পোস্ট বার দেখা হয়েছে
।। গল্প গুচ্ছ । ।
আয়না
বউভাতের রাত পেরোতে না পেরোতেই সদ্য শ্বশুরবাড়িকে নিজের আসল রূপ’টা দেখিয়ে দিয়েছিল মধুজা।
বাড়ির মালকিন রীতমাদেবী এতদিন একা হাতেই সংসারটার যাবতীয় ঝড়-ঝাপটা সামলে এসেছেন।অনেক সাধ করে একমাত্র ছেলের বিয়ে দিয়ে ছিলেন যাতে শেষ বয়সটা একটু আরাম আয়েশে কাটিয়ে ছেলের সুখী সাজানো সংসার দেখে শান্তিতে চোখ বুঝতে পারেন।কিন্তু মধুর স্বাদ যে এমন তেতো হতে পারে সেই ধারনা’টাকে গলাধঃকরন করতে গিয়ে বাড়িসুদ্ধ সকলের চোখ রীতিমত কপালে উঠেছে।
বয়স্কা শাশুড়ির ইহকাল পরোকাল’কে সাধ্যমত উদ্ধার করে সকাল সকাল একটা ট্যাক্সি ডেকে বেরিয়ে পড়ল মধুজা।তারপর বাপের বাড়ির চৌকাঠে পা রেখেই থমকে গেল সে।উঠানের কলতলায় একগাদা এঁটো বাসনের উপর হুমড়ি খেয়ে পড়ে অশ্রুপাত করছেন মধুজার মা আর তার বৌদি ঠিক সেই কথাগুলো বলেই তার মাকে মুখঝামটা দিচ্ছে যে বিষাক্ত শব্দগুলো সে এই মাত্র শুনিয়ে এসেছে নিজের শাশুড়িকেই।
সারপ্রাইজ
নিজের ঘরে বসে পুরানো কিছু কাগজপত্র গুছাচ্ছিলেন সুভাদেবী যখন পিছন থেকে আচমকা তাঁর গলা জড়িয়ে ধরল তাঁর আট বছরের নাতি অংশু।তারপর আদুরে গলায় বলল—“ জানো ঠাম্মি, তোমার জন্য না একটা বিগ সারপ্রাইজ আছে!”
“সারপ্রাইজ...!” সুভাদেবীর ঠোঁটের কোনে একচিলতে বিষন্ন হাসি ফুঁটল, গত আটবছর ধরে জীবনের কাছ থেকে একের পর এক সারপ্রাইজই তো পেয়ে আসছেন তিনি—প্রথমে হার্ট স্ট্রোকে স্বামীকে হারালেন, তারপর থেকে একমাত্র ছেলে অম্লানের সংসারে একটা লিভিং প্রপারটির মতোই বেঁচে আছেন।যে সংসারটাকে একদিন নিজের হাতে নিজের সবটুকু উজার করে সাজিয়ে ছিলেন আজ তার সবকিছু থেকে তাঁকে একরকম যেন অবসরই দিয়ে দেওয়া হয়েছে।বাড়ির এককোনের এই ছোট্ট ঘরটা আর দু’বেলা দুমুঠো খাওয়া-পরা সাথে উঠতে বসতে নানাবিধ খোঁটা—ইদানীং এটুকুই তাঁর বরাদ্দ; তার ঘরেও সচরাচর কেউ আসেনা।সে’সব নিয়ে অবশ্য কোন অভিযোগ কখনও করেননা তিনি। হয়ত নিঃস্বার্থ ভালোবাসায় অভিযোগের জায়গাটাই থাকেনা আর মায়ের চেয়ে বেশি নিঃস্বার্থভাবে কেই বা ভালোবাসতে পারে এ দুনিয়ায়।অতঃপর কোন শারীরিক আঘাত সহ্য করতে না হলেও সুভাদেবী বেশ বোঝেন যে ছেলে-বউয়ের সংসারে এখন তিনি ভীষন রকম অবাঞ্ছিত-গলগ্রহ।নেহাত বাড়িটা তার নামে আছে বলেই হয়ত...
