পোস্ট বার দেখা হয়েছে প্রায় চল্লিশ বছর পর দেশে ফেরা। ওয়াশিংটন ডি সি থেকে দিল্লি পৌঁছে লাউঞ্জেই প্রায় ঘন্টা পাঁচেক বসা। তারপর রাতের ফ্লাইটে দিল্লি থেকে কলকাতা পৌঁছাতে রাত একটা বেজে গেল। একটা ক্যাব বুক করল ইদ্রিশ। দমদম এয়ারপোর্টের ( সুভাষ চন্দ্র বসু আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ) কতো পরিবর্তন হয়ে গেছে। দেশ ছাড়ার সময় এতো সুন্দর আলোকোজ্জ্বল ছিল না। কতো রকমের নতুন নতুন ব্যবস্থা। প্রিপেড ট্যাক্সি আর ক্যাবের দুটো আলাদা লাইন। যার যেটা সুবিধা সে সেটাতে উঠে যাচ্ছে। এক কাপ কফি নিয়ে ইদ্রিশ অপেক্ষা করতে লাগল। কিছুক্ষণের মধ্যেই ক্যাব এসে দাঁড়াল। কফি মগে শেষ চুমুক দিয়েই ডিকিতে লাগেজ রেখে ক্যাবে উঠে পড়ল।
এতো রাতেও রাস্তায় প্রচুর জ্যাম। এক নম্বর গেট পেরোতেই ঘড়ির কাঁটা রাত দুটো ছুঁয়ে গেল। সারা আকাশ কেমন একটা নীলচে কালো মেঘে ঢাকা। গভীর নিম্নচাপ। ঝিরঝিরে বৃষ্টির রিমঝিম শব্দে বেশ একটা আবেশে মন ভরে গেল ইদ্রিশের। ক্যাব ড্রাইভার একমনে গাড়ি চালাচ্ছে। ক্রমাগত স্পিড বাড়াতে লাগল। ফাঁকা রাস্তা তাই বেলঘোরিয়া এক্সপ্রেস ক্রস করে বি টি রোড ধরতে বেশি সময় লাগল না। ইদ্রিশ যাবে ব্যারাকপুর। ক্যাব যখন ব্যারাকপুর চিড়িয়ামোরে পৌঁছাল তখন রাত তিনটে বেজে গেছে। এবার বাঁ দিক ধরে যেতে হবে। মিশন ছাড়িয়ে ধুবি ঘাটের কাছে আসতেই মুষলধারে বৃষ্টি শুরু হয়ে গেল সেইসাথে প্রবল বেগে হাওয়া বইতে লাগল। বিকট শব্দে বাজ পড়তে লাগল। এর মধ্যেও ক্যাব গন্তব্যের দিকে এগিয়ে যেতে লাগল। ইদ্রিশ খুব চিন্তায় পড়ে গেল। যা অবস্থা বাড়ি পৌঁছাতে পারবে তো ! চারিদিকে ঘুটঘুটে অন্ধকার। স্ট্রিট লাইটগুলো অজানা কোনো কারণে আজ আর জ্বলছে না। আশেপাশে কোনো বাড়ি দেখা যাচ্ছে না। কোথায় এলাম ! রাস্তা ভুল হয়ে গেল না তো ! কিন্তু তাই বা হবে কি করে ? লোকেশন তো সেট করা আছে তবে !! এইসব চিন্তায় মাথা ভার হয়ে আছে। এককাপ চায়ের জন্যে ইদ্রিশের মনটা ছটফট করতে লাগল। হঠাৎ বিকট শব্দে একটা জোড়ে ঝাঁকুনি দিয়ে গাড়িটা থেমে গেল।
- সাব গাড়ির টায়ার পাঙ্কচার হয়ে গেছে।
- সে কি ! তোমার কাছে এক্সট্রা নেই।
- না সাব।
- কিন্তু তুমি কি করবে ?
- আমাকে গাড়িতেই রাত কাটাতে হবে।
- আমিও তোমার সাথেই থেকে যাই এই রাতটা।
- না সাব। আপনি বাড়ি যান। আমার সাথে সাথে আপনি কেন কষ্ট করবেন!
