দর্পণ পত্রিকা || স্বাধীনতা দিবসের গল্প




পোস্ট বার দেখা হয়েছে

স্বাধীনতার গলদ

সুচন্দ্রা বসু 


অনেক দিন বৌদির কোন খবর পাই না।সেদিন 

একটু অবসর পাওয়ায় বৌদিকে ফোন  করলাম।

কিছুক্ষণ পরে বৌদি ফোন তুলে বলল,কেমন 

আছো তোমারা ঠাকুরঝি?

আমরা তো ভালো আছি। তোমারা কেমন আছো বল।

আমরা ভালো নেই খুব একটা। 

কেন?

বিক্রম সব সময় মনমরা হয়ে থাকে।

কেন কি হল আবার তার?

কি আর হবে। যোগ্যতা অনুযায়ী কাজ কর্ম পাচ্ছে না।তাই মনমরা হয়ে থাকে।

বিক্রমকে হতাশ হতে বারণ কোরো,হতাশা মানুষকে অবনতির দিকে ঠেলে দেয়। 

বৌদি বলল হতাশ হবে না কি করবে বল।দেশে প্রায় দেড়শো কোটি  লোক।  ম্যান পাওয়ার (মানবিক শ্রমশক্তি) সে ভাবে ব্যবহার হয় না। বেশিরভাগটাই অপচয় হয় বেকারত্বের কারণে।  চাকরির তেমন সুযোগ সুবিধা নেই দেশে।তাই  স্কিলড লেবার প্রশিক্ষিত শ্রমিকরা  দেশ-বিদেশে পাড়ি দেয় কাজের সন্ধানে। আমরা স্বাধীন তবু আজও দেশ জুড়ে  কত বেকার। বৌদি ফোনে আমাকে এ'সব কথা বলল। 

আমি শুনে বললাম ঠিকই,বলেছ বৌদি। তবে শুনতে পাই আজকাল কিছু কিছু বেকারের নাকি চাকরি হচ্ছে।

বৌদি আমার কথা শুনে বলল দেখ ধরা করার লোক আছে তাদের।মামা কাকা পিসেমশায় দাদা এইসব আরকি! অথবা কেউ কেউ টাকার বিনিময়ে চাকরি পাচ্ছে শুনেছি। তাও ১০ / ১৫ লাখের কম নয়।আমরা এতো টাকা কোথায় পাব বল।


বৌদির ছেলে অ্যাকাউটেন্সি অর্নাস গ্র‍্যাজুয়েট।

কিন্তু থাকে গ্রামে। পৈতৃক কিছু জমি জায়গা আছে।

চাষবাস করেই দাদা সংসার করে এসেছে এতোদিন।খরা অতিবৃষ্টির কারণে যে ক্ষতি হয় তা ধার দেনা করে মেটাতে হয় দাদাকে। তাতে লাভের মুখ  দেখা যায় না। 

তবে বছরে ধারদেনা হয়ে যাওয়ায়

অনেক ভালো জমি বিক্রী করে দিতে বাধ্য হয়েছে দাদা।

ফলে চাষের জমি কমে গেছে। তাই

ছেলে বিক্রমের একটা চাকরি হলে ভালো  হত।


বিক্রম চাকরি পায়  ঠিকই কিন্তু 

ওর যোগ্যতা অনুযায়ী  পায়না বলে সে চাকরি করে না ।  যা টাকা দেয় তা খুবই 

সামান্য। তাতে লাভ কিছু হয়না। সংসার তাতে চলে  না।এদিকে ছেলের বিয়ের বয়স হয়ে যাচ্ছে।  বেকার ছেলেকে কে মেয়ে দেবে বল।



আমি বৌদিকে বললাম যেসব জমিতে চাষ হয় না সে রকম একটা জমিতে  মুরগীর পল্ট্রি ফার্ম খুলতে পারে তো।গ্র‍্যাজুয়েট তো কি হয়েছে সেটাকে জীবিকা হিসাবে  নিতে পারে তো। সরকারী চাকরি যে পাবে  তার কি ঠিক  আছে?