একটা ভারী দীর্ঘশ্বাস নেমে আসে তার আয়ূর্ধ্ব পাঁজর বেয়ে, তথাপি অংশুর কচি হাতদুটোয় একটা স্নেহার্দ্র চুমু খেয়ে তিনি স্মিতভাবে বললেন—“ আমার জন্য আবার কীসের সারপ্রাইজ দাদুভাই?”
ঘাড়টা ঝাঁকিয়ে সে বলল—“ উফফ ঠাম্মি, তুমি না খুব বোকা! সারপ্রাইজ কি আগে থেকে বলে দিতে হয় নাকি? আজ তো তোমার জন্মদিন তাই বাপি সারপ্রাইজ প্ল্যান করেছে, দেখবে কত্ত মজা হবে!” বলেই শিশুসুলভ চাঞ্চল্যে ছুটে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল অংশু।
একপ্রস্থ বিস্ময় নিয়ে পশ্চিমের জানালার কাছে এসে দাঁড়ালেন সুভাদেবী।দু’ফোঁটা নোনা জল তাঁর ঘোলাটে দৃষ্টিকে আরও ঘোলাটে করে তুলছে।
“খোকা এখনও আমার জন্মদিন মনে রেখেছে? তবে কী......” তাঁর মনটা কেমন যেন অস্থির করে ওঠে।অম্লানের প্রথম ‘মা’ ডাকার দিনটা তাঁর চোখে ভেসে ওঠে। আহা! কতদিন হল ছেলের মুখে আর অমন ‘মা’ ডাক শোনেননি!
#
ছুটন্ত গাড়ির জানালা দিয়ে বাইরের শহরটার দিকে চোখ রাখেন সুভাদেবী।তাঁর দৃষ্টি আচ্ছন্ন, মুখে তৃপ্ত প্রসন্নতার আভা।আজ দুপুরের ঘটনাগুলো যেন এখনও তাঁর চোখে লেগে আছে সুখ-স্বপ্নের মত। অন্যান্য দিন তিনি নিজের ঘরে একলাই খাওয়া দাওয়া করেন কিন্তু আজ তাঁর বউমা নিজে এসে তাঁকে খাবার টেবিলে ডেকে নিয়ে যায়। তারপর নিজের হাতে পাঁচ তরকারি-ভাত-পায়েস বেড়ে তাঁকে খাওয়ায়।তাঁর জন্মদিন বলে অম্লানও অফিস থেকে তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরে এসেছে, আর হাতে করে তাঁর জন্য নিয়ে এসেছে একটা ঢাকাই জামদানী শাড়ি আর তাঁর প্রিয় একগোছা হলদে গোলাপ।
সুভাদেবীর শরীরে একটা শিহরন খেলে গেল।নাহ, তাঁর সংসারে তিনি এখনও ফেলনা হননি।আপনজনেরা তাঁকে আজও ভালোবাসে।এতদিন তিনি অযথাই তাদেরকে ভুল বুঝে এসেছেন।
গাড়ি যখন থামল তখন সন্ধ্যের অন্ধকার গাঢ় হয়ে এসেছে।সামনে একটা পুরানো দোতলা বাড়ির আবছা অবয়ব।বাড়ির ভিতরে পা দিয়েই চমকে উঠলেন সুভাদেবী। তাঁকে বুকে জড়িয়ে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানালেন তাঁরই বাল্যসখী মনোরমা।তারপর হাত ধরে তাঁকে নিয়ে গেলেন ভিতরের একটা ঘরে।সেখানে তাঁর পরিচিত আরও অনেক মুখ। টেবিলের ফুলদানীতে সাজানো শুভ্র রজনীগন্ধা আর মাঝখানে একটা ছোট্ট টেবিলে রাখা একটা কেক।গল্প-গুজবে কখন যে রাত বেড়ে গেল তিনি খেয়ালই করলেন না। আজ দশ বছর পর প্রিয় বান্ধবীর সাথে দেখা তাছাড়া তাঁর জন্মদিনে ছেলের এমন কল্পনাতীত আয়োজন—সুভাদেবীর আনন্দ যেন ধরছিল না।
“আচ্ছা রমা, আজ তবে উঠি রে।এবার তো বাড়ি ফিরতে হবে।অনেক রাত হয়ে গেল, অংশুটারও কই আর সাড়া-শব্দ পাচ্ছিনা, বোধহয় ঘুমিয়েই পড়ছে।সত্যি বলতে কী, এত সুখ যে এখনো পাওনা ছিল সে তো ভাবতেই পারিনি।আচ্ছা ভালো থাকিস রে, খোকাকে বলে আরেকদিন আসব, কেমন...” বলে উঠতে যাচ্ছিলেন শুভাদেবী, হটাৎই মনোরমাদেবী তাঁর হাতটা চেপে ধরলেন।তারপর তাঁর বিস্মৃত মুখের উপর করুন দৃষ্টি ফেলে বললেন—“অম্লান তো কখনই চলে গেছে সুভা।”
“চলে গেছে, আমাকে না নিয়ে! মানে...”
