পোস্ট বার দেখা হয়েছে
চন্দ্রযান-৩ এর বিজয় অভিযান এবং প্রাসঙ্গিক আলোচনা
রূপম চক্রবর্ত্তী
প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট
রাশিয়ার প্রেরিত মহাকাশযান লুনা-২৫ চাঁদের মাটিতে ভেঙে পড়ার পর ভারতের প্রেরিত চন্দ্রযান-৩ নিয়ে অনেকর সন্দেহ ছিল। যাই হোক সেই সন্দেহের অবসান ঘটিয়েছে চন্দ্রযান-৩। কোভিড-১৯ মহামারীর কারণে শুধু ভারত নয় বরং পুরো বিশ্ব যখন অচল তখনও ইসরোর কিছু দেশপ্রেমিক মানুষ দিনরাত করে গেছেন চাঁদের কাছে যাওয়ার জন্য। চাঁদের দক্ষিণ মেরু নিয়ে বিজ্ঞানীদের রহস্য দীর্ঘদিনের। এর আগে সোভিয়েত ইউনিয়ন, যুক্তরাষ্ট্র ও চীন চাঁদে নভোযান পাঠাতে সক্ষম হলেও এই অংশে কেউই পোঁছাতে পারেনি। বিশ্বের প্রথম দেশ হিসেবে চাঁদের দক্ষিণ মেরুতে সফলভাবে কোনো মহাকাশযানের সফট ল্যান্ডিং করাতে সক্ষম হয়েছে ভারত। স্থানীয় সময় বুধবার সন্ধ্যা ৬টা ৪ মিনিটে চাঁদের মাটি স্পর্শ করে চন্দ্রযান-৩ এর ল্যান্ডার বিক্রম। ভারতের চন্দ্রযান-৩ এর সাফল্য নি:সন্দেহে অজানাকে জানতে সাহায্য করবে। লেখাটা যখন লিখতে বসেছি তখন ভারতে আতশবাজি পুড়িয়ে চন্দ্র বিজয়ের সাফল্য উদ্যাপনে মেতেছেন সাধারণ মানুষ। আবেগে ভেসেছেন ইসরোর বিজ্ঞানীরা। তৃতীয় বিশ্বের দেশের চোখ টাটিয়ে দেওয়া সাফল্যে শুভেচ্ছাবার্তা ভেসে আসছে প্রথম বিশ্বের দেশগুলি থেকেও। চাঁদের মাটিতে নভোযান অবতরণ করিয়ে ইতিহাস গড়ল ভারত। যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, চীনের পর চতুর্থ দেশ হিসেবে চাঁদে অবতরণের বিরল গৌরবের তালিকায় নাম লেখানোর জন্য দক্ষিণ এশিয়ার দেশ হিসেবে ভারতকে অভিনন্দন জানাচ্ছি। এই চন্দ্র বিজয়ে ভারতের আরেকটি ইতিহাস রচিত হয়েছে। চাঁদের দক্ষিণ মেরু এখনও সবার কাছেই অজানা। পৃথিবীর আর কোনও দেশ সেখানে পৌঁছতে পারেনি। সেখানেই পৌঁছে নতুন কীর্তি গড়ল ভারত। তৈরি হল ইতিহাস কেননা চাঁদের দক্ষিণ মেরুতে অবতরণ করা বিশ্বের প্রথম দেশ হয়ে উঠেছে ভারত। নির্ধারিত সময়ের আগেই চাঁদের দক্ষিণ মেরু স্পর্শ করে ফেলল ভারতের চন্দ্রযান-৩।
