দর্পণ || মে দিবস




পোস্ট বার দেখা হয়েছে

মে দিবস

.

ঘটনার সূত্রপাত সেই উনিশ শতকের গোড়ার দিকেই । আর পটভূমি ছিল আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন শহর-শিল্পাঞ্চলগুলি । তখনকার প্রচলিত অলিখিত নিয়ম অনুযায়ী শ্রমজীবীদের দৈনিক কাজের সময়সীমা ছিল সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত । কখনও কখনও বা সূর্যাস্তের পরেও কাজ চালিয়ে যেতে হত । এর প্রতিবাদে উনিশ শতকের গোড়ার দিকেই প্রতিবাদ জানায় আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের শ্রমিকরা । ১৮২০ সালে আমেরিকায় বিভিন্ন শহরে ছোট ছোট স্থানীয় ট্রেড ইউনিয়নগুলো একত্র করে একটা ফেডারেশন গঠনের চেষ্টা করা হয় । ১৮২৭ সালে বিশ্বের প্রথম ট্রেড ইউনিয়নের জন্ম হয় ফিলাডেলফিয়ার গৃহনির্মাণ শিল্পে নিযুক্ত শ্রমিকদের উদ্যোগে । তখন থেকেই প্রথমে দৈনিক দশ ঘণ্টা ও পরবর্তীতে আট ঘন্টা কাজের দাবিতে সোচ্চার হয় শ্রমিকরা, যদিও দেশের অর্থনৈতিক সঙ্কট, আর্থিক মন্দা প্রভৃতি কারনে তাদের সেই আন্দোলন কিছুটা গতিহীন হয়ে পড়ে । উনিশ শতকের ছয়ের দশক থেকেই আবার তাদের আন্দোলন গতি পায় । শ্রমিকরা তাদের মজুরি না কমিয়ে দিনে আট ঘণ্টা কাজের সময় নির্ধারণের জন্য দাবি জানায় । তাদের স্লোগান ছিল - Eight hours for work, eight hours for rest, eight hours for what we will. অর্থাৎ, ৮ ঘণ্টা কাজ, ৮ ঘণ্টা বিশ্রাম এবং ৮ ঘণ্টা অবসর বিনোদন ।


তবে দৈনিক আট ঘন্টা কাজের দাবিতে এই আন্দোলন চরম আকার নেয় উনিশ শতকের আশির দশকে । আট ঘন্টাকে প্রমাণ কর্মঘন্টা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে সেসময়ে মালিকের হাতে নিপীড়িত হয় অনেক শ্রমিককে, যাঁদের বেশিরভাগই সংগঠিত ছিলেন না । আন্দোলন করে দাবি আদায় করতে চাইলেই নিপীড়ন করে উদাহরণ প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে, শ্রমিকদের মনে ভয়ের সঞ্চার করা হয়েছে । এইভাবে পিঠ যখন দেয়ালে ঠেকে যায় তখন আমেরিকার শিকাগো, নিউ ইয়র্ক, উইসকনসিন এবং বিভিন্ন রাজ্যে গড়ে উঠতে থাকে শ্রমজীবীদের সংঘবদ্ধ আন্দোলন । ১৮৮৪ সালের অক্টোবর মাসে আমেরিকার 'ফেডারেশন অফ অর্গানাইজড ট্রেডস এন্ড লেবার ইউনিয়নস' -এর এক বৈঠকে আট ঘন্টা কাজের সময়কে কীভাবে প্রতিষ্ঠা করা যায় সেই বিষয়ে আলোচনা শুরু হয় । আমেরিকার বিভিন্ন লেবার ইউনিয়নের সম্মতিক্রমে ১৮৮৬ সালের ১লা মে তারিখটি নির্ধারিত করা হয়, ওইদিন থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য সাধারণ ধর্মঘট শুরু হয় । দাবি একটাই, দৈনিক আট ঘন্টার বেশি আর কাজ নয় ।


ধর্মঘটের কেন্দ্র ছিল আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো শহর । পূর্বঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী, ১৮৮৬ সালের ১লা মে শিকাগো শহরের প্রায় তিন লক্ষ শ্রমিক কাজ ছেড়ে রাস্তায় নেমে আসে । প্রথম দুইদিন আন্দোলন শান্তিপূর্ণভাবে চললেও ৩রা মে শিকাগোর ম্যাককরমিক হারভেস্টিং মেশিন কোম্পানির সামনে পুলিশ গুলি চালায় আন্দোলনকারী শ্রমিকদের উপর, সেখানে নিহত হয় ছয় জন শ্রমিক । ছত্রভঙ্গ শ্রমিকদের বিপুল সংখ্যক হতাহত হয় ।