“হ্যাঁ, অম্লান তো বিদেশে চলে যাচ্ছে।তোদের বাড়িটাও বিক্রি করে দিচ্ছে আর তাই তোর থাকার সব ব্যবস্থা সে এই বৃদ্ধাশ্রমেই করে দিয়ে গেছে একসপ্তাহ আগেই! তুই কি এসবের কিছুই জানতিস না?”
বান্ধবীর কথায় যেন বজ্রাহত হয়ে পড়লেন সুভাদেবী।নিজের কানকে অবিশ্বাস্য লাগছিল তার। দৌড়ে বেরিয়ে এলেন ঘর থেকে তারপর গেটের কাছে এসেই স্তব্ধ হয়ে গেলেন তিনি।
তাঁদের গাড়িটা নেই।তাঁর খোকা সত্যিই তাঁকে ফেলে চলে গেছে আর সাথে দিয়ে গেছে তাঁকে তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় সারপ্রাইজটা।
সারোগেট
স্কুলের বড় গেটটা দিয়ে ঝিলমিলের বাবা-মা’কে ঢুকতে দেখেই সবটা জলের মতো পরিস্কার হয়ে গেল কিরণের কাছে।কেন অচেনা একটা বাচ্ছার জন্য তার এত টান, কেন তাকে একদিন না দেখতে পেলেই তার মন আঁকুপাঁকু করে ওঠে; কেন, সবসময় মনে হয় ছুটে যায় তার কাছে, তাকে বুকে জড়িয়ে ধরে আদর করে!
আড়াল আবডাল থেকে লুকিয়ে ঝিলমিলকে দেখে কিরণ আর নিজেকে প্রবোধ দেয়—“ দুরেই সই, তবু মেয়েটাকে চোখের দেখা দেখতে তো পাই।কাছে গেলে হয়ত সেটুকুও হারাবো।বড় ঘরের মেয়ে সব, আমার মতো একজনের ভালোবাসাও হয়ত ওদের অছুত ঠেকবে।হয়ত কাজটাই চলে যাবে, তখন তো আর...” স্নেহের ঝরনাটাকে নিজের বুকেই নীরবে কবর দেয় স্কুলের ঝাড়ুওয়ালি কিরণ।
#
নার্সিংহোমের এককোনে দাঁড়িয়ে রণজয় আর রাত্রির সাথে ডাক্তারদের কথপোকথনের দিকে কান পেতে ছিল কিরণ।ওদের ভাষা দুর্বোধ্য হলেও রাত্রির মুখের ভাব তাকে স্পষ্টই বুঝিয়ে দিচ্ছিল যে সংবাদ শুভ নয়।আজ খেলতে খেলতে স্কুলে হঠাৎই অজ্ঞান হয়ে যায় ঝিলমিল।খবর পেয়েই ছুটে আসে ওর বাবা-মা।স্কুলে রাত্রিকে দেখেই চিনতে পারে কিরণ আর সাথেই পেয়ে যায় নিজের সমস্ত ‘কেন’গুলোর জবাব।
“তুমি আর না কোরোনা কিরণ।রাত্রির অবস্থা তো দেখতেই পাচ্ছ, এখন তুমিই পারো ওকে বাঁচাতে।প্লিজ কিরণ...আই রিকোয়েস্ট ইউ!” আইসিইউ এর কাঁচের আড়ালে দাঁড়িয়ে রণজয়ের সেদিনের কাতর মুখটা আবারও একবার মনে পড়ল কিরণের। রণজয়ের স্ত্রী রাত্রি তখন মেন্টাল অ্যাঞ্জাইটিতে ভুগছে।কিছু শারীরিক সমস্যার কারনে বিয়ের সাত বছর পরেও মা হতে না পারার হতাশা ক্রমে তাকে আত্মঘাতীপ্রবণ করে তুলছিল।তখন ডাক্তারের পরামর্শে রণজয় নিজেদের পরিচারিকা কিরণকে অনুরোধ করে তাদের সন্তানের সারোগেট মাদার হবার জন্য__বিনিময়ে সে যা চাইবে তাই পাবে।
