দর্পণ || রবীন্দ্র - নজরুল সংখ্যা || মুক্ত গদ্য




পোস্ট বার দেখা হয়েছে

জন্মদিন  ...

সায়ন্তিকা ভট্টাচার্য্য 


" তবু  মনে রেখো যদি দূরে যাই চলে।

যদি পুরাতন প্রেম ঢাকা পড়ে যায় নবপ্রেমজালে,

 যদি থাকি কাছাকাছি,

দেখিতে না পাও ছায়ার মতন আছি না আছি--তবু মনে রেখো।"


 শ্রাবণ সন্ধ্যায় ফুটে ওঠা নক্ষত্রের আলোয় ভেসে ওঠে নৌকাখানি , ছাদের এক কোণে শুকিয়ে যাওয়া বেল ফুলের টবে ভিজে যায় গোপন দুঃখরা ! গাছেদের গ্রন্থি ছিঁড়ে বেরিয়ে আসে বিষাদ ! শাদা দাঁড়িওয়ালা মানুষটির ছায়ায় মন খারাপ হয় কোলকাতার !


"আজ নিশীথে অভিসার তোমারি পথে প্রিয়তম,

বনের পারে নিরালায় দিও হে দেখা নিরুপম।"


অন্ধকারে জোড়াসাঁকোর এক পাশ দিয়ে নেমে আসে বৈশাখের চাঁদ , নীল ডুরে পড়া শাড়ির মেয়েটির পায়ে নুপুরের তালে মাতাল মাধবীলতা , অরণ্যের গভীরে দ্বীর্ঘ হয়ে বিদ্রোহী শরীর , কোলকাতার রাস্তায় জ্বলে ওঠে সারি সারি পাইন অথবা দেবদারু !


"আজ জোৎস্না রাতে  সবাই গেছে বনে

বসন্তের এই মাতাল সমীঁরণে,

যাব না গো যাব না যে, রইনু পড়ে ঘরের মাঝে-

এই নিরালায় রব আপন কোণে

যাব না এই মাতাল সমীরণে।"


জোৎস্নায় পুড়ে যাওয়া মাঝির আঙ্গুলে নেমে আসে ভৈরবী ! মাতাল হাওয়ায় নিভে যায় প্রদীপ ! ঘরের ঈশান কোণে বেজে ওঠে ষষ্ঠ অথবা সপ্তম সুর ۔۔۔۔একলা এক নাবিক এগিয়ে যায় ۔۔۔দূরে , বহু দূরে !


"এই শিকল-পরা ছল মোদের এ শিকল-পরা ছল

এই শিকল পরেই শিকল তোদের করবো রে বিকল।"


খাঁচার পাখির ডানায় নেমে আসে মেঘ , মৃত্যুর কাছে পরাজিত হওয়া কবির কণ্ঠনালীতে আটকে আছে অষ্টপ্রহরের যন্ত্রণা ! শিকল ভেঙে যে মানুষটি উড়ে গ্যাছে কাঁটাতারের ওই পাশে ۔۔۔তার ভ্রুর মাঝে আঁকা চন্দ্রবিন্দু !


"আজি ঝড়ের রাতে তোমার অভিসার

পরানসখা বন্ধু হে আমার ।"


ঝড় ওঠে শহরে ! মরুভূমির রুক্ষতায় আরও বেশী শুস্ক হয় দেয়াল ! বাউলের একতারায় জেগে ওঠে শিরা উপশিরা ! প্রেয়সীর স্তনবৃন্তে মাথা পাতে নদী !


