দর্পণ || নির্বাচিত সাপ্তাহিক সেরা ফেসবুক সাহিত্য




পোস্ট বার দেখা হয়েছে

 

মুকুল 

বাংলা নবজাগরণের পথিকৃৎ হিসেবে রামমোহন রায় ও বিদ্যাসাগরের নাম যতোখানি শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারিত হয়, বিদ্যাসাগরের সমসাময়িক নবজাগরণের অন্যতম পথিকৃৎ অক্ষয়কুমার দত্তের নাম সেভাবে স্মরণ করা হয় না । অথচ মননশীল বাংলা গদ্যচর্চার পাশাপাশি প্রখর যুক্তিবাদিতা, বিজ্ঞানমনস্কতা ও ধর্মনিরপেক্ষ ভাবনার নিরিখে সম্ভবতঃ সবথেকে বেশি অবদান রেখেছেন তিনি । যুক্তি ও তথ্যনিষ্ঠা, বিজ্ঞানচেতনার প্রসারে তিনি তাঁর সমকাল থেকে অনেক যুগ এগিয়ে ছিলেন, একথা অনস্বীকার্য ।

.

অক্ষয়কুমার দত্তের মতে এই বিশ্বজগৎ প্রকৃতির নিয়মের অধীন । তাঁর কাছে প্রাকৃতিক নিয়মই ঈশ্বরের নিয়ম। প্রার্থনার পরিবর্তে প্রাকৃতিক নিয়ম পালন করলেই মানুষ সুখী হতে পারে । “মানবকুলের হিতসাধন করাই পরমেশ্বরের যথার্থ উপাসনা…” এই ছিল তাঁর মত । অক্ষয়কুমার মনে করতেন, বিজ্ঞানই সব জ্ঞানের আকার । বিজ্ঞানভিত্তিক প্রাকৃতিক নিয়মের মাধ্যমেই মানুষের জীবন ও সমাজের নীতি নির্ধারিত হওয়া উচিত । প্রকৃতির নিয়মের সঙ্গে সংগতি বজায় রেখে নিজের আত্মীয়বর্গ, সমাজ ও দেশের, তথা সমগ্র মানবকুলের প্রতি কর্তব্য পালন - এই হল শ্রেষ্ঠ ধর্ম ও উপাসনা ।

.

যুগে যুগে ধর্মীয় উগ্ৰতা তথা বিদ্বেষ যখন মানবতার বিরুদ্ধে গিয়েছে, তীব্র ভাষায় তিনি সেসবের বিরুদ্ধে কলম ধরেছেন, তাঁর বিখ্যাত "ভারতবর্ষে উপাসক সম্প্রদায়" গ্রন্থের প্রথম ভাগের উপক্রমণিকাতে দেখা যায়, ভাল-মন্দ নির্বিশেষে সকল ধর্মকে মানবতার পক্ষে অহিতকর বলে মনে করেছেন অক্ষয়কুমার । সাধারণভাবে প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মের মানবতাবিরােধী ভূমিকার কথা উল্লেখ করে অক্ষয়কুমার বলেছেন : “অবনীমণ্ডলে ধর্ম নিবন্ধন যত যন্ত্রণা, যত নরহত্যা ও যত শােণিত-নিঃসরণ হইয়াছে, এত আর কিছুতেই হইয়াছে কিনা সন্দেহ । কি পুরাতন, কি অধুনাতন, কি প্রতীয়মান, কি অভ্যুদয়বান, সকল ধর্মই বিদ্বেষকলুষে কলুষিত হইয়া অধর্মের ক্রোড়ে অধিষ্ঠিত ও পরিপালিত হইয়াছে। হিন্দু ও ইরানীদের বদ্ধমূল বিরােধ-প্রসঙ্গ বেদ ও আবেস্তাকে চির-কলঙ্কিত করিয়া রাখিয়াছে । খ্রিস্টানদের ক্রসেড ও মুসলমানদের ধর্ম-সংগ্রাম স্মরণ করিলে হৃদয় কম্পমান হইতে থাকে । হিন্দু ও বৌদ্ধদিগের চির-বদ্ধ বিসংবাদে বৌদ্ধগণকে ভারতবর্ষ হইতে একেবারে নির্বাসিত করিয়া দিয়াছে । …অনতিপ্রাচীন শৈব ও বৈষ্ণব সম্প্রদায়ে যেরূপ ঘােরতর বিসংবাদ উপস্থিত হয়, পূর্বকালীন বৈদিক সম্প্রদায়ীদিগেরও তদনুরূপ বিরােধ ও বিদ্বেষ-রচনা হইয়াছিল, তাহার সন্দেহ নাই ।”

.