রাত্রির উপর বড় মায়া হত কিরণের।সে নিজে কোনোদিনও বৈবাহিক সুখ পায়নি। একমাত্র ছেলেটাকেও হারিয়েছিল মাত্র সাতদিনের জন্ডিসে।নিজের কোলের শুন্যতার সাথে রাত্রির রিক্ত মাতৃত্বের কোথায় যেন একটা মিল খুঁজে পেত কিরণ, তাই প্রথমটা ঘাবড়ে গেলেও ক্রমে সে রাজি হয়ে গেল রণজয়ের প্রস্তাবে তবে অর্থলোভে নয় মানবিকতার খাতিরে।এক মা আরেক মায়ের কোল ভরে দেবে, এর চেয়ে মহৎ আর কি হতে পারে!
ন’মাস দশ দিন গর্ভযন্ত্রনা সহ্য করে আবারো মা হল কিরণ।দুধপরীর মতোই ফুটফুটে মেয়েটা, প্রথমবার তার মুখের দিকে তাকিয়েই যেন অতীতের সমস্ত আঘাত ভুলে গেল কিরণ আর সাথে এই নির্মম সত্যিটাও যে একটা প্রাণকে নিজের মধ্যে লালন করে জন্ম দিলেও মা হবার অধিকার সে পায়নি; তথাপি জলদিই তাকে চোখে আঙুল দিয়ে বুঝিয়ে দেওয়া হল যে ওই বাড়িতে তার জায়গাটা আসলে কী!
#
অপারেশনের দুদিন পর চোখ খুলল ঝিলমিল।গত কয়েকদিন যেন একটা দুঃস্বপ্নের মধ্যে দিয়ে কেটেছে সকলের।টেস্টে ওর হার্টে ফুটো ধরা পড়ে, ইমিডিয়েট হার্ট ট্রান্সপ্লান্ট ছাড়া ওকে বাঁচানো ইমপসিবল কিন্তু হিউম্যান হার্ট তো আর বাজারের বিলাসদ্রব্য নয় যে দাম দিলেই কিনে ফেলা যাবে! দুর্যোগের অন্ধকারে আশার কিরণের মতো হঠাৎই খবরটা এল—কোনো অজ্ঞাত ডোনার ঝিলমিলকে নিজের হার্ট ডোনেট করেছে।
ম্যানেজমেন্টের কাছে ডোনারের পরিচয় জানতে চাইল রাত্রি-রণজয়।একমাত্র মেয়ের জীবনদাতা তখন তাদের কাছে ইশ্বরের চেয়ে কম নয়।তার পরিবারকে অন্তত একটা কৃতজ্ঞতা জানাতে চায় ওরা।কিন্তু ডোনার ফর্মটা হাতে নিয়েই স্থবির হয়ে গেল দুজনে।লজ্জিত দৃষ্টিতে পরস্পরের দিকে চাইল।রাত্রির কানে তখন একটাই কথা বাজছে—“ তোর সাহস কি’করে হল কিরণ আমার মেয়েকে তোর বুকের দুধ খাওয়াবার, ভুলে যাস না ওর মা শুধু আমি__অ্যান্ড ইউ আর জাস্ট এ সারোগেট মাদার!”



1 মন্তব্যসমূহ
বারবার শুধু মুগ্ধতায় বিমোহিত হই ♥️♥️🌹🙏
উত্তরমুছুন