পোস্ট বার দেখা হয়েছে
সুমিতার সংসার
জয়া চক্রবর্তী
সুমিতার আজ ভালো লাগছে না। কিচ্ছু ভালো লাগছে না। অথচ কেন যে ভালো লাগছে না তার স্পষ্ট কারণ সে খুঁজে পাচ্ছে না৷ কারণের কষ্টকে দূর করা যায় কিন্তু অকারণের কষ্টকে দূর করা বড় শক্ত। অথচ মজার কথা আজ তো সুমিতার খুশী হবার দিন। ভীষণ ভীষণ খুশী হবার দিন। সুমিতা যা যা নিয়ে এত বছর ধরে অভিযোগ করে এসেছে সেই প্রত্যেকটা জিনিষ আজ তার পূরণ হয়েছে। তবু....
বাবলুর সাথে বাড়ির অমতে বিয়ে করে ঘর ছেড়েছিল আজ থেকে চোদ্দ বছর আগে সুমিতা। সুমিতা আর বাবলুর সম্পর্কের কথাটা সুমিতার বাড়িতে জানাজানি হয়ে যাবার পরেই সুমিতার বাবা স্থির করেছিলেন ওর বিয়ে দিয়ে দেবেন অন্যত্র৷ মরিয়া সুমিতা ছুটে এসেছিল বাবলুর কাছে। বলেছিল-" অন্য কারোকে বিয়ে করার থেকে আমার মরে যাওয়াও ভালো। তার চেয়ে যেমন করে হোক আমাদের বিয়ে করতেই হবে। " বাবলু বলেছিল-" কিন্তু আমার যা রোজগার আমি যদি এখন বিয়ে করি সংসার চালাবো কিভাবে? তুমি অনেক সুখে থেকে অভ্যস্ত সুমিতা। আমি যে তোমায় তেমন করে যত্নে রাখতে পারব না।" সুমিতা জলভরা চোখে হাত চেপে ধরে বলেছিল-" সুখ চাই না আমার। শুধু তোমায় চাই। যেমন করে রাখবে তেমনই থাকবো। গাছতলায় থেকে তোমার সাথে দুখের ভাত ভাগ করে খেতেও আমি রাজি। কিন্তু অন্য কারোকে বিয়ে করা...অসম্ভব।"
বাবলু বিয়ে করে গাছতলায় রাখে নি। এনে তুলেছিল নিজের টিনের চালের দুকামড়ার বাড়িতে। সেই সুমিতার সংসার। শ্বশুর শ্বাশুড়ি দেওর ননদ কেউই নেই। একদম একার সংসার। প্রথম প্রথম অনেক স্বপ্ন নিয়ে সে সংসার গোছানো শুরু করে। টিনের চালের প্লাস্টারহীন ইটের বাড়িকেই করে তুলতে চেয়েছিল স্বর্গ। কিন্তু কয়েকদিন যেতেই সে বুঝল ' অভাব দরজা দিয়ে ঢুকলে প্রেম জানলা দিয়ে পালায়।' কিছুদিনের মধ্যেই শুরু হয় তাদের মধ্যের খিটিমিটি। শুধু যদি অভাব হত তাহলে হয়ত একরকম হত। কিন্তু বাবলুকে সুমিতার মনে হতে থাকে মাত্রা ছাড়া দায়িত্বজ্ঞানহীন। কোন কাজই সে ঠিক মত করে না। আলমারির দোকানের কাজ থেকে যে টাকা আসে তাতে সংসার চালাতে হিমসিম খেতে হয় সুমিতাকে। বেশ একটু দূরে পাইকারী বাজার থেকে সে বাজার করে সস্তা হবে বলে। রেশনে লাইন দিয়ে চাল তোলে। কেরোসিন তেলের লাইনে ঠ্যালা গুঁতো খেয়ে তেল তোলে। আবার এরই মধ্যে সংসারে যাতে একটু স্বাচ্ছল্য আসে তাই নিজের কানের দুল জোড়া বিক্রি করে সে টাকায় কিনে ফেলে একটা সেলাই মেশিন৷ শুরু করে টেলারিং এর কাজ।
