পোস্ট বার দেখা হয়েছে
কবিতারা জন্মাক
সুমন ঘোষাল
শূন্য এ বুকে শব্দের মুখোশ
বেখেয়াল বেসামাল ,
অলীক স্বপ্নের সীমানা পেরিয়ে
নিঃশব্দের মায়াজাল !
নিয়ে জীবনের যাতনা যত
কলমের আর্তনাদ ,
সাদা পাতায় আঁকিবুঁকি কাটে
ভাবনারা উন্মাদ ।
আলেয়ার মতো অতীত ছায়ায়
নিমগ্ন চারিপাশ ,
কলমের হাতে সোপেছি জীবন
শব্দেরা নিঃশ্বাস ।
সৃষ্টির আলোয় মুছুক আঁধার
শব্দেরা গর্জাক ,
হৃদয় পাতায় রক্ত কলমে
কবিতারা জন্মাক ।
*************************
বদলানো জীবনের হাওয়া
জয়ীতা চক্রবর্তী আচার্য
কিছু অমীমাংসিত প্রশ্ন…
চেনা জানা রাস্তার গলিপথ
অন্ধকার জুড়ে শ্রেষ্ঠ ঘোরপাকে
অকেজ শব্দ,মৌন আবহাওয়া
মেঘের অচলায়তনে বৃষ্টি
রাস্তা অচেনা,একটু দূর মনে হয় শূন্যপুর
এখানে বিদ্যুৎ নেই,
প্রবাহ যেদিকে যাবে যাক..
পুনর্মিলন উৎসবের জন্য,
নিশ্চুপ ঘরময়,
নিঃসঙ্গ স্বপ্নের মতো কেউ আসে
বোধের ব্যঞ্জনায়, আমি
কূটকৌশলী চিন্তায়!
ভাঙা মরচে ধরা জানলায় ফুটে ওঠে
একান্নবর্তী পরিবার
সরু রাস্তায়,দেহবনের হাওয়ায়
ফেরারি পাখি খোঁজে ,ছোট্ট একটা নীড়।।
***************************************
Truth
Clive Norman
Hope swims eternally within the hearts.
Of all, who, in their wisdom, seek the purest of light,
Shining ever-brighter within the essence of soul’s ever-flowing consciousness
Wrapped within spiritually blessed swaddling clothes
Within the all-encompassing, warming silence of the purest of love and compassion,
Re-awakening within the ever-silencing still waters of thoughts, words, and deeds,
The unadulterated peace within timeless, serene tranquillities.
The untethering, mindfully awakening, spiritually endowed serpent’s blissfully natured, ultimate reality - truth!
******************
অন্ধকারের আত্মকথা
কল্যাণ ভট্টাচার্য্য
এতো আলোয় পুড়ে যাচ্ছি আমি
শব্দ খুঁজে পাচ্ছি না ,
হয়তো লুকিয়ে গেছে ঘরের কোনে
বাটিতে রান্নাঘর অন্ধকার
বটের বয়স জুড়ে,
কলতলায় এঁটো গন্ধ আর পরিযায়ী শ্যাওলা—
বৃদ্ধ দুপুর আলোকিত কি ?
বাংলার আবার এপার ওপার
ক্ষুধার্ত সকাল ভাগ করে খায় রোদ-চোখ
নদীর কপালে ঘাম ঝরা অপেক্ষা
রাত কবিতার দালানে চাপা কান্নার তরঙ্গ
শুকনো কালির গা ঘসে স্বাধীনতা
মিছিলের শব্দ গুনছে জানালার অন্ধকার।
চোরা গলি বনলতা খুঁজতে খুঁজতে
বৃষ্টি নেমে গেছে শহীদ বেদিতে ।।
***********************
আশ্রয়
সুজাতা দে
ভালোবাসা পানসে হয়ে গেলে
আলোবাসা ছুঁয়ে দিতে; মন চায়।
শুধু এই ইচ্ছে প্রকাশ করেছি তাই,
জুটলো চড়,লাথি;চুল ধরে টানাটানি।
কেন হে পুরুষ? প্রশ্ন তুলবো না?
প্রশ্ন তোলাও কি অপরাধ?
তবে প্র্যাক্টিক্যাল ক্লাসেই দেখা হবে এবার।
তোমাদের ইচ্ছেরা পুরুষালি কেতায়;-
কলার তুলে-বেশ ফলবান হতে পারে..
এতে দোষ ধরবার কিছুই নাকি নেই!
মেয়েদের ইচ্ছেরা ফলবতী হলেই দোষের?
কেন তুমিই তো বলতে,
তোর পিরীতে মরচে ধরে গেলে
চরজাগা নদীর বুকে বসাতি গড়বো।
তারার আলোয় শাণ দিয়ে
নয়া চাঁদের জোছনা ভাঙবো।
হরেক প্রেমে পোক্ত হয়ে যদি
একটা মরদ তৈরি হতে পারে তবে
একটা মাগী তৈরি হতে, কি কি লাগবে?
অসম্মান,করুণা,অবহেলা,অশ্রদ্ধা,চোখ রাঙানি..
পায়ে সমাজের বেড়ি পরানো,আরও কি কি?
আরও কি কি হাতিয়ার লুকিয়ে রেখেছো পুরুষ?
কেনরে মাগী; তোর বুঝি মন নেই-মান নেই?
সম্মান নেই,স্বাধীনতা-ইজ্জত-ইচ্ছেদের দাম নেই?
দে দে ভয় কিসের? ইচ্ছেদের ফলবতী হতে দে।
আলোবাসা ছুঁয়ে দ্যাখ একবার,পুরুষ কেমন আঙুল কামড়াতে থাকে।
পুরুষতো জানেইনা মাগী,তোর মনের গোপন কথা।
পুরুষের কাছে নারীমনের চাহিদা জানাবার সময় এসে গেছে এইবার ।
বলে দে মেয়ে,শাড়ি, গহণা,গাড়ি,বাড়ি,অর্থ,চাইনা। তোমার কাছে কিছুই চাইনা পুরুষ।
শুধু অবিচল বিশ্বাস আর
মাথা রেখে নির্ভার হওয়ার জন্য এক টুকরো শক্ত কাঁধ,
এইটুকু নির্ভরতা দিতে পারো কি ?