- তোমাকে এই অবস্থায় একা ফেলে আমি কিভাবে যাই !তুমিও না হয় আমার সঙ্গে চল ?
- আমার উপায় থাকলে নিশ্চয়ই যেতাম।
- কেন ? সকাল হলে কোনো মেক্যানিক ডেকে নেওয়া যাবে। গাড়ি এখানেই রেখে আমার সঙ্গে চল।
- এ গাড়ি আমার নিজের নয় সাব। আমার যাওয়ার উপায় নেই। যদি চুরি হয়ে যায়।
ক্যাব ড্রাইভারকে কিছুতেই রাজি করাতে না পেরে ইদ্রিশ অগত্যা একাই লাগেজ নিয়ে এগিয়ে চলল। ক্রমশ বাতাসের গতি বাড়তে লাগল। চারিদিক অন্ধকার , জনবসতিও দেখা যাচ্ছে না। এখনতো ইদ্রিশ ক্যাবে নেই যে লোকেশন সেট করা আছে তাহলে ? কোথায় এসে পড়ল ও ? বৃষ্টির দাপটও ক্রমাগত বেড়েই চলল। ফোনটাও সুইচড অফ হয়ে আছে। বাড়িতে একটা খবর দেবে সে উপায় ও নেই। এদিকটা কি এখনো ইনভার্টারের বন্দোবস্তও নেই নাকি ! কোথাও কোনো বৈদ্যুতিক আলোর এক চিলতে আলো দেখা যাচ্ছে না। হয়তো ট্রান্সফর্মার বার্স্ট করেছে। যাইহোক যা বৃষ্টি আর হাওয়ার বেগ আর এ পাও হাঁটা মুস্কিল হয়ে যাচ্ছে। যে করেই হোক একটা আশ্রয়ের দরকার অন্তত মাথাটা যাতে গোঁজা যায়। চারিদিকে অসহায়ের মতো তাকাতে লাগল ইদ্রিশ। হঠাৎ সারা আকাশ জুড়ে বিদ্যুতের ঝলকানি আর বিকট শব্দে কোথায় একটা বাজ পড়ল। ভয়ে বুক শুকিয়ে গেল বেচারীর। এতদিন বাদে কাউকে না জানিয়ে দেশে ফিরছে বাড়ির সবাইকে সারপ্রাইজ দেবে বলে তা না উল্টে প্রকৃতিমাতা তাকেই সারপ্রাইজ দিয়ে দিলেন! বলতে চাইছেন এতদিন কোথায় ছিলে আমাকে ভুলে ! অভিমান ক্ষোভে পরিণত হয়ে এই হচ্ছে তাঁর বহিঃপ্রকাশ।এতো অসহায়তার মধ্যেও ইদ্রিশের হাসি পেল। আবার বিদ্যুৎ চমকাল এমনভাবে চারিদিকে আলো হয়ে গেল আর সেই আলোর ঝলকানিতে ইদ্রিশ দেখল ও একটা পোড়ো বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে আছে। আর কিছু ভাবতে পারল না লাগেজ নিয়ে সোজা বাড়ির ভেতরে ঢুকে গেল। আপাতত মাথাটাতো বাঁচুক। রাস্তায় থাকলে বাজের ঘায়ে প্রাণটাই যাবে! কেউ জানতেও পারবে না। পকেট থেকে রুমালটা বার করতে গিয়েও আবার ঢুকিয়ে রাখল। কি হবে ! বিদ্যুতের চমকানির জন্যে মাঝে মাঝে বাড়িটার ভেতরটা দেখা যাচ্ছিল। একটা বড় হল ঘরে ও দাঁড়িয়ে আছে। অস্পষ্ট আলোয় দেওয়ালে কাঠের ফ্রেমে একটা বড় অয়েল পেন্ট। ইদ্রিশ আস্তে আস্তে পা ফেলে ফেলে অয়েল পেন্টটার সামনে এসে দাঁড়াল। আবার অন্ধকার! বিদ্যুত এখন আর চমকাচ্ছে না কেন ? বাতাসের গতিবেগও কম মনে হচ্ছে। বৃষ্টিটা একটু ধরেছে মনে হচ্ছে। একটু কোথায় বসতে পারলে ভালো হতো। পা দুটো অসম্ভব কামড়াচ্ছে। কোমরটা প্রচণ্ড ব্যথাও করছে। এতো লং ট্যুর ! কোমরের আর দোষ কি ! বসার জন্যে কিছুই না পেয়ে ইদ্রিশ মেঝেতেই বসে পড়ল আর যাবে কোথায় ? বসাতো তো দূর ও ক্রমশ গড়িয়ে নীচে নেমে যেতে লাগল। স্লোপিং নয়, সিড়ি থেকে পড়ে যাচ্ছে সে টা বুঝতে কোনো অসুবিধা হল না। গড়াতে গড়াতে একটা চাতালে এসে ধপাস করে পড়েই ইদ্রিশ জ্ঞান হারিয়ে ফেলল। এভাবে কতক্ষণ পড়ে রইল কে জানে ! যখন দুচোখ খুলল ইদ্রিশ দেখল একটি সুন্দরী মেয়ে ওর মুখের ওপর ঝুঁকে দেখছে -
- কে কে তুমি ?