পরিশ্রম যত বাড়তে থাকে, ক্লান্তি যত বাড়তে থাকে বাবলুর প্রতি অসন্তোষও তত বাড়তে থাকে সুমিতার। মনে হয় সে নিজে যেভাবে সংসারটাকে দাঁড় করাবার জন্য খাটে সেই ডেডিকেশনটার বেশ খামতি আছে বাবলুর ব্যবহারে। আলমারির দোকানের কাজের পরে সেই তো পারে চালটা এনে দিতে। কিম্বা পাইকারি বাজার থেকে বাজারটা করে আনতে। নিদেন পক্ষে সকালের জলটুকু তুলে দিতে। কিন্তু না। বাবলুর যেন সেসব ইচ্ছেই নেই। মাঝে মাঝেই চোখে জল আসে সুমিতার। বাবলু কি তার পরিশ্রম দেখতে পায় না। বাবলু কি তাকে আদৌ ভালোবাসে? বাসলে কি এভাবে তাকে খাটতে দিত? একটা ভালো চাকরির চেষ্টাও তো করত নিদেনপক্ষে।
কিন্তু সেইসব অভিমান চিরস্থায়ী হয় না। যখন রাতে সুমিতাকে কোলের কাছে টেনে নিয়ে বাবলু বলে-" আমি জানি সুমিতা তোমার খুব কষ্ট। অনেক খাটতে হয় তোমাকে। অনেক পরিশ্রম করতে হয় আমার জন্য, আমাদের সংসারের জন্য। কিন্তু দেখো বেশী দিন নয়। একদিন আমি সব ঠিক করে নেব। সেদিন তুমি রানীর মত থাকবে। পায়ের উপর পা তুলে।"
হাসি পায় সুমিতার। এক অপরিসীম মায়ায় ভরে যায় মনটা। একেই বোধহয় আক্ষরিক অর্থে বলে -" ছেঁড়া কাঁথায় শুয়ে লাখটাকার স্বপ্ন দেখা।" কিন্তু বাবলুর এই স্বপ্নটুকু তাকে তৃপ্তি দিত৷ বাবলু তাকে আদৌ ভালোবাসে কিনা ভেবে যে অনিশ্চয়তায় সে ভুগত তার উপর লাগিয়ে দিত শান্তির মলম। মনে হত-" আহারে, অক্ষম একটা মানুষ। তেমন কিছু করে উঠতে পারে না। কিন্তু আমাকে ভালো তো বাসে। আমায় সুখে রাখতে তো চায়। সাধ্য না থাক, সাধটুকু তো আছে।"
তাই সংসার চলতে থাকে...অভাব অভিযোগও চলতে থাকে। বাবলুর অল্প হলেও মাইনে বাড়ে। সংসারের হাল হয়ত একটু ফিরত, কিন্তু তখনই বাবলু সুমিতার জীবনে নতুন অতিথি এসে পরে। খরচও সমান তালে বেড়ে যায়। কার্যত সংসার সেই এক জায়গাতেই দাঁড়িয়ে থাকে।
বুকাই জন্মাবার পর সুমিতার একই সঙ্গে বেড়ে গেল সংসারের প্রতি অভাব অভিযোগ আর মায়া। বাবলুর অবশ্য বেশ একটা দায়িত্ববোধ তৈরী হল। সে আলমারির দোকানের কাজের পরে আরো একটা দোকানে পার্ট টাইম কাজ ধরে নিল। আগে বাবলু আটটায় বেরিয়ে যেত আর রাত আটটায় ঢুকত। এখন সাড়ে সাতটায় বার হয় আর রাত এগারোটায় বাড়ি ঢোকে। সংসারের আয় বাড়লো ঠিকই কিন্তু সব দায় দায়িত্ব একা সুমিতার ঘাড়ে এসে পরল। এতদিন শুধু সংসার ছিল। এখন তার সাথে ছোট বাচ্চার কাজটাও। সুমিতা প্রায়ই গজগজ করে-" খেটে খেটে হাড়ে মাসে কালি হয়ে গেল। একটা সাহায্য যদি কেউ করে। সংসার যেন আমার একার। আর পারি না বাবা। "