এই হতাহতের সংবাদে, বিশেষতঃ পুলিশের গুলিতে শ্রমিকদের মৃত্যু, দাবি সম্পর্কে মালিকপক্ষের উদাসীনতা শ্রমিকদের মাঝে তীব্র উত্তেজনার সৃষ্টি করে । পরদিন অর্থাৎ ৪ঠা মে শ্রমিকদেরকে আন্দোলনের পূর্ণ প্রস্তুতি নিয়ে শিকাগোর হে মার্কেট স্কোয়ারে সমবেত হওয়ার আহ্বান জানান বেশ কিছু শ্রমিক নেতা । হে মার্কেট স্কোয়ারে শ্রমিকদের সেই বিপুল সমাবেশে বক্তব্য রাখছিলেন শ্রমিক নেতা অগাস্ট স্পিজ । ওই সময় মালিকপক্ষের অজ্ঞাতপরিচয় কোনো দুষ্কৃতি সমাবেশের কাছে দায়িত্বরত পুলিশের ওপর শক্তিশালী ডিনামাইট বোমা নিক্ষেপ করে । এতে মেথিয়াস জে ডিগান নামে একজন পুলিশ অফিসার ঘটনাস্থলেই নিহত হন এবং বেশ কয়েকজন পুলিশকর্মী আহত হন । খুব স্বাভাবিকভাবেই পুলিশের সঙ্গে আন্দোলনরত শ্রমিকদের সংঘর্ষ শুরু হয় । সংঘর্ষে চার জন শ্রমিক ও সাতজন পুলিশকর্মী নিহত হন । আহত হন অগণিত । রক্তে ভেসে যায় হে মার্কেট স্কোয়ার । বেসরকারি হিসাব অনুসারে নিহত শ্রমিকের সংখ্যা ছিল অনেক বেশি ।


পুলিশের ওপর বোমা নিক্ষেপ, দাঙ্গা-হাঙ্গামার ষড়যন্ত্রে যুক্ত থাকার অভিযোগে পুলিশ আটজন শ্রমিক নেতাকে গ্রেপ্তার করে । তারা হলেন অগাস্ট স্পিজ, আলবার্ট পার্সন, স্যামুয়েল ফিল্ডেন, লুইস লিং, মাইকেল সোয়াব, জর্জ অ্যাঙ্গেল, অ্যাডলফ ফিশার ও অস্কার নেবে । বিচারের নামে প্রহসনে শ্রমিক নেতা অগাস্ট স্পিজসহ আটজনকেই দোষীসাব্যস্ত করা হয় । এই আটজনের মধ্যে মাইকেল সোয়াবকে যাবজ্জীবন এবং অস্কার নেবেকে ১৫ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয় । আর বাকি ছয়জনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয় । এঁদের মধ্যে স্যামুয়েল ফিল্ডেন ক্ষমার আবেদন করলে তাঁকে মৃত্যুদণ্ডের পরিবর্তে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয় । মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগেই কারারুদ্ধ অবস্থায় লুইস লিং আত্মহত্যা করেন । বাকি চারজন শ্রমিক নেতাকে ১৮৮৭ সালের ১১ই নভেম্বর সর্বজনসম্মুখে প্রকাশ্যে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে অত্যন্ত নৃশংসভাবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয় । ফাঁসির মঞ্চে দাঁড়িয়ে শ্রমিক নেতা অগাস্ট স্পিজ বলেন - The day will come when our silence will be more powerful than the voices you are throttling today. অর্থাৎ, এমন এক দিন আসবে যখন আমাদের এ নীরবতা, তোমাদের আওয়াজ অপেক্ষা অনেক শক্তিশালী হবে ।