ইদ্রিশ লাফ দিয়ে উঠে বসল। মেয়েটি ওর মুখে আঙ্গুল দিয়ে চুপ করতে বলল -
- আস্তে! কথা বোলো না। ওরা শুনতে পাবে।
- কারা শুনতে পাবে ?
- ঐ দেখ।
মেয়েটির হাতের ইশারায় ইদ্রিশ একটা ছোটো ঘর দেখতে পেল। দরজাটা ভেতর থেকে বন্ধ করা মনে হল। কারা যেন ফিসফিস করে কথা বলছে। ইদ্রিশ দরজায় কান পাতল। কেউ যেন কাউকে চাপা স্বরে ধমকাচ্ছে।
- আই চুপ একদম কাঁদবি না। মেরে মাটিতে পুঁতে ফেলব।
- আমি মার কাছে যাব। আমাকে কেন ধরে রেখেছ ?
- আবার কথা !
- আমাকে ছেড়ে দাও।
একটা সপাটে চড় পড়ল মেয়েটির গালে।
- চুপ একদম চুপ থাক।
ইদ্রিশ দরজার বাইরে থেকে ফোঁপানির আওয়াজ পাচ্ছে। যাকে ধরে রাখা হয়েছে তার বয়স বেশি নয়। বড় জোর চোদ্দ হবে।
- ওকে ধরে রেখেছে কেন ?
মেয়েটি চুপ করে রইল। দুচোখ থেকে জল গড়িয়ে পড়তে লাগল।
- ও কে তুমি জান ?
- আমার মেয়ে।
চমকে উঠল ইদ্রিশ-
- কি বলছ তুমি ? তোমরা এখানে এলে কি ভাবে ? তোমার বর কোথায় ?
- ওকে ওরা মেরে গঙ্গায় ভাসিয়ে দিয়েছে।
- আর তোমরা ?
- কে বাঁচাবে আমাদের? আপনার জন বলতে আর তো কেউই নেই। শুধু ইন্দ্রাবতীর বাবাই ছিলেন।
- ওনাকে ওরা মারল কেন ?
- উনি এদের হয়ে কাজ করতে চান নি তাই।
- এরা কি কাজ করে ?
- এরা ড্রাগের বিজনেস করে। একদিন একথা আমার স্বামী জানতে পেরে যায়।
- আপনার স্বামী কি কাজ করতেন ?
- নায়েব ছিলেন এই এলাকার জমিদারবাবু রুদ্রশেখর বণিকের।
চমকে উঠল ইদ্রিশ। এই মেয়েটি কবেকার কথা বলছে !
কমপক্ষে দেড়শ - দুশ বছর আগেকার কথাতো হবেই। এ কে তবে ? এতো বছর কারোর বয়সতো হতে পারে না ! এ কি আদৌ জীবিত না কি !!!
কথাটা মনে হতেই একটা ঠান্ডা স্রোত শিড়দাড়া থেকে নেমে গেল যেন। বুকের রক্ত ছলকে উঠল। অজানা এক ভয়ে ইদ্রিশের সারা শরীর কাঁপতে লাগল।
- কে কে আপনি ?