এই নির্ভরতার আরেক নাম যে; ভালোবাসা গো।
তুমি এতো জানো পুরুষ, এইটুকু জানো না!
*************
ঊর্মি
দেবাশিস ভট্টাচার্য্য
ঊর্মি তুমি কেমন আছো সোনা আমার ,
আজ দীর্ঘ দিন তোমার সাথে নেই কোনো যোগাযোগ ,
না না তোমার প্রতি আমার নেই কোন অভিযোগ।
তোমার জন্মদিনে সে দিন ফিরেছি অনেক রাতে
অতন্দ্র প্রহরীর মতন গিন্নী ছিলেন গেটের প্রহরায়,
প্রশ্নবাণে জর্জরিত আমি মিথ্যা বলতে পারি নি গো।
সত্যিই যে তোমাকে আমি ভালবাসি আপনার চেয়ে।
কে এই ঊর্মি? কেন আমার নতুন জি এফ।
হ্যাঁ। অকপট স্বীকার উক্তি আমার।
ছিঃ ছিঃ ছিঃ! এই বৃদ্ধ বয়সে পরকীয়া ?
দূর,প্রেমের আবার কোন বয়স আছে নাকি!
লজ্জা করে না? এই বয়সে এই সব করতে?
লজ্জা কিসের? যুদ্ধে আর প্রেমে লজ্জাহীন আমি।
মেয়েটির স্বামী কিছু বলে না?
না না। ঊর্মির তো এখনও বিয়ে হয়নি,
তা ছাড়া ওর বাড়ির লোকজনের ও আমাকে খুব পছন্দ
কি লজ্জার কথা। শেষে একটা অল্প বয়সী মেয়ের সাথে এই সব?
একদম বাজে কথা বলবে না। ঊর্মি আমার জান্।
ওঃ তাহলে রোজ বিকালে সেজে গুজে ওই পার্কে?
মোটেও না। আমি সরাসরি বাড়িতেই যাই।
আলাপ? হ্যাঁ আলাপ হয়েছিলো ফেসবুকে।
এবার বুঝলাম পেনশনের টাকায় কেন পড়ে টান।
আদর, হামি সব ই হয় ঊর্মির সাথে নিরালায় বসে।
সে তো বোঝাই যায় গালে লিপস্টিকের দাগে।
এই বয়সে তোমার এত সখ। বোকা তুমি,সখের তো নেই মৃত্যু।
আর ঊর্মিকে না দেখলে আমি মরেই যাব, এটা কিন্তু সত্যি।
কেন আমাকে দিয়ে আর চলে না বুঝি?
চলুক বা না চলুক ঊর্মিকে আমার চাই ই চাই।
কেন? কেমন দেখতে সে? ডানা কাটা পরী ,
অসাধারণ।
শুরু হলো ক্রন্দন, এবার অপেক্ষার হোক নিরসন।
দেরী না করে বিকালেই নিয়ে এলাম আমার ঊর্মিকে।
চারিদিকে হইচৈ , কি হয় কি হয়, এই ছিলো ভয়।
ঊর্মি কে জানো? তুমি ও চেনো। কে সে?
আমাদের পলাশের দু বছরের মেয়ে।
আমার ছোট্ট নাতনী যে সে।
গিন্নি হেসে বলে যাঃ তুমি না কি!
********************
Mirroring
Daniela Marian
The rock lifts me from the waves
I fall asleep on the shore when I get tired
I am enveloped in glints of mirrors
The sob listens to me at night
I collect the dew of spheres in my palm
They love each other like a summer dawn
Through my hair they ripple
It shine to just like the them
You are my vice because I love you
With sad eyes I touch your cheek
In the wave of the sea you are mirrored
I see your gaze on the waves.
********************
স্বামী
শান্তনু ঘোষ
।। ১ ।।
তুলির ফোনটা যখন এলো, অনিরুদ্ধ তখন অফিসের কাজে খুব ব্যস্ত। মোবাইলের স্ক্রিনে তুলির নামটা দেখার পর থেকে অনিরুদ্ধর কাজে আর মন লাগছিলো না। বারবার শুধু একটা কথাই মনে হচ্ছে, এতগুলো বছরের পর হঠাৎ তুলির ফোন! পাঁচ বছর হবে, তুলি তখন এগারো, ষষ্ঠ শ্রেণী। সব ঠিক আছে তো! সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতেই ফোনটা কেটে গেল। হাতে নিয়ে কল ব্যাক করতে যাবে, সেই সময় আবার বেজে উঠলো ফোন, আবার তুলি করেছে।
“হ্যালো”
ওপ্রান্ত থেকে তুলির উদ্বেগ ভরা কণ্ঠস্বর, “কাকু, মায়ের স্ট্রোক হয়েছে। হসপিটালে নিয়ে যাচ্ছি। বাবা অ্যামস্টারডাম গেছে। তুমি তাড়াতাড়ি এখানে এসো” একনাগাড়ে কথাগুলো বলে হাঁপাচ্ছে তুলি।
কথাগুলো শুনে অনিরুদ্ধর যেন দমবন্ধ হয়ে যাবে। স্থবিরের মতো বসে রইলো ফোনটা ধরে।
“হ্যালো, কাকু, শুনতে পাচ্ছ?”
তুলির কথায় নিজেকে ফিরে পেলো অনিরুদ্ধ, “হ্যাঁ, আমি আসছি। তুই একদম চিন্তা করিস না। কোন হসপিটালে নিয়ে যাচ্ছিস?”
