নজরুলের সৃষ্টি সাধনা || অমল কুমার আচার্য




পোস্ট বার দেখা হয়েছে

 
একটা গান বহুদিন আগে খুব বহুশ্রুত  হয়েছিল।"সবার হৃদয়ে রবীন্দ্র নাথ, চেতনায় নজরুল "। ডঃ ভূপেন হাজারিকার সুরে ও কণ্ঠদানে, শিবদাস বন্দ্যোপাধ্যায় এর কথায়। কিন্তু আমার মনে হয় কথার অদল বদল  হয়ে 'চেতনায় রবীন্দ্রনাথ',' হৃদয়ে নজরুল ' হলে আরো ব্যাঞ্জনা পেতো গানটি। 

এ জন্যই এ প্রসঙ্গটি তোলা, নজরুল আমাদের সকলের হৃদয়ে ভাবে, ভালোবাসায়, বিপ্লবে প্রতিবাদে, মাতৃবন্দনার আকুলতায় আর কৃষ্ণ প্রেমের বিধুরতা সকল কিছু জুড়ে বসে আছেন। রবীন্দ্রনাথ ও আছেন সচেতন ভাবে আমাদের চেতন জলের ফুটন্ত ফুল হয়ে।

নজরুল প্রসঙ্গে শুধু একটা কথা বলা যায় যে তার সঠিক মূল্যায়ন এখনো পর্যন্ত আমরা দু বাংলার মানুষ করে উঠতে পারি নি। এ আমাদের বড়ো অক্ষমতা, আমরা  কোথায় যেন নিজেদের ভালোবাসা তাকে উজার করে দিতে পারি নি, তাঁর সৃষ্টিকে যথাযথ স্থান নির্ধারণ করে, চর্চার মাধ্যমে প্রসারের মাধ্যমে তাঁর অনবদ্য লেখা, সংগীত, আর জীবনযুদ্ধ সঠিক ভাবে অনুভব করতে পারিনি। যদিও ওপার বাংলায় বাংলাদেশ সরকার কিছুটা হলে প্রয়াস করেছে তাঁর জীবনের নির্বাক শেষ দিনগুলিতে  সম্মানের সঙ্গে রাখতে। কিন্তু সেটাই কি পরিপূর্ণ শ্রদ্ধা জ্ঞাপন।

নজরুল কে বিদ্রোহের কবি বলা হয়, তাঁর কবিতার চরণে চরণে আগুন আবার কোথাও তাঁর কবিতায় কখনো লেখেন " যদি আর বাঁশি না বাজে... " এ এক অপরূপ বৈষম্য। বৈষম্য তাঁর জীবনচর্যায় বিভিন্ন ঘাত প্রতিঘাতে সুখ -দুঃখের উত্থান পতনের মধ্য দিয়ে অনিশ্চিত এক অতিক্রমণ। 

বর্ধমান জেলার চুরুলিয়া গ্রাম থেকে উঠে আসা এক প্রতিভা  অভাব অনটন আর জাত ধর্মের বজ্জাতি তাঁকে অগ্নিস্নাত স্বর্ণে করে তুলেছিল। লেটো গানের দল থেকে সেপাই এর চাকরি করতে করতে বিদ্রোহের বীজ মহিরুহ হয়ে তাঁর কাব্যে, সংগীতে প্রকাশিত হলো "আমি বিদ্রোহী রণ ক্লান্ত, আমি কভু হবো নাক শান্ত "। তিনি শান্ত হন নি তবে অসীম প্রজ্ঞায় কৃষ্ণকথা আর কালিকীর্তনে মন সমর্পন করেছিলেন, তাঁর অপূর্ব সংগীতবেত্তা আর সুর ময়  জগৎ  আমরা পেয়েছি এক স্রষ্টা হিসাবে, আমরা পেয়েছি অজস্র মনোমুগ্ধকর গান। বিশেষ করে বাংলা গানে রাগের ব্যবহার যেমন  আহির ভৈরবীতে " অরুন কান্তি কে গো যোগী ভিখারী, নীরবে শেষে দাঁড়াইলে এসে, প্রখর রূপ তব নেহারিতে  নারি। " এই সুর টি হুবহু প্রয়োগ করে হিন্দি চলচ্চিত্রে শচিন দেব বর্মন করলেন " পুছো না ক্যায়সে  মেরে... "  আরেকটি গান " সাজিয়াছ যোগী, বলো কার লাগি, " যোগিয়া রাগের অপূর্ব বিন্যাসে। জয় জয়ন্তী রাগের ওপর বিখ্যাত গান " মেঘ মেদুর বরসায়, কোথা তুমি? " বাগেশ্রী রাগের  ওপর তিনি রচনা করলেন " হারানো হিয়ার নিকুঞ্জ পথে  কুড়াই বন ফুল একেলা আমি " এক বিষন্নতার ছোঁয়া এনে দেয়।

