দর্পণ || আজ ১লা এপ্রিল




পোস্ট বার দেখা হয়েছে

আজ ১লা এপ্রিল । গোটা বিশ্ব এই দিনটিকে এপ্রিল ফুল বা বোকা বানানোর দিন হিসেবে পালন করে । ১লা এপ্রিল আত্মীয়-স্বজন থেকে শুরু করে বন্ধুবান্ধবরা কোনও কথা বললে সেটা চট করে বিশ্বাস করতে চান না কেউই । যদিও হাজার সাবধানতা সত্ত্বেও "এপ্রিল ফুল" বনে যেতেই হয় ! কিন্তু কোন ঘটনা থেকে এর সূত্রপাত ? এ'নিয়েও রয়েছে অজস্র কাহিনী ।


এপ্রিল ফুলের সবচেয়ে প্রচলিত কাহিনী অনুযায়ী এর উদ্ভব ষোড়শ শতাব্দীর ফ্রান্সে । ১৫৬৪ সালে সর্বপ্রথম ফ্রান্স তাদের ক্যালেন্ডার পরিবর্তন করে । এর আগে বছর শুরু হতো মার্চের শেষে, যা জুলিয়ান ক্যালেন্ডার নামে পরিচিত ছিল । কিন্তু এটা এগিয়ে নিয়ে এসে বছর শুরু করা হয় ১লা জানুয়ারি থেকে, যা গ্ৰেগরিয়ান ক্যালেন্ডার নামে পরিচিত । কিন্তু চিরাচরিত ক্যালেন্ডারের হঠাৎ করে নতুন এই পরিবর্তন অনেকেই মানতে পারলেন না । তারা এই সিদ্ধান্তে অটল থাকলেন যে, ২৫শে মার্চ থেকে ১লা এপ্রিল পর্যন্ত তারা আগের মতোই নববর্ষ পালন করবে । কিন্তু যারা পরিবর্তন গ্রহণ করেছিল তারা পুরাতনপন্থীদের বোকা বানিয়ে তাদের সাথে মজা করতে চাইল । যারাই মার্চের শেষে নববর্ষ করতে চেয়েছিল তাদের অজান্তে তাদের পিঠে কাগজের মাছ আটকিয়ে দিয়ে শুরু হয় বোকা বানিয়ে মজা নেওয়া । যাদের পিঠে এইভাবে অজান্তে কাগজের মাছ আটকিয়ে এই ধরনে মজা করা হত, তাদেরকে "পয়সন দ্য আভ্রিল" বা "এপ্রিল মাছ" বলে ডাকা হত । কবি চ্য-সারের ক্যান্টারবেরি টেইলস গ্ৰন্থে এই ঘটনার বিবরণ মেলে ।


আরও একটি কাহিনী অনুসারে এর সূত্রপাত আরও আগে; চতুর্দশ শতাব্দীর ইংল্যান্ডে । ১৩৮১ সালে ইংল্যান্ডের রাজা রিচার্ড এবং রানী অ্যান ঘোষণা করেছিলেন তাঁরা ৩২শে মার্চ ১৩৮১ সালে বাগদান করবেন । কিন্তু, বাস্তবে ৩২শে মার্চ বলে কোনও দিনই হয় না । তাই ইংল্যান্ডের জনগণ এই সংবাদ শুনে প্রথমটায় দারুণ খুশি হলেও খুব তাড়াতাড়ি তারা বুঝতে পারেন তাদের আসলে বোকা বানানো হয়েছে । এরপর থেকেই ৩১শে মার্চের পরদিন অর্থাৎ ১লা এপ্রিল "বোকা দিবস" হিসেবে পালনের চল শুরু হয় ।


রোমান মিথোলজি অনুসারে রোমান মৃত্যু দেবতা প্লুটো যখন তার স্ত্রী পারসিফনকে অপহরণ করে আনলেন, তখন পারসিফনের মা সেরিস মেয়েকে প্রাণপনে খুঁজতে চেষ্টা করেন । কিন্তু বোকার মতো অনেক খুঁজেও পেলেন না পারসিফনকে । কারণ পারসিফন তখন মাটির নিচে, আর তাঁর মা সেরিস তখন মাটির উপরে । সেরিসের বোকামি স্মরণ করে ১লা এপ্রিল "বোকা দিবস" পালন করা হতো বলে অনেকে মনে করেন ।