ইসরো টুইট করে দেশবাসীকে জানিয়েছে, চন্দ্রযান-৩ মিশন তার গন্তব্যে পৌঁছেছে। সফল হয়েছে চন্দ্রযান-৩। চাঁদে সফল অবতরণের জন্য সমগ্র দেশবাসীকে অভিনন্দন। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী বললেন, "এরকম ইতিহাস তৈরি দেখতে পারলে জীবন ধন্য হয়ে যায়। এরকম ঐতিহাসিক ঘটনা দেশের চিরদিনের চেতনা হয়ে থেকে যায়। এই মুহূর্ত অবিস্মরণীয়, অভূতপূর্ব।" তিনি আরো বলেন, “চন্দ্রযানের এই সাফল্য শুধু ভারতের নয়। গোটা বিশ্বের মানুষ এই সাফল্যের শরিক। বিশ্বের প্রথম দেশ হিসাবে চাঁদের দক্ষিণ মেরুতে পৌঁছেছে ভারত।” এরপরেই চাঁদের সঙ্গে মানুষের চিরকালীন সম্পর্কের কথা তুলে ধরেন। বলেন, “আমরা পৃথিবীকে মা বলে ডাকি, আর চাঁদকে মামা বলি। একটা সময় বলা হত, চাঁদ মামা অনেক দূরে থাকেন। কিন্তু কয়েকদিন পরে বাচ্চারা বলবে, মাত্র একটা ট্রিপেই চাঁদ মামার কাছে পৌঁছে যাওয়া যাবে। ভারতে বসে আমরা পরিকল্পনা করেছিলাম, চাঁদে গিয়ে সেটা সফল করলাম।”
সতীশ ধাওয়ান মহাকাশকেন্দ্র থেকে ভারতীয় মহাকাশ গবেষণা সংস্থা (ইসরো) নভোযানটি উৎক্ষেপণ করে প্রায় একই সময়ে চাঁদের দক্ষিণ মেরুতে অবতরণের জন্য লুনা-২৫ নামের মহাকাশযান পাঠিয়েছিল রাশিয়া। তবে রাশিয়ার মহাকাশযানটি গেল শনিবার চাঁদে বিধ্বস্ত হয়।
এরমধ্য দিয়ে ৪৭ বছরের মধ্যে রাশিয়ার প্রথম চন্দ্রাভিযান ব্যর্থ হয়। এই ঘটনার দিন কয়েকের মাথায় চাঁদের দক্ষিণ মেরুতে অবতরণের চেষ্টা করে সফল হলো ভারত।
নাসার প্রধান বিল নেসলন লিখেছেন, চন্দ্রযান-৩ সফলভাবে চাঁদের দক্ষিণ মেরুতে অবতরণ করায় ইসরোকে অভিনন্দন। সেইসঙ্গে চাঁদে অবতরণকারী চতুর্থ দেশ হওয়ার গৌরব অর্জন করায় ভারতকে অভিনন্দন। আমরা এই মিশনে আপনার অংশীদার হতে পেরে আনন্দিত! ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থার (ইএসএ) মহাপরিচালক জোসেফ অ্যাশবাচারও অভিনন্দন জানিয়েছেন। সেইসঙ্গে এই অভিযানের অংশ হতে পেরে তিনি ইসরোকে ধন্যবাদ জানান। তিনি বলেন, অবিশ্বাস্য! নতুন প্রযুক্তি প্রদর্শন এবং মহাকাশে ভারতের প্রথম সফট ল্যান্ডিং করার গৌরব অর্জন করায় ইসরো, চন্দ্রযান-৩ এবং ভারতবাসীকে অভিনন্দন।
১৪ জুলাই ঠিক দুপুর ২টো ৩৫ মিনিট। ইতিহাস গড়ার পথে প্রথম পা বাড়িয়েছিল চন্দ্রযান-৩। শ্রীহরিকোটার সতীশ ধওয়ান স্পেস সেন্টারের লঞ্চিং প্যাড থেকে চাঁদের উদ্দেশে উড়ে গিয়েছিল ভারতীয় মহাকাশ গবেষণা সংস্থা ইসরোর এই মহাকাশযান। দিন রাত এক করে, খাওয়া-নাওয়া-ঘুম ত্যাগ করে একে একে ৪০ দিন কাটিয়েছেন ইসরোর বিজ্ঞানীরা। নজর রাখেছিলেন চন্দ্রযান-৩-এর গতিবিধির উপর। চন্দ্রযান-৩ চাঁদের কক্ষপথে প্রবেশ করে ৫ আগস্ট। তারপর