- আমি ইন্দুলেখা। আর আমার স্বামী ঊষাণ।
- আর ঐ যে মেয়ে কে যারা ওকে আটকে রেখেছে ? ওর বয়স কত ?
- বললাম তো ইন্দ্রাবতী। তুমি আমার ইন্দুকে বাঁচাও ঐ নরপিশাচগুলোর হাত থেকে ।
- কিভাবে ?
- ওরা এখনই আমার ইন্দুকে গঙ্গার ওপারে শ্রীরামপুরের এক ধনী ব্যবসায়ীর কাছে বেঁচে দেবে। ওরা আমার মেয়েকে নিয়ে যাবে। তুমি বাঁচাও না ওকে ? দয়া কর ও ছাড়া যে আমার আর কেউ নেই। ওর জীবনটা ওরা নষ্ট করে দেবে। দোহাই তোমার আমার মেয়েকে রক্ষা কর!
এরই মধ্যে কার যেন পায়ের শব্দ শোনা গেল।
ইদ্রিশ আর ইন্দুলেখা লুকিয়ে পড়ল ঐ হল ঘরের একটা থামের আড়ালে। সশব্দে দরজাটা খুলে ফেলল আর একটা নরপিশাচ। মেয়েটির তীক্ষ্ণ চিৎকার রাতটাকে যেন ভেঙ্গে টুকরো টুকরো ফেলছে।
- সর্দার নৌকা গঙ্গায় ভিড়ানো আছে। শীঘ্র নিয়ে যেতে হবে। মেয়েটার মুখ কাপড় দিয়ে বেঁধে ফেলতে হবে। একটু পড়েই ইদ্রিশ দেখল একটা চোদ্দ - পনের বছরের মেয়েকে মুখ কাপড়ে বেঁধে টানতে টানতে ঘর থেকে বার করে নিয়ে আসছে ঐ দুটো নরপিশাচ। যেমন বিভৎস তাদের চাহনি তেমনি তাদের মুখাবয়ব। মেয়েটি হাত পা ছুঁড়তে লাগল, বাঁধা মুখ থেকে গো গো আওয়াজ বেরিয়ে আসছে। এদের হাত থেকে নিজেকে মুক্ত করার জন্যে আপ্রাণ চেষ্টা করতে লাগল। একটা পিশাচ মেয়েটিকে মাটিতে আছড়ে ফেলে বেল্ট দিয়ে মারতে লাগল। মেয়েটার নরম শরীর রক্তে ভেসে যেতে লাগল। মেয়েটি জ্ঞান হারিয়ে ফেলল। হঠাৎই ইদ্রিশ দেখল ইন্দুলেখা একটা ধারাল হাতিয়ার নিয়ে থামের আড়াল থেকে ছুটে এসে সজোরে একটা নরপিশাচের বুকে আমূল বসিয়ে দিল। ইদ্রিশ কিছু বুঝে উঠবার আগেই আর একজন নরপিশাচ গলায় বেল্ট পেঁচিয়ে শ্বাসরোধ করে দিল ইন্দুলেখার। " ওমা ইন্দু "- এই বলে ইন্দুলেখা প্রাণ হারিয়ে মাটিতে লুটিয়ে ফেলল।
ইদ্রিশ আর সহ্য করতে পারল না। সে সজোরে নরপিশাচটার মুখে একটা ঘুসি বসিয়ে দিল। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় লোকটার গায়ে তো লাগল না ! ও লোকটির হাত থেকে ইন্দ্রাবতীকে ছাড়ানোর চেষ্টা করতে লাগল। লোকটাকে প্রচুর পেটাল কিন্তু লোকটিকে দেখে মনে হল না একটাও ওর গায়ে লেগেছে। বড় অদ্ভুদ তো !!
