দর্পণ || রবীন্দ্র - নজরুল সংখ্যা || আলোচনা




পোস্ট বার দেখা হয়েছে

রবিঠাকুরের জন্মদিন

শরণ্যা চক্রবর্ত্তী 


সকালবেলা উঠেই নিজের ফোনটা নিয়ে ফেসবুক আর ওয়াটসআপে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছবি পোস্ট করলাম।আরও অনেকে ছবি পোস্ট করেছে।দর্পণেও প্রচুর কবিতা এসেছে।

আজ অফিস ছুটি।করার মত কিছু নেই বলে বারান্দায় বসে একটা গল্পের বই পড়ছিলাম।কাছেই কোথাও কোন ফাংশন হচ্ছে।সেখান থেকে গানের সুর ভেসে আসছে।রবি ঠাকুরেরই গান।কি গান যেন,খুব চেনা।রবিঠাকুরের প্রায় সব গানই জানি,গান শিখতাম তাই।

আমার কিছুতেই মনে পড়ল না।কিন্তু কেন?যদি কোন আধুনিক গান হত ঠিক মনে পড়ত।

এমন সময় মা ডাকল।বলল

'বই এর তাকটা গুছিয়ে রাখ।আর ঐ পুরনো গীতবিতানটা  আলাদা করে রাখবি বিক্রি করব।'

বইয়ের তাকটা গোছাতে গোছাতে গীতবিতান,গল্পগুচ্ছ,

গোরা এই বইগুলো পেলাম।আমারই।ওগুলোপড়ি না আর।

এখন নতুন নতুন ইংরেজি বই

গুলো আমার মন কেড়েছে।

ড্রয়িংরুমে গিয়ে দেখি,প্রতি বছরের মত মা একটা রবি ঠাকুরের ছবি সাজাচ্ছে।মাকে বললাম'মা সারাবছর এই ছবি টা কোথায় থাকে?দেখি না তো।'

মা বলল'কোথায় আবার থাকবে,স্টোররুমে থাকে।এ দিনটাই বের করি।'

মনে কোথাও যেন খুব ব্যাথা পেলাম।কেন জানি না।

রাতে স্বপ্নে দেখলাম রবিঠাকুর আমার সামনে বসে আছেন।

আমি তাঁকে বললাম'শুভ রবীন্দ্রজয়ন্তী রবি ঠাকুর।'

তিনি মুখ তুললেন।তাঁর মুখে বেদনার ছাপ।তিনি বললেন'সত্যিই এইদিনটাই আমার জন্য শুভ।এইদিনটাই তোমরা আমাকে মনে কর।ছোটদের আমার গল্প বল।ভালো লাগে।কিন্তু তারপর!

-এরকম কেন বলছেন কবিগুরু!আমাদের মনে আপনি সদাই আছেন।

-আছি তো।অপদার্থ,ভুলে যাওয়া এক ব্যক্তি রূপে।মনের স্টোররুমে পড়ে আছি।কেউ মনে রাখে না।

-কেন?ফেসবুকে তোমার কত ফ্যানপেজ।তারা প্রতিদিন তোমায় নিয়ে পোস্ট করে।

-করে।ঠিকই।কিন্তু তা দেখে

কজন?আনন্দ পায় কজন?মন

দিয়ে দেখে কজন?আমার ছবি

দেখে লাইক করে ছেড়ে দেয়।আর আমি কি তা চেয়েছি?আমি চেয়েছি,সবাই আমার লেখা পড়ুক।আমাকে ভালোবাসুক।মনে রাখুক।কিন্তু,

রবীন্দ্রজয়ন্তীর দিনই সবার মনে পড়ে,রবীন্দ্রনাথ বলে কে যেন একজন ছিল!' 