বলে বটে তবে সে নিজেও জানে সকাল থেকে রাত অবধি বাবলুও তো আলমারি কারখানায় আর তারপর দোকানে হাড়ভাঙা খাটুনিই খাটে। সুমিতা বাড়ির সামনের সরু মাটিতে লঙ্কা বেগুণ পুঁইশাক কুমড়ো গাছ বসায়। বাবলু বলে-" এমনিই তোমার খাটনির শেষ নেই। এর মধ্যে আবার এই সব গাছটাছ লাগানোর খাটুনি... "
সুমিতা বলে-" সে খেটে মরা তো আমার কপালে। এ আর নতুন কি। তবু দুটো লঙ্কা ফললেও তো ভালো। সংসারের একটা সাশ্রয় হয়। "
বাবলু সস্নেহে ওকে কাছে টেনে নেয়-" বলে বড় কষ্ট তোমার, আমি বুঝি মিতা। কিন্তু দেখ আমি এ কষ্ট তোমার কিছুতেই থাকতে দেব না। একদিন ঠিক আমি সব গুছিয়ে নেব। সেদিন তুমি শুধু হুকুম করবে বসে বসে।" সুমিতা সুখী হয় কিন্তু মুখে কপট রাগ দেখিয়ে বলে -"থাক বাপু আর আমার রানী হয়ে কাজ নেই। এই চাকরানী আছি খিদমত খাটছি এই ঢের।"
সুমিতা জানত তার স্বামী স্বপ্ন দেখে। এমন সব স্বপ্ন যা পূরণ করার সামর্থ্য তার নেই। তবু ওর এই স্বপ্নেও যে ও সুমিতাকে রানী করে রাখার কথা ভাবে এতেই সুমিতা সুখী হত। তার সংসারের খাটুনি পরিশ্রম যা নিয়ে তার নিত্য অভিযোগ তার উপর যেন একটা মমত্বের স্নিগ্ধ অনুভূতির প্রলেপ পরত। সুমিতাও ধীরে ধীরে নিজের মত করে গুছিয়ে নিয়েছিল নিজের দৈনন্দিন জীবন।
সারাদিনের প্রচুর দৌড়দৌড়িগুলোকে নিজের রুটিন মত দিব্যি এডজাস্ট করে নিয়েই চলছিল সে। পাড়ার লোকেও বলত -" সত্যিই বাবলু ভাগ্য করে বৌ পেয়েছে৷ ঠিক যেন দশভূজা। সংসার সামলাচ্ছে। দুটো পয়সা সাশ্রয়ের জন্য চরকি পাক খাচ্ছে। স্বামীর যাতে সাহায্য হয় তাই আবার সেলাইএর কাজও করছে। এমন মেয়ে আজকাল পাবে কোথায়?" সুমিতার সামনে কেউ একথা বললেই সুমিতা বলে-" মাসীমা আশীর্বাদ করুন। শরীরে যেন সেই ক্ষমতা থাকে যে এমন হেঁপে ঝেঁপে কাজ করতে পারি। নিজের সংসারের জন্য কাজ করব নিজের স্বামী সন্তানের জন্য সুখের জন্য তাতে আর কষ্ট কি?" পাড়ার বয়োবৃদ্ধরা দুহাত তুলে আশীর্বাদ করত-" একদিন তুমি রাজরানী হবে দেখো মা। "
তাদের আশীর্বাদই কি ফলে গেল? নাকি সবটাই সুমিতার লক্ষ্মীভাগ্য? বাবলু অবশ্য উচ্ছ্বসিত হয়ে বলেছিল সব স...অঅঅব হয়েছে সুমিতার পয়ে। না হলে আলমারি ডেলিভারি দিতে গিয়ে দত্তবাবুরব সাথে আলাপই বা হবে কেন? সেই আলাপ ঘনিষ্টতাতে পরিণতই বা হবে কেন? আর দত্তবাবুই বা কেন ওদের কোম্পানিতে এত ভালো চাকরীর অফারটা দেবেন। বাবলু কখনও স্বপ্নেও ভাবতে পেরেছিল যে এমন একটা মোটা অংক সে মাইনে হিসেবে পেতে পারে। না, এই টাকা দিয়ে রাজপ্রাসাদ কিনে নেওয়া যায় না ঠিকই। কিন্তু সুমিতার জন্য অনেক খানি সুখ কিনতে পারবে বাবলু এই টাকায়।
