দর্পণ || বর্ষা সংখ্যা ২০২২ || পর্ব -৩




পোস্ট বার দেখা হয়েছে

জলে ভেজা বকুলের ঘ্রাণ

এ কে আজাদ 


স্মৃতির আলপথ বেয়ে হেঁটে যায় এই সব দিন রাত্রি,

স্বপ্নের বালিশে মাথা রেখে ঘুমোতে যায় সময়ের শিশু,

কাফনে আবৃত একটা বুড়ি এসে দাঁড়িয়ে যায় পথের উল্টো দিকে,


মেঘের ফাঁকে উঁকি দেয়া সূর্যটা হেসে ওঠে,

প্রশ্ন করে- বৃষ্টির ফুলে এত প্রেম কেন, হে যুবক?


কি করে বলি- কবিতার শরীর জুড়ে কেবল

বৃষ্টির নূপুর দোলে,

প্রতিটি জলের ফোঁটা মায়াবী ফুল হয়ে ফুটে ওঠে 

নয়নের কোলে।


একটা চাতক পাখি এসে সন্ধ্যার আলোতে গেয়ে ওঠে গান- 


এ জীবন তো কেবল বৃষ্টি ভালবাসে,

কদমের ফুলে খুঁজে পায় প্রাণ,

শ্রাবণের মেঘ জমে থাকে মাথার ওপরে,

বৃষ্টির আদরে এ জীবন শুঁকে যায় শুধু

জলে ভেজা বকুলের ঘ্রাণ!

=====

চিএপটে বর্ষা

পূজা রায়


আজ গগন শিখরে অনেক কালো কথা।

 অগণিত সূক্ষকণিকাগুলো ঝরছে অবিরল।

 যেন সুধা হয়ে পড়ছে ধরণীর হৃদে।


ওগো খেচরদল হর্ষমন্ডিত কেন বল দেখি।

বাতায়মে আজ পেয়েছে পরাণখালি।

অমৃত ধরারো ললাটে, 

আজ যে আগমন ঘটেছে বারিষের।


সবুজের মাতা যে তাই গাহিছে গান।

তারি সুরে ভরিয়া উঠিল প্রকৃতির কলতান।


ওগো সুরপাণি গাহো নাকো আজ গান।

পিতা ভোলারে ডাকিবো আসরে

তুলবে নৃত্যতাল।


তরীর খেয়া আজ শ্রান্ত বক্ষে

দেখিছে বারির খেলা।

সব্যসাচী রচিছে কাব্য,

নীলাম্বরীর আঁখিরো কুন্জ্ঞে।

স্রোতোস্বীনি গর্ভে আজ,চলছে

ভীষণ মেলা।

সুপ্ত কুটিরে বসিয়া বসিয়া খেলছে মেঘের খেলা।


রবিরে বলিল বিটপীলতা, 

আজ পাইবো নাকি দেখা তোমারো।

সবুজ হয়েছে পল্লব সকল,

দেখাবো তোমারে ভাবছি ভীষণ। 


বাবুই,শালিক, দোয়েল,টিয়া দেখেছে চেয়ে

রূপ যে আজ আর ধরে না।

বুলবুলি আর মাছরাঙা খুনসুটি যে আর সয় না।

ময়না বলে ওগো বর্ষা শোন মোর বাণী,

জলের খেলায় ভাসছে,

 যে মানবের চক্ষুখানি।

====

বৃষ্টিময় ছোঁয়া

ছন্দা দাম


নীল কচুরিপানা ময় মন দিঘিতে

টুপটাপ টুপ মোহময় বৃষ্টি,

ভিজিয়ে যায় যেন মনের গতর

একি নিদারুণ...আহা দারুন বৃষ্টি!


অঝোর ধারায় চিলেকোঠাটা ভিজে

জানালার শার্শিতে ঝাপসা প্লাবন,

বৈশাখী কাঠফাঁটা এই জীবন রোদ্দুরে

কদম সুবাসিত পেলব মোহক শ্রাবণ!


