সুকুমার রুজ (SUKUMAR RUJ) কবি ও সাহিত্যিক




পোস্ট বার দেখা হয়েছে

সুকুমার রুজ (SUKUMAR RUJ)

কবি ও সাহিত্যিক


৫৯ বছর বয়সী এই সাহিত্যিকের পড়াশোনা পদার্থ বিজ্ঞান নিয়ে। পেশায় রাজ্য সরকারী আধিকারিক। ৩৩ বছর ধরে সাহিত্য রচনা করছেন। দেশ, আনন্দবাজার প্রতিদিন, বর্তমান ইত্যাদি বানিজ্যিক পত্রিকা এবং পরিচয়, অনুষ্টুপ, কথাসাহিত্য, ' ENGLISH LITERATURE' ইত্যাদি বিভিন্ন আবানিজ্যিক পত্রিকাতে বড়দের ও ছোটদের উপযোগী কবিতা, গল্প, ইংরেজি গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ লিখে চলেছেন। বর্তমানে কলকাতায় বসবাস করেন।

কাব্যগ্রন্থ গল্পগ্রন্থ, উপন্যাস, প্রবন্ধগ্রন্থ, নাটকের বই মিলিয়ে এ যাবৎ ৩০-টি গ্রন্থ প্রকাশিত। সেগুলির মধ্যে ' আনন্দ পাবলিশার্স' থেকে প্রকাশিত গল্পগ্রন্থ ' দোয়েলের শিস', উপন্যাস ' বিষাদমেঘ', ' সৃষ্টিসুখ' থেকে ' পঞ্চাশটি গল্প', ' পারুল প্রকাশনী' থেকে ' উত্তরকথা', ' সপ্তর্ষি থেকে' কর্কটক্রান্তি ', ' অমৃতধারা', ' পুনশ্চ' থেকে ' মানুষ মানুষ রোবট', ' subham books' থেকে নভেল ' machine dot com' ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য।

 সম্প্রতি মেসিন এজ ডট কম উপন্যাসের অসমীয়া অনুবাদ ' মেচিন এজ ' ডট কম ' এর জন্য অসম থেকে' রবীন্দ্রনাথ টেগোর অ্যাওয়ার্ড ' পেয়েছেন।

তাঁর দু'টি গল্প নিয়ে দু'খানি চলচিত্র' স্টেথোস্কোপ এবং ' শিলালিপি ' নির্মিত হয়েছে। তাঁর লেখা বেশ কিছু নাটক আকাশবাণীতে সম্প্রচারিত হয়েছে এবং মঞ্চায়িত হয়েছে।

ভারত ও বাংলাদেশের বিভিন্ন সংস্থা থেকে শতাধিক পুরস্কার ও সম্মাননা পেয়েছেন। সেগুলির মধ্যে' সাহিত্যবাণী পুরস্কার ', শৈবভারতী কথা সাহিত্য পুরস্কার' ' ড্রিম অ্যাওয়ার্ড',  ' চোখ সাহিত্য পুরস্কার', ' হিউম্যান রাইটস শান্তি পুরস্কার ',' সৈয়দ আহসান আলী স্মৃতি পুরস্কার '' দেশ ' পত্রিকা প্রদত্ত' প্রশংসিত গল্পকার সম্মাননা ', AMERICAN BIOGRAPHYCAL INSTITUTE' থেকে ' HONORARY MEMBER OF THE BOARD OF ADVISORS' উল্লেখযোগ্য।

আকাশবাণী কলকাতা, ও কলকাতা দূরদর্শন-এর বিভিন্ন সাহিত্য বিষয়ক অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেছেন। দীর্ঘ ২০ বছর ধরে ' আলো সাহিত্য পত্রিকা সম্পাদনা করে চলেছেন।