বাবলু বলে-" বিয়ে করে থেকে তোমায় তো কিছুই দিয়ে উঠতে পারি নি। শুধু পরিশ্রম করে গেছ৷ যুদ্ধ করে গেছ। এবার তোমার লড়াই এর শেষ। এত বছর তুমি করে গেছ আমি দুহাত ভরে নিয়ে গেছি। আর এখন আমি তোমায় একটু সুখ একটু নিশ্চিন্ততা দিতে চাই। "
আনন্দে চোখে জল এসে যায় সুমিতার। এমন প্রাপ্তি যে শুধু ভাগ্যবতী হলেই মেলে। বাবলু বলে-" শোনো আর দুটো পয়সা বাঁচাতে তোমাকে দু কিলোমিটার ঠেঙিয়ে পাইকারী বাজার ছুটতে হবে না। এই যে এত ভারী মাল নিয়ে এতটা আসো এতে তোমার শরীরের কতটা ক্ষতি হয় বুঝি না ভেবেছ? এতদিন কিছু করতে পারিনি। তাই বলিও নি। কিন্তু এখন থেকে আর একদম না। আমি রতন মুদির দোকানে কথা বলেছি। তুমি মাসের শুরুতেই লিস্ট করে দেবে। রতন ওর দোকানে ফাইফরমাশ খাটা ছেলেটাকে দিয়ে পাঠিয়ে দেবে।"
সুমিতা হা হা করে ওঠে-" আরে এ কি কান্ড। তুমি আমায় একবার জিজ্ঞেস করবে তো। কত গুলো টাকা শুধু শুধু জলে যাবে। কোথায় রেশানের তেরটাকার চাল আর কোথায় রতনের দোকানের বিয়াল্লিশ টাকা কেজির চাল।"
বাবলু গভীর চোখে সুমিতার দিকে চেয়ে বলে-" যাক টাকা। আমার সুমিতাকে আমি আর খেটে খেটে হাড় মাস কালি করতে দেব না।" একই সাথে একটা সুখ বোধ আর একটা অস্বস্তি লেগে থাকে সুমিতার মনে।
বাবলু একটা ঠিকে ঝি হঠাৎ করেই রেখে দেয়। এবার বাবলুর উপর রেগেই যায় সুমিতা। নতুন চাকরি পেয়ে কোথায় সে দুটো পয়সা জমাবে তা নয় একের পর এক বাড়তি খরচ করে চলেছে। সুমিতার মনে হয় তাদের তিনটি প্রানীর সংসারে কিই বা এমন কাজ যে তার জন্য ঠিকে কাজের লোক লাগবে। অবশ্য কথাটা ভেবে সে নিজেই অবাক হয়। এতদিন তো তিনটি প্রানীর এই সংসারের কাজকেই পাহাড় প্রমাণ মনে হত।
মাস খানেকও যায় না, ঠিকে কাজের লোকের সাথে বনে না সুমিতার।
মেয়েটির কাজ ভীষণ অপরিষ্কার মনে হয়। ঘরের কোনের দিকে ঝাঁট দেয় না। বাসনের পিছনের পোড়াদাগ তোলে না। সুমিতা বাসন মাজলে যেখানে সারা মাসে দুটো সাবান লাগে এর সেখানে চারটে লাগছে। আলমারি বিছানার নীচে হাত বাড়িয়ে মোছে না। কাজের লোকও বিরক্ত। পাড়ায় বলে বেড়ায় -" হাজার মালকিন দেখেছি বাবা। এমন টাইপের দেখিনি। যতক্ষণ কাজ করব ছায়ার মত পেছন পেছন ঘুরতে থাকবে আর হুকুম করতে থাকবে। " শেষে কাজের লোক একদিন মুখে মুখে জবাব দেওয়ায় সুমিতা কাজ ছাড়িয়েই দিল। সুমিতা একটা অদ্ভুত শান্তি অনুভব করল। রাতে বাবলু এসে শুনে বলল-" একদম