অরুণ মিত্র (২ নভেম্বর, ১৯০৯ - ২২ অগস্ট, ২০০০)




পোস্ট বার দেখা হয়েছে

অরুণ মিত্র 
(২ নভেম্বর, ১৯০৯ - ২২ অগস্ট, ২০০০) 

 রবীন্দ্রোত্তর বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রথিতযশা কবি ও ফরাসি ভাষা ও সাহিত্যের খ্যাতনামা অধ্যাপক ও অনুবাদক। তিনি যশোর জেলায় জন্মগ্রহণ করেন। পেশাগত জীবনে তিনি ছিলেন অধ্যাপক। তাঁর কাব্যগ্রন্থের নাম : প্রান্তরেখা (১৯৪৩), উৎসের দিকে (১৯৫৭), ঘনিষ্ঠ তাপ (১৯৬৩), মঞ্চের বাইরে (১৯৭০), শুধু রাতের শব্দ নয় (১৯৭৮), প্রথম পলি শেষ পাথর (১৯৮০), শ্রেষ্ঠ কবিতা (১৯৮৫)।

মাত্র ষোলো বছর বয়সে 'বেণু' নামে একটি কিশোর পত্রিকায় প্রথম অরুণ মিত্রের কবিতা প্রকাশিত হয়। তার মৌলিক কাব্যগ্রন্থগুলি হল প্রান্তরেখা (১৯৪৩), উৎসের দিকে (১৯৫০), ঘনিষ্ঠ তাপ(১৯৬৩), মঞ্চের বাইরে মাটিতে (১৯৭০), শুধু রাতের শব্দ নয় (১৯৭৮), প্রথম পলি শেষ পাথর (১৯৮১) ও খুঁজতে খুঁজতে এতদূর (১৯৮৬)। শুধু রাতের শব্দ নয় কাব্যগ্রন্থটি ১৯৭৯ সালে রবীন্দ্র পুরস্কারে এবং খুঁজতে খুঁজতে এতদূর কাব্যগ্রন্থখানি ১৯৮৭ সালে সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কারে সম্মানিত হয়। তার কাব্য সংকলন পনেরো খণ্ডে প্রকাশিত হয়েছে।

।। কবিতা। ।

নিসর্গের বুকে 

আমি এত বয়সে গাছকে বলছি 
তোমরা ভাঙা ডালে সূর্য বসাও 
হাঃ হাঃ আমি গাছকে বলছি 
অন্ধকার হয়েছে আর আমি নদীকে বলছি 
তোমার মরা খাতে পরী নাচাও 
হাঃ হাঃ আমি নদীকে বলছি 
থরায় মাটি ফেটে পড়ছে 
আর আমি হাঁটছি রক্তপায়ে 
যদি দু-একটা বীজ ভিজে ওঠে 
হাঃ হাঃ যদি দু-একটা 
নিসর্গের বুকে আমি হাড় বাজাচ্ছি 
আর মাদারির মতো হেঁকে বলছি 
এই আওয়াজ হয়ে যাবে একমাঠ ধান 
ঝিঁ ঝিঁ হুতোম প্যাঁচা শেয়াল 
আস্থায়ী আর অন্তরায় রাত ধুনছে 
আমি বলছি একমাঠ ধান 
হাঃ হাঃ হাঃ হাঃ 

==========

বাগান 

এক বাগান ধুতরো নিয়ে বসে আছি 
পোস্টারও লাগিয়ে দিয়েছি 
অক্ষরগুলো জোর গলায় হাঁকছে; 
‘যদি মরন চাও এসো যদি স্মরন চাও এসো’। 
অনেকেই আসছে, আসবেই তো, 
বাঁচার হ্যাপা কি কম? 
খিদেতেষ্টা আছে প্রেমপীরিত আছে 
ধুতরো খেলে সব জ্বালাযন্ত্রনা জুড়োবে, 
অবিশ্যি তার আগে একটু ছটফটানি আছে 
তবে সে আর কতক্ষনই বা 
জীবনের চক্কর তার চেয়ে ভীষনরকম বড়। 

কিন্তু ধুতরো বাগানে অনেকে আবার আসছেও না 
তারা চলে যাচ্ছে অপরাজিতার কাছে 
বিড়বিড় করে বলতে বলতে 
‘ও বড় মধুর মরণ’। 
তা যদি মনে করো, তবে অমনভাবেই মরো 
তোমরা মধুরে মরো অপরাজিতায় মরো। 
কিন্তু একবার ধুতরো বাগানে এলে পারতে 
রূপলাবণ্য নেই বটে, তবে ধুতরো খেলে 
সোজাসাপটা মরণ আছে 
ধিকিধিকি জ্বলা নয় রূপসুবাসের জ্বালা নয় 
দেখতে দেখতে ঢলে পড়া, 
মরণ এবং বাঞ্ছা থাকলেও স্মরনও। 

==========



একজন নিশ্চয়ই দাঁড়িয়ে

ট্রামবাসের ঝড় এইরকমই বয়, 
ভোররাতের কুঁড়িটা মরে 
আর আমি টলতে টলতে 
তারস্বরে ঘন্টি লাগাই, 
থামো, 
বুঝি থামলেই আমি জমি পাব। 

