পোস্ট বার দেখা হয়েছে
সম্পূর্ণ সিং কালরা সম্পূর্ণ সিং কালরা জন্ম ১৯৩৪ সালে পাকিস্তানে।
ইনিই গুলজার সাহেব। বিশিষ্ট কবি, সাহিত্যিক ও গীতিকার গুলজার চলচ্চিত্র দুটির নির্দেশক। গীতিকার হিসেবে সাফল্য অর্জনের পর তিনি ভিন্ন ধারার চলচ্চিত্র নির্মাণে এগিয়ে আসেন। বলা যায় হিন্দি চলচ্চিত্রে কিছু পরীক্ষামূলক কাজের ক্ষেত্র তিনিই প্রথম তৈরি করেছিলেন। গান নির্মাণের ক্ষেত্রে তার অবদান অসামান্য। তার লেখা গানের প্রতিটি কলি থেকে যেন জীবনের গভীর ভাব প্রকাশ পায়। চারপাশে যা ঘটছে তা দিয়েই খুব সহজ করে সুন্দর সুন্দর গান লিখতে পারেন।
দৈনন্দিন জীবনের সুখ, দুঃখ, ভাব, রাগ, অভিমান, কষ্ট প্রভৃতি আবেগকে গানের মাধ্যমে জীবন্ত করে তোলা যেন তার খেলা। চমৎকার আবৃত্তি করতে পারেন তিনি। আবৃত্তি এবং কোনো ঘটনার সংলাপ বলার ভঙ্গি যে কাউকে সেটা শুনতে বাধ্য করবে। চিত্রনাট্য তৈরিতেও তার জুড়ি মেলা ভার। উপমহাদেশের বিখ্যাত অভিনেতা নাসিরুদ্দিন শাহ্-এর অভিনীত ‘মির্জা গালিব’ টেলিভিশন সিরিজের জন্য গবেষণা, তথ্য সংগ্রহ, চিত্রনাট্য, নির্মাণ দায়িত্ব, গালিবের গানগুলোকে দর্শকদের উপযোগী করে তোলা ইত্যাদি কাজ একাই করেছিলেন তিনি। তার অবদানের কারণেই হয়তো আজও এ সিরিজের কথা মনে রেখেছে দর্শকরা।
দিল্লীতে পড়াশুনার শুরু হয় কবি গুলজারের। পরে বোম্বেতে একটি মোটর গ্যারেজে দুর্ঘটনাকবলিত গাড়ির রংয়ের মিশ্রণ এবং রং মেলানোর কাজ করতেন। ছোটবেলা থেকেই বই পড়ার প্রতি আলাদা নেশা ছিল। গ্যারেজে কাজ করার সময় রাতে কিছু করার ছিল না বলে সেখানেও বই পড়তেন। গ্যারেজের কাছেই ছিল একটি লাইব্রেরি। মাত্র চার আনায় সেখান থেকে বই নিয়ে পড়া যেত। সেখান থেকে গোয়েন্দা গল্প ও রহস্য-রোমাঞ্চ কাহিনী দিয়ে শুরু করেছিলেন। এরপর একদিন তার হাতে এলো রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাব্যগ্রন্থ মালীর ইংরেজি অনুবাদ Gardener। এটি পড়ার পর গুলজারের বই পড়ার ভাব এবং ধরন পুরোপুরি বদলে যায়। এমনকি বই নির্বাচনের ক্ষেত্রেও পরিবর্তন আসে। সাহিত্যের প্রতি আকর্ষণ বেড়ে যায়।