আবার যখন কোনো শাসক ধর্মনিরপেক্ষ ভাবনায় দেশশাসন করেছেন, উচ্ছ্বসিত প্রশংসায় ভরিয়ে তুলেছেন তাঁকে । মৌর্য সম্রাট অশোকের দেশশাসন সম্পর্কে লিখেছেন : “অশােক রাজার একখানি অনুশাসনপত্রে এইরূপ লিখিত আছে যে, যাহাদের বৌদ্ধ ধর্মে বিশ্বাস নাই, তাহারাও আমার রাজ্যমধ্যে নির্বিঘ্নে বাস করুক । ...বৌদ্ধগণ-সংহারক আস্তিকপ্রবর ব্রাহ্মণকুল ! এই নাস্তিক নরপতির সুপবিত্র গুণগান শ্রবণ কর, আর লজ্জায় অধােমুখ হইয়া ধরণী-গর্ভে প্রবিষ্ট হইতে থাক ।”


প্রাচীন ভারতে আস্তিক ব্রাহ্মণরা যেভাবে নাস্তিক বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের উপর অত্যাচার চালিয়েছিল, সেই ঐতিহাসিক ঘটনা অক্ষয়কুমারকে বিশেষভাবে আলােড়িত করে । ইতিহাস থেকে তার বহু উদাহরণ তিনি তুলে তীব্র ভাষায় এর প্রতিবাদ করে লেখেন : “হিন্দুরা যে, বৌদ্ধদিগকে নৃশংসভাবে নিগ্রহ করেন, তাহার ভূরি ভূরি প্রমাণ ও বিস্তর নিদর্শন প্রাপ্ত হওয়া যায় । কাশীর সমীপস্থ সর্নাথ বৌদ্ধ-সম্প্রদায়ের একটি প্রধান স্থান । বুদ্ধ বৰ্ত্তমান থাকিতেই সর্নাথের বিহার প্রস্তুত হয় । তথায় বৌদ্ধদের অনেক দেবালয়, বুদ্ধ-প্রতিমূর্তি এবং অত্যুৎকৃষ্ট বিদ্যালয় ছিল । ওই সৰ্নাথ একেবারে নষ্ট হইয়া গিয়াছে । এখন চারিদিকে এরূপ প্রভূত ভস্মরাশি বিদ্যমান আছে যে, দেখিয়া বােধ হয়, বৌদ্ধ-দ্বেষী হিন্দুপন্থীয়েরা সমুদয় ভস্মীভূত করিয়াছে।  ...কুমারিল ভট্ট বৌদ্ধদিগকে অত্যন্ত পীড়ন ও সৰ্ব্বতােভাবে পরাভব করিয়া স্বদেশ হইতে বহির্ভূত করিয়া দেন । …মাধবাচাৰ্য্য লিখিয়াছেন, কুমারিলের সহায়-ভূত সুধন্বা রাজা বৌদ্ধসম্প্রদায় সংহার উদ্দেশ্যে এই আদেশ দেন যে, …এক দিকে সেতুবন্ধ রামের অপর দিকে হিমালয় পর্বত, ইহার মধ্যে আবাল-বৃদ্ধ যত বৌদ্ধ আছে, সকলকে সংহার কর । যাহারা পূজা করে না, তাহাদিগকে বধ কর ।” এমনকি আদি শংকরাচার্য্যের প্রতিও অক্ষয়কুমার এই একই অভিযােগের আঙুল উত্থাপন করেছেন । তিনি স্পষ্ট ভাষায় লিখেছেন, “শঙ্করাচার্য্য বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের বিদ্বেষী ছিলেন এইরূপ একটি প্রবাদ প্রচলিত আছে । তিনি নেপালবাসী বৌদ্ধগণের বিস্তর গ্রন্থ নষ্ট করিয়া ফেলেন এবং বৌদ্ধরাও তাঁহার প্রতি বিরূপ হইয়া যৎপরোনাস্তি ক্রোধ ও ঘৃণা প্রকাশ করিতে থাকে ।”

.