অসহায় মানুষ হঠাৎ আশ্বাস পেলে চোখের কোন ভিজে আসে। নিজেকে আর একা মনে হয় না। এতক্ষণ যে কান্নাটা বুকের মধ্যে চাপা ছিল, হঠাৎ এক দমকায় সেটা বেরিয়ে এলো চোখের জলে, “মেডিকা। তুমি এক্ষুনি এসো। আমি একা, খুব ভয় করছে। “
।। ২ ।।
তুলির মা মল্লিকা আর অনিরুদ্ধর বড় হয়ে ওঠা একসঙ্গেই। একে অপরকে কবে থেকে চেনে সেটা ওদের আর মনে নেই। জ্ঞান হওয়ার পর থেকেই ওদের সম্পর্ক। তারপর স্কুলও এক, ক্লাসও এক এমনকি বিষয়ও এক। কলেজেও সেই ধারা অব্যাহত থেকেছে।
বন্ধুত্ব থেকে ভালোলাগা, ভালোলাগা থেকে ভালোবাসা। ওদের ভালোবাসায় কোন গতানুগতিক নিয়ম ছিল না। কলেজে এসে অনিরুদ্ধ উপলব্ধি করতে পেরেছিল, মল্লিকা শুধু ওর বন্ধু নয়, আরো বেশি কিছু। অনিরুদ্ধর যা আছে সব কিছুই সে মল্লিকাকে দিতে চায়, সব কথা, সকল আনন্দ, সমস্ত স্বপ্ন। কিন্তু মল্লিকাকে সে কথা বলা হয়নি কোনদিন। কেমন যেন লজ্জা পেয়েছিল। অনিরুদ্ধ ভেবেছিল মল্লিকা ঠিক বুঝে যাবে।
মল্লিকাও বুঝতে পেরেছিল। কিন্তু সে মনে করতো, “ভালোবাসি” এটা বলতে হয় কেন? ভালোবাসা তো একটা আস্বাদ যা উপলব্ধি করতে হয়, শরীরের প্রতিটি রন্ধ্রে রন্ধ্রে অনুভূত হয় ভালোবাসার পরশ। কে যেন জানিয়ে দেয়, প্রেম এসেছে।
।। ৩ ।।
তুলির ফোনটা রেখেই অনিরুদ্ধ রাজ্যের মুখ্য সচিবকে ফোন করে, সেখান থেকেই নির্দেশ যায় মেডিকার মেডিকেল সুপারিন্টেনডেন্ট, নিউরোলজির হেড অফ দ্য ডিপার্টমেন্ট আর মুখ্য প্রশাসনিক আধিকারিককে। অনিরুদ্ধ মিত্র, প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের একজন উচ্চপদস্থ অফিসার। এ রাজ্যের প্রশাসনিক মহলে কে না চেনে তাকে! চিকিৎসার যেন কোন ত্রুটি না হয়, দরকার পড়লে বাঙ্গুরেও কথা বলে রাখার নির্দেশ দেয় অনিরুদ্ধ। এয়ারপোর্ট যাওয়ার পথে সে নিজে ডাক্তারের সাথে কথা বলবে, সেই মতো ডাক্তারের ফোন নম্বরও চেয়ে পাঠায়।
গাড়িতে বসেই ডাঃ মজুমদারকে ফোন করে অনিরুদ্ধ, “হ্যালো, আমি অনিরুদ্ধ মিত্র বলছি। মল্লিকা বসু …
“ও হ্যাঁ, আপনার ফোনের অপেক্ষায় ছিলাম। এটা Acute intracerebral hemorrhage, উনি এখন অনেকটা Stable তবে এখনো জ্ঞান ফেরেনি। MRI Report এলে বোঝা যাবে অপারেট করতে হবে কি না।"
“চিন্তার কি কোন কারণ আছে?”
“আমার তো মনে হয় না, তবে রিপোর্ট গুলো হাতে এলে পরিষ্কার করে বলতে পারবো।"
“Thank you Doc আমি পৌঁছে আপনার সাথে দেখা করছি।"
“অবশ্যই।"
ফোনটা শেষ করে স্বস্তি পায় অনিরুদ্ধ। মাথাটা হালকা হয়ে আসে। একবার তুলিকে ফোন করে জানাতে হবে। রিং যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ফোনটা ধরে তুলি, বোধহয় ওর ফোনের জন্যই অপেক্ষা করছিল।
“হ্যালো কাকু, তুমি কখন পৌঁছবে?” মেয়েটা এখনো কেঁদে যাচ্ছে।
“আমি বেরিয়ে গেছি সোনা। তুই একদম চিন্তা করিস না, আমি ডাক্তারের সাথে কথা বলেছি। সব ঠিক আছে। ভয়ের কিছু নেই। তুই কিছু খেয়েছিস?”
“না।"
“কিছু খেয়ে নে। তোর মায়ের এখন অনেকগুলো টেস্ট হবে, তাতে সময় লাগবে। আমি এক্ষুনি আসছি।"
।। ৪ ।।
গ্রাজুয়েশনের পর অনিরুদ্ধ IAS -এর প্রস্তুতিতে লেগে যায়। ওর একটাই স্বপ্ন, বড় হয়ে IAS অফিসর হবে। মল্লিকা অনেক বলতো, “কি হবে বাবু হয়ে! এতো কষ্ট করে পরীক্ষা দিয়ে বাবু হবি আর তারপর অশিক্ষিত বা অর্ধ শিক্ষিত মন্ত্রীদের পদসেবা করবি।"
এই ব্যাপারে অনিরুদ্ধ মল্লিকার সাথে একমত হতে পারে না, “সে তুই যাই বল। অনেকের স্বপ্ন থাকে বড় হয়ে ডাক্তার হবে, ইঞ্জিনিয়ার হবে, পাইলট হবে, সেই রকমই আমি IAS অফিসার হবো।"
মল্লিকা চেয়েছিল অনিরুদ্ধ যেন তাড়াতাড়ি থিতু হয়। IAS পরীক্ষার থেকে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা গুলোর যেন প্রস্তুতি নেয়। বেসরকারি কতো রকম চাকরিও তো আছে। সেলস -এর চাকরি। চাকরির সাথে সাথে MBA টাও করে নেওয়া যেতে পারে। একথা সে বলেছিল অনিরুদ্ধ কে, কিন্তু অনিরুদ্ধ রাজি হয় নি।
মল্লিকার বাড়ির আর্থিক সচ্ছলতা ভালো নয়। মল্লিকা জানে ওর বাবা বেশি দিন অপেক্ষা করবে না। তবুও দু'বছর অপেক্ষা করেছিল মল্লিকা, ভেবেছিল অনিরুদ্ধর কিছু একটা হলেই সে বাবাকে বলবে। নিজেও চাকরির চেষ্টা করেছে, কিন্তু সফল হয়নি।
দু'বছরে অনিরুদ্ধ IAS পাস করতে পারেনি। অনিরুদ্ধ IAS উত্তীর্ণ হলো মল্লিকার বিয়ের ছ'মাস পরে।
সিদ্ধার্থ খুব ভালো ছেলে। একটি বহুজাতিক সংস্থার ভাইস প্রেসিডেন্ট। সারা পৃথিবী চষে বেড়াচ্ছে। হানিমুনে সুইজারল্যান্ড যাওয়ার পরিকল্পনা হয়ে গেছে। চেহারায় যেমন স্মার্ট, কথাবার্তায় তেমনি আধুনিকতা আছে। মল্লিকার ভাগ্য খুলে গেল এমন স্বামী পেয়ে। অনিরুদ্ধ নিজের সমস্ত দুঃখকে এক লহমায় বিসর্জন দিয়েছিল।
।। ৫ ।।
হসপিটালে এসে অনিরুদ্ধ দেখল, তুলি দাঁড়িয়ে আছে ICU – র বাইরে। অনিরুদ্ধকে দেখে তার কান্নার বাঁধ ভেঙে পড়ল। তুলির সঙ্গে ওদের পাশের বাড়ির জেঠু- জেঠিমা, অনিরুদ্ধ কে দেখে ওরাও যেন ভরসা পেল।
তুলির মাথায় হাত দিয়ে অনিরুদ্ধ বলল, “কাঁদছিস কেন, সব ঠিক হয়ে যাবে। বাবাকে খবর দিয়েছিস?”
