পোস্ট বার দেখা হয়েছে
তালসারির সমুদ্রে খুব একটা গর্জন নেই, যেটা আছে সেটা যেন অনেকটা গোঙানির শব্দ। সাগরের চরা যেখানে শেষ হয়ে একটা রাস্তা ধরে ওপরে উঠেছে সেখানে এক চায়ের দোকানে বসে একজন বৃদ্ধ বড় অদ্ভুতরকমের একটা কথা বলেছিলেন।
-- আসলে সমুদ্রকে পেয়ে সুবর্ণরেখা খুশী হয়নি। সেকানেই ওদের সঙ্গমে আনন্দ উচ্ছ্বাস নেই, শুধু ধর্ষিতা সুবর্ণরেখার ব্যথার, কষ্টের, যন্ত্রণাবোধের গোঙানোর শব্দ। দেখোনা গঙ্গার মিলন যে উচ্ছ্বাসে গঙ্গার বুকে বান ডাকে এখানে সেসব কোথায়? এখানে শুধু শুকনো বালুচর। আর দেখো, নদীও যেন দু ঠ্যাঙ ফাঁক করে নিঃশব্দে আত্মসমর্পণ করেছে সমুদ্রের কাছে।
সেকথাগুলো যেন রোজ একবার করে ঘুরেফিরে শ্রেয়ানের মনের মধ্যে ঘুরপাক খায়। কিন্তু আজকের এই বাইকের ছেলেটা কী অদ্ভুত! আর ওর কথাগুলিও কী গভীর!
--- তবে ভালো গান গায়। ওর গান শুনলে নদীও থমকে দাঁড়িয়ে শোনে।
হঠাৎ করেই যেন শ্রেয়ানের সামনে থেকে সমুদ্র মুছে গেলো, আকাশের চাঁদ হারিয়ে গেলো, হারিয়ে গেলো বালুচর। এক চরম বিশৃঙ্খলার উন্মত্ত আওয়াজে ভরে গেলো ওর চেতন। ও ওর সামনে দেখতে পাচ্ছে হাওড়া জেলার এক গ্রামীণ জলসার দৃশ্য। পাঁচ হাজারেরও বেশী উপস্থিত দর্শক রাগে ক্ষোভে ফেটে পড়েছেন। কোনো সংগঠককে ডায়াসের ওপরে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। উন্মত্ত মানুষেরা চেয়ার, চারদিকের দেওয়ালের রঙিন কাপড়, চট ত্রিপল, হাতের সামনে যা পাচ্ছে তাই ছিঁড়ে ফেলছে বা ভেঙে ফেলছে। চরম বিশৃঙ্খল অবস্থা। কলকাতা থেকে যেসব শিল্পীদের আসার কথা ছিলো তারা কেউ এসে পৌঁছোন নি। আদৌ আসবেন কিনা, সংগঠকেরা সেটাও শিওর করে বলতে পারছেন না। চড়চড় করে এককোণের ত্রিপল ছেঁড়ার আওয়াজ হলো। ঠিক সেই মূহুর্তে স্টেজের আলো নিভে গেলো আর ভেসে এলো লতা মঙ্গেসকারের একটা গানের সুর -- ইয়ে মেরে বতন কি লোগো
তুম খুব লাগালো নারা
ইয়ে শুভ্ দিন হ্যায় সবকা
লহেরে লো তেরঙ্গা প্যারা
পর মত ভুলো সীমা পর
বীর নে হায় প্রাণ গবায়ে
কুছ ইয়াদ উনহে ভী করলো
যো লটকে ঘর না আয়ে ---
ইয়ে মেরে বতন কি লোগো,
যারা আঁখ মে ভরলো পানি,
যো শহিদ হুয়ে হ্যায় উনকি
যারা ইয়াদ করো কুরবানি...
স্টেজে তিরঙ্গা আলো খেলে বেড়াচ্ছে। সমস্ত অডিয়েন্স নির্বাক। সুরলহরী খেলে বেড়াচ্ছে উপস্থিত পাঁচ হাজার দর্শকের মনে। সবাইকে যেন এক লহমায় যাদু করে নিয়েছে বছর পনেরোর মেয়েটি। বাড়িতে পড়ার সাধারণ একটা এক কাটের ফ্রক। হাতে কর্ডলেস মাউথপিসে ঠোঁট ছুঁইয়ে চোখ বন্ধ করে গেয়ে চলেছে লতা মঙ্গেসকারের গান। সে গান শেষ হতেই শুরু করলো ছমছম বাজে রে পায়েলিয়া, আজ নয় গুনগুন গুঞ্জন প্রেমের, কী লিখি তোমায়।
গান শেষ করে সবাইকে প্রণাম করে স্টেজ থেকে নামতে যেতেই শুরু হলো আরেক বিপত্তি। ততক্ষণে কলকাতার শিল্পীরা পৌঁছে গেছেন কিন্তু স্রোতারা পাগলের মতো চিৎকার করে চলেছে ওই কিশোরীর গান শুনবে বলে। অন্য কারো গান আজ হবে না। আজ শুধু সেই কিশোরীর গানই হবে সারাটা সময়।
শ্রেয়ান সেই গান শুনছে বালির চরায় দাঁড়িয়ে। আজ সারাটা রাত ও ফিরবে না। মাথার চাঁদ হেলে পড়ুক পশ্চিমে, পাখিরা ফের ভোরের গান ধরুক। শ্রেয়ান আজ সারারাত ধরে মঞ্জিলার কাছে যে গানগুলো শুনেছে শুধুমাত্র সেই গানগুলোকেই মনের লংপ্লে রেকর্ডার চালিয়ে একের পর এক শুনে যাবে।
-- বাবু, বাড়ি ফিরবেন না?
সেই বাইকের ছেলেটির ডাকে হুঁশ ফিরলো শ্রেয়ানের।
-- বাইক থেকে আপনাকে নেমে পড়তে দেখেই আমার মনে হয়েছিলো, আজ আপনার মন... চলুন বাবু, আপনাকে বাড়ি পৌঁছে দিয়ে আসি।
-- আমার যে মনের বসত ছাড়া আর কোনো চালাঘর নেই রে বাবু, আমার যে নিজস্ব কোনো আটচালা নেই...
ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠে শ্রেয়ান। সমুদ্রের বাতাসে যেন ওর কথাগুলো প্রতিধ্বনিত হয়ে ঘুরপাক খেতে থাকে -- আমার যে মনের বসত ছাড়া...
( ক্রমশ )

0 মন্তব্যসমূহ