তবে অক্ষয়কুমার পরমত অসহিষ্ণুতার জন্য শুধু ব্রাহ্মণ্যধর্ম নয়, অন্যান্য ধর্মের প্রতিও অভিযােগের আঙুল উত্থাপন করেছেন সমানভাবে : “উগ্র-মূৰ্ত্তি শৈব ও বৈষ্ণব সমাজের ভয়াবহ তীর্থস্থানে ধিক ! ধিক ধিক খ্রিস্টানদিগের শােণিতাক্ত মুণ্ডমালা-বিভূষিত ভয়ঙ্কর ত্রুসেড যুদ্ধের ক্রুস-চিহ্নেও ধিক! স্বসম্প্রদায়ের পক্ষপাতমদে উন্মত্ত দুর্দান্ত মােসলমান সম্প্রদায়ের কর-সঞ্চালিত চাকচিক্যশালী সুতীক্ষ্ম তরবারিকেও ধিক !”

.

আজকের দিনে অক্ষয়কুমার দত্তের রচনা আরও বেশি প্রাসঙ্গিক ।  অক্ষয়-চেতনার চর্চার বড়োই প্রয়োজন । জন্মদিনে শ্রদ্ধা অবিরত ।

***************


গুটিকয়েক রাতজাগা পাখি

পরিতোষ জানা



সারি সারি কবিতার দোকান 

অসংখ্য কবির আনাগোনা, 

সহস্র পাণ্ডুলিপির ভিড়। 


রঙ্গ মঞ্চে কলাকুশলীদের বিচিত্র সংলাপ। 

নায়ক, নায়িকা ও ভিলেনের জোর টক্কর। 


ক্ষুধার বাসরে নিরন্ন মানুষের ভিড়, 

ভোট কুশলীদের রাজনৈতিক তৎপরতা, 

কর্ম খালি বিজ্ঞাপনের কাগজের

ঠোঙায় চপের বাণিজ্যিক রমরমা, 

আলোহীন নিষিদ্ধ পল্লীতে বাধ্যবাধকতার প্রেম। 


বেগম বাহার আয়নায় মুখ দেখা দিন শেষে

অরাজক রাত। 

আলসেমির চাদর  গায়ে গাছগুলোর নিশিঘুম। 


কংক্রিটের খাঁজে খাঁজে লোভী কীট, 

রাতের গন্ধ পেয়েই তাদের  তাৎপর্যপূর্ণ  বাহিরে পদক্ষেপ। 

নির্লোভ সময়ের পিঠে ছুরি বসিয়ে

লোভের স্বার্থ সিদ্ধি একেবারেই বাম হাতের কাজ।


নিরপেক্ষ চাঁদের আলো, আর নক্ষত্রেরা নীরব দর্শক। 

গুটিকয়েক রাতজাগা পাখি শাবকের নিরাপত্তার কথা ভেবে

মাঝে মাঝে চিৎকার করে উঠে।

******************

মেঘ ছুটোছুটির মেলায়

স্মৃতি সাহা চৌধুরী



সাঁঝ আকাশে আজ মেঘেদের ঘনঘটায়,

মিঠে মিঠে ছোঁয়া দেয় স্নিগ্ধ এলো বায় ।

         নিরালায় ছাদে একা 

         মেঘেদের করি সখা,

এ মন হারালো ওই মেঘোময় ধোঁয়াশায় ।

         ফুল, পাখি, প্রজাপতি

          হয় যে আমার সাথী,

এদের সনে ধাই মনে মেঘেদের সীমানায় ।

           টবেতে মালতীগুলো

             খুশিতে উৎফুল্ল ,

  এ ওর গায়ে তারা হাসিতে লুটায় ।

           অষ্টাদশী নয়নতারা 

           চঞ্চল তারুণ্যে ভরা

হাতছানি দিয়ে যেন ডাকছে আমায় ।

        সন্ধ্যারতির ঘন্টাধ্বনি 

        বেজে ওঠে ওই শুনি--

অদূরে কোন দেবালয়ে এ বিমল সন্ধ্যায় ।

  শুভ শঙ্খ মুখরিত দিক হতে দিঙ্ময় !