“হ্যাঁ। বাবা ডাইরেক্ট ফ্লাইট পায়নি। জার্মানি হয়ে আসতে হবে। পরশু সকালে পৌঁছবে।"
ডাঃ মজুমদারের স্থূল চেহারা, মুখমণ্ডলে জ্ঞান আর অভিজ্ঞতার ছাপ স্পষ্ট। অনিরুদ্ধকে দেখে উঠে দাঁড়ালেন “নমস্কার মিঃ মিত্র। বসুন। “
তুলিকে সঙ্গে নিয়েই এসেছে । চেয়ার টেনে বসে দুজনে। ডাঃ মজুমদার বলতে শুরু করলেন, “দেখুন মিঃ মিত্র, এমনিতে আপনার পেসেন্ট এখন ভালো আছে, কিন্তু ওনার ব্রেনের একটা জায়গাটায় একটা ক্লট রয়েছে, যেটা এখনই অপারেট করলে ভালো হয়। দেরি করলে ভবিষ্যতে অনেক রকম সমস্যা হতে পারে। আমি চাইছি আজকেই এটা অপারেট করতে।"
“মানে, কোন জটিল অপারেশন নয় তো?”
“আরে না না, এটা খুব সাধারণ অপারেশন। তবে পেসেন্টকে কিছুদিন Observation - এ রাখতে হবে।"
অনিরুদ্ধ একবার তুলির দিকে তাকায়, বুঝতে পারে এখন সমস্ত সিদ্ধান্ত তাকেই নিতে হবে।
“ঠিক আছে ডাঃ মজুমদার। আপনি অপারেশন শুরু করুন। “
নিজের প্রভাবের জন্যই বোধহয়, নিয়মকানুনের বেড়াজাল তেমন ছিল না। শুধু একটা ফর্মে সই করতে হল।
অনেক বলা স্বত্বেও তুলি বাড়ি যেতে চায়নি। ওর পাশের বাড়ির জেঠু জেঠিমাও বসে রইল অপারেশন থিয়েটারের বাইরে।
।। ৬ ।।
মল্লিকার বিয়ের পরেও অনিরুদ্ধ যোগাযোগ রেখেছিল। কোলকাতায় গেলে ওদের বাড়ি যাবেই। প্রথম পোস্টিং ছিল চেন্নাই, তারপর আমেদাবাদ, লউখনউ হয়ে PMO তে পৌঁছেছিল। তুলি যখন হয়, তখনও অনিরুদ্ধই ছিল, সিদ্ধার্থ সেদিনেও ছিল বাইরে।
তুলি ওর বাবাকে যতটা চেনে, তার থেকে বেশি চেনে ওর অনিকাকুকে। ছোট থেকে অনিকাকু বলতে অজ্ঞান। সেই আধোআধো সময় থেকেই সমস্ত গল্পে, সব খেলায়, সকল আবদারে অনিকাকু। মল্লিকা কতবার বলেছে মামা বলতে, কিন্তু ও সেই ছোট থেকেই কাকু বলে এসেছে।
কিন্তু গত পাঁচ বছরে সব কিছু কেমন যেন ওলটপালট হয়ে গেছে।
সেদিন ছিল তুলির জন্মদিন। অনিরুদ্ধ শুধু সেদিনটার জন্যই লউখলউ থেকে কোলকাতা গিয়েছিল। বারোটায় কেক কাটা হোল, অতিথিরা সব এলো, চলেও গেলো কিন্তু সিদ্ধার্থ এলো না। তুলি খুব কেঁদেছিল সেদিন। অনিরুদ্ধ ওকে ছেড়ে যেতে পারেনি। সিদ্ধার্থ সেদিন ফিরেছিল ভোররাতে। অনিরুদ্ধকে দেখে সিদ্ধার্থ যেন কিছুটা অবাক হয়েছিল, “তুমি এখানে কি করছ?”