"চল্‌ চল্ চল্

ঊর্দ্ধ গগনে বাজে মাদল,

নিম্নে উতলা ধরণী তল

অরুণ প্রাতের তরুণ দল

চল্‌ রে চল্‌ রে চল্‌

চল্‌ চল্ চল্ ।"


ধর্মতলার মোড় পর্যন্ত এগিয়ে আসছে যৌবন ! রক্তবীজের চারাগুলো ক্রমশঃ আরও বেশী উঁচু হয়ে ওঠে ! ফুটপাতে হেঁটে বেড়ায় ছাত্রসমাজ ! আকাশে উড়ে যাওয়া লিফলেটে লেখা থাকে কবির ছদ্মনাম !ভারতবর্ষে এখন বর্ষাকাল ! বিদ্রোহ বলতে শুধুই খিদে, খিদে এবং খিদে !


"যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে ,

তবে একলা চলো রে ,

একলা চলো , একলা চলো , একলা চলো রে |"


কেউ শুনলো তার ডাক , তবুও ফিরে ফিরে আসে পিছুটান ! প্রতিধ্বনিত হয়ে ওঠে কেবল জীবনের স্বরলিপি ! কবির আলোয় এ এক নতুন সকাল , স্বাধীন পৃথিবীর বুকে নব আনন্দে জেগে ওঠা শ্রেষ্ঠ পুরুষের সুখ ও এক অনন্তকাল !তবুও তো বৃষ্টি ভেজা কোলকাতার আকাশের মতো  এখন বড়ো স্যাঁতস্যাঁতে আমাদের কবিতা !


"কারার ঐ লৌহকপাট,

ভেঙ্গে ফেল কর রে লোপাট,

রক্ত-জমাট শিকল পূজার পাষাণ-বেদী।"


ভাঙছে শৃঙ্খল , কয়েদির জানলায় পুড়ছে চাঁদ , রুটি সেঁকার ঝাঁজরিতে উঁকি দিচ্ছে দু মুঠো রোদ্দুর ! আগুনে ঝলসে যাচ্ছে রক্তকরবী ! লাল বেদীতে খোদাই চলছে দেবীর ۔۔۔রক্তাক্ত শুধু কাফন !


"এই আকাশে আমার মুক্তি , 

আলোয় আলোয় ,

আমার মুক্তি ধুলায় ধুলায় ঘাসে ঘাসে |"


মুক্তি শুধু অন্তরে , মুক্তি শুধুই তার নামে ! আলোহীন শহরে বাতি জ্বলে ওঠে ! স্তব্ধ হয় রবীন্দ্রনাথ ! প্রেক্ষাগৃহের সামনের সারিতে তখন একলা আমি ও লাবণ্য ! গীতবিতানের ভাঁজে তীব্র হয় বোধ ! কবির সম্ভ্রমটুকু কুড়িয়ে নেয় এ মহাজীবন ! নিমগ্ন প্রেমে ডুবে যায় আরও একটা বৈশাখ !


"খেলিছ এ বিশ্ব লয়ে

বিরাট শিশু আনমনে।

প্রলয় সৃষ্টি তব পুতুল খেলা

নিরজনে প্রভু নিরজনে।"


পৃথিবীর বুকে বিঁধে থাকে কেবল একজন নজরুল ! বিদ্রোহী কবিতায় নিখোঁজ শুধু একটি গ্রহ ! তারাদের আখড়ায় শুধু উৎসব চলে ۔۔۔আরও একটা সকালের ! একটি সংসারে শুধু পালিত হয় একটা কিম্বা দুটো জন্মদিন দিন ! শাঁখ আর উলুধ্বনিতে ফেটে পড়ে হলুদ আলোগুলো !


কবিতার খাতায় লেখা থাকে একজন  রবির নজরুল অথবা নজরুলের রবির খবর ۔۔۔۔

বিশ্বসংসারে কান পাতলে শোনা যায় আত্মীয়ের শোক কিম্বা আমাদের ঈশ্বরের কণ্ঠ ۔۔۔

"এভাবেই আরও একটা জন্মদিনে আমি থেকে আমরা হয়ে উঠবে মানুষ ,কেবলই ওদের জন্য !"

বাকি সময়টুকু আমরা পরিচয় আঁকড়ে বেঁচে থাকি ۔۔۔অভ্যেসে !

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