।। প্রকাশিত বই সমূহ ।।



।। কবিতা গুচ্ছ ।।


চলকে ওঠা  

ওই যে কারা রঙ ছুঁড়েছে নীল আকাশে
রঙবাহারি নৌকো হয়ে হাওয়ায় ভাসে...
রঙ কি ওরা ফিরিয়ে নেবে দিনের শেষে? 
ভিনদেশী মেঘ রঙ হারিয়ে ফিরবে দেশে! 
হয় নাকি তা! দিয়ে আবার ফিরে চাওয়া! 
উৎসর্গের মাঝেই আছে পরম পাওয়া। 
 
বৃষ্টি যদি ভেজায় তোমার চোখের পাতা, 
চাইবে কি দাম! বলবে কি সে নোয়াও মাথা! 
সুখী সে যে ভিজিয়ে তোমার ভেতর বাহির,  
মোটেও সে করবে না তো মিথ্যে জাহির। 

নদী যেমন নিঃস্ব হয়ে সাগরকে দেয় 
জোছনাকে চাঁদ কি আবার ফিরিয়ে নেয়!  
সন্ধেপ্রদীপ আলোক দিয়ে অহংকারী...  
তুলসীতলা ঋণ মেটাবে, ভাবতে পারি! 
তেমনি ভাবে দম্ভ বিলোও উদারতায় 
চলকাবে সুখ হৃদয়ঘরের প্রশস্ততায়।  


মায়াজাল
দ্রোণ আচার্য 

প্রত্যেকের আছে নিজস্ব এক খ্যাপলা জাল... 
অন্তহীন মনসাগরে সে জাল ফেলে তুলে নেয় 
পছন্দমতো স্ফটিককথা, জলপুষ্ট শিকড়, খইফোটা সংলাপ...
তা থেকে ফিসফিসে কথার ওমে জন্ম নেয় 
আদর-যত্ন, প্রেম-ভালবাসা, সমীহ-শ্রদ্ধা। 
 
একসময় রামধনু কৈশোর কামগন্ধি যৌবন আর 
তুলতুলে আসক্তির বার্ধক্যে সেসব একমেটে ইতিহাস।   
অন্যের জালে নিজেকে বন্দী করতে কে আর চায়...  
তবুও অপেক্ষাকাতর কথার উদ্ভাসে 
কারও অভিলাষী মুকুল ফুল হয়ে ফোটে।
  
সোহাগী রোদ্দুর, তার উপরে আলোর সিন্দুক খোলে...  
তখন দুধবেলার মিঠেল গন্ধে মন হয় আনচান 
বহুবর্ণ কোলাহলে মেতে ওঠে লালায়িত ছোঁয়া 
সন্ধানী নিঃশ্বাস ঠিক খুঁজে নেয় নওল কুয়াশা 
সেই জালসন্ধানী সৌকর্যে এ মহাবিশ্ব হয়ে ওঠে বাঙময় 
এভাবেই জাল থেকে জালে অবিরত ঘুরে চলে অলাতচক্র...


খনন


আলতামিরার গুহাগাত্র থেকে নেওয়া শস্যবীজে
ইঙ্কা সভ্যতার পাতিত জলসিঞ্চন দেখে 
হেরোদোতাস প্রাণ খুলে হেসেছিল নিজে,
আর কাঁদিয়েছিল থুকিদিতিসের বংশধরকে...

তবুও আলেকজান্ডার পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ বীর হতে চেয়ে 
হেঁটেছিল আজীবন, অর্ধেক পৃথিবী তার
করেছিল অধীনতা স্বীকার...
মেসোপটেমিয়া স্বাধীন হবে বলে
জনগণের বুকের খাঁচা থেকে সাড়ে তিন খানা হাড় খুলে নিয়ে, 
কলিজা বের করে  সেরেছিল আহার

তাতে নেহরু নাইডু রাঘবন কিংবা চাটুজ্যে বাড়ুজ্যেদের 
একটা লোমও যায়নি ছেঁড়া।
তাদের শুধুই নিয়ন আলোয় ঘোরাফেরা।
তারা বংশপরম্পরায় ফলিয়েছে হিরের ফসল… 

আর চার অক্ষরের জনগণ 
চোখে ঠুলি পরে করে যায় চাষ... 
এভাবেই নোস্ত্রাদামুস কিংবা চাণক্য প্রাসঙ্গিক,
পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠিত থিওরি অব ম্যালথাস। 