“ঐ তো তুলির জন্মদিনে এসেছিলাম, তারপর তোমার আসতে দেরি হচ্ছিল, তুলিও খুব জেদ করছিল, তাই………
“আমি এসে গেছি। তুমি এখন যাও।"
“না, মানে সকাল হতে তো আর বেশি দেরি নেই, সকাল সকাল বেরিয়ে পড়বো"
সেদিন সিদ্ধার্থকে যেন চেনা যাচ্ছিল না, “কোলকাতা শহরে অনেক হোটেল আছে অনিরুদ্ধ, তুমি সেখানে যেতে পারো।"
তুলি ঘুমিয়ে পড়েছে তখন। মল্লিকা বিদ্যুতের মতো ঘটে যাওয়া এই ঘটনায় জড়ভরতের মতো দাঁড়িয়ে আছে, অবাক দৃষ্টি নিয়ে দেখেছে সে সিদ্ধার্থ কে। পাঁচ বছর আগে সেই শেষ বার দেখেছিল অনিরুদ্ধ তুলিকে, ঘুমিয়ে ছিল। মল্লিকার চোখের কোন ভিজে ছিল বোধহয়।
সেদিন অনিরুদ্ধ এক নতুন সকালকে দেখেছিল, একদম আলাদা, একদম অচেনা।
।। ৭ ।।
অপারেশন খুব ভালো হয়েছে ডাঃ মজুমদার আশ্বাস দিয়েছেন। তুলি চলে গেছে ওর পাড়াতুতো জেঠু – জেঠিমার সাথে।
তুলি দিনের বেলায় আসে আর গত দু’রাত অনিরুদ্ধ থেকেছে একা মল্লিকার সাথে। যত্নের এতটুকু অবহেলা করেনি। সারারাত চেয়ে ছিল মল্লিকার মুখের দিকে। নার্সও এসে বলে গেছে, “আপনার স্ত্রী খুব লাকি, আপনার মতো স্বামী পেয়ে।"
অনিরুদ্ধ আশ্চর্য হয়েছে স্বামী শব্দটা শুনে। এই শব্দর সাথে জুড়ে আছে অনেক লুকানো অর্থ, প্রভু, রাজা, ঈশ্বর, সে এর কোনটাই হতে চায়নি। মল্লিকার হাতটা নিজের হাতের মধ্যে নিয়ে বলে,” আমি তো তোকে ভালোবাসি মলি, স্বামিত্ব তো চাইনি কোনোদিন। অধিকার বোধ জাগেনি কোনোদিন। কিন্তু গত পাঁচ বছরে একবারও আমায় মনে পড়লো না তোর? একবারও তোর জানতে ইচ্ছে করলো না, তুই ছাড়া আমি কেমন আছি?”
তৃতীয়দিন ভোরে মল্লিকার জ্ঞান ফিরল,অনিরুদ্ধ ছুটে গিয়ে নার্স কে ডেকে আনল। ফোন করে তুলি কে আসতে বলল। অনিরুদ্ধ চাইল জ্ঞান ফিরে মল্লিকা যেন তুলিকেই দেখে।
তুলির জন্য অপেক্ষা করতে থাকে হসপিটালের বাইরে। আবার একটা নতুন সকাল এসেছে, সেদিনের মতো একদম অচেনা। কিন্তু অনেক স্বপ্নকে রাঙিয়ে নিয়ে এসেছে এই নতুন সূর্যের আলো। অনিরুদ্ধ দিল্লী যাওয়ার ফ্লাইট টিকিট কাটার জন্য ওর সেক্রেটারি কে ফোন করে জানিয়ে দিল।
বিড়বিড় করে কি যেন বলছে মল্লিকা। কিছুই বোঝা যাচ্ছে না। নার্স কানের কাছে মুখ নিয়ে গিয়ে বলল, “আপনার স্বামী কে ডেকে দেবো। দু রাত ধরে উনি আপনার অনেক সেবা করেছেন। সত্যিই আপনি ভাগ্য নিয়ে জন্মেছেন।"
সকালের দিকে মল্লিকা অনেকটা সুস্থ হয়ে এলো। তুলিকে দেখতে চাইল। তুলি আসতেই ওকে কাছে টেনে নিয়ে জিজ্ঞাসা করল, “তোর বাবা কোথায়?”
“বাবা তো এখনো আসেনি মা।"
মল্লিকা নিজের হাতকে স্পর্শ করে, এক অন্য অনুভূতি, অনেক কিছু লেখা আছে সেই অনুভূতির গভীরে।
********************************
বৃষ্টিস্নাত সবুজ
মালা সেন দে
উড়ো মেঘেদের চিঠি এলো লালমাটির আকাশে,
সারাদিন মেঘের সাথে ঘুরে বেড়ালাম ।
রাত্রির অগোচরে সীমানা ছাড়ায় বৃষ্টির উদ্দামতা ,
একবার মুগ্ধ হতে চাই তোমার প্রতিটি ফোঁটার স্পন্দনে ।
বাতি স্তম্ভের ঝাপসা আলোয় দেখা ,
বহুতলের রুক্ষ শরীরে ভেজা আল্হাদ ছড়িয়ে পড়ে ।
।
ইঁটের পাঁজরে জমানো ছিল কিছু ক্ষোভ, অভিমান,
বৃষ্টিস্নাত হয়ে শরীর থেকে শরীরে পাঠালো সংকেত ।
বর্ষা এসেছ আজ নবযৌবনারূপে ধরায় ,
কদম , কামিনী , মাধবীলতা জানায় ইশারায় ।
খুলে দি জানালা , হওযায় ছড়িয়ে পড়ে মিষ্টি সুবাস ,
যে ঘর তপ্ত ছিল ভরা বোশেখে ,
আজ বৃষ্টির ছাট ভিজিয়ে দেয় দৃপ্ত পটভূমি,
নিবিড় ছোঁয়ায় লাগে শিহরন ।
কৃষ্ণ মেঘে ঘন ঘন বিদ্যুতের চমক ,
বৃষ্টির প্রবল শব্দে চারিদিক এক স্বপ্নময় !
এতদিন যে মনে ছিল স্নিগ্ধ হওয়ার বাসনা।
ভাবের ঘরে সঙ্গী হয়ে দুচোখ মেলে দেখে ।
পদ্ম, শালুক আসার খবর পেয়ে হয়েছে আত্মহারা ,
সৃষ্টির উৎসবে এই মন চায় একবার ছুঁয়ে দেখি ।
অদ্ভুত লাবণ্য ধারা গড়িয়ে পড়ে সৃষ্টির আনন্দে,
বেদনায় কুঁকড়ে যাওয়া কুঁড়ির আবার ফুটতে চাওয়া ।
অতীতের কিছু বিবর্ন স্মৃতি ডানা মেলুক আপন ছন্দে ,
যা এতদিন ছিল চাপা পড়ে থাকা কিছু ইঁটের খাঁজে ।
বৃষ্টির জলে ভেজে চোখের পাতা,কালো অন্ধকারের গভীরে,
অপূর্ব রূপের মাদকতা জাগে সবুজ হওয়ার বাসনায়, প্রকৃতির শ্যামলে॥
অবসরের আকাশের বাগানে---শান্তিনিকেতন
*************************************
OO ব্রহ্মাণ্ডের (Universe) রহস্যময় শব্দ OO
TG Roy
"অজানা ভাষা দিয়ে পড়েছ ঢাকা তুমি, চিনিতে নারি তোমারে আমি ! কুহেলী আছে ঘিরি, মেঘের মতো তাই দেখিতে হয় গিরি"।
কি তার অর্থ কেমন তার অনুভুতি কার উদ্দেশ্যে.....