ধীরে ধীরে চাঁদের কক্ষপথে ঘুরতে থাকে চন্দ্রযান ৩। ৬ আগস্ট বাইরের দিক থেকে চাঁদের দ্বিতীয় কক্ষপথে প্রবেশ করে গন্তব্যের ছবি তুলে ফেলেছিল চন্দ্রযান। ১৭ অগস্ট আরও গন্তব্য চাঁদের দিকে আরও এক ধাপ এগোয় চন্দ্রযান-৩। মূল মহাকাশযান থেকে বিচ্ছিন্ন হয় ল্যান্ডার ‘বিক্রম’। সেদিক থেকে দেখতে গেলে চন্দ্রপৃষ্ঠে অবতরণের প্রক্রিয়া শুরু হয়ে যায় ১৭ অগস্টেই। ২৩ আগস্ট রোভার প্রজ্ঞানকে পেটের ভিতরে নিয়ে সেখানেই সফট ল্যান্ডিং শুরু করে সেটি। এদিন সন্ধে ৬টা ৪ মিনিটে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছায় বিক্রম। অর্থাৎ চাঁদের মাটিতে পা দেয় ভারত। বিশ্বের চতুর্থ দেশ হিসাবে চাঁদের মাটি ছোঁয়ার স্বপ্নপূরণ করে ইসরো। অপেক্ষায় ছিলেন আপামর দেশবাসী। ইতিহাস তৈরির মাহেন্দ্রক্ষণের সাক্ষী থাকবেন বলে। অবশেষে অবসান হল সেই অপেক্ষার। ভাসতে ভাসতে ‘চাঁদের বাড়ি’ পৌঁছল ল্যান্ডার বিক্রম।
ইসরোর বিজ্ঞানী তুষার কান্তি দাশ লিখেছেন, ঘড়ির কাঁটায় তখনও ৬টা বাজেনি। আমাদের চন্দ্রযান-৩-এর ল্যান্ডার ক্রমশ নামছে। চাঁদের মাটির সঙ্গে দূরত্ব কমতে কমতে যখন আর দু’কিলোমিটার বাকি, না চাইতেই গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল। চার বছর আগে ঠিক এই পর্যায়ে এসেই তো থমকে গিয়েছিল আমাদের সব স্বপ্ন। ২.২ কিলোমিটার উচ্চতায় পৌঁছনোর পরেই ল্যান্ডার থেকে আর কোনও সিগন্যাল আসছিল না। চেষ্টা করেও লাভ হয়নি। চাঁদের বুকে ধাক্কা খেয়ে ভেঙে গিয়েছিল আমাদের যত্নে লালিত সেই ল্যান্ডার। সেই স্মৃতি যেন আমার অবচেতনে এখনও টাটকা ছিল। এ বার তাই সেই পর্যায়ে কয়েক মুহূর্তের জন্য কেঁপে উঠেছিলাম মনে মনে। কিন্তু সে সব অতীত। আমাদের বিক্রম (ল্যান্ডার) চাঁদে পা রেখেছে। আর দ্বিমত নেই। চাঁদের দক্ষিণ মেরুতে আমরাই ‘ফার্স্ট’।
২৩ আগস্ট বুধবার সন্ধ্যা ৬টা ৪ মিনিটে চাঁদের মাটি ছুঁয়ে জানান দিল ভারতীয় বিজ্ঞানের অগ্রগতির বিশাল অস্তিত্ব। এই অর্জনের পেছনে বিজ্ঞানীদের নিরলস পরিশ্রম ছিল।