লোকটা মেয়েটিকে টানতে টানতে নিয়ে গেল গঙ্গার ঘাটের দিকে। ইদ্রিশ ওদের পেছনে ছুটতে লাগল মেয়েটিকে বাঁচানোর জন্যে। কিন্তু কিছুই করতে পারল না। নরপিশাচ টা মেয়েটিকে টানতে টানতে নৌকায় উঠিয়ে নিতেই মাঝি নৌকা ছেড়ে দিল। ইদ্রিশ গঙ্গার তীরে দাঁড়িয়ে অসহায়ের মতো দেখতে লাগল নৌকাটি ধীরে ধীরে অন্ধকারে মিলিয়ে গেল। হতভম্বের মত কতক্ষণ যে এভাবে দাঁড়িয়ে ছিল ইদ্রিশ জানে না। হুঁশ যখন ফিরল তখন পূবের আকাশে সূর্য ওঠার আভাস ছড়িয়ে পড়ছে। অবসন্ন ভাঙ্গাচোড়া মন নিয়ে ইদ্রিশ আবার ফিরে এল নিজের লাগেজ নিতে আর পুলিশে একটা খবর দেওয়াতো দরকার। সেই পোড়ো বাড়িটার দিকে একবার ভালো করে তাকিয়ে দেখল ইদ্রিশ --- সারাটা বাড়ি জঙ্গলে ঘেরা। জানলা কপাট সব ভাঙ্গা। বট গাছের ঝুড়ি বাড়িটাকে যেন মুরে ফেলেছে। ইট বার করা দেওয়ালে ছ্যাদলা পরে গেছে। উঠোনটা কাদায়- শ্যাওলায় পিচ্ছ্বিল হয়ে গেছে। একটু অসতর্ক হলেই পিছলে পড়ার সম্ভাবনা আছে পুরোমাত্রায়। বাড়িটার ভেতরে ঢোকার প্রবৃত্তি হল না। তবুও ইন্দুলেখার তো একটা গতি করতে হবে আবার লাগেজটাও নিতে হবে।
বাড়ির ভিতর ঢুকে চমকে উঠল ইদ্রিশ -- একি ইন্দুলেখাতো এখানেই মরে পড়ে ছিল! ওর বডিটা কোথায় গেল ? মেঝেটা ভালো করে তাকিয়ে দেখল -- নাঃ ! কোত্থাও এতটুকু রক্তের ছিটেফোঁটাও নেই। হঠাৎ ইদ্রিশের বাড়ির বাইরে চোখ পড়ল ,দেখল একজন মাঝবয়সি ভদ্রলোক হেঁটে আসছেন।
- কি হয়েছে আপনার ? আপনি এমন করছেন কেন ?
বিরবির করতে লাগল ইদ্রিশ---- এখানেই তো ওরা ছিল ,কোথায় গেল সব !!
ভদ্রলোক ইদ্রিশের হাত ধরে বাইরে নিয়ে এলেন। বোধহয় উনি এখানকার বাসিন্দা হবেন। রাস্তার ধারে একটি চায়ের দোকানে ইদ্রিশকে বসিয়ে চাওয়ালাকে বললেন -
- মনতোষ এক গ্লাস জল,এক কাপ চা আর দুটো বিস্কুট চটপট দিয়ে ঐ বাড়ির ভেতরে যা যা লাগেজ আছে নিয়ে আয়।
চাওয়ালা দুকাপ চা, চারটা বিস্কুট ও এক গ্লাস জল দিয়ে লাগেজ আনতে চলে গেল। চা - জল খেয়ে একটু স্বস্তি বোধ করতে লাগল ইদ্রিশ। কিন্তু গতরাতের অভিজ্ঞতার ছাপ মুখের ওপর রয়ে গেছে। ঘোর কাটে নি।ভদ্রলোক বললেন -
- কি হয়েছে এবার খুলে বলুন। আপনি কোথায় যাচ্ছিলেন আর এই বাড়িতেই বা কি করে এলেন ?
ইদ্রিশ সব ঘটনা খুলে বলে বলল -
- ইন্দ্রাবতী আর ইন্দুলেখা কোথায় গেল ? ইন্দ্রাবতীকে বাঁচাতে পারলাম না।
- কাকে বাঁচাবেন আপনি ? ওরাতো কেউ নিজেরাই বেঁচে নেই।
- অ্যাঁ ! এ আপনি কি বলছেন ? তবে যে আমি দেখলাম !
