:খও হয় না।অনুভূতিগুলোও কি ভোঁতা হয়ে গেছে।বাবা,সুজয় কাঞ্চন রোজ দেখতে আসে নিয়ম করে।কামিনী চোখ খোলে না।ওরা ফিরে যায়।কামিনী কি কাঁদছে।ব্যান্ডেজ দিয়ে শুধু দুটো চোখ বেরিয়ে থাকে।চোখের জল দেখা যায় না।সুজয় ঢোকে কেবিনে।দ্রুত চোখ বুজে নেয় কামিনী।সুজয় বলে-"এভাবে আর কদ্দিন ঘুমের নাটক চলবে শুনি।কাল তোর ব্যান্ডেজ খুলবে।সব ঠিক থাকলে তোর ছুটি।" কামিনী ধীরে ধীরে চোখ খোলে।সুজয়ের মুখে স্মিত হাসি।সুজয় এখনও তাকে ঘেন্না করছে না? তার এই বীভৎস মুখ সে সুজয়কে দেখাবে না।মুখ ঘুরিয়ে নেয়।সুজয় বলে-"উফ আবার শুরু করলি তো।আচ্ছা ছাড়।দেখ কে এসেছে।" কামিনী দেখে কাঞ্চন তার দিকে হাসি হাসি মুখে চেয়ে আছে।কামনীর মনে পরে আজ এই বেডে সে চেয়েছিল এই মেয়েটা শুয়ে থাকুক।কিন্তু জীবনে প্রথম আজ কামিনীর মনে হচ্ছে কাঞ্চনএর এই হাসিটা বোধহয় নাটক নয়।কাঞ্চন কি তাকে ঘেন্না করবে?করুণা করবে?  মনে মনে হাসবে? কাঞ্চন এগিয়ে এসে কামিনীর মাথায় হাত রেখে বলে-" খুব কষ্ট হচ্ছে না? " কামিনী স্পষ্ট দেখে কাঞ্চনের চোখে জল।কাঞ্চন কষ্ট পাচ্ছে তার জন্য।কামিনী অস্ফুটে বলে-"না, সব জ্বালা ঠান্ডা হয়ে গেছে।" কাঞ্চন ওর হাতটা মুঠোয় চেপে ধরে।কামিনী কিছু বলে না।সুজয় বলে-"হুম বাড়ি ফিরে একটু সুস্থ হয়ে নে।স্টেটসএ যাবার এত শখ ছিল তোর, এবার সবাই মিলে যাব।কাকু কাকীমা একজন কসমেটিক সার্জেনের সাথে কথা বলেছেন।যাই হোক আজ আসি।কাল সক্কাল সক্কাল চলে আসব।" কাঞ্চন বেরিয়ে যেতে যায়।কামিনী ডাকে-"দিদি..মা আমায় ক্ষমা.." কথা শেষ করতে পারে না।কাঞ্চন বলে-"মা কাল নিতে আসবে তো।আজ আসে নি তোর ঘরটা খুব ভালো করে পরিষ্কার করাচ্ছে দাঁড়িয়ে থেকে।ডাক্তার বাবু বলেছেন ইনফেকশনএর চান্স থাকে তো।" ওরা চলে যায়।কামিনী আবার আকাশের দিকে চোখ মেলে সত্যিই আর জ্বালা বোধ হয় না।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

1 মন্তব্যসমূহ