চার বছর আগে এই পর্যায়ে এসে ব্যর্থ হয়েছিল "চন্দ্রযান-টু"। ২০১৯ সালে চন্দ্রযান-২-এর ব্যর্থতার পর এক ধাক্কায় চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যায় ইসরোর চাঁদের মাটি ছোঁয়ার স্বপ্ন। কান্নায় ভেঙে পড়েন ইসরোর প্রাক্তন চেয়ারম্যান কে শিবন। কিন্তু দমে যাননি ইসরোর বিজ্ঞানীরা। মন খারাপ সরিয়ে চন্দ্রযান-৩-এর কাজে হাত লাগায় ইসরো। অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে নতুন করে চাঁদের মাটি ছোঁয়ার প্রস্তুতি নিতে শুরু করে। গত চার বছর ধরে অক্লান্ত পরিশ্রম করে চলেছেন ইসরোর একাধিক বিশেষজ্ঞ। প্রায় এক হাজার ইঞ্জিনিয়ার এবং গবেষকরা দিন-রাত কাজ করেছেন যাতে ভারত চাঁদ ছুঁতে পারে। একাধিক মানুষের মেধা, পরিশ্রম মেশানো রয়েছে চন্দ্রযান ৩ মিশনে। ইতিহাস তৈরির লক্ষ্যে নতুন করে পথ চলা শুরু করে ভারতীয় মহাকাশ গবেষণা সংস্থা।
যাদের অবদানের কথা স্মরণ করতে হয় তাদেরকেও স্মরণ করতে হয়। বিডিনিউজের মাধ্যমে জানা গেল গত ১৪ জুলাই এলভিএম-৩ বা বাহুবলী নামের যে রকেটটির মাথায় চেপে চন্দ্রযান-৩ মহাকাশে যাত্রা করেছিল সেই রকেটটির নকশায় সহায়তা করেছেন সোমনাথ। যাকে একজন যোগ্য নেতা বলে মানেন ইসরোর বিজ্ঞানী ও প্রকৌশলীরা। ভারতের মহাকাশ সংস্থার (ইসরো) প্রধান হিসেবে তার দায়িত্ব ছিল উৎক্ষেপণের আগে চন্দ্রযান-৩ এর সবকিছু পরীক্ষা করে দেখা। ব্যাঙ্গালুরুর বিখ্যাত ইন্ডিয়ান ইন্সটিটিউট অব সাইন্স এর সাবেক শিক্ষার্থী তিনি। রকেট নিয়ে ভারতের প্রধান গবেষণা প্রতিষ্ঠানের পরিচালক উন্নিকৃষ্ণান নায়ারও একজন অ্যারোস্পেস ইঞ্জিনিয়ার এবং ব্যাঙ্গালুরুর ইন্ডিয়ান ইন্সটিটিউট অব সাইন্স এর সাবেক শিক্ষার্থী। তিনি হিউম্যান স্পেস ফ্লাইট সেন্টার এর প্রথম পরিচালক এবং ভারতের গগনযান প্রকল্পের বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ মিশনে নেতৃত্ব দিয়েছেন। তার নেতৃত্বে ভারতের স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ রকেট এলভিএম-৩ এর সাফল্যের হার শতভাগ। চন্দ্রযান-৩ অভিযানের প্রকল্প পরিচালক প্রযুক্তিতে স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী ভীরামুথুভেল গত চার বছর ধরে চন্দ্রযান-৩ কে ঘিরেই জীবন অতিবাহিত করেছেন। তিনি ভারতের দ্বিতীয় চন্দ্রাভিযান চন্দ্রযান-২ এবং মঙ্গলযান মিশনের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। প্রকৌশলী কল্পনা তার পুরো জীবন উৎসর্গ করেছেন ভারতের স্যাটেলাইট প্রকল্পে। তিনি চন্দ্রযান-২ এবং মঙ্গলযান মিশনের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। চন্দ্রযান-২ এর প্রকল্প পরিচালক ছিলেন এম ভিনিতা। ইলেক্ট্রোনিক্স সিস্টেমস