কিছুই জানা হয় না।
প্রায় তিন যুগ পূর্বে আমার কর্মস্থল রৌমারীতে যাতায়াত কালেও মাঝ দরিয়া থেকে শুনতে পাওয়া যেত উত্তাল ব্রহ্মপুত্রের হাড়হিম করা সেই রহস্যময় গোঙানির শব্দ!
ছাত্র থাকাকালীন একবার "নিরিবিলি জীবন" খুঁজবার উদ্দেশ্যে আলিপুরদুয়ার জংশন লাইনের ঘন বন জঙ্গল পরিবেষ্টিত উচু পাহাড়ের মাঝখানে অপূর্ব সুন্দর 'সেবক রেলওয়ে ষ্টেশন' এর পাশেই থাকবার সুযোগ হয়েছিল। সেবক রেলওয়ে স্টেশন সেবক-রংপো রেলওয়ে লাইন হল ভারতের পশ্চিমবঙ্গ এবং সিকিম রাজ্যগুলির সাথে সংযোগকারী লাইন। এটি নিউ জলপাইগুড়ি-আলিপুরদুয়ার-সমুকতলা রোড লাইন থেকে সেবক রেলওয়ে স্টেশন, দার্জিলিং জেলার শিলিগুড়ির কাছে সেবক টাউন থেকে শাখা প্রবাহিত হয় এবং পশ্চিমবঙ্গের কালিম্পং জেলার গ্রাম ও শহরের মধ্য দিয়ে চলে এবং সিকিমের পাকিয়ং জেলার রংপোতে রংপো রেলওয়ে স্টেশনে শেষ হয়।
এর কাছেই ছিল পাহাড়ের গভীর গিরিখাত চিরে নেমে আসা তিস্তা নদী। সেখানে নদীর উপরে নির্জন সেবক রেলওয়ে ব্রীজ থেকে "তিস্তা নদীর ভয়ংকর হরপা বান" দেখবার সুযোগ হয়েছিল। হড়পা বান হল একটি প্রকারের বন্যা যা অতিরিক্ত জল সৃষ্টি হলে ঘটে। উচ্চ পার্বত্য অঞ্চলে অতিধিক বৃষ্টি বা হিমবাহ সৃষ্টি হ্রদের জলে আচমকা বাঁধ ফেটে বন্যার সৃষ্টি হলে, তাকে হড়পা বান বা (Flash Flood) বলে।
"হরপা বান" সেবক এ আঘাত হানার ঠিক আগ মুহূর্তে হঠাৎই জলস্তর ফুলে উঠেছিল তিস্তা নদীর। সেই সাথে ছিল উন্মত্ত তিস্তার সর্বনাশা প্রায় ৬/৭ ফুট উচ্চতার জলপ্লাবন আর এক রহস্যময় ভৌতিক আতঙ্কিত শব্দ! সেই "হরপা বান" রেখে গিয়েছিলো অসংখ্য মানুষের মৃত্যু আর চারিদিকে ভয়াবহ ধ্বংসলীলা।
অনেকদিন দিন আগে আসামের ডিব্রু-সাইকিয়া জাতীয় উদ্যানে বিনা অর্থ ব্যয়ে এক সপ্তাহ রাত যাপনের সুযোগ হয়েছিল। ভরা পূর্ণিমার জোস্নাস্নাত গভীর রাতে বিশাল উদ্যান ব্যাপী অপূর্ব এক হৃদয়কাড়া মর্মরধ্বনি শোনা যেত! এই শব্দটি আমার কানে পৌঁছানো মাত্রই মুহুর্তের মধ্যেই আমার মনটা খুশিতে ভরে যেত। মনে হতো অপরূপ সুরের লহরী আর নীল আকাশের দলছুট সাদা মেঘের ছোট ছোট ঢেউ খেলানো দ্বীপপুঞ্জ অসংখ্য তাঁরার মালা পড়ে মাটির পৃথিবীকে সাজিয়েছে এক মোহময়ী প্রেয়সীরুপে আর এক অজানা পরীর কন্ঠের সেই মর্মর সুরের আবেশ আমাকে সব ভুলিয়ে নিয়ে যেত নির্জন বন বিভাগের উচু বাংলোর খোলা ব্যালকনি থেকে এক ভিন্ন জগতে যেখানে নেই কষ্ট আর অভিমান শব্দের অভিধান। এক প্রচন্ড উন্মাদনা আর আবেগে মনে হতো চাঁদনী রাতে নক্ষত্রখচিত নীল আকাশের মধ্যে ভেসে যাচ্ছি অন্য এক দুনিয়ায়। পৃথিবীর কোন ভাষাতেই এই সুখানুভূতির বর্ণনা দেয়া অসম্ভব।
এসব "রহস্যময় শব্দ" থেকে গেল আমার জীবনে চিরকাল অজানা আর জানা হলো না কেমন ছিল তাদের সবার অনুভূতি..... কি ছিল সেসব ভাষার মর্মার্থ!!
