পোস্ট বার দেখা হয়েছে
পরাধীনতার বিষাক্ত দংশন, দুর্ভিক্ষের কান্না,
দাঙ্গার রক্ত,
মানুষের চোখে অনিশ্চয়তার নিকষ অন্ধকার।
ঠিক সেই সময়
ভবানীপুরের এক ভদ্রাসন থেকে
ধ্বনিত হল এক দৃপ্ত উচ্চারণ।
এগিয়ে এলেন এক তরুণ শিক্ষাবিদ,
এক নির্ভীক দেশনায়ক, শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী।
তিনি শুধু একজন রাজনীতিবিদ নন।
ছিলেন এক যথার্থ জাগরণ।
একটি আপোষহীন মেরুদণ্ডের পরিভাষা।
এক অদম্য আত্মমর্যাদার প্রতীক।
স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের সন্তান,
কিন্তু পরিচয় শুধু পিতার গৌরবে নয়,
নিজের সাধনা, কর্ম, নিজের আগুনে
তিনি হয়ে উঠেছিলেন এক স্বতন্ত্র বহুমাত্রিক মহীরুহ।
প্রেসিডেন্সি কলেজের মেধাবী ছাত্র,
কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উজ্জ্বল নক্ষত্র।
উপাচার্যের আসনে বসেও
তিনি কখনো ক্ষমতার অহংকার শেখেননি।
তিনি বিশ্বাস করতেন —
শিক্ষা মানে কেবল ডিগ্রি নয়,
শিক্ষা মানে চরিত্র।
শিক্ষা মানে দেশপ্রেম।
শিক্ষা মানে জাতির ভিত্তি মজবুত করা।
তখন বাংলার পথে পথে মন্বন্তরের রাহুগ্রাস।
ক্ষুধার জ্বালায় প্রতিদিন মায়ের কোল যাচ্ছে শূন্য হয়ে।
রাস্তায় পড়ে কঙ্কালসার মানুষের অগণন মৃতদেহ।
ব্রিটিশ শাসকের নির্মম বঞ্চনা ও উদাসীনতা,
বাংলাকে ঠেলে দিয়েছে মৃত্যুর কিনারায়...
সেই সময়
শ্যামাপ্রসাদ কেবল বক্তৃতা দেননি।
তিনি সহমর্মিতায় মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন।
ক্ষুধার্ত মানুষের হাতে তুলে দিয়েছিলেন সাহায্য,
ভরসা, সাহস, মানবতার স্পর্শ।
তারপর এল ভয়ংকর দাঙ্গার আগুন।
জ্বলছে পূর্ববঙ্গ।
ভীত সন্ত্রস্ত মানুষের আর্তনাদ,
বিদীর্ণ করছে রাতের আকাশ।
ধর্মের নামে উন্মাদনা যখন মানুষকে
পরিণত করছে অস্তো এক শয়তানে,
তখন তিনি হয়ে উঠলেন সাধারণ মানুষের রক্ষাকবচ।
তিনি বুঝেছিলেন —
জাতিকে বাঁচাতে হলে
প্রথমে মানুষকে বাঁচাতে হবে।
দেশ স্বাধীন হলো।
কিন্তু স্বাধীনতার ভোরেও
দেখলেন নতুন সংকট।
মন্ত্রীসভায় ছিলেন।
ক্ষমতা, সম্মান ছিল।
তবু তিনি নীরব থাকেননি।
কাশ্মীর প্রশ্নে তখন চলছিল আপসের রাজনীতি,
সংসদের ভেতর বজ্রকণ্ঠে তিনি হলেন সরব -
“এক দেশ, দুই বিধান, দুই প্রধান,
আর দুই নিশান —
কখনোই চলতে পারে না…
এরকম চলতে দেওয়া যায় না।”
তাঁর এই দৃপ্ত উচ্চারণ ছিল না
কোনো রাজনৈতিক স্লোগান।
ছিল এক অখণ্ড শক্তিশালী ভারতের স্বপ্ন।
এক সংবিধান,
এক পতাকা,
এক জাতীয় আত্মপরিচয়ের আহ্বান।
১৯৫১ সালে তিনি প্রতিষ্ঠা করলেন 'জনসংঘ।'
তিনি জানতেন,
রাজনীতি কেবল ক্ষমতা দখলের পথ নয়।
রাজনীতি মানে প্রসারিত আদর্শ।
মানব কল্যাণে নিজেকে সমর্পণ।
রাজনীতির অর্থ জাতির আত্মাকে জাগিয়ে তোলা।
