পোস্ট বার দেখা হয়েছে
গভীর অসুখ
মুকুল
.
আমাদের মতো Hypocrite -রা এর দায় কী কোনোভাবেই এড়াতে পারব ?
.
খুব উদারমনস্ক ও মুক্তচিন্তার অধিকারী ছাড়া সমকামিতাকে আমরা আজও কেউই খুব একটা ভালো চোখে দেখি না । এটা চরম বাস্তব । অথচ, এটা বাস্তবে কোনো অন্যায় বা অপরাধই নয়, যদি দু'জন প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তির পারস্পরিক সম্মতিতে এটা হয়ে থাকে । এটা তখনই অন্যায় এবং অপরাধ, যখন একজন সম্পূর্ণ অনিচ্ছুক অপর একজনের ওপর জোর করে অন্যায় ভাবে এই জিনিসটা চেষ্টা করতে যায় । Ragging-এর ক্ষেত্রে ঠিক এই জিনিসটাই সবচাইতে বেশি করে ঘটে । একজন নবাগতকে ভয় দেখিয়ে বা জোর করে উলঙ্গ করা, যৌনাঙ্গ দেখাতে বা প্রকাশ্যে এই সংক্রান্ত আনুসঙ্গিক আরও নানান ধরণের স্বাভাবিক ও অস্বাভাবিক উৎকট রকমের যৌন আচরণ করতে বাধ্য করা, এমনকি ক্ষেত্রবিশেষে যৌনসঙ্গমে (পায়ুসঙ্গমে) লিপ্ত হতে বাধ্য করাও Ragging-এর অঙ্গ । যারা এটা করে, কিংবা যাদের এটা করতে বাধ্য করা হয়, তারা কেউই যে সমকামী, তা নয় । তবুও এটা ইঞ্জিনিয়ারিং, ম্যানেজমেন্ট সহ অনেক কলেজের হোস্টেলগুলিতে হয়ে থাকে । এগুলি আমরা কমবেশি সকলে জানিই, কারণ, আমাদেরই পরিবারের কিংবা আমাদেরই আশেপাশের বহু হোস্টেলে থেকে পড়াশোনা করা পড়ুয়া আমাদের কাছে, বিশেষতঃ ঘনিষ্ঠ মহলে এ'সব অভিজ্ঞতা শেয়ার করে থাকে । আমরা সমকামিতাকে অপছন্দ করলেও এগুলোকে দিব্যি মেনে নিই । Ragging-এর নামে এগুলো খুব স্বাভাবিক বলেই মনে হয় । বরং অনেকেই গর্ব করে থাকি এভাবেই আমাদের বাড়ির ছেলে স্মার্ট হচ্ছে, সিনিয়ারদের সঙ্গে গভীর বন্ধুত্বের সম্পর্ক তৈরি হচ্ছে, এ'সবের মাধ্যমে নাকি এমন বন্ধুত্বের সম্পর্ক তৈরি হয়, যা নাকি অন্য কোনোভাবে সম্ভব নয়, ইত্যাদি ইত্যাদি । যারা এ'সবের শিকার, একই মত তাদেরও । বরং যারা এগুলো সহ্য করতে না পেরে হোস্টেল থেকে চলে আসতে বাধ্য হয়, দোষটা আমরাই দিয়ে থাকি তাদেরকেই । সবক্ষেত্রে না হলেও তার নিজের পরিবারের লোকজন, আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধবের কাছ থেকে রীতিমতো দোষারোপের শিকার, Bullying-এর শিকার তাকেই হতে হয় বেশি করে । এবার বলুন, দোষটা কাকে দেবেন ?
.
আমরা সবাই ছোটবেলা থেকে গুরুজনদের, বিশেষতঃ বাবা-মাকে শ্রদ্ধা করতে শিখি, শেখাই । স্কুলপড়ুয়া কোনো ছেলেকে তার বাবা-মা'কে নিয়ে কোনো অসম্মানজনক মন্তব্য করে দেখুন, মুহুর্তেই তার প্রতিক্রিয়া দেখতে পাবেন । কিন্তু হোস্টেলগুলিতে Ragging-এর নামে বাবা-মা সম্পর্কে চরম অশ্লীল, অনৈতিক ও অত্যন্ত ঘৃণ্যস্তরের আলোচনা করতে বাধ্য করা হয়ে থাকে পরম্পরাগতভাবেই । সেখানে এটা খুবই স্বাভাবিক । তখন কোথায় যায় আমাদের আজন্মলালিত শিক্ষা ? আজন্মলালিত মূল্যবোধ ? এ বিবরণও আমাদের একেবারে অজানা নয় । আমরা আমাদেরই পরিবারের কিংবা খুব কাছের কোনো হোস্টেলে থেকে পড়াশোনা করা ছেলেদের কাছে এ'সব কমবেশি শুনে থাকব । তবুও আমরাই তো তাকে জীবনের ইঁদুরদৌড়ে সফল (?) হবার স্বার্থে, কঠিন পরিস্থিতিতে মানিয়ে চলার (?) স্বার্থে, বন্ধুত্বের (?) স্বার্থে এগুলিকে মানিয়ে নিয়ে চলতে শেখাই । এ'সব জেনেও গর্ব করি আমাদের ছেলে প্রতিষ্ঠিত হতে চলেছে !