বাইবেলে বর্ণিত নোয়া'র একটি গল্পও এ'সম্পর্কে প্রচলিত রয়েছে । বাইবেলে বর্ণিত মহাপ্রলয়ের পর যখন নোয়া তাঁর নৌকা থেকে দেখেন যে বন্যার জল কমার কোনো লক্ষণ নেই, তখন তিনি একটি পায়রাকে পাঠান দেখার জন্য যে পায়রাটি তাঁর কাছে ফিরে আসে কিনা, ফিরে আসলে সেটা হবে ডাঙ্গা খোঁজার একটা ব্যর্থ প্রচেষ্টা । ডাঙ্গা পেলে ওই পায়রাটি আর ফিরবে না । কিন্তু পায়রাটি ফিরে আসায় নোয়া বোকা বনে গেলেন । বাইবেলে বর্ণিত এই ঘটনা উল্লেখ করে এপ্রিল ফুল পালন করা হতো বলে কেউ কেউ মনে করলেও এর সপক্ষে কোনো যুক্তিগ্ৰাহ্য প্রমাণ মেলে না ।


ব্রিটিশ লোককথা বলে, ব্রিটেনের নটিংহ্যামশায়ারের "গথাম" শহরে নাকি বোকারা বাস করত। ত্রয়োদশ শতকের দিকে নিয়ম ছিল, ব্রিটেনের রাজা যেখানে যেখানে পা রাখবেন তা হয়ে যাবে রাষ্ট্রের সম্পত্তি । যখন গথামবাসীরা শুনল রাজা জন আসছেন গথাম শহরে, তারা ঠিক করল যে কোনোভাবেই রাজা জন'কে গথামে ঢুকতে দেবে না, তারা কিছুতেই গথামকে হারাবে না । এই শুনে রাজা ক্ষেপে গেলেন, সৈন্য পাঠালেন । যখন সৈন্যদল এল, শহরের প্রধান দরজা থেকে তারা দেখল সারা শহরে হুলস্থূল কাণ্ড । সব বাসিন্দা বোকার মতো কাজ করছে । তারা হতভম্ব হয়ে ফিরে গিয়ে এমন রিপোর্ট দিল যে, রাজা বললেন, এমন বোকাদের শাস্তি দেওয়া যায় না, তাদের রাজ্যও কেড়ে নেওয়া ঠিক হবে না । তিনি আর গথাম শহরে পা রাখলেন না । গথাম স্বাধীন থাকল । এপ্রিলের ১ তারিখে এই ঘটনা ঘটায় এই দিনটি "বোকা দিবস" বলে চিহ্নিত বলে কেউ কেউ মনে করে থাকেন । এটি "ব্রিটিশ গথাম থিওরি" নামে পরিচিত ।


১৫৩০ সালের ১লা এপ্রিল, জার্মানির অগসবার্গ শহরে একটা আইন বিষয়ক গুরুত্বপূর্ণ মিটিং হবার কথা ছিল । এই মিটিং-এর ফলাফল নিয়ে অনেক লোক তাদের অনেক টাকা এক ম্যাজিশিয়ানের কাছে জমা রাখে । কিন্তু শেষ পর্যন্ত ওই দিন সেই মিটিং হয়নি । ম্যাজিশিয়ানও ওই টাকা ফেরত দেয়নি । সব টাকা গচ্চা যায় । এই বোকামি একটা উৎস হতে পারে এপ্রিল ফুলস্ ডে'র । 


১৫৭২ সালের ১লা এপ্রিল তারিখে হল্যান্ডের (নেদারল্যান্ডের) ডেন ব্রিয়েল শহরটি স্পেনীয় শাসন থেকে মুক্ত হয় ।  স্পেনীয় শাসক লর্ড আলভাকে পুরো বোকা বানিয়ে ছাড়ে হল্যান্ডের বিদ্রোহীরা । ১লা এপ্রিলে আলভার বোকামিকে  স্মরণ করে এপ্রিল ফুলস্ ডে পালন করা হয় ।