- তবে আপনি ইন্দুলেখার কাহিনী যা বললেন তা কিছুটা হলেও সত্যি।
- আপনি কি করে জানলেন ?
- সবই লোকমুখে শোনা।
- তাহলে সব সত্যি বলছেন ! কোন সত্যির কথা বলছেন আপনি ? নায়েব , জমিদার এসব তো অনেককাল আগের ঘটনা।
- হ্যাঁ তাই। অনেক আগের ঘটনাতো বটেই।
- কি ঘটনা ?
- এই যে জমিদার সত্যিই ছিল। এই গোটা ব্যারাকপুরের একজন জমিদার ছিলেন। সেই সময় অবশ্য এই জায়গাটার নাম ব্যারাকপুর ছিল না। ওনার নায়েব ঊষাণ খুব ভালো মানুষ ছিলেন।
- আপনি একটু খুলে বলুন। আমার মাথায় কিচ্ছু ঢুকছে না।
- আপনি কোথায় যাচ্ছিলেন ?
- আমার বাড়িতে। আজই দেশে ফিরেছি।
- আপনার বাড়ি কোথায় ?
- গান্ধীঘাটের কাছে রোডের ওপর।
- আপনি কোথায় এসে পড়েছেন জানেন ?
- কেন বলুন তো ?
- একেবারে গঙ্গার ধারে। ঐ যে ভাঙ্গাচোড়া বাড়িটা দেখছেন কতো পুরোনো জানেন ?
- কতো ?
- প্রায় তিনশ বছরের পুরোনো।
- এতো পুরোনো ?? ওই বাড়িতে কারা থাকতেন ?
- এই অঞ্চলের বেশিরভাগ জমিই ছিল রুদ্রশেখর বণিকের অধিকারে। আপনি যে বাড়িতে আশ্রয় নিয়ে ছিলেন সে বাড়িটা ছিল অবশ্য রুদ্রশেখর বণিকের নায়েবের। ঐ নায়েবই ঊষাণ। ঊষাণ স্ত্রী আর একমাত্র মেয়েকে নিয়ে এই বাড়িটায় থাকতেন। সারাদিন জমিদারির হিসাব-নিকাশ সামলে সন্ধ্যাবেলায় ঘরে ফিরতেন। বড় সুখী পরিবার ছিল। কিন্তু গতকাল রাতের আকাশের মতো এদের জীবনেও একদিন হঠাৎই কালো
মেঘ ঘনিয়ে এল। একদিন সন্ধ্যাবেলায় ঊষাণ আর ঘরে ফিরল না। পরদিন ভোরবেলায় ঊষাণের লাশ গঙ্গায় ভেসে উঠল। জমিদার বাড়িতে খবর গেল। জমিদারবাবু অনুসন্ধান করে জানতে পারেন কিছু অসাধু ব্যবসায়ী মাদকদ্রব্য নৌকায় গঙ্গার ওপারে চালান করে নিয়মিত। একদিন জমিদারির কাজে ঊষাণ শ্রীরামপুরে যান। বাড়ি ফেরার পথে বেশ রাত হয়ে যায় আর তখনই তাঁর নজরে আসে। ধরা পরার ভয়ে তারা প্রথমে ঊষাণের কাছে মাপ চায় আর অনুরোধ করে যাতে এই খবর জমিদারবাবুর কানে না যায়। প্রস্তাব দেয় ঊষাণকে -
- আপনিও আসুন আমাদের এই ব্যবসায়ে ?
- তোমাদের সাহস তো কম নয়। তোমরা আমাকে এই অন্যায় কাজ করতে বলছ ? তোমাদের এই কাজের কথা
আমি জমিদারবাবুকে অবশ্যই জানাব।
- তারপর ?
- আর তারা অপেক্ষা করল না। সঙ্গে ধারাল অস্ত্র এরা বোধহয় সবসময়ই রাখত। এক কোপে ঊষাণের ধর মুণ্ডু আলাদা করে গঙ্গায় ভাসিয়ে দিল। আর এখানেই থেমে গেল না। রাতের আঁধারে এদিকে ঊষাণের জন্য ইন্দুলেখা ছটফট করতে লাগল। হঠাৎ দরজায় করাঘাত। ইন্দুলেখা ঊষাণ এসেছে মনে করে দরজা খুলে দিতেই যমদূতের মত উদয় হল তিনজন ষণ্ডামার্কা লোক। ভয়ে ইন্দুলেখা চিৎকার করে উঠল -
- কে কে তোমরা ?