.
আমরা ছোটবেলা থেকেই সন্তানকে শেখাই নেশা করা খুবই খারাপ । আমাদের পরিবারের কোনো স্কুল পড়ুয়া যদি অসৎ সংসর্গে পড়ে কৌতুহলবশতঃ সামান্য বিড়ি-সিগারেট টেনে থাকে আমরা তাকে শাসনের নামে উত্তম-মধ্যম দিই । কিন্তু হোস্টেলগুলিতে Ragging-এর নামে শুধু বিড়ি-সিগারেট দূর অস্ত, মদ-গাঁজা থেকে শুরু করে কাশির ওষুধ, ড্রেনড্রাইট-ফেবিকল বা আরও অদ্ভুত সব জিনিস থেকে নেশা করতে বাধ্য করা হয় । এমনকি কোথাও কোথাও হেরোইন, চরসের মতো ড্রাগ নিতে বাধ্য করার কথাও শোনা যায় Ragging-এর নামে । এসব কোনোটাই আমার-আপনার অজানা নয় । কিছু ব্যতিক্রম বাদ দিলে এসব জেনেবুঝেও আমরা আমাদের ছেলেকে ওইসব জায়গা থেকে ছাড়িয়ে আনি কী ? উত্তর হল - না ।
.
এরপরেও আছে চেহারার অসঙ্গতি, Smartness -এর অভাব, রুচিবোধের ভিন্নতার কারণে মানসিক-শারীরিক নির্যাতন । সেগুলিও মেনে নিই অম্লান বদনে । উদাহরণ আরও অজস্র রকমের আছে । আমরা আসলে খুব বড় Hypocrite । প্রশ্ন একটাই, আমাদের সন্তানদের আদৌ কি আমরা মানুষ করতে চাই ? নাকি শুধুই কোনো মোটা টাকা রোজকারের মেশিন ? যার পোশাকি নাম সফলতা (?) । আসলে সমাজের এই পচন অনেক গভীরে । আমি-আপনি, ছাত্রসমাজ, শিক্ষকসমাজ, কলেজ কর্তৃপক্ষ, হোস্টেল কর্তৃপক্ষ, কেউই এই পচনের বাইরে নেই । তাই Ragging মতো ক্যান্সারতুল্য সামাজিক ব্যাধি দীর্ঘদিনধরে পরম্পরাগতভাবে সমাজে এমনভাবে শিকড় চালিয়েছে যে কার্যতঃ এর সম্পূর্ণ উচ্ছেদ প্রায় দুরূহ । Ragging-এর করাল গ্ৰাসে লোকচক্ষুর অন্তরালে ঝরে যাওয়া অসংখ্য প্রাণের মধ্যে একজন স্বপ্নদীপের ঝরে যাওয়ার ঘটনাটা দেশের অন্যতম সেরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে (পুঁথিগত শিক্ষার ক্ষেত্রেই সেরা, মানুষ গড়ে তুলবার ক্ষেত্রে কখনই নয়) হওয়ার কারনে এটা নিয়ে বেশ তোলপাড় হচ্ছে । হয়তো দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তিও হতে পারে (যদিও এ'বিষয়েও যথেষ্ট সন্দেহ আছে) । কিছুদিন পরে আবার যেই কে সেই । সে সম্ভাবনাও আমাদের এই আপাদমস্তক পচন ধরা মূল্যবোধহীন সমাজে যথেষ্ট রয়েছে । তবে যদি এই ঘটনার অভিঘাতে সত্যিই যদি Ragging-এর মতো অভিশাপ থেকে দেশের উচ্চশিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তথা হোস্টেলগুলি মুক্ত হতে পারে, তবে তা হবে এই শতাব্দীর সেরা প্রাপ্তি ।
.
(স্বরচিত)

0 মন্তব্যসমূহ