       আজ নেচে গেয়ে ওঠে মন

         রিমিঝিমি রুমঝুম ঝুম 

এমনি মেঘ ছুটোছুটির মেলায়  ।।

*****************

Julie's pride

Daniela Marian


July is hot

An oven in the bowl of the sun

He came to vent his displeasure,

in sheets of lightning,

He built bridges between peoples,

He strung a lace, colorful

of rainbow petals,

Spread over seas and lands, far, over other realms.


On the way he met a beautiful girl,

He has strands of fire in his hair,

He combed his fields,

It came down from a clear sky

He spread love on earth.


The girl does not live on earth,

She is dressed in a blue holiday dress

He stole a ray from the sun,

Reddened the cheeks of the children, in her lap,

blushes everything she touches, wherever

she walks like a nymph,

And the green ridge of the woods.


A boy walks galloping along a path,

He is tall as a fir tree, beautiful, good,

He opened his golden arms,

full of love and peace,

He embraced the girl from the sky,

He begged her to stop burning

green, emerald.


**************

রানুর ডাইরি

রীনা নস্কর


রানা ........, রানা .........,

এক দৌড়ে এসে মায়ের আঁচলে টান দিয়ে 

জড়িয়ে ধরলো মাকে

মাও তখন বুকে জড়িয়ে আদর করে খুব,

পৃথিবী বলতে মায়ের আঁচল যতখানি বড়

ঠিক ততটাই বড় ছিল তার পৃথিবী ।

বাইরের জগৎ অজানা, অচেনা ! 

কয়েকদিন পরে বাড়ীর কাজে এক মহিলা এলো

সঙ্গে ছিল তারই সমবয়সী ছোট্ট এক মেয়ে,

দুজনার বয়স তখন তিন কি সাড়ে তিন হবে,

গায়ের রঙ ও এক, ঘনো কালো,

নাম তার মঙ্গলা।

মা তার সঙ্গে সখ্যতা করিয়ে দিল

খুব ভাব জমে গেল দুজনার মধ্যে,

বন্ধুত্বের রঙ এত গাঢ়, স্বাদ যে এত মধুর হতে পারে

তা তার জানা ছিলনা ।

একটু একটু করে তার প্রভাতী আকাশে

সোনালি আলো ভরতে লাগলো ।

তার বন্ধুত্বের স্বাদে আজও যেন 

আচ্ছন্ন হয়ে থাকে সে,

যখন যা পেত তার অর্ধেক বন্ধুকে দিয়েই

তার স্বাদ নিত মঙ্গলা ।

দুজনার অজানা জগৎ এক অচ্ছেদ্য ভালোবাসায়

বাঁধা পড়ে গেলো ,

ঘরে বাইরে এক অনন্য অনুভূতি ! 


একদিন তারা যখন খেলাঘরে ব্যস্ত খুব,

হঠাৎ ছোট কাকু ডাক দিল রানু ........, রানু ............,

চল মাছ ধরবো তুই কুড়াবি ।

মা অতি আদরে ডাকে রানা, 

বাবা, কাকু, পিসি সবাই ডাকে রানু বলে ,

কাকুর কাঁধে বিরাট মাছ ধরার জাল,

ছোট্ট একটা মাটির কলসি তার হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলল, মাছ কুড়িয়ে এতে রাখবি ।

মঙ্গলা ও চলল সঙ্গে, দুজনেই গল্প করতে করতে

পৌঁছালো পুকুর পাড়ে,

কিছুক্ষণ না দেখা পেয়ে মায়ের চিৎকার কানে এলো

রানা ........, রানা ............

অমনি ছোটকাকু হেঁকে বলল বৌদি .........

আমার কাছে আছে , মাছ ধরতে যাচ্ছি ।


অনেকখানি মাছ ধরার পর মঙ্গলার মনটা

কেমন চঞ্চল হয়ে উঠলো ! 