এরপর তিনি পড়েন শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের উপন্যাসগুলো। শরতের উপন্যাসগুলোতে তিনি বড় পরিবার এবং পরিবারের মানুষদের জটিল সম্পর্কগুলোকে দেখতে পান। একপর্যায়ে তিনি এসব উপন্যাসের চরিত্র এবং চরিত্রের ভাবের সাথে নিজের জীবনে ঘটে যাওয়া কিছু ঘটনার মিল খুঁজে পান। সেই তখন থেকে তিনি বাংলা ভাষার প্রতি আকৃষ্ট হন। বাঙালিদের খুব পছন্দ করেন তিনি। বাংলা ভাষাকে মিষ্টি ভাষা বলে মনে করেন।
হিন্দি চলচ্চিত্রে কাজও শুরু করেন আরেক কিংবদন্তী বাঙালি বিমল রয়ের সাথে। বিমল রয় ছাড়াও আরো অনেক গুণী মানুষদের সংস্পর্শে এসে তিনি কাজ করেছেন। সুরকার শচিন দেব বর্মণ, নির্দেশক হৃষিকেশ মুখার্জী তার মাঝে অন্যতম।
হৃষিকেশ মুখোপাধ্যায়ের পাশাপাশি সহকারি হিসেবে কাজ করতে থাকেন পরিচালক বিমল রায়, সুরকার হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে। বলিউডে পা রেখে সম্পূর্ণ রূপান্তরিত হলেন গুলজার-এ। তাঁর প্রথম কাজ 'বন্দিনী' ছবিতে শচীন দেব বর্মনের সুরে লেখা গান। আস্তে আস্তে গানের পাশাপাশি ছবি পরিচালনাও করতে থাকেন তিনি। গুলজারের বিখ্যাত গানগুলির মধ্যে অন্যতম, 'মেরে তেরে লিয়ে হি সাত রঙ্গ কে স্বপ্নে চুনে', 'জিন্দেগি, ক্যায়সি হ্যায় পহেলি', 'কহি দূর যব দিন ঢল যায়ে', 'না জিয়া লাগে না', 'সজন আয়ো রে', 'অ্যায় বতন', 'চপ্পা চপ্পা চরখা চলে' ইত্যাদি। প্রথম ছবি তপন সিংহের বাংলা ছবি 'আপন জন'-এর রিমেক 'মেরে আপনে'। এরপর একের পর এক তিনি তৈরি করেন, 'আঁধি', 'মৌসম', 'ইজাজত', 'পরিচয়', 'কোশিশ', 'মাচিস', 'হু তু তু' ইত্যাদি।
বড়পর্দার পাশাপাশি ছোটপর্দাতেও স্বকীয়তার ছাপ রেখেছেন গুলজার 'জঙ্গল বুক', 'এলিস ইন ওয়ান্ডারল্যান্ড', 'পটলি বাবা কি', 'হ্যালো জিন্দেগি' ধারাবাহিকের মাধ্যমে। জঙ্গল বুকের টাইটেল সং 'জঙ্গল জঙ্গল বাত চলি হ্যায়' আজও লোকের মুখে মুখে ফেরে।
কবি গুলজারের সবচেয়ে বড় ইতিবাচক দিক হলো তিনি সাহিত্য বিষয়ে প্রচুর পড়াশোনা করেছেন। ভিন্ন ধারার সিনেমাগুলো তৈরি হতো ভালো কোনো সাহিত্যিকের গল্প-উপন্যাস থেকে। গুলজারের ক্ষেত্রে দেখা যায় তিনি আগে থেকেই সেসব গল্প-উপন্যাস পড়ে রেখেছেন। গল্প-উপন্যাসের চরিত্রের সাথে পরিচয় থাকার কারণে চরিত্রগুলোর আবেগ, অনুভূতি সম্পর্কে তার ভালো ধারণা থাকতো। সে কারণে চলচ্চিত্রের চরিত্রগুলোকে মূল গল্পের চরিত্রের সাথে মিলিয়ে অভিনয় করতে কোনো অভিনেতা বা অভিনেত্রীর সমস্যা হতো না।