ঠিক করেছ। এসব লোক রেখে কাজ নেই।" সুমিতা ভেবেছিল আবার যেমন নিজের সংসারে নিজে গুছিয়ে কাজ করত তেমন করেই করবে। কিন্তু পরদিন দুপুরেই সন্ধ্যা নামের একটি মেয়ে এসে হাজির হয়। এই মেয়েটি পাড়ার মাস্টার মশাইএর বাড়ি আজ দশ বছর কাজ করছে। খুব সুনাম কাজের লোক হিসেবে। বাবলু নাকি তাকেই ঠিক করেছে ঠিকে কাজ করার জন্য। পরেরদিন থেকে কাজে আসবে বলে মেয়েটি চলে যায়। হঠাৎই কেন জানি না কি এক বিষন্নতায় চোখে জল এসে যায় সুমিতার৷
মেয়ে বুকাই এর উঁচু ক্লাস হচ্ছে। আগে সুমিতাই মেয়েকে পড়াতো। অনেক খাটত সে মেয়ের পিছনে। আগের ক্লাসের স্টুডেন্টদের থেকে পুরানো বই জোগাড় করত৷ তাদের নোটস জোগাড় করত। ঘুরে ঘুরে আগের বছরের প্রশ্নপত্র জোগাড় করত। সবাই বলত তুমি এত মেয়েকে নিয়ে খাটো বলেই মেয়ে প্রতিবছর এত ভালো রেজাল্ট করে৷ সুমিতা মেয়েকে সেগুলো পড়াতো, মুখস্থ করাতো। বিকেলে ব্লাউজের ফিনিশিং এর কাজ করতে করতেই চশমা চোখে দিয়ে পড়া ধরত সে। কিন্তু এখন মেয়ের পড়াগুলো তার নাগালের বাইরে চলে গেছে একটু একটু। সে নিজে আর্টসের ছাত্রী। বিজ্ঞান অঙ্কটা তার বেশ অসুবিধাই হচ্ছিল৷ গত বছরই একটা অঙ্কের কোচিং এ দিয়েছিল। তাতে সুমিতার খাটুনি বেশ বেড়েছিল অবশ্য৷ স্কুলে দেওয়া নেওয়া, আবার হাঁফাতে হাঁফাতে কোচিং এ দেওয়া নেওয়া৷ মেয়ের বন্ধুর মায়েরা হেসে বলত-" সুমিতা এই সারাদিন এত পরিশ্রম করো বলেই চেহারাটা এমন ছিপছিপে সুন্দর রাখতে পেরেছ। আমরা তো সব মুটিয়ে যাচ্ছি।" বাবলু কিন্তু আর সুমিতাকে এই পরিশ্রম করতে দিল না। দুম করে পাড়ার মাস্টারমশাই এর সাথেই কথা বলে বাড়িতেই মেয়ের জন্য বিজ্ঞানবিভাগের টীচার রেখে দিল সে। মেয়ে আজকাল নিজেই পড়ে। সুমিতাকে অন্য অন্য বিষয়ও পড়াতে হয় না৷ অসহায়ের মত সুমিতা বলেছিল -" এত কাড়ি গুচ্ছির টাকা দিয়ে বাড়িতে লোক রাখার কি দরকার ছিল? " বাবলু ওর মাথায় সস্নেহ হাত রেখে বলে-" অনেক অনেক কষ্ট করেছ এতদিন। কিন্তু আর না। এখন তো আর সেই অবস্থা নেই। বিশাল কিছু ধনী না হই। এইটুকু মধ্যবিত্তের সংসার ঠিক চালাতে পারবো। আমি তো রিক্সার সাথেও কথা বলেছি। আগামী মাস থেকে মেয়েকে দিয়ে আসবে নিয়ে আসবে। " সুমিতা যেন খড়কুটো আশ্রয় করার মত করে বলেছিল-" তাহলে আমি কি করব?" বাবলু বলেছিল-" বিশ্রাম করবে। নিজেকে একটু সময় দেবে। সিরিয়াল দেখবে৷ গল্প করবে।"
