সমাজের চলচ্চিত্র।। কাকলী দাশগুপ্ত




পোস্ট বার দেখা হয়েছে

*ধার্মিকতা এবং ধর্মাচরণ নিয়ে  এই প্রশ্নটি অত্যন্ত গভীর এবং যৌক্তিক।* আমাদের সমাজে প্রায়ই বাহ্যিক আচার-অনুষ্ঠানকে ধর্মের একমাত্র মাপকাঠি মনে করা হয়, যা একটি বড় ভুল ধারণা।

*সরাসরি প্রশ্নের উত্তর বলতে গেলে:* পুজো-আর্চা বা তীর্থ ভ্রমণ করলেই একজন মানুষ প্রকৃত ধার্মিক হয়ে যান না, আবার এগুলো না করলেই কেউ অধার্মিক হয়ে যান না।প্রকৃত ধার্মিকতা ও ধর্মাচরণের আসল অর্থ নিচে সহজভাবে আলোচনা করা হলো:

*ধার্মিক বলতে আসলে কী বোঝায়?*

'ধর্ম' শব্দটির উৎপত্তি সংস্কৃত 'ধৃ' ধাতু থেকে, যার অর্থ ধারণ করা। অর্থাৎ, যা মানুষকে ধারণ করে রাখে, যা সমাজ ও মানবতাকে টিকিয়ে রাখে, তাই ধর্ম।প্রকৃত ধার্মিক হলেন তিনিই, যিনি নিজের জীবনে সত্য, ন্যায়, দয়া, ক্ষমা, সততা এবং পরোপকারের মতো মানবিক গুণাবলি ধারণ করেন।যিনি নিজের কাজের মাধ্যমে কারও ক্ষতি করেন না এবং সমাজের কল্যাণে ভূমিকা রাখেন, তিনিই প্রকৃত ধার্মিক।

*পুজো-আর্চা বনাম ধার্মিকতা:* পার্থক্য কোথায়?আমাদের সমাজে মানুষ প্রায়ই 'ধর্মীয় আচার' (Rituals) এবং 'আধ্যাত্মিকতা বা নৈতিকতা' (Spirituality/Morality)-কে গুলিয়ে ফেলে।বাহ্যিক আচার (পুজো-আর্চা, তীর্থ): এগুলো হলো ধর্মের একেকটি পথ বা মাধ্যম। দুবেলা পুজো করা বা তীর্থে যাওয়া মানুষের মনকে শান্ত করার বা ঈশ্বরের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের একটি ব্যক্তিগত উপায় হতে পারে। কিন্তু এটি কোনো সার্টিফিকেটের মতো নয় যে এটি করলেই মানুষটি ভালো হয়ে যাবেন। 

*ভিতরের মানুষটি কেমন?:* একজন মানুষ দিনে তিনবার পুজো করলেন, কিন্তু ঘর থেকে বেরিয়েই অন্যের হক নষ্ট করলেন, মিথ্যা বললেন বা অহংকার করলেন—তবে সেই পুজোর কোনো মূল্য নেই। তিনি কেবল আচার পালন করছেন, ধর্ম নয়।

*পুজো-আর্চা না করলেই কি মানুষ অধার্মিক*?একেবারেই নয়। পৃথিবীর বহু মানুষ কোনো প্রথাগত পুজো-পার্বণ বা উপাসনা করেন না, কিন্তু তারা অত্যন্ত সৎ এবং দয়ালু হন।

স্বামী বিবেকানন্দ বলেছিলেন, "জীবে প্রেম করে যেই জন, সেই জন সেবিছে ঈশ্বর।" অর্থাৎ, কোনো মানুষ যদি মন্দিরে বা মসজিদে না গিয়েও একজন ক্ষুধার্তকে অন্ন দেন, কোনো পশুপাখির প্রতি দয়া দেখান বা নিজের দায়িত্ব সততার সাথে পালন করেন, তবে তিনি পরম ধর্মাচরণ করছেন। 

সনাতন ধর্মে 'কর্মযোগ' কে অন্যতম শ্রেষ্ঠ ধর্ম বলা হয়েছে। নিজের কর্তব্য সততার সাথে পালন করাই সবচেয়ে বড় উপাসনা।

*প্রকৃত ধর্মাচরণ বলতে কী বোঝায়?*

প্রকৃত ধর্মাচরণ হলো একটি জীবনশৈলী। একে কয়েকটি স্তরে ভাগ করা যায়:

*সততা ও নৈতিকতা:* যেকোনো পরিস্থিতিতে ন্যায়ের পক্ষে থাকা এবং লোভ বর্জন করা।

*অহিংসা ও করুণা:* কোনো প্রাণীকে বিনা কারণে কষ্ট না দেওয়া এবং দুর্বলকে সাহায্য করা।

*অহংকার মুক্তি:*

 নিজেকে অন্যের চেয়ে বড় বা বেশি পবিত্র মনে না করা।

*মানবিক কর্তব্য:*

 সমাজ, পরিবার এবং প্রকৃতির প্রতি নিজের দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করা।

*সংক্ষেপে বলতে গেলে, পুজো-আর্চা হলো সিলেবাসের প্রাকটিস খাতার মতো, আর মানুষের সাথে আপনার ব্যবহার ও সততা হলো আসল পরীক্ষা। পরীক্ষায় পাস না করে শুধু খাতা ভরলে যেমন লাভ নেই, ঠিক তেমনি চরিত্রে সততা না এনে শুধু পুজো বা তীর্থ করলে ধার্মিক হওয়া যায় না।

আমাদের সমাজের এই চশমাটা বদলানো দরকার, যেখানে মানুষের আচার নয়, বরং তার আচরণ দেখে তাকে বিচার করা উচিত।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