ইঞ্জিনিয়ার ভিনিতা প্রথম নারী যিনি ভারতের একটি চন্দ্রাভিযানের নেতৃত্ব দিয়েছেন। চন্দ্রযান-২ সম্পর্কে তার জ্ঞান নিশ্চিতভাবেই চন্দ্রযান-৩ এর বেলার দারুণ কার্যকর হয়েছে। ভি নারায়ানান লিকুইড প্রপালশন সিস্টেম ইঞ্জিন বিষয়ে একজন বিশেষজ্ঞ। তার নেতৃত্বেই ল্যান্ডার বিক্রমের আধুনিকায়ন হয়েছে। চন্দ্রযান-৩ স্যাটেলাইটটি সত্যিকার অর্থেই চাঁদের চারপাশে নেচে বেড়িয়েছে। পৃথিবীতে বসে সেটিকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারার জন্য বিএন রামাকৃষ্ণার দলের ধন্যবাদ প্রাপ্য। এভাবে অনেকেই আছেন যারা অক্লান্ত পরিশ্রম করে গেছেন।
কিন্তু কেন ‘বিক্রম’ এবং ‘প্রজ্ঞান’? কেন এই দু’টি নাম বেছে নেওয়া হয়েছিল চন্দ্রযানের ল্যান্ডার এবং রোভারের?ভারতীয় মহাকাশ যাত্রার পথপ্রদর্শক তথা বিজ্ঞানী বিক্রম সারাভাইয়ের নামানুসারে ‘বিক্রম’ ল্যান্ডারটির নামকরণ করা হয়েছে। ভারতীয় মহাকাশ গবেষণার এই স্বর্ণাভ মুহূর্তের নেপথ্যেও রয়েছে বিক্রম সারাভাইয়ের অবদান। তিনি ভারতীয় মহাকাশ গবেষণার অন্যতম পথিকৃৎ। জাতীয় স্তরে গঠনমূলক বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাঁর অবদান অনস্বীকার্য। ১৯১৯ সালের ১২ অগস্ট তাঁর জন্ম গুজরাতের বিখ্যাত সারাভাই পরিবারে। দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে এই বর্ধিষ্ণু ব্যবসায়ী পরিবারের অবদান অনেক। যদিও বিজ্ঞান থেকে ক্রীড়া হয়ে সংখ্যাতত্ত্ব, বিক্রমের আকর্ষণ ছিল বহুমুখী। কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের এই প্রাক্তনীর আকর্ষণের ভরকেন্দ্র ছিল অবশ্যই বিজ্ঞান। তিনি আজীবন চেয়ে এসেছিলেন পারমাণবিক শক্তি ব্যবহৃত হোক মানবকল্যাণে। ১৯৭৫ সালে রুশ কসমোড্রোম থেকে সফল উৎক্ষেপণ হয় ভারতের প্রথম কৃত্রিম উপগ্রহ ‘আর্যভট্ট’-র। এই সাফল্যে যাঁর অবদান অগ্রগণ্য, সেই বিক্রম সারাভাই কিন্তু এই সুদিন দেখে যেতে পারেননি। ১৯৭১ সালে মাত্র ৫২ বছর বয়সে মৃত্যু হয় এই বিজ্ঞানসাধকের। বিশেষজ্ঞ ও বিজ্ঞানীদের মধ্যে অনেকেরই অভিমত, তাঁর মৃত্যু স্বাভাবিক ছিল না। অন্য দিকে, রোভারটির নামকরণ হয়েছে সংস্কৃত শব্দ ‘প্রজ্ঞান’ থেকে। সংস্কৃতে যার অর্থ ‘প্রজ্ঞা’ বা জ্ঞান। ল্যান্ডার বিক্রমের মোট ওজন ১৭৪৯.৮৬। যার পেটের মধ্যে ছিল রোভার প্রজ্ঞান। প্রজ্ঞানের ওজন ২৬ কেজি।
