শ্রদ্ধার্ঘ্য :মহাবিপ্লবী রাসবিহারী বসু || জয়দীপ চট্টোপাধ্যায়




পোস্ট বার দেখা হয়েছে

ইতিহাস যেখানে এসে থমকে যায়

শ্রদ্ধায় নত করে মাথা

সেখানেই দাঁড়িয়ে আছেন তিনি।


যে মানুষটির নাম

পাঠ্যবইয়ে হয়তো ছোট হরফে লেখা

কিন্তু যাঁর কাজের বিস্তার

একটি মহাদেশ জুড়ে।


যাঁর পদচিহ্নে

ব্রিটিশ সাম্রাজ্যে জেগেছিল আতঙ্ক

আর ভারতবর্ষ দেখেছিল

স্বাধীনতার হিরন্ময় স্বপ্ন।


তিনি কোনো সিংহাসনে বসে নেতৃত্ব দেননি,

কোনো মঞ্চে দাঁড়িয়ে হাত তুলেও দেননি ডাক।

তবু তাঁর এক একটি সিদ্ধান্ত

ছিল এক একটি বিদ্রোহের 

অগ্নিগোলক।


নাম নয়

এ এক দায়িত্ব।

একটি পরিকল্পনা।

একটি চলমান সংগ্রাম।


রাসবিহারী বসু,

যাঁকে বুঝতে গেলে

ইতিহাস পড়া নয়,

ইতিহাসকেই নতুন করে ভাবতে হয়।


বর্ধমানের সুবলদহ গ্রামে জন্ম,

কিন্তু তাঁর স্বপ্নের মানচিত্রে

শুধু ছিল না গ্রাম 

ছিল সমগ্র ভারতবর্ষ,

ছিল এশিয়া,

ছিল মুক্ত পৃথিবীর স্বপ্ন।


অল্প প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনা,

কিন্তু অসীম প্রখর মেধা।

দশ–বারোটি ভাষায় অনায়াস দক্ষতা—

ভাষাও তাঁর কাছে ছিল অস্ত্র।

ছদ্মবেশ ছিল তাঁর শিল্প,

ব্রিটিশ পুলিশের চোখে ধুলো দিয়ে থাকা ছিল কৌশল।


নানার নাম নানান ছদ্মবেশ ধারণ।

কাশীতে পুলিশ বাড়ি ঘিরে ফেলেছে—

বেরিয়ে এলেন এক “উড়ে ঠাকুর”!

বললেন, “রাসবিহারী ভিতরে ঘুমাচ্ছেন।”

পুলিশ ঢুকতেই—

তিনি অদৃশ্য হলেন...


কলকাতা জুড়ে তল্লাশি,

শিয়ালদা থেকে ধর্মতলা—

আর তিনি?

এংলো-ইন্ডিয়ান বেশে

পোস্ট অফিসের দোতলায়

নিশ্চিন্তে বেহালা বাজাচ্ছেন।

চন্দননগরে বিশাল পুলিশ বাহিনী ঘিরে ফেলেছে বাড়ি। 

ঝাড়ুদারের বেশে

ময়লার বালতি হাতে

তাদের চোখের সামনে দিয়েই  হেঁটে বেরিয়ে গেলেন তিনি।


২৩শে ডিসেম্বর, দিল্লি—

রাজপথে হাতির পিঠে সাম্রাজ্যের অহংকার।

আর আড়ালে

এক বিপ্লবীর চূড়ান্ত প্রতীক্ষা..

একটি বোমা,

একটি ইতিহাস বদলে দেওয়ার সাহস, স্বপ্ন।


হার্ডিঞ্জ বেঁচে গিয়েছিল,

কিন্তু ভেঙে গিয়েছিল

ব্রিটিশ পরাক্রমের ঔদ্ধত্য। রাসবিহারী বসুর মাথার দাম তখন এক লক্ষ টাকা।


শিকারিরা ছুটছে,

কিন্তু ধরা পড়েননি তিনি।

কারণ তিনি জানতেন—

বিপ্লব মানে ধরা পড়া নয়,

বিপ্লব মানে যেভাবেই হোক টিকে থাকা।


১৯১৫—

সেনা বিদ্রোহের জ্বলন্ত পরিকল্পনা।

গদর, সেনা, আগুন—

সব প্রস্তুত।

কিন্তু বিশ্বাসঘাতকতা

ইতিহাসের এক ব্যাধি। 


অনেকের হল ফাঁসি,

অনেকেরই  দ্বীপান্তর—

আর তিনি

আরও নীরব, আরও গভীর।


তিনি পালালেন না—

তিনি পৌঁছে গেলেন জাপান।

সেই দূর দেশে গিয়েও

তিনি ভারতবর্ষের স্বাধীনতার জন্য সক্রিয় হলেন...

বললেন—

Asia for the Asians. Go home, white.


ব্যাংকক সম্মেলন।

ইন্ডিয়ান ইন্ডিপেন্ডেন্স লীগ।

আজাদ হিন্দ ফৌজ।

এই সব নামের পেছনে

একজন ছিলেন নীরব স্থপতি।


জাপানে তিনি পৌঁছলেন

“রাজা প্রিয়নাথ” সেজে—

ছদ্মবেশে সমুদ্র পেরিয়ে

স্বাধীনতার মানচিত্র আঁকতে।

আর যখন এলেন

সুভাষচন্দ্র বসু,

রাসবিহারী বসু

নিজের সব দায়িত্ব

একটি হাসিতে তুলে দিলেন

যোগ্য উত্তরসূরীর হাতে।


কারণ তিনি জানতেন,

বিপ্লব মানে ক্ষমতা আঁকড়ে ধরা নয়।

বিপ্লব মানে

সঠিক হাতে প্রজ্বলিত আগুন তুলে দেওয়া।


তিনি বলেছিলেন—

“I was a fighter. One fight more, the last and the best.”


শেষ জীবনে

তিনি ছিলেন অসুস্থ,

প্রায় একা—

কিন্তু নিঃস্ব নন।

কারণ তাঁর রেখে যাওয়া

একটি সেনাবাহিনী,

একটি স্বপ্ন,

একটি জাগ্রত ভারতবর্ষ।


১৯৪৫-এর জানুয়ারি—

একটি শরীর থেমে গেল।


কিন্তু একটি যুগ—

থামেনি।

রাসবিহারী বসু

আজও বেঁচে আছেন

প্রতিটি সাহসী সিদ্ধান্তে,

প্রতিটি নীরব ত্যাগে।

ইতিহাস যেখানে এসে থমকে যায়, আজও

শ্রদ্ধায় নত করে মাথা।


সতত একটি নাম উচ্চারিত হয়—

মহাবিপ্লবী রাসবিহারী বসু।

অদৃশ্য নেতা

নীরব বিপ্লব।


ইতিহাসের চিরন্তন অগ্নিমানব।


--------------------------

রচনা - ১৭.০২.২০২৬

কোলকাতা ৩০

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