এ ছাড়াও অজস্র রাগপ্রধান গান তিনি সৃষ্টি করেছিলেন, সৃষ্টি করেছিলেন বাংলা গানে গজল ও কাওয়ালি।  যেমন কাওয়ালী  অঙ্গে রচিত একটি বিখ্যাত গান   " বাগিচায় বুলবুলি তুই "  এবং আরো অনেক সুফী সংগীত ইসলামিক গান নবী কে নিবেদন করে যে গান গুলি রচনা করেছিলেন সেগুলি বাংলা গানে এক ভিন্ন মাত্রা পেয়েছিলো। বিশেষত নবী কে নিবেদন করে তাঁর কিছু গান ইসলাম ধর্মাবলম্বী মানুষদের তৃপ্ত করে ছিল।  আবার কৃষ্ণকথা নিয়ে তাঁর গান " খেলিছ এ বিশ্ব লয়ে, বিরাট প্রভু প্রাণভরে " আবার একটি গান " হে গোবিন্দ রাখো চরণে " বৈষ্ণব ধর্মাবলম্বী দের মুগ্ধ করেছিল যেমন ভাবে আপ্লুত  করেছিলেন শ্যামা সংগীতের আবেদনে, কিছু কালজয়ী শ্যামাসংগীত যা মুগ্ধ করেছে শ্রোতা এবং সাধকদের 

১.আমার কালো মেয়ে রাগ করেছে

২.আমার কালো মেয়ের পায়ের তলায় দেখে যা আলোর নাচন

৩ মহাকালের কোলে এসে গৌরী হ’ল মহাকালি

৪ শ্যামা নামের লাগ্ ল আগুন আমার দেহের ধূপ-কাঠিতে

৫. শ্মশানে জাগিছে শ্যামা, অন্তিমে সন্তানে নিতে কোলে

৬. বল রে জবা বল্।

৭. মহাবিদ্যা আদ্যাশক্তি

৮. মা গো আমি  মন্দমতি

৯.আর লুকাবি কোথায়ম 

১০.মা গো চিন্ময়ী রূপ ধরে আয়

১১.আমার আর কোনো গুণ নেই

 এছাড়াও অসংখ্য গান বাংলা সংগীতকে ঋদ্ধ করেছে কথায় ও সুরের আবেশময় তায়।


আমার কাছে আর একটি বিষয় বড়োই আশ্চর্যের মনে হয়েছে। সেটি হলো নজরুল কৃত ১৭ টি রাগের সৃষ্টি।

১বেণুকা 

২রুদ্র ভৈরব

৩অরুণ ভৈরব

৪আশা ভৈরব

৫শিবানী ভৈরব

৬দেবযানী

৭যোগিনী

৮.সন্ধ্যামালতী

৯. বন কুন্তলা 

১১. শিব সরস্বতী 

১২. শঙ্করী।

১৩. অরুন রঞ্জনি 

১৪.নির্ঝরিনি 

১৫. দোলন চাঁপা 

১৬. মীনাক্ষী 

১৭.রূপমঞ্জরী 

এই রাগগুলিকে নিয়ে তিনি আকাশবানীতে১৯৩৯ সালে " নব রাগ মালিকা " শীর্ষক অনুষ্ঠানে প্রচারিত করেছিলেন বাংলা গান সহ। কিন্তু  পরবর্তী কালে সেগুলি প্রায় অনাবিস্কৃত হয়েই অবহেলিত হয়ে পড়ে আছে। বর্তমান প্রজন্ম এই দায় ভার নিলে তিনি হয়তো একটু শান্তি পাবেন।

