রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও লালন সাঁই ~ দেবাশীষ ভট্টাচার্য্য




পোস্ট বার দেখা হয়েছে

লালন এবং রবীন্দ্রনাথের মুখোমুখি সাক্ষাৎ নিয়ে গবেষকগণের মধ্যে মতভেদ থাকলেও রবীন্দ্র মানসে লালন দর্শন তথা বাউল দর্শনের প্রভাবের কথা অস্বীকার করার কোন সুযোগ কারোরই নেই। আবার রবীন্দ্র-লালনের মুখোমুখি সাক্ষাতের ব্যাপারটা যে একেবারেই অসম্ভব এমনটি বলাও মুস্কিল। কারণ রবীন্দ্রনাথ ১৮৯০ সালের শেষের দিকে জমিদারির দায়িত্ব নিয়ে কুষ্টিয়ার শিলাইদহে আসার পূর্বে ১৮৭২ এবং ১৮৭৫ তিনি জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাথে শিলাইদহে এসেছিলেন। এবং এই পর্বে রবীন্দ্রনাথের সাথে লালনের দেখা হয়েছে বলে অনেক গবেষক দৃঢ়ভাবে মত ব্যক্ত করেছেন। আবার অনেকে এই ঘটনা অগ্রাহ্য করেন | যাইহোক এই তর্কে যাবো না, তবে রবীন্দ্রনাথের রচনায় বাউলের প্রভাব যথেষ্ঠ লক্ষণীয় | 


লালন গীতির কোন লিখিত রূপ লালন সাঁইয়ের স্বহস্তে না থাকার কারনে তাঁর ভাব শিষ্যদের কন্ঠে বা খাতায় মূল ভাবাদর্শের রূপখানি অনেকাংশে বিকৃত হয়ে গিয়েছে। এমনকি তাঁর দেহান্তরের পরে বহু সংগ্রাহক ও সংকলকগনও সংশোধনের নামে যথেচ্ছ বিকৃত ঘটিয়েছেন। তথাপি লালন প্রেমিক বা লালন ভাবাদর্শে বিশ্বাসীগণ লালনের কালামকে অর্থাৎ, লালন সঙ্গীতকে - তাঁর দর্শনকে বা লালনের স্বকীয় প্রভাময় ভাবাদর্শকে বাংলা সাহিত্য ভান্ডারে ধরে রাখার জন্য অনেক চেষ্টা ও কষ্ট করেছেন। ঐ সকল জ্ঞানী অনুসন্ধিৎসু সংগ্রাহক ও সংকলকদের মধ্যে আমরা পরম শ্রদ্ধাভরে একজনকে বিশেষভাবে স্মরন করতে পারি। তিনি হলেন মহৎ প্রাণ কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। যিনি মহারাজ ফকির লালন শাহের প্রতি প্রচন্ড ভালোবাসা আর গুরু ভাবজ্ঞানে লালন সঙ্গীতের সংগ্রাহক ও সংকলক রূপে নিঃসন্দেহে এক গুরুত্বপূর্ন ভূমিকা পালন করেছেন।


লালন সাঁই সব সময় বিলীন থাকেতেন পরমাত্মার মাঝে। আর সেই অসীম পরম আত্মার মাঝেই খুঁজে বেরিয়েছেন মানবসত্ত্বার মানুষকে। মানবতাই তাঁর নিকট ছিল বিশেষ গুরুত্ববহ । পরমাত্মার সাথে মানুষের একাত্ম হওয়ার ধর্মই মানবতা ধর্ম। যা মানবাত্মার দিব্যজ্ঞানের পরিচায়ক। তাঁর ভাষায় -


‘ডানে বেদ, বামে কোরান,

মাঝখানে ফকিরের বয়ান,

যার হবে সেই দিব্যজ্ঞান

সেহি দেখতে পায় ।’

