পোস্ট বার দেখা হয়েছে
চৌরঙ্গীতে গড়ের মাঠে বসেছে সরকারি প্রদর্শনী।
সালটা ১৮৮২।
কলেজের ক্লাস করে কয়েকজন বন্ধুকে নিয়ে
ছেলেটি ছুটলো সেখানে।
কিছু সম্ভ্রান্ত ইংরেজ মহিলা তাদের পরিচারিকা
নিয়ে এসেছে প্রদর্শনীতে। সঙ্গে নেই কোন পুরুষ অভিভাবক।
৭-৮ জন ইংরেজ যুবক হাসি ঠাট্টা, অশ্লীল ভঙ্গিতে উত্ত্যক্ত করছে তাদের। ভয়ে লজ্জায় গুটিয়ে আছেন তাঁরা।
কিছুটা দূর থেকে লক্ষ্য করছে, ইংরেজিতে এম.এ পড়া ছেলেটি।
শুরু তীব্র বাদানুবাদ। ছেলেটি কোনক্রমে সেই মহিলাদের তুলে দিয়ে আসে তাদের গাড়িতে।
আসা মাত্র তাকে ঘিরে ধরে গালাগাল দিতে থাকে উদ্ধত ইংরেজ যুবকেরা। ছেলেটি শেষে একাই ঝাঁপিয়ে পড়ে। তাদের দলপতির নাকে মারে ঘুসি। রক্তাক্ত হয়ে লুটিয়ে পড়ে সে। এবার ইংরেজদের পুরো দলটি ঝাঁপিয়ে পড়ে ছেলেটির ওপর। চলতে থাকে হাতাহাতি। ছেলেটি একাই পর্যদস্ত করে তাদের। বাঙালির এ হেন পরাক্রমে তাজ্জব বনে যায় তারা।
এবার মেলায় আসা বাঙালি দর্শকরাও ঝাঁপিয়ে পড়ে।
বেগতিক বুঝে রণে ভঙ্গ দেয় অভব্য ইংরেজ।
বেরোনোর সময়ে ছেলেটি দেখে ওঁৎ পেতে
দাঁড়িয়ে সেই ইংরেজ দলপতি।
ভাবলেন এরা কি আবারো প্রতিশোধ নিতে চায় ?
না, এবার ভিন্ন সুর। ইংরেজ ছেলেটি ভুল স্বীকার করে হ্যান্ডশেক করে।
ধুলো মাখা শতচ্ছিন্ন পোশাকে
বাড়ির পথে পা বাড়ায় বাঙালি ছেলেটি।
তখন ঘোড়ায় টানা ট্রাম। একবার এক বন্ধুকে নিয়ে ছেলেটি চলেছে ইডেন গার্ডেন। মুখোমুখি বসা সাহেব অবলীলায় কাদামাখা বুট তুলেছে সিটের মাঝখানে।
ধরিয়েছে সিগারেট। পা নামাতে বলায় সেই ইংরেজ এবার দুটি পাই তুলে দিলেন সিটের ওপর।
তাচ্ছিল্যের সুরে বলে- " নিগ্রো দূর হটো।"
গর্জে ওঠে সেই তরুণ। উঠে দাঁড়িয়ে সেই সাহেবের পায়ে সজোরে মারে লাথি। বেগতিক বুঝে সাহেব
নেমে যায় পরের স্টপে।
এই অসীম সাহসী, আত্মমর্যাদায় উদ্ভাসিত,তরুণটির নাম ডি.এল .রায়, দ্বিজেন্দ্রলাল রায়।
কৃষ্ণনগরের ভূমিপুত্র, বাড়িতে ছিল সাহিত্য সংস্কৃতির আবহ। বংশ-পরম্পরায় পিতা পিতামহ সবাই ছিলেন রাজদরবারের সম্ভ্রান্ত পদে আসীন।
পিতা ছিলেন উচ্চাঙ্গ সংগীতের যশস্বী সাধক।
শিক্ষকতার চাকরি ছেড়ে দ্বিজেন্দ্রলাল সরকারী বৃত্তি নিয়ে পাড়ি দিলেন ইংল্যান্ড। কৃষিবিদ্যার ওপর বেশ কিছু ডিগ্রি অর্জন করে সসম্মানে ফিরে এলেন দেশে।
এদেশের রক্ষণশীল সমাজ নিদান দিল, বিলেত ফেরত ম্লেচ্ছকে করতে হবে প্রায়শ্চিত্ত।
অস্বীকার করলেন প্রগতিশীল, দৃঢ়চেতা মানুষটি।
নানান সামাজিক উৎপীড়ন নেমে এল হৃদয়বান মানুষটির ওপর। জীবন জীবিকা সূত্রে এবার পাড়ি মধ্যপ্রদেশ।
জমি জরিপ, খাজনা সংক্রান্ত সরকারি নানান উচ্চতর পদ, পরবর্তীতে ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবেও কাজ করলেন বেশ কয়েক বছর।
ইংরেজের রোষে ঘনঘন বদলি হতে থাকেন।
শেষে অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে নিলেন স্বেচ্ছাবসর।
প্রকৃত অর্থে মানুষটি ছিলেন স্বাদেশিকতার মন্ত্রে দীক্ষিত, বহুমুখী প্রতিভার বিচ্ছুরণ।
গান- কবিতা - নাটক তাঁকে দিয়েছে
মহাকালের বুকে হিরন্ময় আসন।
প্রায়শই ভাব জগতে বিচরণ করতেন। লোকে ভাবতো উদাসীন। অসাধারণ স্মৃতিশক্তির অধিকারী ছিলেন।
মাত্র ৫০ বছর বয়সে নিভে যায় তাঁর জীবনদীপ।
দেশের প্রতি, দেশের মানুষের প্রতি ছিল তাঁর অকৃত্রিম ভালোবাসা। নারী জাতির প্রতি ছিল তাঁর প্রগাঢ় শ্রদ্ধা ও সম্মান।
শৃঙ্খলিত দেশজননীকে নিয়ে ছিল অপরিসীম আবেগ,
তীব্র আকুতি।
তাঁর লেখা ও সুরারোপিত সংগীত "ধনধান্য পুষ্পে ভরা আমাদের এই বসুন্ধরা," " বঙ্গ আমার জননী আমার" সহ একগুচ্ছ গান আবহমান বাঙালি হৃদয়ে পেয়েছে স্থায়ী আসন। অর্জন করেছে অমরত্বের গরিমা।
দ্বিজেন্দ্রগীতি আজ বাঙালি ঐতিহ্য ও পরম্পরার এক অনিবার্য অঙ্গ। আমাদের ভালবাসার ঐশ্বর্য।
দেশপ্রেম ও মুগ্ধতার এক আলোকবর্তিকা।
তোমার কাছে অসীম ঋণী কবি
দিয়েছো তুমি মন্ত্র, ভালোবাসা
তোমার গানে স্বদেশ প্রেমের সুর
দীপ্ত মোহন, মানবিক প্রত্যাশা।
জেগে আছো প্রিয় হৃদয়তন্ত্রী ছুঁয়ে
ধনধান্য পুষ্প ভরা সুর
আমার ভারত, সকল দেশের সেরা
হোক না মানুষ চেতনাতে রোদ্দুর।
------------------------------------------
কাব্যগ্রন্থ- ভালো থেকো ভালোবাসা
প্রথম প্রকাশ- আন্তর্জাতিক কলকাতা বইমেলা ২০২৪, ( আনন্দ প্রকাশন)
----------------------------------------------------
Copyright reserved.

0 মন্তব্যসমূহ