এছাড়াও আরও একটি মতবাদ সম্প্রতি তৈরি হয়েছে হোয়াটসঅ্যাপ ইউনিভার্সিটিতে । মূলতঃ ওপার বাংলার (এবং কিছুক্ষেত্রে এপার বাংলারও) কিছু উগ্ৰ মৌলবাদী মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষ সম্পূর্ণ সাম্প্রদায়িক ও পরধর্মবিদ্বেষমূলক উদ্দেশ্য নিয়ে এই কাহিনী তৈরি করে, যা স্যোশাল মিডিয়ায় বেশ ভাইরাল । এই কাহিনী অনুসারে ১৪৯২ সালে রাজা ফার্দিনান্দ স্পেনের মুসলিম অধ্যুষিত গ্রানাডার অভিমুখে হামলা করেন । এই সময় ফার্দিনান্দ শহরের আশেপাশের সকল শস্যক্ষেত্র জ্বালিয়ে দেবার আদেশ দিলে মুসলিমদের মাঝে মারাত্মক খাদ্য সংকট নেমে আসে এবং অচিরেই সেখানে দুর্ভিক্ষ দেখা দেয় । দুর্ভিক্ষ চরম অবস্থায় এসে পৌঁছলে তখন রাজা ফার্দিনান্দ ঘোষণা করেন যে, মুসলমানরা যদি শহরের প্রধান ফটক খুলে দিয়ে নিরস্ত্রভাবে মসজিদে আশ্রয় নিলে তাদেরকে বিনা রক্তপাতে মুক্তি দেওয়া হবে । রাজার কথা শুনে তারা সকলে মসজিদগুলোতে আশ্রয় নিলে রাজার সৈন্যবাহিনী মসজিদগুলোতে তালা আটকে দিয়ে আগুন লাগিয়ে মুসলমান সম্প্রদায়ের লক্ষ লক্ষ মানুষকে হত্যা করে । মুসলমানদের এইভাবে বোকা বানিয়ে গণহত্যার ঘটনাকে "এপ্রিল ফুলস ডে” হিসেবে পালন করার রীতি চালু হয় খ্রিষ্টান দেশগুলোতে । বলাই বাহুল্য, এই বিবরণ সর্বৈব মিথ্যা, সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন, ভীষণ রকমের অসৎ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং এই কাহিনী সর্বাংশে পরিত্যাজ্য ।


এ'ছাড়াও রয়েছে এ'সংক্রান্ত আরও অনেক কাহিনী ও মতবাদ । যেমন কিছু মানুষ আবার এই দিনটিকে প্রাচীন রোমান উৎসব "হিলারিয়া"-র সঙ্গে সংযুক্ত করেন, যার ল্যাটিন অর্থ উৎসব । এটি একটি হাসি এবং মজার উৎসব । মানুষ ছদ্মবেশে নানান আজব পোশাক পরে আত্মীয়-স্বজন, বন্ধুবান্ধবদের নিয়ে ঠাট্টা তামাশায় মেতে থাকত এবং শীতের শেষে বসন্তকে উপভোগ করত । কারোর কারোর মতে প্রাচীন মিশরের পৌরাণিক কাহিনির সঙ্গেও এপ্রিল ফুলস্ ডে'র  সম্পর্ক রয়েছে । কিছু প্রতিবেদন অনুসারে, ব্রিটিশরা ভারতে ১৯ শতকে এই দিনটি উদযাপন শুরু করে । যদিও গত কয়েক বছরে এটি উদযাপনের উন্মাদনা বেড়েছে । এমনকী সোশ্যাল মিডিয়াতে, এই সম্পর্কিত মিমস্ মারাত্মকভাবে ভাইরাল হয় । তবে মজা করার সময় মাথায় রাখা অতি অবশ্যই জরুরি, মজার ছলে কোনো কথা কিংবা ঠাট্টা-তামাশা যেন অপর মানুষটিকে কোনোভাবেই কষ্ট না দেয় কিংবা আহত বা অপমানিত না করে ।

_______

তথ্যসূত্র : সংগৃহীত 

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