আর এই বাণীর দ্যোতনা খুঁজে পাই কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখায় । তিনি সীমাবদ্ধতার ভেতর খুঁজেছেন অসীমের আলোক রশ্মি। অন্য এক ধরনের ভাব দর্শনে আলিঙ্গন করতে চেয়েছেন অসীমত্বের মাঝে অস্তিত্বের সন্ধান। তাই তিনি লেখনীর তুলিতে ছাপিয়ে তোলেন সেই আকাঙ্খার সুর ও ছন্দ -


‘সীমার মাঝে, অসীম, তুমি

বাঁজাও আপন সুর।

আমার মধ্যে তোমার প্রকাশ

তাই এত মধুর।

কত বর্ণে কত গন্ধে

কত গানে কত ছন্দে,

অরূপ, তোমার রূপের লীলায়

জাগে হৃদয়পুর।’


বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথের নিজের ভাষায় - ‘.............. বাউলের সুর ও বানী কোন এক সময় আমার মনের মধ্যে সহজ হয়ে মিশে গেছে। আমার মনে আছে, তখন আমার নবীন বয়স- শিলাইদহ (কুস্টিয়া) অঞ্চলের এক বাউল একতারা হাতে বাজিয়ে গেয়েছিল -


‘কোথায় পাবো তাঁরে - আমার মনের মানুষ যেঁরে।

হারায়ে সেই মানুষে- তাঁর উদ্দেশে

দেশ বিদেশে বেড়াই ঘুরে ।’


(এই গানটি গেয়েছিল-ফকির লালন শাহের ভাবশিষ্য গগন হরকরা। যার আসল নাম বাউল গগনচন্দ্র দাস।)

সেই কথাই যেন আমরা শুনতে পাই কবিগুরু রবি ঠাকুরের কন্ঠে -


‘তুমি কেমন করে গান কর যে, গুণী,

অবাক হয়ে শুনি কেবল শুনি।

সুরের আলো ভূবন ফেলে ছেয়ে,

সুরের হাওয়া চলে গগন বেয়ে,

পাষান টুটে ব্যাকুল বেগে ধেয়ে

বহিয়া যায় সুরের সুরধুনী।’


রবীন্দ্রনাথ অরূপের (নিরাকার) অপরূপ রূপে অবগাহনের নিমিত্তে অতল রূপ সাগরে ডুব দিয়েছেন অরূপ রতন (অমূল্য রতন) আশা করি, তাঁর ভাষায়-


‘রূপসাগরে ডুব দিয়েছি

অরূপ রতন আশা করি ;

ঘাটে ঘাটে ঘুরব না আর

ভাসিয়ে আমার জীর্ণ তরী ।

সময় যেন হয় রে এবার

ঢেউ-খাওয়া সব চুকিয়ে দেবার

সুধায় এবার তলিয়ে গিয়ে

অমর হয়ে রব মরি।’


লালন তাঁর একতারার তারে সুরে ও ছন্দে গেয়ে গেছেন -


‘রূপের তুলনা রূপে।

ফণি মণি সৌদামিনী

কী আর তাঁর কাছে শোভে ।

যে দেখেছে সেই অটল রূপ

বাক্ নাহি তার, মেরেছে চুপ।

পার হলো সে এ ভবকূপ

রূপের মালা হৃদয়ে জপে ।’


এই রূপের তুলনা মানবসত্ত্বায় নিহিত বস্তুমোহমুক্ত নিষ্কামী মহা মানবের স্বরূপ। তাই লালন ফকির দ্বিধাহীন চিত্তে প্রকাশ করেছেন -


‘যার আপন খবর আপনার হয় না।

একবার আপনারে চিনতে পারলেরে

যাবে অচেনারে চেনা ।

আত্মরূপে কর্তা হরি,

নিষ্ঠা হলে মিলবে তাঁরই ঠিকানা।

ঘুরে বেড়াও দিল্লি লাহোর

কোলের ঘোর তো যায় না ।’