000 অনবচ্ছিন্ন আমি 000
আজি মগ্ন হয়েছিনু ব্রহ্মাণ্ড মাঝারে;
যখন মেলিনু আঁখি, হেরিনু আমারে ||
ধরণীর বস্ত্রাঞ্চল দেখিলাম তুলি,
আমার নাড়ীর কম্পে কম্পমান ধূলি ||
অনন্ত-আকাশ-তলে দেখিলাম নামি,
আলোক-দোলায় বসি দুলিতেছি আমি ||
OO বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর OO
বিজ্ঞানীরা দীর্ঘকাল গবেষণা করে নির্ণয় করেছেন যে এ বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সৃষ্টি শুরু হয়েছিল আজ থেকে প্রায় ১৫০০ কোটি বছর পূর্বে এবং অদ্যাবধি এ সৃষ্টিধারা অব্যাহত রয়েছে। বিজ্ঞানীরা এ তত্ত্বটির নাম দিয়েছিলেন বিগ ব্যাং থিওরি (Big Bang Theory)। তথ্যটি নেহাৎ অলিক নয়, কারণ এ আবিষ্কারের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকার জন্য বিশ্বনন্দিত বিজ্ঞানীরা তিন তিন বার নোবেল পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন: ১৯৭৮, ২০০৬ এবং ২০১১। জগৎ বিখ্যাত বিজ্ঞানীরা হলেন আর্ম পিনাজিয়াস ও রবার্ট উইলসন (১৯৭৮), এবং জন মাথার ও জর্জ স্মুট (২০০৬)।
এ আবিষ্কারের প্রথম দিকে ধর্মীয় নেতারা উচ্চ বাচ্চ্য করলেও নোবেল প্রাপ্তির পর তারা কিছুটা নড়ে চড়ে বসেন এবং বলতে শুরু করেন যে তাদের ধর্মেও এর কিছুটা আভাস আছে। একটি গবেষণার ফলকে অতি সহজেই তুলেধুনা করা যায় কিন্তু সেটি যখন নোবেল পুরষ্কারে ভূষিত হয়, তখন কটাক্ষ করলে জনরোষে পড়ার প্রভূত আশঙ্কা থাকে। তাই জগৎ সৃষ্টির এ তত্ত্বটিকে অগত্য মধুসুধনের মতো হজম করতে হয়েছে ধর্ম গুরুদের।
তবে একটি ধর্মের সঙ্গে এ সৃষ্টি তত্ত্বটির মিল ছিল এবং সেটি হচ্ছে সনাতন ধর্ম। মহামূল্য ঋগবেদের নিসা পর্বে ১৬টি শ্লোকে বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডের সৃষ্টি রহস্যের কথা বর্ণনা করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে যে এ বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সৃষ্টি শুরু হয়েছিল একটি বিন্দু থেকে।
অতি সংক্ষেপে দেখা যাক বিগ ব্যাং (Big Bang) তত্ত্বে বিজ্ঞানীরা কী বলেছিলেন এ বিশ্বব্রহ্মাণ্ড উৎপত্তি কারণ হিসেবে। তাদের মতে এ বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের উৎপত্তি শুরু হয়েছিল একটি অতি ক্ষুদ্র দানা থেকে এবং সৃষ্টির প্রাথমিক কালে মহাবিশ্ব সুষম এবং সমতাপীয় রূপে একটিই অতি উচ্চ শক্তি ঘনত্ব এবং উচ্চ তাপমাত্রা ও চাপবিশিষ্ট পদার্থ দ্বারা পূর্ণ ছিল। পরবর্তিতে এ ক্ষুদ্রকায় বিন্দুটি সম্প্রসারিত হতে থাকে, তবে কোথায় হতে এবং কিভাবে এ অতি ক্ষুদ্র পিণ্ডটি আবির্ভূত হয়েছিল তার হদিস বিজ্ঞানীরা আজও খুঁজে না পেলেও এটি স্পষ্টভাবে প্রমাণ পেয়েছিলেন যে ওই ক্ষুদ্র বিন্দুটি ছিল একক্ধর্মী বা সুষম (singularity) এবং ওই বিস্ফোরণের পূর্বে না ছিল কোনো সময় (time), না জায়গা (space) এবং না কোনো পদার্থ (matter) |
এই ক্ষুদ্র বিন্দুটি প্রসারিত হতে হতে এক সময় বিশালকায় পরিণত হয়ে বিস্ফোরিত হয় এবং তার সমস্ত শক্তিকে তিনটি ভাগে নির্গত করে: ১) তাপ (৪২০০০ ডিগ্রি কেলভিন) ২) শব্দ এবং ৩) আলোক রশ্মি, এবং একই সঙ্গে সময়ের সূচনা ঘটে। অতঃপর গত ১৫০০ কোটি বছর ধরে এ শক্তির প্রভাবেই সৃষ্টি হয়ে চলেছে আমাদের মহাবিশ্ব। মহাবিস্ফোরণের প্রায় ৩৮০,০০০ বছর পর শক্তি হতে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পরমাণু, তার পর পরমাণু থেকে অণু এবং অণু থেকে মৌলিক এবং মৌলিক থেকে নানাবিধ যৌগিক ও মহাযৌগিক পদার্থের সৃষ্টির একেবারে শেষ পর্যায়ে আমরা পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ অথচ অকৃতজ্ঞ জীব ‘মানুষ’ তৈরি হয়েছি। অকৃতজ্ঞ শব্দ শুনে হয়তো আমার ওপর অনেকেই রুষ্ঠ হতে পারেন কিন্তু নিরপেক্ষভাবে চিন্তা করে দেখুন আমি হয়তো অত্যন্ত নিষ্ঠুর সত্য কথাটিই আমাদের সম্পর্কে বলেছি। যাই হোক এ বিষয়ে পরে আরও বিস্তর আলাপ করা যাবে।
মহাকাশে শব্দের কোনও অস্তিত্ব নেই। শব্দের প্রবাহের জন্য বাতাসের প্রয়োজন ! মহাকাশে সেটিরও অস্তিত্ব নেই। ফলে মহাকাল শব্দহীন।
এমনটাই বিশ্বাস ছিল। কারণ বৃহস্পতিবার সারা বিশ্বের জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা ঘোষণা করেছেন যে তারা মহাকর্ষীয় তরঙ্গের অস্তিত্বর প্রমাণ পেয়েছেন। যা বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের শব্দ বলেই বিবেচনা করছেন তাঁরা। যাকে বিজ্ঞানীরা নাম দিয়েছেন, 'Background Hum'।