পাড়ার বৌ মেয়েরা বিকেলে টি.ভি সিরিয়াল দেখে। শীতের দুপুরে রোদে চুল শুকাতে শুকাতে একে অন্যের সাথে গল্প করে৷ সুমিতার কোনকালে ওসবের সময় হয় না। টি.ভি অবশ্য তারও আছে। সে এতকাল বলত -" আমার বাবু এত সময় নষ্ট করার সময় নেই। নিজের সংসারের গল্পই সাতকাহন। অন্যের সাথে গল্প করব সে ফুরসত কই?" এখন নতুন করে এসব করবে ভাবতেই যেন কেমন খাপছাড়া লাগে তার। মনে হয় সে বোধহয় বাতিল হয়ে যাচ্ছে।
বাবলু রাতে সুমিতার শুকনো মুখ দেখে উদ্বিগ্ন স্বরে জিজ্ঞেস করে-" কি হয়েছে মিতা? তোমার কি শরীর খারাপ?" সুমিতা কি বলবে ভেবে পায় না। তার যে শরীর নয় মন খারাপ একথা বাবলুকে বলা যায় না৷ কারণ মন খারাপের কারণটা তার নিজের কাছেই ভীষণ অস্পষ্ট। যেকোন মেয়েই তো এমন একটা সুখের জীবন চায়৷ তবে তার যে কোথায় আটকাচ্ছে তা সে নিজেই সঠিক বুঝে উঠতে পারছে না। বাধ্য হয়েই বলে-" না মানে শরীরটা ওই একটু আর কি।" ভীষ্ণ চিন্তিত হয়ে পরে বাবলু। আজ বলে নয়। এ বাবলুর বরাবরের স্বভাব। সে সুমিতার সামান্য হাত কাটলেও দিশেহারা হয়ে যায়। সুমিতা এই বিষয়টা নিয়ে লজ্জাও পায় আবার ভিতরে ভিতরে একটা প্রছন্ন সুখ ভোগ করে। কিন্তু আজ আর বাবলু শুধু উদ্বিগ্ন হয়েই শান্ত হল না। সে জোর করে সুমিতাকে নিয়ে গেল পাড়ার ডাক্তারখানায়। এমনিতে এতকাল অসুখে বিসুখে সুমিতা সরকারী হাসপাতালেই দেখিয়েছে। বলতে নেই সুমিতার শরীর-স্বাস্থ্য এতটাই ভালো যে এক বাচ্চা হওয়া ছাড়া ডাক্তার দেখানোর মত তার হয়ও নি কিছু৷ পেটের অসুখে এক বেলা উপোস, আর জ্বর সর্দি তে বাসকপাতার রস কিম্বা শিউলি পাতার রসেই কাজ চালিয়েছে সে। মেয়ের কিছু হলেও সেই নিয়ে গেছে। বাবলু কোনকালেই ঠিক এভাবে নিয়ে যায় নি। অবশ্য তার কারণ বাবলু তো বাড়িতেই থাকত না। আলমারির কারখানা বা দোকান দুটোতেই ছুটি নেওয়ার বড় বাঁধা নিষেধ ছিল। তাছাড়া বাবলু বোধহয় সুমিতার উপর দায়িত্ব ন্যস্ত করে নিশ্চিন্ত ছিল বলেই জ্বর সর্দি কিম্বা পেটখারাপে তেমন মাথা ঘামাই নি কখনো। কিন্তু এখন নতুন চাকরীতে এত বেশীক্ষণ বাড়ির বাইরে থাকতে হয় না। বাড়ি ফিরে তাই সুমিতার মুখের দিকে তাকানোর অবকাশ মেলে তার।আজ তাই সুমিতার শত সহস্র বাঁধাকে উপেক্ষা করে প্রায় জোর করেই নিয়ে গেল ডাক্তারখানায়। রোগ অবশ্য ডাক্তার তেমন কিছু পেলেন না। প্রেসারটাই যা একটু লো। উনি ভিটামিন লিখলেন একটা। বাবলু ডাক্তারকে বলল-" আসলে কি জানেন, সময় মত খাওয়া দাওয়া করে না। অযথা বেশী পরিশ্রম করে। " ডাক্তার বললেন-" না মিসেস দে। শরীর নামক যন্ত্রেরও কিন্তু বিশ্রাম দরকার হয়৷ না হলে সেও বিকল হতে সময় নেয় না।"