বললো, কাকু আমি এখন বাড়ি যাবো,

ভাই ওদিকে একা আছে !

আমি যাচ্ছি রে রানু , পরে আবার আসবো খেলতে ।

ক্ষণিক বিচ্ছেদে রানুর করুণ দৃষ্টি !

পাশের কচুবন থেকে বড় পাতা তুলে

অনেকটা মাছ মুড়ে তার হাতে দিয়ে বলল কাকু

সাবধানে যাবি, এটা মাকে দিবি তোদের জন্য,

মঙ্গলা ওখান থেকে চলে যাওয়ার সময়

দৃষ্টির শেষ সীমা পর্যন্ত তাকিয়েছিল রানু !

কি জানি, মনটা কেমন করে উঠলো যেনো !

আবার খেলতে আসবে তো 

আমার সাজানো খেলাঘরে ?

হঠাৎ কয়েক টুকরো মেঘের কটাক্ষ দৃষ্টি

ঢেকে দিল পুকুর পাড় ! 

কিছুক্ষণের মধ্যেই পাশের বাড়ির ঠাকুমা

খুব জোরে চিৎকার করে ডাকতে লাগল সবাইকে !

ওগো তোমারা কে কোথায় আছো ? 

দেখো কার বাচ্চা জলে ডুবে যাচ্ছে গো ..... !

শুনেই সব ফেলে আমি আর কাকু

একদৌড়ে গিয়ে দেখি

কেউ একজন তার নিথর দেহখানি পাড়ে রেখেছে তুলে, একটু দেরী হয়ে গেছে !


কাছে যেতেই চমকে উঠলাম !

এযে আমারই প্রিয় বন্ধু ! একমাত্র বন্ধু মঙ্গলা !

ও কি আর কখনও উঠবেনা ? কথা বলবেনা?

আর খেলবেনা? ও যে কথা দিয়েছিল ..... !

মন ভারাক্রান্ত হল ! 

এই জন্যই বুঝি ওর কিছুক্ষণের বিচ্ছেদে

মনটা খুব কেঁদে কেঁদে উঠেছিল !

চাক্ষুষ দেখা ঘটনা বলছিল সেই ঠাকুমা,

ওর ছোটভাই জলে পড়ে গেছিল

তাকে হাত ধরে টেনে উপরে তুলে

ও নিজেই কিভাবে পড়ে গেল ! 

ঝাপসা দৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখি

ওর পাসে পড়ে আছে  

কচুপাতা মোড়া মৃত মাছগুলো  !!

******************

আঁধারে হারাতে বসেছে বর্ণমালাদের মিতালী 

প্রিন্স এ ওয়াকী 


যেদিকে চোখ যায় শুধু অন্ধকার 

অন্ধকার ঘাপটি মেরে থাকে নিজের ভেতর, 

জোছনার আলো শুষে নেয় 

অনাকাঙ্খিত অমাবস্যা, 

আলোর পথে ঝরে ঝরে পড়ে 

মিথিলা মিথ্যা,

মিশ্রিত অনুভূতি পুঞ্জীভূত উদ্বিগ্নতার 

বিচ্ছিন্ন সব পদাবলী, 

ভয়ের দাবানল পুড়িয়ে দেয় 

স্বস্তিকার আবাসন, 

স্বরবর্ণ ব্যঞ্জনবর্ণ মিছিলের বাহিরে 

অর্থহীন জীবন যাপনে ব্যতিব্যস্ত,

অন্ধকার ক্রমশ গ্রাস করে নিয়েছে বিগত অতীত 

যেখানে ভালোবাসার নকশীকাঁথা ছিল বেশ মোলায়েম,

সম্পর্কগুলো বড্ড নড়বড়ে 

অস্থিরতা দৃশ্যমান স্বপ্নের ভাঁজে ভাঁজে, 

স্মৃতিসৌধের চত্বরে দাঁড়িয়ে বুভুক্ষু জনতা

হারিয়ে যাচ্ছে অন্ধকারের অতলে,

নিজস্বতার স্বাধীনতা স্থবির 

মৃত্যুর মিছিলে সূর্যগ্রহণ দীর্ঘসূত্রিতার পেরেক ঠুকছে...