অবশ্যই বিজ্ঞানের ইতিহাসে এটি অন্যতম মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হবে। গবেষণার নতুন দিগন্তও উন্মোচিত হবে বলে আশা রাখা হচ্ছে। যদিও এক শতাব্দীরও বেশি আগে অ্যালবার্ট আইনস্টাইন প্রথম ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন এই মহাবিশ্বের শব্দের বিষয়ে।
বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের নিজস্ব শব্দ রয়েছে, যা অনেকটা ব্যস্ত রেস্তরাঁয় বসে থাকার সমান। একাধিক মহাকর্ষীয় তরঙ্গের ফলেই তৈরি হয় এই বিশেষ শব্দ। দীর্ঘদিনের গবেষণার পর সেই মহাকর্ষীয় বিষয়ে তথ্য-প্রমাণ পেয়েছেন বিশ্বের একাধিক জ্যোতির্বিদ। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন তথা বাঙালি বিজ্ঞানীরাও।
গত বৃহস্পতিবার ২৯শে জুন ২০২৩ এ এমনটাই দাবি করেছেন তাঁরা। ইতিমধ্যেই মহাবিশ্ব সংক্রান্ত গবেষণায় সাড়া ফেলে দিয়েছে এই খবর। সূত্রের খবর, প্রায় একশো বছর আগে বিষয়টি প্রথম সামনে আনেন অ্যালবার্ট আইনস্টাইন। তিনি জানান, এই মহাকর্ষীয় তরঙ্গগুলি আলোর গতিতেই ছুটতে সক্ষম। এরপর থেকেই চলছিল বিস্তর গবেষণা।
আমেরিকা, ইউরোপ, চীন, ভারত এবং অস্ট্রেলিয়ায় কয়েকশত বিজ্ঞানী রেডিও টেলিস্কোপ ব্যবহার করে বছরের পর বছর কাজ করার পর এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন। অবশ্যই বিজ্ঞানের ইতিহাসে এটি অন্যতম মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হবে। গবেষণার নতুন দিগন্তও উন্মোচিত হবে বলে আশা রাখা হচ্ছে। যদিও এক শতাব্দীরও বেশি আগে অ্যালবার্ট আইনস্টাইন প্রথম ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন এই মহাবিশ্বের শব্দের বিষয়ে। তিনি বলেছিলেন, মহাকর্ষীয় তরঙ্গগুলি আলোর গতিতেই থাকে। ফলে তা বাধাহীনভাবে সমস্ত কিছুর মধ্য দিয়ে ঘুরে বেড়াতে সক্ষম।
যদিও আইনস্টাইনের বক্তব্যকে পরীক্ষা করার সুযোগ ঘটেনি। ২০১৫ এর পর দুটি ব্ল্যাক হোলের সংঘর্ষের ফলে তৈরি প্রথম মহাকর্ষীয় তরঙ্গ সনাক্ত করা গিয়েছিল মার্কিন এবং ইতালীয় মানমন্দিরগুলিতে। সেই সময় থেকে বিশ্বাস জন্মাতে থাকে যে মহাকাশেও 'শব্দের' অস্তিত্বও হয়ত রয়েছে। তবে তা 'হাই ফিক্রোয়েন্সি'। সাধারণ ডেসিবেলে নেই বলেই সে শব্দ কানে শোনা যায় না। কিন্তু কয়েক দশক ধরে বিজ্ঞানীরা কম-ফ্রিকোয়েন্সি মহাকর্ষীয় তরঙ্গের জন্য অনুসন্ধান করছেন, যা Background Hum এর মতো মহাকাশের মধ্য দিয়ে ক্রমাগত ঘূর্ণায়মান বলে মনে করা হয়। ইউরোপীয় পালসার টাইমিং অ্যারে-এর মাইকেল কিথ সংবাদসংস্থা এএফপিকে বলেন, "আমরা এখন জানি যে মহাবিশ্ব মহাকর্ষীয় তরঙ্গে পরিপূর্ণ। ফলে ব্রক্ষাণ্ড যে শব্দহীন এ কথা আর এখন বলা যাবে না।
রেডিও টেলিস্কোপের সাহয্যে এই বিশেষ তরঙ্গের সন্ধান করছিলেন উত্তর আমেরিকা, ইউরোপ, চীন , ভারতীয় ও অস্ট্রেলিয়ার কিছু বিজ্ঞানী। ২০১৫ সালে প্রথমবার এই ধরনের শব্দতরঙ্গের হদিশ পায় মার্কিন ও ইতালীয় অবজার্ভেটরি। জানা গিয়েছিল, দুটি ব্ল্যাক হোল বা কৃষ্ণগহ্বরের সংঘর্ষের ফলেই তৈরি হয়েছিল সেটি। যদিও সেই তরঙ্গের তীব্রতা ছিল অনেক বেশি। বিশেষজ্ঞদের মতে, এর পাশাপাশি কম তীব্রতার বিভিন্ন মহাকর্ষীয় তরঙ্গ রয়েছে। যেগুলি বারবার সৃষ্টি হতে থাকে। তার ফলেই তৈরি হয় এক অদ্ভুত আবহ। গত বৃহস্পতিবার অবশেষে সেগুলির সন্ধান পেলেন জ্যোতির্বিদরা।
আইসার কেরালার গবেষক ফজল করিম। তিনি বলেন, সরাসরি আমরা তরঙ্গ দেখতে পারি না। মৃত বা মৃতপ্রায় একাধিক তারার উপর পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে এই তরঙ্গের অস্তিত্ব বুঝতে হয়। এই তরঙ্গের ফলে সূর্যের চেয়ে কয়েকশো কোটি গুণ বেশি ভরের তারাগুলিতে সামান্য চ্যুতি ঘটে। তখন ছন্দপতন ঘটে তাদের রেডিও ফ্রিকোয়েন্সিতে। কয়েক বছর ধরে সেই ছন্দপতনের হিসেব করে কম তরঙ্গ দৈর্ঘ্যের ইনপিটিএ অন্তত দশটি পালসার বা মৃতপ্রায় তারাকে পর্যবেক্ষণ করে। মহাকর্ষীয় তরঙ্গে যে ইঙ্গিত আমরা এখনও পর্যন্ত পেয়েছি, তা নিশ্চিত করতে আরও কয়েক বছরের গবেষণা প্রয়োজন। এর থেকে জানা যাবে, আমরা বিশাল মহাবিশ্বের কোন স্পেস-টাইমে অবস্থান করছি। সেটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
এই গবেষণায় রয়েছেন দুই বাঙালি। তাঁরা চেন্নাইয়ের ইনস্টিটিউট অব ম্যাথামেটিক্যাল সায়েন্সেসের গবেষক মঞ্জরি বাগচি (যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষার্থী) এবং প্রতীক তরফদার (কলকাতা সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজের প্রাক্তন শিক্ষার্থী)।
■লেখক চিরকৃতজ্ঞ রইল বর্নিত তথ্য সূত্রের কাছে।
তথ্যসূত্র :
১। Background Hum
২। Magazine of the Department of Electrical Engineering, IIT Bombay.
৩। BBC
**********************

0 মন্তব্যসমূহ