মাটির পদ্য


সময়ের তাপে মাটি ফেটে ওঠে, মরে যে স্বরাজ-পোকা,  
রাজনৈতিক রোদ্দুরে পোড়ে জনগণ মহাবোকা।
অন্ধ না তবু চক্ষু বন্ধ, কানে তুলো গুঁজে চলা,
রাত্রি-বাতাসে বারুদ-গন্ধ, যাবে না সে কথা বলা। 
শতাব্দী-শেষে শূন্য কলসে বৃথা জলপান চেষ্টা, 
এভাবেই নাকি বিশ্বের সেরা হয়ে যাবে এই দেশটা! 

প্রলেতারিয়েত, প্রযুক্তিবাদী, সাম্যবাদী বা বুর্জোয়া, 
এইসব শুনে কান পচে যায় মেরুদণ্ডটা যায় খোয়া। 
সংসার ভাঙে, পরিবার ভাঙে, কোষাগার ভেঙে নিঃশেষ,
বোধ ফুটিফাটা নেতার পা-চাঁটা মানুষ ভাঙবে শেষমেষ। 

মাটিও এখন সত্যি বোঝে না শস্যকণার ভাষা,  
ফুল-ফল-বীজ দূর-অস্ত, জমি শুধু আগাছায় ঠাসা। 
প্রতিবাদ-টাদ বাদ দাও ভাই, শিয়রে দাঁড়িয়ে জল্লাদ, 
শাখামৃগ হয়ে, জয়গান গেয়ে, পচা ফল খেয়ে আহ্লাদ! 

তবুও মাটিই শেষ কথা বলে, উর্বর হয় যদি 
বিপ্লব-বীজ রোপণে ফলবে প্রকৃত স্বরাজ-বোধি। 


স্মৃতির হ্যান্ডনোট


তোমার হৃদয়ের ওয়ালেট থেকে চুরি করা  
আবেগ খুচরো করে নিই... 
আমার মানি-পার্সে ছোটবড় নানা অনুভূতি।  

উদ্বেগ দিয়ে অনায়াসে কিনি টকঝাল নয়নসুখ,   
হাতে-গরম স্পর্শসুখ পেতে বিহ্বলতা দিই,  
স্বর্গীয় সুখ পেতে বের করি কড়কড়ে উচ্ছ্বলতা।  

তাই সবসময় থাকি উন্মুখ, 
কখন তোমার ওয়ালেটখানা 
রেখে যাবে আমার মুগ্ধতার ছায়ায়!

একদিন মুগ্ধতা নিঃশেষ... 
তোমার হৃদয় আমার নাগালের বাইরে,
তখন আমার হৃদয়-বাক্সে জমিয়ে রাখা 
রাশি রাশি স্মৃতির হ্যান্ডনোট ভাঙাই, 
প্রাপ্তি কোকিলের বিরহ,
প্যাঁচার বিষাদ আর ঘুঘুর নিঃসঙ্গতা।

সে বিরহ বিনিময়ে অবসাদ, বিষাদ দিয়ে হতাশা, 
মানিব্যাগ খালি করে নিঃসঙ্গতা ঢেলে দিতেই  
শরীর-মনে অসীম শূন্যতা...  


সুতো

স্টেথোস্কোপের নল বরাবর এগিয়ে যাও 
চোখ বানভাসি হলে দেখতে পাবে তোমার বাসস্থান
অন্যমনস্ক হওয়ার জন্য আশপাশে তাকালেই
দেখতে পাবে আঙুলে সূঁচ ফোটানোর রক্তের দাগ

বিধাতা ভালো সেলাই করতে পারেন...
দেখবে, কী সুন্দর ভাবে সম্পর্কটাকে জুড়ে দিয়েছেন
সুতো খুঁজতে যেও না
এ সুতোয় শুধুমাত্র সম্পর্ক জোড়া যায়
একে বলে মায়ের সুতো।  