বাংলার মাটিতে তিনি যে বীজ বপন করেছিলেন,
আজ তা সমগ্র উপমহাদেশে
আশা ও ভরসার প্রতীক হয়ে বিস্তৃত।
জাতীয়তাবোধ, সাংস্কৃতিক আত্মবিশ্বাস,
দেশকে সবার ওপরে ভাবার শিক্ষা —
এই সবকিছুর ভিত্তিপ্রস্তর গড়ে দিয়েছিলেন তিনি।
তারপর এল সেই ঐতিহাসিক যাত্রা।
কাশ্মীরে প্রবেশ করতে গেলে
নিজের দেশেই লাগবে পারমিট।
এ তিনি কিছুতেই মেনে নিতে পারেননি।
তিনি জানতেন, বিপদ আছে।
হয়তো কারাবরণ হতে পারে।
তবু থামেননি তিনি।
কাশ্মীরের পথে রওনা হওয়ার আগে
তিনি যেন সমগ্র ভারতবাসীকে বলেছিলেন —
“ব্যক্তিগত সুখের জন্য নয়…
প্রাদেশিক সুবিধার জন্য নয়…
সমগ্র দেশের কল্যাণের জন্য
যারা আঘাত সহ্য করে,
তাদের ত্যাগ কোনোদিন ব্যর্থ হয় না।”
গ্রেপ্তার হলেন তিনি।
শ্রীনগরের চরম অস্বাস্থ্যকর পরিত্যক্ত একটি কটেজ। চারপাশে ইঁদুর, পেঁচা, সাপের বসতি।
প্রচন্ড ঠান্ডায় তাঁর অসুস্থতা।
নিঃসঙ্গতা। চিকিৎসার গাফিলতি।
আর এক গভীর ষড়যন্ত্রের হাতছানিতে রহস্যময় মৃত্যু।
মাত্র একান্ন বছর বয়সে
নিভে গেল এক অমূল্য অগ্নিশিখা।
সত্যিই কি নিভে গেলেন এই মহাপ্রাণ ?
আজও কাশ্মীরের পাহাড়ে পাহাড়ে
তাঁর কণ্ঠস্বর ধ্বনিত -প্রতিধ্বনিত হয়।
আজও ভারতের সংসদে, রাজনীতিতে,
জাতীয় চেতনায়
তাঁর প্রবলতর উজ্জল উপস্থিতি।
আজ কাশ্মীরের বুকে
তাঁর নামাঙ্কিত বিশাল টানেল
শুধু যাত্রাপথকে সংক্ষিপ্ত করেনি —
এ যেন মহৎ বাঙালি প্রাণের প্রতি শ্রদ্ধার্ঘের এক প্রতীক।
যে মানুষটি জীবনের বিনিময়ে
জম্মু-কাশ্মীরকে ভারতের সঙ্গে একসূত্রে বাঁধার স্বপ্ন দেখেছিলেন,
আজ তাঁর নামেই
পাহাড় ভেদ করে এগিয়ে চলেছে ভারতের নতুন গর্বিত যাত্রাপথ।
তিনি আমাদের শিখিয়েছেন —
দেশপ্রেম মানে কাউকে ঘৃণা নয়।
দেশপ্রেম মানে দায়িত্ব।
দেশপ্রেম মানে সততা।
দেশপ্রেম মানে নিজের চেয়ে দেশকে বড় করে ভাবা।
আজকের প্রজন্মের কাছে
শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় শুধু ইতিহাসের নাম নন।
তিনি এক অনন্ত প্রেরণা।
এক সাহস।
এক আপসহীন মেরুদণ্ড।
হিন্দু বাঙালির জন্য
পশ্চিমবঙ্গের ভারত অন্তর্ভুক্তির
অন্যতম প্রনম্য কারিগর।
যতদিন ভারত থাকবে,
যতদিন কোনো তরুণ বুক ভরে বলবে
দেশ আগে, রাষ্ট্র আগে।
ততদিন প্রবল ভাবে বেঁচে থাকবেন
ডক্টর শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়।
ভারতমাতার বিরল রত্ন তুমি
আপসবিহীন সত্যের বাতিঘর
ক্ষুদ্র জীবন, মহান কর্মব্রতী
সময় শরীরে আলোকিত স্বাক্ষর।
জীবন দিয়েছো স্বদেশকে ভালোবেসে
আবহমানের প্রেরণার ধ্রুবতারা
দুচোখে স্বপ্ন, দৃপ্ত ভারতবর্ষ
পৃথিবীর বুকে শান্তির বারিধারা।
-------------------------------------------
Copyright reserved
#আবৃত্তি শিল্পীরা মঞ্চে ও fb লাইভ এ আবৃত্তি করতে পারেন..

0 মন্তব্যসমূহ