গুলজার গতানুগতিক চলচ্চিত্র না বানিয়ে ভিন্ন ধাঁচের গল্প নিয়ে চলচ্চিত্র বানাতেন, যা দর্শকদের ভালো লাগতো। এগুলো সমালোচকদেরও পছন্দ হতো। বেশ কিছু চলচ্চিত্র অবশ্য অর্থনৈতিকভাবে সফলতার মুখ দেখেনি। তবে অর্থনৈতিকভাবে সফল না হলেও পরবর্তীতে সেগুলো ক্লাসিকের মর্যাদা অর্জন করেছে।
যারা তার কবিতা ও গান পড়েছে কিংবা শুনেছে তারা একটি বিষয় স্বীকার করেছে- তার প্রতিটি লেখার কোনো না কোনো অংশের সাথে তাদের জীবনের কোনো একটি ঘটনার মিল রয়েছে। সাধারণ মানুষকে যেন পড়তে পারেন গুলজার। তিনি এমন এক কবি যাকে জনসাধারণের কবি বললে ভুল হবে না। চলচ্চিত্র জগতে তিনিই একমাত্র মানুষ যিনি সাহিত্যকে জনসাধারণের জন্য নির্মাণ করতে পেরেছেন। আর তিনি এ কাজটি করেছেন তার সংলাপ, গান এবং চলচ্চিত্র দিয়ে।
একবার কবিতা লেখা নিয়ে তাকে একটি প্রশ্ন করা হয়েছিল- কবি হতে গেলে এবং কবিতা লিখতে হলে কি কাউকে উদাস হতেই হবে? উদাসী না হলে কি কবিতা লেখা যাবে না? তখন কবি গুলজার চমৎকার একটি উত্তর দিয়েছিলেন- মানুষের জীবনে উদাসীনতা একটু বেশী সময় ধরে থাকে, আর সুখ কিংবা আনন্দ হয় অনেকটা ফুলঝুরি বা আতসবাজির মতো যেটা বেশী সময় থাকে না। নিমিষেই আলো দিয়ে ফুঁড়িয়ে যায়। কিন্তু উদাসী অনেকটা আগরবাতির মতো। চারদিকে নিজের বাসনা বা গন্ধ ছড়িয়ে দেয়।
(তথ্য সংগৃহীত )
।। অনুবাদ ।।
ঈশ্বর
সমগ্র আকাশ জুড়ে খেলাঘর,
কালো ঘরে সূর্য রেখে
তুমি হয়তো ভেবেছিলে , আমার সব ঘুঁটি খোয়া যাবে,
আমি সামান্য প্রদীপ জ্বালিয়ে,
নিজের রাস্তা খুলেছি
তুমি একসমুদ্র হাতে নিয়ে, আমার উপর ঢেলে দিয়েছো ,
আমি আত্মবিশ্বাসের জাহাজ রেখেছি তার উপর,
এভাবেই সময় কেটেছে, বন্ধু তুমি দেখেছো
আমি সময় কে ভেঙে, ক্ষণে ক্ষণে বাঁচতে শিখে গেছি।
আমার নিজস্বতাকে মারতে চেয়েছো সামান্য চমকপ্রদ বিষয় দিয়ে,
আমার একটা বোরে তোমার চাঁদের ঘুঁটি খেয়েছে,
মৃত্যুর চেক দিয়ে তুমি ভেবেছো মরে গ্যাছে সবকিছু,
আমি শরীরের পোষাক খুলে সঁপে দিয়েছি,
এবং আত্মাকে বাঁচিয়েছি ,
সমগ্র আশাক জুড়ে এবার দেখো খেলাঘর।
কাটানো যায় না
আমার এক সমুদ্র আছে
আমার নিয়ন্ত্রণে,
আর একটি বিন্দু আছে
যা আমি সামলাতে পারছি না,
একটা জীবন আছে যা কাটাতে হবে
তাকে ছাড়া শূন্যতার মুহূর্ত আছে
যা আমি কাটাতে পারছিনা ...


.jpeg)
0 মন্তব্যসমূহ