ঝেঁপে এলো স্মৃতি বরিষণ

মন শালিক ভিজে এলোমেলো ছাঁটে,

ঝিরিঝিরি বারিধারায় ঝঙ্কৃত হৃদয়

চোখের পাতা ভারী চশমা ঘোলাটে।


আধোডোবা ঘাসের বুক পকেটে বৃষ্টিরেনু

ঘাসফড়িং উড়ে উড়ে স্বপ্ন চুরি করে,

আমি ছন্নছাড়া যেন ভোকাট্টা ঘুড়ি

হারাতে চাই দূর আকাশে সুতো ছিঁড়ে।


অর্থহীন শব্দেরা জটলা করে

কবিতা হতে আবেগী মেঘ খোঁজে,

কল্পবৃষ্টিরা আজ যেন থৈ হারায়

কার বৃষ্টিময় ছোঁয়া খুঁজে চোখ বুঁজে!!

====

 বর্ষারানীর আগমনে

 শুভ্রা ভট্টাচাৰ্য 


নানা ঋতুর সম্ভারে সেজে

প্রকৃতি সদাই বৈচিত্রময়,

ঋতুরঙ্গের রঙিন খেলায় 

জীবনের রঙ্গমঞ্চ নাট্যময়। 


সকল দহন জ্বালা জুড়িয়ে 

নবরূপে আসো তুমি বর্ষা,

শস্য শ্যামলিমার শোভায় 

সজীবতায় বাঁচার ভরসা। 


আকাশ জুড়ে ভাসাও তুমি 

সাদা কালো মেঘের ভেলা, 

রোদ বৃষ্টির আড়ি ভাবেই

জমাও লুকোচুরির খেলা।


হে সুন্দরী ঋতুর রানী বর্ষা

তোমার একি অপরূপ সৃষ্টি!

কৃষকের মুখে ফোটাতে হাসি

হুড়মুড়িয়ে ঝরাও তুমি বৃষ্টি।


ঐ মেঘের সনে মন উড়িয়ে 

কেন উদাস করো প্রাণমন!

পাগল হাওয়ায় বারিষ ধারায় 

কবির পরানে লাগাও কাঁপন।


ধুয়ে মুছে দাও কলুষ নয়ন 

প্রকৃতির যত মলিন দূষণ, 

নদীরা পায় হারানো যৌবন 

সবুজ অভিযানে বৃক্ষরোপন। 


চারিদিকে আম জাম কাঁঠাল 

 কত বর্ণময় ফলের সমাহার,

জিনিয়া জুঁই বেলি হাসনুহানা 

আহা, সুগন্ধি ফুলের বাহার। 


আয়লা যশ ফনি আমফানেরা

যতই গেয়ে যাক ধ্বংসের গান,

তবু ক্ষত সারিয়ে নব উল্লাসে 

তোমারই বুকে সৃষ্টির জয়গান।। 

 ====

আমি যেদিন বৃষ্টি হবো

বন্দনা পাত্র (মন্ডল)


বৃষ্টি রে তুই ভাতভিখারী না মানভিখারী

                 মাটির দিকে তাকাস---?

তোর কাছেতে অত্তোবড় মেঘের আকাশ 

তবু কেন তুই ভিখারী মুষলধারী-

 পুকুর ডোবা ভরিয়ে দিলি জলে-?

মাছ ধরে না কপালে-হাত জেলে।


বৃষ্টি যে তুই এলি আকাশ গায়ে 

গা ভিজিয়ে দিলি আমার তোর 

কালোমেঘের বারি দিয়ে--

সবুজ পাতায় প্রাণ ফিরিয়ে 

        খাদ্য দিলি দেহে।

মেঘের আড়াল থেকে যখন টুকরো 

               আলোর আভাস---

মান পেল সে এমন বাদল বাতাস!

টুপ টুপ্ জলের সাথে ধানের পাতে 

  শিশির শিশির মতো 

বৃষ্টি রে তোর জল ধরেছে যত।


আমি যেদিন বৃষ্টি হবো বর্ষাদূতের মতো

তোর মতো যে মুষলধারে বইব না

ঝিরঝির্ ঝির্ ঝরব না---,

রানীর মতো ঝরব আমি মান দেব যে তোকে -

জেলেরা সব জাল বুনবে ঝোঁকে।


বৃষ্টি আমায় নেশা ধরায় কদম প্রেমে 

পদাবলীর রাধার মতো যাব না তো থেমে?