নির্বাণ  


নির্বাণ-মোহে ছুটে যাই শুধু হাট থেকে মাঠে-ঘাটে, 
অজস্র আশা ব্যথা হয়ে বাজে হৃদয়ের গোবরাটে।
অলীক স্বপন লাবণ্যহীন মনের ড্রইংরুমে, 
মালকোশ বাজে চেতনার তারে, বিবেক তখনও ঘুমে।
বালি-শয্যায় নদী শুয়ে বলে, নির্বাণ চাই আমি 
সাগরের মনে উষ্মা ছড়ায় — জল করে পাগলামি!  
অশ্বমেধের ঘোড়ার লাগামে হাত রাখা বুঝি দায়!  
হরিণের কাছে সঙ্গম শিখি, ধ্রুবতারা থমকায়। 
সারাটা জীবন শিকল-যাপন দহন বলয়ে ঘেরা, 
সম্পর্কের হাত ধরে সেই মৃত্যুবাগানে ফেরা।

তবুও হৃদয় নির্বাণ খোঁজে, রিপু ডুকরিয়ে মরে, 
বিবর্ণ কিছু দুঃখের ফুল ফুটে থাকে চরাচরে। 
সকলেই বুঝি সেই ফুল তুলে সুবাস খুঁজতে চায়! 
তাঁর পদতলে মাথা রেখে দিয়ে স্বর্গীয় সুখ পায়। 

প্রজ্ঞাপথ


খুশি হওয়ার নির্দিষ্ট কোন সমীকরণ নেই, 
নেই দুঃখ পাওয়ার নির্ধারিত ছক... 
তবুও জীবন-ব্ল্যাকবোর্ডে আঁকিবুকিতেই   
কিছুটা সময় কাটে হাতে নিয়ে ডাস্টার-চক।  

জানা নেই কোন রাস্তা ধরে হাঁটে অপচয় 
কোন পথে সঞ্চয় ক্রমে ক্রমে 'তিল থেকে তাল' 
তবুও হিসেব কষা — 'কত ধানে কত চাল হয়'  
জমা খরচের হিসেব কষে হই বেসামাল। 

স্বর্গীয় আলোর সন্ধানে হেঁটে যাই,  
বেদনা-সাগরে খুঁজি আনন্দের দ্বীপ
ঠিকঠাক আনন্দ চিনি না, এ আশঙ্কায় 
প্রজ্ঞাপথে ফেরার সময় দেখি, দুখের অন্তরীপ। 

তবুও জীবনবোধে মন থেকে মনে বিশ্বাস গড়ায়, 
হয়তো কোনদিন পৌঁছব সেই আলোকের দেশে...  
দ্বিধার আকাশে দ্বন্দ্বের চাঁদ ম্লান জোছনা ছড়ায় 
জীবন ফেরে জীবনের কাছে জীবনকে ভালোবেসে।   


উলুখাগড়া

ঘাতক রাত্রি নিশ্চয় জানে তরোয়ালখানা আছে কোথায়!  
মৃত্যুরও হয় কোর্ট-মার্শাল ধর্মভেদের নানা প্রথায়।

ধর্মগুরুই বোদ্ধা যখন, মেধা-কারবারি মূল্যহীন। 
লোভের চক্ষু লাল থেকে নীল, ভোগ-আসমানে মেধা বিলীন'।  

অভ্যাসবশে ফনা তোলে বোধ, ভেট-মাদুলিতে মাথা নামায়... 
মিথ্যার ভিতে সততা-সৌধ, তা নিয়ে কেই বা মাথা ঘামায়! 

অনুগামী শুধু অন্ধই নয়, বধির অথবা বাক্যহীন, 
স্বৈরতন্ত্র বীজ থেকে গাছ, গিরগিটি শুধু হয় রঙিন।
 
বোধের ঘরেই বোধ সিঁদ কাটে, অবশেষে আসে মৃত্যুভয়, 
ধর্মগুরুই লাগায় যুদ্ধ উলুখাগড়ারই মৃত্যু হয়।  


----------------------

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