লজ্জায় নত হল নতুন প্রজন্ম।

===

রবীন্দ্র-নজরুল

রীতা চক্রবর্তী ( লিপি )


ক'দিন আগে পর্যন্ত টেলিভিশনের পর্দা থেকে কানে ভেসে আসত একটি গানের কলি.. 'হৃদয় মোদের রবি নজরুল বক্ষে লালন সাঁই'...গানটি যে আক্ষরিক অর্থেই সত্যি তা আজ আমরা সংস্কৃতি প্রেমীরা মর্মে মর্মে উপলব্ধি করছি।

       আমারতো মনে হয়, রবি ঠাকুর যদি আমাদের বুকের বাম প্রকোষ্ঠে বিরাজ করেন  তবে নজরুলের নিবাস বুকের ডান অলিন্দে।তাঁদের রচিত সাহিত‍্য ,গান ,কবিতার মধ‍্যেই আমরা জীবনের মূল‍্যবোধ খুঁজে পাই, খুঁজে পাই জীবনের দিশা। বাংলা সাহিত্যের আকাশে অন্যতম দুই উজ্জ্বল নক্ষত্র হলেন বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। তিনি জন্মগ্রহণ করেন ১৮৬১ সালের ২৫শে বৈশাখ। এর পরেই আরেক দিকপাল কাজী নজরুল ইসলামের জন্ম ১৮৯৯ সালের ১১ই জৈষ্ঠ্য। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যেমন আমাদের বিশ্বকবি, ঠিক তেমনি নজরুল আমাদের জাতীয় কবি। দুজনের দুই ধারা কবে যেন বাঙালির মননে মিলে মিশে একাকার হয়ে গেছে।সাহিত্য, সমাজনীতি, রাজনীতি প্রতিটি স্তরের নির্মাণেই বাঙালি আজো ঋণী এই দুজনের কাছে। এই দুজন বরেণ্য কবি ছিলেন নতুন যুগের বার্তাবাহী। উজ্জীবনের শক্তিধারী। সাহিত্যের আঙিনায় রবীন্দ্রনাথ, নজরুলের অবদান গগনচুম্বী। এই দুই কীর্তিমানের কর্মকান্ড  সমাজ সংস্কারেও কার্যকর প্রভাব রেখেছে। এই একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়েও পৃথিবীর যে প্রান্তেই বাঙালি বসবাস করুক, তাঁরা অন্য অনুষ্ঠান পালন না করলেও রবীন্দ্র-নজরুল জয়ন্তী কিন্তু উৎসাহ উদ্দীপনার সঙ্গে উদযাপন করেন। আজো এই শতবর্ষ পরেও এই দুই যুগস্রষ্ঠার কী বিপুল প্রভাব,সে কথা ভাবলে অবাক হতে হয়।

       রবি ঠাকুর যেমন মানুষে মানুষে ভেদের তৎপরতার বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন, মানবতার পক্ষে থেকে বৃটিশের দেওয়া নাইটহুড উপাধি প্রত্যাখান করেছেন ঠিক তেমনি কাজী নজরুল ইসলাম তখনকার সময়ে মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেও সাম্প্রদায়িক কারা ভেঙে অসাম্প্রদায়িক হয়ে উঠেছিলেন। নির্ভিক কবির কলম লিখে ফেলেছিল এমন সব কবিতা—

       মানুষেরে ঘৃণা করি

       ও কারা কোরান, বেদ বাইবেল

       চুম্বিছে মরি মরি

       ও মুখ হইতে কেতাব গ্রন্থ

       নাও জোর করে কেড়ে,

       যাহারা আনিল গ্রন্থ কেতাব

       সেই মানুষেরে মেরে,

       পূজিছে গ্রন্থ ভন্ডের দল।

       মূর্খরা সব শোনো

       মানুষ এনেছে গ্রন্থ,

       গ্রন্থ আনেনি মানুষ কোনো।

        বর্তমান বিশ্রীঙ্খল সময়ে দাঁড়িয়ে এমন সৃষ্টিতে স্রষ্টার পরিণতি কী হতো ভাবলেই শিউরে উঠি। তিনি সাহিত্য ও কর্মে লড়াই করেছেন মানবতার পক্ষ নিয়ে। তাঁর বাল্যকালের নাম ছিল দুখু মিঞাঁ। তাঁর মুখে ছিল দৃঢ়তার অঙ্গীকার ,বড় দীঘির মতো ডাগর দুটি চোখজুড়ে ছিল পাশাপাশি ভালবাসা ও বিদ্রোহ। তাঁর রচিত ' বিদ্রোহী' কবিতাটি সামাজিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে আজও আমাদের কাছে সমান প্রযোজ্য।