মুষলধারী হবো প্রেমে ঝিরঝির্ ঝির্ প্রথমে 

খাদ্য,জল আর গৃহকোণ সব দেব রে মেপে -

ভালোবাসায় ভরিয়ে দেব আমার প্রথম কদমে।

====

 বিষাদের বর্ষা

 শিবানী বাগচী


মন কেমনের চুপ কথারা,

বিষাদের বর্ষা নামায় চোখের পাতায় –

নৈঃশব্দের আনকোরা গল্পে মাতে ;

ভাঙা দরজায় খিল তুলে।


সত‍্যি যদি এমন ভাবেই বৃষ্টি নামতো;

গিঁট বাঁধা জল ছোপ রঙে ;

আমার শুকিয়ে যাওয়া উঠোনটাতে --

নতুন করে আবাদ হওয়ার উল্লাসে  ?

তবে হয়তো হোঁচট খাওয়া শব্দরা ;

বাড়িয়ে দিতো হাত।


তলিয়ে যাওয়া সময় অগত‍্যা ;

আপোষ করে তাকিয়ে থাকা,

হাজারো প্রশ্ন বাণে --

জল ভেঙে ভেঙে ডিঙিয়ে যাই, 

পথ ভুলে এ কোথায় আমি? 


বাতাস লেগে ওড়না লুটোয় ঘাসে;

সুযোগ বুঝে গায়ে --

এক মুঠো রোদ্দুর মেখে নিই, 

শূন‍্য মনের ভিজে রেলিং জুড়ে!


ডোবে পথ, ভাঙে ঘর, ঘূর্ণিবর্তের উচ্ছাসে --

উদাস মন পথ চেয়ে বসে থাকে, 

হারিয়ে যাওয়া চেনা মানুষের অপেক্ষায়!

====

 "দূরদেশী মেঘ" 

রঞ্জিতা চক্রবর্তী


গগন পানে চেয়ে দেখি

দূরদেশী এক আষাঢ়ে মেঘ

নামবে বুঝি বৃষ্টি হয়ে!


সার বেঁধেছে হলুদ পাখি,

ফিরবে ঘরে বৃষ্টি নিয়ে - 

সূর্যি মামা নিচ্ছে বিদায়

নদীর জলে ডুবসাঁতারে। 

আঁধার বুঝি ঘনিয়ে এলো.... 

ইচ্ছেগুলো শেষ বেলাতে

ঝরবে বুঝি বৃষ্টি হয়ে? 


ক্ষণিক পরে হঠাৎ দেখি,

ওই সুদূরের একফালি মেঘ

ডাকছে আমার ডাক নামেতে -

বলছে হেসে মৃদুস্বরে,

"ভয় পেও না এবার তুমি,

বৃষ্টিটা যে ক্ষণস্থায়ী!

কাটবে আঁধার - আসবে আলো,

ভয় পেও না এবার তুমি।" 

===

ঋতু রানী

মহুয়া হাজরা


নিদাঘের শেষ বেলা

জীমূতের দেখ খেলা।

নভ মাঝে থাকে ভেসে

কালো হয়ে ঢাকে শেষে,

বারি হয়ে পড়ে এসে

মৃত্তিকা মাঝে মেশে।


ধরণীর বুকে আজ

সবুজের দেখ সাজ। 

নেচে ওঠে হৃদি-মন

নীরদের দেখে রণ,

মাথা ঘোরে বনবন

বায়ু চলে শনশন।


গান গায় পাখি সবে

মুখরিত ভেক রবে।

বিজুরীর ছলকানি

দেখে কাঁপে বুকখানি,

এসেছে ঐ ঋতু রানী

প্রকৃতির দান মানি।


মাঠে মাঠে ধান শিষ

দেখে মন নিশপিশ।

হেলে দুলে চলে রাই

কানু বিনে সুখ নাই,

বাঁশি শুনে গান গাই

কলাপীর ডাক পাই।।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

2 মন্তব্যসমূহ

  1. প্রত্যেক টি কলম খুবই সুন্দর
    সকলকে অনেক শুভেচ্ছা 💐💐

    উত্তরমুছুন
  2. দর্পণের বর্ষা ঋতু নিয়ে এই আয়োজনে সবার লেখাই পড়লাম, অনেকের লেখা তো খুব শক্তিশালী, বাক্য বিন্যাসে মুগ্ধ হয়েছি; আবারও দর্পণের নিজস্ব স্লোগান দিয়ে শেষ করি, ‘ কলম চলুক’ -

    উত্তরমুছুন