অপচ্ছায়ার আচ্ছাদন জড়িয়ে আছে গ্রহণের বলয়


************************


চৈতন্যের অপেক্ষায়

কৃষ্ণা গুহ 


অনুভবে খুঁজি তোমায় অসীম প্রত্যয়ে,

আলোর প্রত্যাশায়।


দিন ঢলে অন্ধকারের গর্ভে, খুঁজি পূর্ণিমার ফুট ফুটে আলো!!

মঙ্গল ভাবনায় চেয়ে থাকি নক্ষত্র মালিকায়।


 গভীর আঁধার কাটুক

ভরে উঠুক আমার আনন্দ ভুবন, 

হৃদ স্পন্দনে ছড়াক   ওঙ্কার নিনাদ।


ঘুম ভাঙ্গানো ভোরে রবি করের উত্তাপে ঊষার প্রথম বাতাসে শিহরন লাগুক শরীরে,

মন আঙিনায়!!


ব্যাস্ত চরাচরে হোক শুদ্ধ স্বত্তার বিকাশ রক্তিম চিদাকাশে প্রতিধ্বনিত হোক ওঙ্কার নিনাদ!!

চৈতন্য উদয়ের অপেক্ষায়।।

************************


প্ৰিয় ক্যাক্টাস

অপূর্ব মজুমদার



কৃপণতা আর উদরতা এই দুই ধারণ করে নিয়েই রক্ত মাংসের মানুষ!

তত্ব বলে মান এবং হুশ!

হতাশা বলে যায় ফেরি করতে করতে 

এ দেশে কিস্সু হবেনা ধূস!


দুটি রাস্তা। দুটি পৃথক পৃথক।

সেখানেই গোটা নাটকটায় ভুলে ভরা সংলাপ আপদমস্তক!


আলাদা আলাদা পথে হাঁটে ধর্মজীবী আর বুদ্ধিজীবীর দল!

উভয়ের ভক্ষন প্রথা প্রায় একই বরফ কুচি দিয়ে রুধির এক্কেবারে হীম শীতল!

গণতন্ত্রের মাঠে ক্যাক্টাসের জঙ্গল!


রবীন্দ্রনাথ ও তাহাদের কথা ও কোরাস

জন গণ মঙ্গল।

*************************

প্রশ্ন  

জয়ন্ত অধিকারি  


বুম, দুম....সস্স...দ্দুম...চারদিকে বোমা এসে পড়ছে। চলছে গুলির আওয়াজ...একই সাথে ভেসে আসছে সৈন্যদের গলার আওয়াজ, পৃথিবীর বুকে ভারি বুটের পদধ্বনি; ভেসে আসছে উল্লাস, আর্তনাদ, জয়ধ্বনি, মৃত্যুর চিৎকার...যুদ্ধক্ষেত্র ঢেকে গেছে ধোঁয়াতে। এক একটা বোমা এসে পড়ছে মাটির ওপরে, জোরালো কানফাটানো শব্দে ফাটছে সেই বোমাগুলো। একইসাথে মাটির অনেকটা অংশ ছিটকে পড়ছে চারদিকে, সাথে বোমার ভেতরের নানান অংশ টুকরো টুকরো হয়ে বেরিয়ে ছুটে যাচ্ছে চারদিকে। যে সব সৈন্য সেই বোমার পরিধির মধ্যে আছে, তাদের দেহ টুকরো টুকরো হয়ে যাচ্ছে। বোমার তীব্র আঘাতে মাটি থেকে ওদের শরীর অনেকটা ওপরে ছিটকে উঠে যাচ্ছে; তারপরেই অভিকর্ষের ধাক্কায় নেমে আসছে মাটিতে। চারদিকে রক্ত। মাটি ভিজে গেছে রক্তে। মাটির ধুলোবালিতে মিশে যাচ্ছে সেই রং। 