বৌদি বলল সবই ভাগ্য। আমাদের বাড়ি যে গ্রামের ভিতরদিকে। সেখানে সারিবদ্ধ চাষের 

জমি আর পুকুর। 


আমি বললাম দেখ নিজের বুদ্ধিকে কাজে লাগিয়ে এগোতে হবে।বেকার বেকার বলে চিৎকার করলে কেউ তো আর এসে হাতের মুঠোয় কাজ গুঁজে  দেবে না।খেটে খাওয়ার জন্য দুটো হাত আছে মাথায় বুদ্ধি আছে,শরীরে শক্তি আছে  সেগুলোকে সঠিকভাবে কাজে লাগালে কারোও বেকার থাকার কথা নয়। 

দেখি বিক্রমের সাথে কথা বলে। একটা মুরগির ফার্ম খোলা যায় কিনা।

আমি বললাম কাজটাকে ছোট  না ভেবে ভালোবেসে মন দিয়ে করলেই সফলতা আসবে নিশ্চয়ই ।

অনেকেই তো গরু ছাগল হাঁস মুরগী পুষে

রোজগার করে সংসার চালাচ্ছে।তবে বিক্রম পারবে না কেন?ও শিক্ষিত ছেলে।

বৌদি বলল এই শিক্ষিত হওয়াতেই তো গোলমাল হয়েছে।বিক্রম বলে আমি কি এগুলো করার জন্য পড়াশোনা শিখেছি?

আমি বললাম হ্যাঁ আজকাল শিক্ষিত ছেলেরা এইসব কাজ করতে লজ্জা পায় । কারণ শিক্ষার গর্বে কাজটাকে তারা ছোট করে দেখে।আসলে কোন কাজই ছোট নয়।এইবোধ-বুদ্ধি অনেকেরই থাকে না। এইটা তুমি বিক্রমকে বোঝাতে

পারলে দেখবে সে আর বেকার থাকবে না।মনের অনেক জ্বালা যন্ত্রণা কমে যাবে তার।


বৌদিকে বললাম কাল ইস্কুল  যাওয়ার পথে রেডিওতে দেশাত্ববোধক গান বাজিয়ে খালি রিকশা আসছিল। আমি হেঁটেই যাচ্ছিলাম।  রাস্তায় খুব একটা ভীড় ছিল না। স্বাধীনতা দিবসে  ছুটির মেজাজে অনেকেই পথে।  হঠাৎ আমার সামনে একটা বাচ্চা এসে শাড়ির আঁচলটা টেনে   বললো  কিছু পয়সা দাও।,ছেলেটার বয়স নয় কি

দশ হবে| এভাবেই ওঁরা আঁচল টেনে ভিক্ষে করে দিনযাপন করে। 


আজ  ব্যতিক্রম  , আজ ওর হাতে রয়েছে কিছু পতাকা ,ছেলেটি বলল মাসী  আজ ভিক্ষে চাইছি না , আজ আমি পতাকা বিক্রী করে  দুটো টাকা চাইছি।

ভাবতে পারছো তুমি রোজগার করার জন্য সে স্বাধীনতা বিক্রী করছে।

 এটাই তার স্বাধীন হওয়ার আনন্দ |   ওর থেকে দুটো পতাকা কিনতেই ওর মুখে একরাশ হাসি ছড়িয়ে পড়ল।দেখে আমার খুব আনন্দ হল।


পরক্ষণেই ভাবছিলাম  পতাকা তো শুধু একদিন বিক্রি হবে ,পরদিন কে পতাকা কিনবে ?  ছেলেটাকে আবার  ভিক্ষে করতে হবে ? এই স্বাধীনতা কি একদিনের ? 


বৌদি বলল দেখেছো আমরা স্বাধীনতাদিবসে স্বাধীনতার গৌরব নিয়ে দিন কাটাই।  কেন প্রত্যেক দিন স্বাধীনতার কথা মনে হয় না আমাদের ?ওই বাচ্চাটাও স্বাধীন হয়ে বাঁচতে পারতো ? ও কি স্কুল যেতে পারতো না? 


বললাম তবে তো সে এই পৃথিবীতে সুন্দরভাবে বাঁচতে পারত। প্রশ্ন জাগছে মনে সত্যিই কি আমরা স্বাধীনতা পেয়েছি? তুমি বল, সত্যিই কি আমরা স্বাধীন? 

বৌদি বলল ছেলেটা অবাক করেছে আমায়।, হয়তো তুমি আমি আর সবাই  এক দিনের স্বাধীনতা পালনে মত্ত |

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