ধর্ম তত্ত্বে পরমাত্মা বা ঈশ্বরকে অনুসন্ধানের জন্য বৈরাগ্য সাধন প্রক্রিয়ায় বনে-জঙ্গলে, পাহার-পর্বতে, অথবা মক্কা-কাশীতে যাওয়ার তাগিদ অনুভব করেনি লালন শাহ; তেমনি তাঁর রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও লালন দর্শনের মতোই ঈশ্বরের মহিমা খুঁজে ফিরেছেন মানুষের মাঝে। মানুষই ঈশ্বর, মানুষই দেবতা, মানুষের মাঝেই পরমাত্মার অস্থিত্ব লীন। তাই লালন শাহের কন্ঠে যেমন শুনি-


‘ ভবে মানুষ গুরুনিষ্ঠা যার।

সর্বসাধন সিদ্ধি হয় তার ।

নিরাকারে জ্যোতির্ময় যে

আকার সাকার হইল সে

যে জন দিব্যজ্ঞানী হয়, সেহি জানতে পায়

কলি যুগে হল মানুষ অবতার ।’


অপরদিকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লালন শাহের ভাব দর্শনের দ্যোতনাকে আরও উচ্চমার্গ্মে তুলে ধরেছেন। মনে হয় লালনের চিন্তা-চেতনাকে শালীন ও সুন্দরভাবে তুলে ধরেছেন স্বয়ং কবিগুরু।" কবিগুরুর ভাষায় তা হলো -


‘ভজন পূজন সাধন আরাধনা

সমস্ত থাক পড়ে।

রুদ্ধদ্বারে দেবালয়ের কোণে

কেন আছিস ওরে।

তিনি গেছেন যেথায় মাটি ভেঙে

করছে চাষা চাষ -

পাথর ভেঙে কাটছে যেথায় পথ,

খাটছে বারো মাস।

রৌদ্রে জলে আছেন সবার সাথে,

ধূলা তাঁহার লেগেছে দুই হাতে -

তাঁরই মতন শুচি বসন ছাড়ি

আয় রে ধুলার ‘পরে।’


অপরদিকে, ফকির লালন শাহ মানবদেহে নিহিত আলোকিত সত্তার উন্মেষের ইচ্ছায় স্বীয় কন্ঠে উচ্চারন করেন -


‘মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি।

মানুষ ছাড়া ক্ষ্যাপারে তুই

মূল হারাবি ।

মানুষ ছাড়া মনরে আমার

দেখিরে সব শূন্যকার

লালন বলে মানুষ আকার

ভজলে পাবি ।’


লালন ফকির তাঁর পরমাত্মার সাথে মিলনের প্রচন্ড আকাঙ্খা তাঁকে উন্মাতাল করে রাখতো, তাই সে প্রভুর সাথে মিলনের আকাঙ্খায় বেদন সুরে গেয়ে বেড়ায়-


‘ মিলন হবে কতোদিনে।

আমার মনের মানুষের সনে ।

ঐ রূপ যখন স্মরণ হয়

থাকে না লোক লজ্জার ভয়

লালন ফকির ভেবে বলে সদাই

ও প্রেম যে করে সেই জানে ।’


প্রভুর সাথে মিলনের ইচ্ছা লালনকে যেমন চাতক প্রায় জোছনালোকের প্রত্যাশায় দিন গুনতো , তেমনি প্রভুর সান্নিধ্য পাবার আশায় রবীন্দ্রনাথ ব্যাকুল হৃদয়ে গাইতেন -


‘যদি তোমার দেখা না পাই প্রভু,

এবার এ জীবনে,

তবে তোমায় আমি পাইনি যেন,

সে কথা রয় মনে ।

যেন ভুলে না যাই, বেদনা পাই

শয়নে স্বপনে !

______________________

( তথ্যসূত্র  : সংগৃহীত) 

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