আমেরিকা বা রাশিয়া চাঁদের অভিযানে যে অর্থ খরচ করে, তার তুলনায় অনেক কম টাকা খরচ চন্দ্র বিজয় করে নিল ভারত। বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারতের এই চন্দ্রাভিযানে মোট খরচ হয়েছে ৭৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। অপরদিকে রোববার চাঁদে বিধ্বস্ত হওয়া রাশিয়ার চন্দ্রযান লুনা-২৫ এর খরচ ছিল ২০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। তুলনা করলে প্রমাণ হয় ভারত রাশিয়ার থেকে অর্ধেকেরও কম খরচে একটি সফল ল্যান্ডিং উপহার দিয়েছে বিশ্বকে। টাকার হিসেবে চন্দ্রযান-৩- এর বাজেট ছিল ৬১৫ কোটি টাকা। ল্যান্ডার বিক্রম এবং বিক্রমের পেঠে থাকা রোভার প্রজ্ঞান তাদের অভিযান পরিচালনার জন্য ব্যবহার করবে সৌরশক্তি। চাঁদের এক মাস সমান পৃথিবীর ২৮ দিন। এক চান্দ্রমাসে টানা ১৪ দিন রাত আর টানা ১৪ দিন দিনের ভাগ থাকে। ফলে চাঁদ অন্ধকারে ডুবে থাকলে কাজ করতে পারবে না ল্যান্ডার। তাই সূর্যের আলো থাকতেই ল্যান্ডার ও রোভার চাঁদের মাটিতে অনুসন্ধান চালাবে।
বিশিষ্ট লেখক শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় আনন্দে আত্মহারা হয়ে লিখলেন, "আমাদের সব চেয়ে কাছের মহাজাগতিক বস্তুটি হল চাঁদ। চন্দ্রিমার সৌন্দর্য নিয়ে কোনও কথা হবে না। তা নিয়ে দিস্তে দিস্তে গদ্য-পদ্য লেখা হয়ে গিয়েছে। লক্ষ লক্ষ নারী ও পুরুষের নামকরণের অনুপ্রেরণা ওই চাঁদ। কবিতা, গান, গল্প, উপন্যাসে চাঁদের ছড়াছড়ি। নর-নারীর ভালবাসা, বিরহ দশা, একাকিত্ব, বাচ্চাদের ভোলানোর জন্য ‘আয় আয় চাঁদমামা, টিপ দিয়ে যা’— ইত্যাকার নানা বিষয়ে চাঁদ আমাদের ভারী কাজে লাগে।" তিনি আরো লিখেছেন, "চন্দ্রযান থেকে দূর-নিয়ন্ত্রণে বিচ্ছিন্ন হয়ে চন্দ্রপৃষ্ঠে ধীর অবতরণ খুবই উন্নত প্রযুক্তিগত গবেষণার ব্যাপার। এর সাফল্য ভারতকে অবশ্যই নন্দিত করবে। বিশ্বব্যাপী স্তবগান না উঠুক, অন্তত এটা বুঝিয়ে দেবে, এ দেশটা হেলাফেলার নয়। কৃতিত্বের বিষয় এই যে, এই অভিযান ভারতের স্বাবলম্বী প্রচেষ্টার ফল।" আশা থাকবে ল্যান্ডার বিক্রম বীরের বেশে তার কার্যক্রম পরিচালনা করে চাঁদের নিত্য নতুন ছবি পৃথিবীতে পাঠাবে এবং জ্ঞান এবং বিজ্ঞানের পরিধির সমৃদ্ধি আনয়নের মাধ্যমে জানার জগৎ প্রসারিত করবে। হয়তো খুব শীঘ্রই নতুন প্রজন্ম সহ আমরা সবাই মহাবিশ্ব সম্পর্কে আরো নিত্যনতুন তথ্য পাব।

0 মন্তব্যসমূহ