যে বিষয়টি নিয়ে কোনো সংগীতবেত্তা তেমন কিছু ভাবনা করেছেন কিনা বা এই বিষয়টিকে নিয়ে গবেষণা মূলক তেমন কিছু হয়েছে কিনা জানা নেই। একটি মাত্র সন্ধান পাওয়া যায় সেটি হলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রকাশিত শ্রী বিশ্ব মোহন ঠাকুর বিরচিত " নব রাগ সৃজনে নজরুল " বইটিতে তিনি বিস্তারিত ভাবে রাগের বিভিন্ন বিষয় বর্ণনা করেছেন এবং আশা রেখেছেন রাগ গুলি গায়নের মাধ্যমে প্রচারের আলোয় আসুক সংগীত গুণীদের প্রচেষ্টায়। কিন্তু দুঃখের সঙ্গে বলতে বাধ্য হচ্ছি, যে তেমন কোনো ইচ্ছে বা প্রয়াস আজ পর্যন্ত কোনো প্রথিত জশা সংগীতবিদ বা প্রচারের কোনো মাধ্যম এই বিষয়ে আলোকপাতের চেষ্টা  করেছেন। আমার এক সুহৃদ সংগীত শিল্পী শ্রী স্বর্ণেন্দু চট্টোপাধ্যায়, তবলা শিল্পী শ্রী আশীষ রায় চৌধুরীর এবং আমরা কজন মিলে এই বিষয়টিকে নিয়ে সামান্য কিছু চেষ্টা করেছিলাম বেশ কয়েক বছর আগে। নজরুলের ১৭ টি রাগের মধ্যে মাত্র ৪ টি রাগের রাগ রূপায়ণ হিন্দি বন্দিশের মাধ্যমে তারা টিভি র " খেয়াল - ই - নজরুল "শীর্ষক একটি অনুষ্ঠানে বেশ কিছু বছর আগে।  করেছিলেন চারটি রাগ নিয়ে

১. বন কুন্তলা ২. শিব সরস্বতী ৩. দোলনচাঁপা ৪. শঙ্করী।

পরবর্তী সময়ে তেমন কোনো সাড়া পাই নি। এতেই বোঝা যায় আমাদের সংস্কৃতি চর্চার অন্তসারশূণ্যতা। 

কাজী  সাহেবের মূল্যায়ন না পেরেছে এপার বাংলার মানুষ না পেরেছে ওপারে বাংলাদেশের মানুষ। অথচ প্রতিভা, তাঁর মনন, তাঁর চিন্তার উজ্জ্বল প্রতিফলনে বাংলা সাহিত্যে এক নবজোয়ারের সূচনা হয়েছিল, বিদ্রোহের বিপ্লবের আগুন ঝরানো কবিতায় গানে "বিদ্রোহী " বা চলরে চলরে চল, উর্দ্ধ গগনে বাজে মাদল, " এরকম অনেক প্রত্যয় ভরা সংগ্রামের  মন্ত্রে। কিন্তু তার প্রতিদান? অবহেলা, নিদারুন দারিদ্র আর অভাবের তাড়নায় সব কিছু হারানোর যন্ত্রনা। এমন কি নির্বাক নিশ্চল চেতনাহীন এক শরীর বয়ে নিয়ে চলে যেতে হলো দীর্ঘ রোগযন্ত্রণার মধ্য দিয়ে বিনা চিকিৎসায় বিনা সহানুভূতির পাওনা নিয়ে।

একান্ত অনুগত কিছু ভক্ত ছাড়া বাকি সমগ্র সমাজ বিভিন্ন ভাবে বিভিন্ন সময়ে প্রতারণা এবং শোষণ করে গেছে। তার গান চুরি করে অন্যের নামে প্রকাশের বিষয় তো আছেই, প্রকাশকরা ঠিকমতন অর্থ দিতেন না, এমন কি তার ছোট ছেলে মারা যাওয়ার পর দাফনের জন্য খরচ করার অর্থ তাঁর কাছে ছিল না, একথা জেনে এক প্রকাশক তাঁকে একটি কবিতা রচনা করে দিয়ে তার বিনিময়ে কিছু অর্থ দেন, এক নিদারুন পরিস্থিতি কবির মনে তাঁকে ভেঙে চুরে শেষ করে দিয়েছিলো।

তিনি বড়ো বেহিসেবি ছিলেন। তার রচনার কথা লিপিবদ্ধ করে সুরগুলিকে স্বরলিপিতে সাজিয়ে রাখতে পারেন নি, যার ফলশ্রুতি আজ পর্যন্ত তাঁর সৃষ্টির পূর্ণাঙ্গ সন্ধান আমরা পাই নি। তাঁর কাছ থেকে কথা নিয়ে অনেকেই সুর করে প্রচলিত করেছেন।

নজরুল এক আপস হীন যোদ্ধা, যন্ত্রনা তাঁকে বিদ্ধ করলেও তিনি নিজেকে নির্বাক করে অবহেলায় সমাজকে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছিলেন প্রতিবাদ এভাবেও হয়। আমরা কি কোনোদিন তাঁর ক্ষমার যোগ্য হবো? মনে হয় না।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

1 মন্তব্যসমূহ

  1. নজরুলের সৃষ্টি সাধনা - বিষয়ক নিবন্ধটি পাঠ করে সমৃদ্ধ হলাম। নিবন্ধনে অনেক মূল্যবান তথ্য জানতে পারলাম।

    উত্তরমুছুন