সেদিন আমিও ওখানেই ছিলাম। আমার বারো নম্বর রয়্যাল প্ল্যাটুনের সাথে। আমাদের দলে ছিল সাড়ে চারশো সৈন্য। আমি আর যশোধর, আমরা দুজন পাশাপাশি ছিলাম। ছিলাম একসাথে। দুজনের ট্রেনিং একসাথে শেষ হয়েছিল। একই কোয়ার্টারে আমরা দুজনে থাকতাম। আর এই যুদ্ধক্ষেত্রে আমরা দুজন ও থাকতাম একই সাথে, একই বাঙ্কারে। ওর বয়স ছিল কুড়ি। যশোধর ভীষণ মিষ্টি স্বভাবের ছিল। যেরকম মজা করতে পারত, সেরকম খেতেও পারত, আবার রাতে যখন আমরা সবাই একসাথে থাকতাম, সেখানে নেচে গেয়ে সবাইকে মাতিয়ে রাখত। যুদ্ধক্ষেত্রে আমি আর যশোধর, দুজনেই একটা গর্তের মধ্যে নিজেদেরকে আড়াল করে রেখেছিলাম। আমাদের আশেপাশে একই ভাবে আর ও জনা পঞ্চাশেক সৈন্য ছিল। আমরা জানতাম, একটু পরে বোমাবাজি বন্ধ হয়ে যাবে। তারপরেই আমরা আবার উঠে দাঁড়িয়ে আক্রমণ করতে শুরু করব। 


কিন্তু, কিন্তু হঠাৎ একটা বোমা আমাদের দিকে ছুটে আসে। সজোরে ফাটে সেই বোমাটা। একইসাথে অনেকগুলো রক্তাক্ত শরীর আকাশে উঠে যায়। তারপরেই নেমে আসে মাটিতে। যশোধরের শরীরটাও একই ভাবে ছিন্ন বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে যায় মাটিতে। আমি কোনও রকমে গড়িয়ে গড়িয়ে ওর কাছে এগিয়ে যাই। ও কাতরাচ্ছিল। কথা বলতে পারছিল না। ওর পেটের ওপরে একটা গভীর ক্ষতস্থান ছিল। সেখানে বোমার একটা টুকরো গেঁথে ছিল। একটা হাত শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল। আমার দিকে কাতর চোখে তাকিয়ে ছিল ও। আমার ও ভীষণ জোরে লেগেছিল। একটা গুলি এসে লেগেছিল আমার পায়ে। 


হঠাৎ ওপরে শুনতে পাই প্লেনের আওয়াজ। আমাদের দেশের বোমারু বিমানগুলো শত্রুপক্ষের ঘাঁটি লক্ষ করে আক্রমণ করে। ওরা পালাতে শুরু করে। আমাদের দলের সৈন্যরা উল্লাসে চেঁচিয়ে ওঠে।  যশোধর কথা বলতে পারছিল না। ঠোঁট কাঁপছিল। চোখ দুটো দিয়ে অসহায় ভাবে আমাকে দেখছিল। বুঝতে পেরেছিলাম ও আর বাঁচবে না।


যুদ্ধ শেষে বাড়িতে ফিরে আসি। তিন মাসের ছুটিতে। নিজের বাড়িতে যাওয়ার আগে আমি যশোধরের বাড়িতে গেলাম। বৃদ্ধা মা আমার কাছে সবকিছু শুনল। আমার বুকের ওপরে আছড়ে পড়ে কাঁদতে কাঁদতে জিজ্ঞেস করে, "ও শান্তিতে মারা গিয়েছিল তো? আমার ছেলেটা, আমার ছেলেটা একটুও কষ্ট সহ্য করতে পারত না। একটু ব্যথাতেই খুব কান্নাকাটি করত। আমাকে জড়িয়ে ধরে থাকত। "


"হ্যাঁ আন্টি। ওর কোনও কষ্ট হয় নি।"


আমাকে ছেড়ে ধীরে ধীরে ভেতরের দিকে পা বাড়াল বৃদ্ধা। হেসে বিড়বিড় করতে করতে বলে, কোনও কষ্ট পায় নি। ছেলেটা কোনও কষ্ট পায় নি। হঠাৎ আমার দিকে ঘুরে দাঁড়িয়ে চেঁচিয়ে জিজ্ঞেস করে বৃদ্ধা,"তুমি, তুমিও তো সেদিন ওখানেই ছিলে? তাহলে তুমি কী করে বেঁচে ফিরে এলে? কেন বেঁচে ফিরে এলে? কেন?"

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