       রবীন্দ্র-নজরুল দুজনের প্রতি দুজনের ছিল অগাধ বিশ্বাস ও ভালোবাসা। কাজী নজরুল ইসলাম রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে লিখেছিলেন, " বিশ্বকবিকে আমি শুধু শ্রদ্ধা নয়,পূজা করে এসেছি সকল হৃদয়-মন দিয়ে। যেমন করে ভক্ত তার ইষ্ট দেবতাকে পূজা করে। ছেলেবেলা থেকে তাঁর ছবি সামনে রেখে গন্ধ-ধূপ-ফুল-চন্দন দিয়ে সকাল সন্ধ্যা বন্দনা করে। এ নিয়ে কত লোকে কত ঠাট্টা বিদ্রুপ করেছেন"। প্রবন্ধ ( বড় পিরীতি বালির বাঁধ )। আবার বিশ্বকবি কাজী নজরুল ইসলাম সম্পর্কে লিখেছেন,

       " আয় চলে আয় রে ধূমকেতু

         আঁধারে বাঁধ অগ্নিসেতু,

         দু'দিনের এই দুর্গশিরে

         উড়িয়ে দে তোর বিজয় কেতন।"

         বৃটিশ বিরোধী আপোষহীন রাজনৈতিক সংগ্রামের জন্য কাজী নজরুল ইসলাম যখন কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দী, তখন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর রচিত বসন্ত নাটকটি নজরুল ইসলামকে উৎসর্গ করেন উপরের কথাগুলো লিখে। এর বাইরেও দুজনের ব্যক্তিগত সম্পর্ক ছিল অত্যন্ত মধুর। তাই নিঃসন্দেহে বলা যেতে পারে বাঙালির মননে চিন্তনে বিশ্বকবি ও জাতীয় কবি স্বমহিমায় প্রতিষ্ঠিত উজ্জ্বল দুই শ্রেষ্ঠ নক্ষত্র। আজও এই দুই বাঙালি অলক্ষ্যে থেকেও নীরবে সুখের চাবিকাঠি হয়ে ওঠেন দিশাহীন বাঙালির হৃদয়ে।।

****

অনুভবে রবীন্দ্রনাথ

নবনীতা


রবীন্দ্রনাথের সাথে প্রথম পরিচয় ঠিক কবে, কোথায়, আজ থেকে কত বছর আগে অথবা আমার কত বছর বয়সে, সে'সব কথা সত্যি বলতে কি, আজ আর সেভাবে মনে পড়ে না৷ এটা কি আদৌ মনে করা সম্ভব জীবনে ঠিক কবে প্রথম শ্বাস নিয়েছিলাম বুক ভরে!


সহজাত এক অভ্যাসের বশেই তিনি মিশে গিয়েছেন অস্তিত্বে অনাড়ম্বর দৈনন্দিন যাপনের মতোই৷ খুব ছোট্ট থেকে পারিপার্শ্বিক পরিবেশ যেমন শিশুর অজান্তেই তাকে অনেক কিছু শিখিয়ে দেয়, তেমনই আয়াসহীনভাবেই তিনি হৃদয়কে পাঠ পড়িয়ে দিয়েছেন কেমন করে সংহারকরূপী ঝঞ্ঝার প্রেমে মেতে উঠে দ্বিধাহীন গেয়ে ওঠা যায়, "আজি ঝড়ের রাতে তোমার অভিসার, পরাণ-সখা, বন্ধু হে আমার"৷