ওলটপালট হুহু পথ, 
দোকানঘরের আগুন 
দুই ধারে ছড়িয়ে যায়, 
রাস্তার কোণগুলো গনগন করে। 
আমার শিরার সব ঢেউ 
চোরা পাথরে লাগে 
আর আমাকে অস্থির করে, 
এই থামো, 
আমি এখানেই ঝাঁপিয়ে পড়ব 
যেখানে রাশ রাশ মানুষ ঘুরপাক খায়। 
একসঙ্গে অন্ধকারে যাব 
মাটির উপর দিয়ে হেঁটে 
কখনকার সেই কথা আমি আঁকড়ে আছি। 
আমার জন্যে একজন দাঁড়িয়ে রয়েছে। 
চৌরাস্তার কাছে 
যেখানে ভীষন এলোমেলো টান 
যেখানে সমস্ত মুখ ঘুরেযায় 
আর অপেক্ষা করার জায়গাগুলো 
হলকার ভিতরে কাঁপতে থাকে, 
কাউকে ঠাওর করতে পারি না, 
থামো, আমি এখানেই ঝাঁপিয়ে পড়ি, 
আমার জন্যে একজন নিশ্চয় দাঁড়িয়ে রয়েছে। 

==========

সময়

সময়কে নিয়ে অনেক মজা দেখা গেল। 
কখনও তাকে ইন্দ্রধনুর রঙে রাঙানো হল, 
কখনও হাসিতে উছলে তোলা হল 
বা চাপা কান্নায় কাঁপানো হল, 
কখনও-বা তাকে হৃদয়ে হৃদয়ে 
বাজানো হল। 

সৌরভ বিষাদের আভা কৌতুক 
উজ্জ্বল পথ ধ্যানের সুষমা ধূপছায়া, 
কত রকম। 

চোখ নাক কান খুলেই রাখো, 
বোধহয় দৃশ্যের চূড়ান্তে আসা গেছে। 
এবার সময়ের গলায় দাঁত বসেছে, 
লোভের দাঁত। 
দ্যাখো এবার কী হয়! 

==========

ডাকছি 

পুরোনো কথা ঝলমলিয়ে ওঠে। সেই সময় আমি খুব উজ্জ্বলের মধ্যে প্রবেশ করেছিলাম যেমন হয় দেয়ালায়। তোমার দু চোখ ছেঁকে নিয়েছিল হীরেচুর, সে এক ভেলকি আলো আলোর ঢেউয়ে ভাসছিল আমার রক্তমাংসের শরীর ইটকাঠ গাছপালা-পশুপাখি আঃ কী ঝলক , আমার ঠোঁটে সেই স্বপ্নহাসি যেমন ফুটত শুনি খুব কচি বয়সে । কোনো ভাবনা কি কাছে ঘেঁষতে পারে তখন? তা তখনই পর্দা নামল ঝপাং। আর না, ইবার ফেরো হে জ্যান্ত শহরে। 

সাঁকোটা ভিড়সুদ্ধ মড়মড় ভেঙে পড়ে । আমি ছিটকে যাই পাতালের দিকে। নামছি তো নামছিই আর মুঠো করে ধরছি ঝুরঝুর বালি পিছল নুড়ি। পড়তে পড়তে ভাবছি পুরোনো কথা আর তোমাকে ডাকার জন্যে ঠোঁট খুলছি। কী নাম যেন তোমার? কঙ্কাবতী? কাঞ্চনমালা? না, অমন রূপকথার মতন নাম কি তোমার হতে পারে কখনো? তবে কী? মুখে না আসুক, মনে মনে তার সঙ্গে কত যে মিল আসছে। পা হড়কায় না এমন সমতলের। পাপড়ি মেলেছে এমন ভুঁইচাঁপার।  সোনালি হয়েছে এমন ধানের, আর তাপজুড়োনো গানের, ভয়তাড়ানো চোখের, ঘুমের দাওয়ায় বিছোনো শীতলপাটির । না, রূপকথা না, জলমাটিমানুষের সত্যিকারের জায়গা চেনার মতন। তোমার সেই নাম ঘুরছে আমার শিরা উপশিরায়, লাল কণিকাগুলো চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে বলছে। শুনতে পাচ্ছ না? গলার আওয়াজ যদি মরে মরুক, তাতে কী? তুমি সাড়া দাও। আমাকে পা ফেলবার জমিতে টেনে তোলো। 

==========



নিয়ন - আলোর ভেতরে 

নিয়ন-আলোর ভিতরে ঘরবাড়ি নটনটী। আমার সঙ্গের ভাবনা-চিন্তাগুলো আমি পায়ের নিচে মাটিতে চেপে ধরেছি এবং চোখের সামনে এই নীলকে অপার্থিব সত্য হয়ে জ্বলতে দিয়েছি। কারও কোনো চেনাচিনির ধাঁধাঁ নেই, সাজসজ্জা রং আসবাবপত্র উষ্ণ ঘনিষ্ঠ হয়ে আছে। 

আপাদমস্তক সমঝদার ব্যবহারে রাত ঘোরালো হয়। আর দেরি সয় না। চলো এবার ভারহীনতার চূড়ান্তে উঠে যাই। শিকড়গুলো কাটা হয়ে গেছে, আমাদের বুকের মধ্যে আর কোনো অভিকর্ষ নেই। আমাদের মেদমজ্জা একশো কোটি যন্ত্রণার বাইরে রয়েছে। এসো এইবার তাদের মহাশূন্যে বাজাই। 

গূঢ় আলাপের যতখানি নিকটে আসা যায়, আমি এসে পড়েছি। এখন বানানো দিগন্তে সূর্য ওঠার খাতিরে আমাকে একটু ঘুমিয়ে নিতে হবে। 

==========

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

3 মন্তব্যসমূহ