চেম্বার থেকে ফেরার পথে দেখা হল পাড়ার মালা বৌদির সাথে৷ হেসে বললেন-" কি ব্যাপার সুমিতা৷ কত্তা গিন্নি ইভনিং ওয়াক নাকি?" সুমিতা হেসে বলল-" আর বলো কেন বৌদি৷ একটু ক্লান্ত লাগছিল। তাতেই তোমার দেওর ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেছিল। কোন মানে হয় বল।" মালা বৌফি হেসে বলে-" আহা, অমন বোলো না গো৷ একটু যত্ন করছে করতে দাও৷ ভাগ্য করে এমন স্বামী পেয়েছ। আমরা তো তাই বলি ভাগ্যবতী মেয়ে তুমি।" কানে লাগে ভাগ্যবতী শব্দটা সুমিতার। আশ্চর্য হয় সে। কটা দিন আগেও এরা সুমিতাকে বলত বাবলু ভাগ্যবান এমন বৌ পেয়েছে বলে। আজ কয়েকটা মাত্র দিনের ব্যবধানে সুমিতা কেমন যেন অপ্রয়োজনীয় হয়ে গেছে। এই ভাগ্যবতী শব্দটা যেন বুঝিয়ে দিচ্ছে যে বাবলুর মত ছেলেকে স্বামী হিসেবে পাওয়াটা আসলে তার যোগ্যতার অতিরিক্ত প্রাপ্তি। কেমন ভারি হয়ে ওঠে তার মন।
বাবলু রাতে খেতে বসে বলল-" দেখলে তো ডাক্তারবাবুও বিশ্রামের কথা বললেন। এবার আর আমি তোমার কোন কথা শুনবো না। সারাদিন ওই মেশিন চালানো আর চলবে না। আমি যেমন করে পারি সংসার চালাবো।বাড়তি রোজগার দরকার নেই। " সুমিতা দারুণ চমকায়৷ নিজেকে যেন হঠাৎ কেমন অস্তিত্বহীন মনে হয়। হঠাৎই কেমন রেগে ওঠে সে।
বাবলু থতমত খেয়ে যায়। কি হয়েছে বুঝে উঠতে পারে না। সুমিতা বলে-" কেন এমন করছ? আমার কি নিজের একটা ইচ্ছে অনিচ্ছে থাকতে নেই? আমার সাজানো সংসারে আমাকেই এভাবে অতিথি করে দিচ্ছ? আমি কি এ সংসারের শোকেসে সাজানো শোপিস? দুদিন একটু পয়সার মুখ দেখলেই সব উড়িয়ে পুরিয়ে দিতে হবে? " মেয়ে বুকাই কিছু বুঝতে পারে না। মা আগে যে অভিযোগ করত তাতে সে বুঝত যে মাএর পরিশ্রম হয় তাকে সাহায্য করার কেউ নেই বলে মা কষ্ট পায়। কিন্তু এখন বাবা এত ভালো ভালো কাজ করার পরেও কেন মা রেগে গেল তা বুকাই বোঝে না। বুকাইএর বিস্মিত দৃষ্টির সামনে সুমিতা নিজেকে সামলে নেয়৷ রাতে বুকাই ঘুমিয়ে গেলেও সুমিতার চোখে ঘুম আসে না। খেতে বসে যে ছেলেমানুষী আবেগ সে প্রকাশ করে ফেলেছে তার জন্য নিজেই লজ্জা বোধ করে। আবার তার যে কষ্ট হচ্ছে তাও তো এক বর্ণ মিথ্যে নয়। সুমিতা নিজেকে বোঝাতে চেষ্টা করে যে তার সুখের অসুখ করেছে। রাত বেড়ে চলে। একসময় পিঠে হাত রাখে বাবলু। বাবলুরও ঘুম আসে নি। সুমিতা মুখ ফেরায় তারপর অস্ফুটে বলে-" আমায় ক্ষমা করো। খাবার সময় তখন ওরকম করে বলাটা আমার অন্যায় হয়েছে।" বাবলু সেই ছোটবেলার মত সুমিতার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলে -" দূর পাগলী। তুমি তো ঠিকই বলেছ। আসলে আমিই নতুন রোজগারের আনন্দে বাড়াবাড়ি করে ফেলছিলাম। দেখ ভেবে দেখলাম তোমার বিবেচনাই ঠিক। মেয়েটা বড় হচ্ছে। পড়াশোনায় ওর মাথা যখন ভালো ওর পড়াশোনাটা যতদূর চায় চালিয়ে যেতে হবে। তার জন্য খরচ আছে। তাছাড়া বিয়ে দিতেও খরচ হবে। তাই অতিরিক্ত খরচ করাটা সত্যিই ঠিক নয়৷ তাছাড়া সংসারটা তোমার। তুমি কেমন ভাবে চালাবে সে তুমিই এতদিন বুঝে এসেছ, তুমিই বুঝবে৷ ওসব তো কোনদিনই মাথায় ঢোকে না আমার। তবে তোমারও তো শরীর ভেঙেছে, তাই বলি কি অতিরিক্ত পরিশ্রম করার দরকার নেই। আমি বরং তার চেয়ে যে টাকাটা কাজের লোক রিক্সা মাষ্টারমশাই কিম্বা মুদির দোকানে বাড়তি খরচ করছিলাম সেই টাকাটাই তোমায় দিয়ে দেব। তুমি প্রয়োজন মত বুঝেসুঝে খরচ কোরো। তোমার হাতে থাকলে তবু ভবিষ্যতের দুটো পয়সা জমবে। না হলে আমি যা উড়নচন্ডে..." বাবলুর কথা শেষ হবার আগেই ঝর ঝর করে কেঁদে ফেলে সুমিতা। বাবলু কিছু বলে না মুখে। শুধু সেই বিয়ের প্রথম প্রথম যেমন সুমিতাকে কোলের কাছে টেনে নিত তেমন করে টেনে নেয়। সুমিতার নিজেকে সত্যিই কেন জানি না রানী মনে হয় হঠাৎ।
সুমিতার সংসার এখন আগের মতই চলছে। না কাজের লোক সন্ধ্যাকে আর ছাড়ায় নি সুমিতা। তবে পাইকারি বাজার থেকেই কেনাকাটাটা করে। তফাতের মধ্যে বাজার সেরে এখন আর চড়া রোদে হেঁটে ফেরে না। রিক্সায় ফেরে। পাইকারী বাজারে দামের যা ফারাক রিক্সা ভাড়া দিয়েও আগের থেকে কম হলেও সাশ্রয় হয়।চালটা অবশ্য আর রেশনের খায় না। ওটা রতন মুদির দোকানেই বন্দোবস্ত হয়েছে। না, মেয়েকে রিক্সায় পাঠায় না সুমিতা। নিজেই দিয়ে আসে নিয়ে আসে। তার মতে মেয়ে বড় হচ্ছে। সঙ্গে সঙ্গে থাকাই ভালো। তবে আজকাল দেরী হয়ে গেলে অটোতে চলে যায় এক একদিন। মাস্টারমশাই বাড়ি এসেই পড়াচ্ছেন। সুমিতা দেখেছে তাতে পড়া ভালো হচ্ছে। বিকেলের দিকটা অর্ডারের সেলাইটাও করে সুমিতা। তবে আগের মত চাপ নিয়ে নয়। একটু কমিয়ে দিয়েছে। তার বদলে সন্ধ্যায় আধাঘন্টা সে "মধুমিতার রান্নাঘর" অনুষ্ঠানটা দেখে। ভালো ভালো রান্না শেখা যায়। তবে গজগজ করে এখনও একই ভাবে একই সুরে। বক্তব্য যদিও পাল্টেছে। আগে বলত -" খেটে খেটে হাড়েমাসে কালি পরে গেল। একটা সাহায্য কেউ করবে না। সংসার যেন আমার একার।" আর এখন বলে-" যত্ত উড়নচণ্ডী নিয়ে হয়েছে আমার সংসার৷ টাকা পেলেই উড়িয়ে দিতে হবে। একটু যদি বিবেচনা থাকে। যেদিকে না দেখব.."

0 মন্তব্যসমূহ