কালবৈশাখীর সন্ধ্যেবেলা প্রমত্ত ঝড়ের সাথে তাল মিলিয়ে যখন গেয়ে উঠি, "ঝড়কে আমি করব মিতে, ডরব না তার ভ্রূকুটিতে", অথবা নদীর ধারের বাঁধানো পথ ধরে কোনো দ্বিপ্রহরে চলতে চলতে যখন চোখে পড়ে যায় ঘাটে বেঁধে রাখা নৌকাটি, আর এক লহমায় মনে পড়ে যায়, "নদীর ঘাটের কাছে নৌকো বাঁধা আছে, নাইতে যখন যাই দেখি সে জলের ঢেউয়ে নাচে", তখন এইসব মনে পড়া রবীন্দ্রনাথকে দূরের নক্ষত্রের মতো অচেনা তো করেই না, বরং বড় চেনা খুব কাছের এক বন্ধু বলে মনে হয় তাঁকে, যিনি যে কোনো ভাবনা বুঝে নিতে পারেন, এমনকি সেসব আমরা নিজেরা ব্যক্ত করে উঠতে না পারলেও৷ 


আকস্মিক বিচ্ছেদও সহনীয় হয়ে ওঠে যখন তিনি এসে হাতটি ধরেন৷ নিকষ আঁধারে পথ দেখায় তাঁর সুর, "সুখের মাঝে তোমায় দেখেছি, দুঃখে তোমায় পেয়েছি প্রাণভরে"৷ মন বলে, তাই তো এতকাল কেবল চোখের আলোয় চারপাশে চেয়েছি, অথচ অন্তরের দৃষ্টি দিয়ে তো কিছুই দেখিনি ঠাকুর!


বিশেষজ্ঞের বোধ বা মনন না থাকলেও কেবল সৎ অনুভূতিটুকু দিয়ে উপলব্ধি করে ফেলা যায়, "অশ্রু নদীর সুদূর পারে ঘাট দেখা যায়", বলতে আসলে ঠিক কি বলতে চেয়েছেন তিনি৷ বিষণ্ণতাও যে অন্তরের আশ্রয় হয়ে উঠতে পারে, বিরহও যে হয়ে উঠতে পারে প্রেমের শাশ্বত রূপ এসবই তো তিনিই শিখিয়েছেন৷ 


কিছু পরিচয় সময় ও প্রেক্ষিতের নির্দিষ্ট  গণ্ডীতে আটকে না থেকে কীভাবে যে চিরন্তন হয়ে যায় তা সব সময়ে ভাষায় প্রকাশ করে ওঠা সম্ভব হয় না৷ ঠিক তেমনভাবেই জড়িয়ে আছেন তিনি সমগ্র সত্তায়৷ 


মনে পড়ছে এক সঘন শ্রাবণ সন্ধ্যা৷ বাইরে তখন বৃষ্টি নেমেছে অঝোর ধারায়, ভিতর ঘরে তখন চকমিলানো মেঝের ওপর শতরঞ্জি পেতে বসে  মেঘ রাগেতে সুর ঝরছে এস্রাজের শরীর ছুঁয়ে মীড়ের মূর্চ্ছনায়৷ এমনই কিছু মুহূর্ত যেন আপনা থেকেই বিমূর্ততা পেরিয়ে শাশ্বত অবয়ব নেয় স্মৃতির পাতায়৷ স্হান করে নেয় নিজেকে অমরত্বের আপন অধিকারে; তেমনভাবেই চিনেছি তাঁকে বিরহে আর অশ্রুমুখর পলের নিবিড়তায়, প্রাণের ঠাকুর তিনি, রবীন্দ্রনাথ৷

তাই হয়ত অকারণের বেদনাতে পুলক জাগে পার্থিব শরীর জুড়ে, বিরহ তাই মধুর হয়ে উঠে অশ্রুত কোন্ রাগিণীতে চারিয়ে যায় গভীর হয়ে অনুভবের প্রতিটি তন্ত্রী জুড়ে অপার্থিব শব্দে বোনা তাঁরই সুরের ভাষায়৷

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