মিথ্যা এবং প্রহসনকে বেশি দিন সত্য ও ন্যায় হিসেবে পরিচালিত করা যায় না । ১৮৯৩ সালের ২৬শে জুন ইলিনয়ের গভর্নর জন পিটার অল্টগেল্ডের পক্ষ থেকে জানানো হয়, মিথ্যা ছিল ওই বিচার । সেইসঙ্গে পুলিশের কমান্ডারকেও দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত করা হয় । তবে শ্রমিক আন্দোলন দমন করতে হে মার্কেটের ঘটনায় নিরপরাধ শ্রমিক নেতাদের ফাঁসি দেওয়া হলেও পুলিশের ওপর সেই বোমা নিক্ষেপকারী দুষ্কৃতিকে কখনোই চিহ্নিত করার চেষ্টা করা হয়নি এবং আজও এ ঘটনার কোনো তদন্ত ও বিচার হয়নি ।


তবে শেষ পর্যন্ত শ্রমিকদের আট ঘন্টা কাজের দাবি স্বীকৃতি পায় । ১৮৮৬ সালের ১লা মে থেকে শ্রমিকরা অনির্দিষ্টকালের জন্য যে ধর্মঘট শুরু করেছিলেন, সেই ১লা মে তারিখটিকে স্বীকৃতি দিয়ে হে মার্কেট ট্র্যাজেডির ঠিক দুই বছর পর ১৮৮৮ সালে আমেরিকান ফেডারেশন অব লেবারের উদ্যোগে অনুষ্ঠিত সেন্ট লুইস শ্রমিক সম্মেলনে কাজের সময় আট ঘণ্টা নির্ধারণের দাবিতে 'মে দিবস' পালনের ঘোষণা করে । এর এক বছর পর ১৮৮৯ সালের ১৪ জুলাই ফ্রান্সে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক শ্রমিক সম্মেলনে ইন্টারন্যাশনাল অর্গানাইজেশন ফর ওয়ার্কার্স এন্ড সোসালিস্টস ১লা মে তারিখটিকে শ্রমিক দিবস হিসেবে ঘোষণা করে । পরবর্তী বছর থেকে অর্থাৎ ১৮৯০ সালের ১লা মে বিশ্বব্যাপী পালন হয়ে আসছে 'মে দিবস' বা 'আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস' হিসেবে । যদিও সেইসময় আমেরিকার সরকার এই ঘটনাকে স্বীকৃতি দিলেও শ্রমিকদের আট ঘন্টা কাজের দাবিকে গুরুত্ব দেয়নি । দীর্ঘ সংগ্রামের পথ পাড়ি দিয়ে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের প্রাক্কালে ১৯১৬ সালে আমেরিকা আট ঘন্টা কাজের দাবিকে আইনি স্বীকৃতি দেওয়ার পথে এগিয়ে যায় । ১৯১৭ সালে রাশিয়ার জার দ্বিতীয় নিকোলাসের পতনের চারদিন পরে আমেরিকা অফিসিয়াল ডিক্রির মাধ্যমে দৈনিক আট কর্মঘন্টার স্বীকৃতি দেয় ।


১লা মে পালিত হয় শ্রমিকদের দাবি আদায়ের দিন হিসেবে । এদিন পৃথিবীর সব প্রান্তে ধ্বনিত হয় অগাস্ট স্পিজের সেই নীরবতা । অগাস্ট স্পিজের সেই নীরবতা এখন হয়ে উঠেছে বিশ্বে প্রতিটি মেহনতি মানুষের দাবি আদায়ের কণ্ঠস্বর । আজও বিশ্বজুড়ে শ্রমিক অসন্তোষ বন্ধ নেই, বছর খানেক আগেই ২০১৯ সালে ফ্রান্সে দেখা গেছে ইয়োলো ভেস্ট আন্দোলন । আজও বিশ্বের উন্নয়নশীল দেশগুলোতে বারেবারেই শ্রমিক অসন্তোষ দেখা যাচ্ছে । এটিও প্রমাণ করে পুঁজি টিকিয়ে রাখা এবং মুনাফার স্বার্থে কর্মজীবীদের ক্রমশোষণ করেই যাচ্ছে বৃহদাকার প্রতিষ্ঠানগুলো, একটি প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহীর সাথে বাকিদের বেতনের বৈষম্য নিয়েও প্রশ্ন উঠছে নতুন করে । এমনকি প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে দৈনিক কর্মঘন্টা নিয়েও ।  তাই মে দিবস নামে পরিচিত আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস এখনো বিশ্বের নিপীড়িত কর্মজীবী মানুষকে পথ দেখায় তাদের অধিকার আদায় করে নিতে

______

তথ্যসূত্র : সংগৃহীত 

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