- আই চুপ ! আওয়াজ করলেই তোরও গলা কেটে ফেলব।
- কার কথা বলছ তোমরা ?
- কেন তোর স্বামীর। ও তো এখন গঙ্গায় ভাসছে। এখন তোর পালা।
এই কথা বলে বিশ্রিভাবে হেসে উঠল।
দুর্ভাগ্য বশতঃ লোকগুলোর চিৎকারে ইন্দ্রাবতীর ঘুম ভেঙ্গে গেল। ও ছুটে এসে মাকে জড়িয়ে ধরল। ওরা মেয়েটাকে মায়ের কাছ থেকে কেড়ে নিয়ে একটা ছোট ঘরে আটকে রাখল। ইন্দ্রাবতী কান্নার আওয়াজে বাড়িটা যেন কেঁপে কেঁপে উঠতে লাগল। তখন ওদের মধ্যে একজন ঘরের ভিতরে ঢুকে মেয়েটির মুখ হাত বেঁধে ফেলল।
ইন্দুলেখা ছুটে গিয়ে ওদের পা জড়িয়ে ধরে কাকুতি-মিনতি করতে লাগল -
- দয়া কর আমার মেয়েটাকে ছেড়ে দাও !
কুৎসিত হাসি হেসে একজন বলল -
- কি বললি ছেড়ে দেব ? এমন সুন্দরী একটা মেয়ের জন্যে শ্রীরামপুরের বেণেরা হা করে আছে। এটাকে বেচে দিলে মোটা টাকা পাওয়া যাবে।
ইন্দুলেখা আর সহ্য করতে পারল না। হাতের কাছে ছিল একটা ধারাল ছোঁড়া সোজা ঐ লোকটার বুকে আমূল বসিয়ে দিল। মুহূর্তের জন্যে হতভম্ব হয়ে গেল বাকি দুই নরপিশাচ। হঠাৎই একজন একটা বেল্ট পেঁচিয়ে দিল ইন্দুলেখার গলায়। জ্ঞান হারিয়ে তখনই মেঝেতে লুটিয়ে পড়ল।
রূদ্ধশ্বাসে শুনছিল ইদ্রিশ -
- তারপর !
- তারপর আর কি ! ইন্দ্রাবতীকে রক্ষা করার আর কেউ রইল না। একজন মেয়েটাকে বেল্ট দিয়ে মারতে মারতে গঙ্গার পাড়ের দিকে টানতে টানতে নিয়ে নৌকায় ওঠাল আর একজন তাদের মৃত দোসরকে নিয়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে নৌকা ছেড়ে দিল।
- আপনি এতো কথা কোথা থেকে জানলেন ? এতো অনেককাল আগের ঘটনা।
- এখানকার সবাই একথা জানে বাবা।
- তাহলে আমি যাদের দেখলাম !
- সবার ধারণা ইন্দুলেখার আত্মা আজো ঐ বাড়িতেই রয়ে গেছে। মেয়েকে হারিয়ে, স্বামীকে হারিয়ে ওর অতৃপ্ত আত্মা আজও কাঁদে আর অপেক্ষা করে হয়তো কোনো জন্মে ওদের সাথে আবার দেখা হয়ে যদি যায় এই আশায়।
ভারাক্রান্ত মন নিয়ে ইদ্রিশ উঠে দাঁড়াল। এবার তাকে বাড়ি ফিরতে হবে। কিন্তু অদ্ভুত একটা যন্ত্রণায় ওর বুকটা মুচড়ে উঠতে লাগল। বার বার মনে হতে লাগল ইন্দুলেখা তাকে ডাকছে -- " দোহাই তোমার আমার মেয়েকে বাঁচাও । ওরা যে আমার মেয়েটার জীবন নষ্ট করে দেবে। আমার মেয়েকে রক্ষা কর।"

0 মন্তব্যসমূহ