দর্পণ || সাপ্তাহিক সেরা গল্প




পোস্ট বার দেখা হয়েছে

অপরাজেয় 

নভশ্রী সান্যাল


হাডকো থেকে সল্টলেকের দিকে গাড়ি ঘোরাতেই শীতের মধ্যরাত্রির নিস্তব্ধতায় বাচ্চার কান্না শুনতে পেলেন ডাঃ কমলিনী সেন।

বাঁদিকের ভ্যাটের থেকেই আসছে যেন...

অনেকগুলো কুকুরের ভিড়..হিংস্র-গরগর্..

একমুহূর্ত দেরী না করে গাড়ি সাইড করে দ্রুত নেমে এগিয়ে গেলেন।

কুকুরগুলো প্রথমে তেড়ে এলেও সরে গেলো।

কান্নার আওয়াজে মোবাইলের টর্চের আলোয় দেখতে পেলেন নোংরার মধ্যে  স্পন্দিত কাপড়ের পুটলিটাকে।

তুলে নিলেন বাচ্চাটিকে।

অভিজ্ঞ অনুভবে বুঝেছিলেন, এই ঠাণ্ডায় এতটুকু শিশুর জীবনসংশয়ের সম্ভাবনা।

গাড়ির কাঁচ তুলে দিয়ে এসির ওয়ার্মার অন করে বাচ্চার গায়ের নোংরামাখা কাপড়টি ফেলার জন্য সরাতেই চমকে উঠলেন অসংখ্যবারের মতোই আবারও 'মানুষ' নামক প্রাণীটির অমানবিক-নৃশংসতায়।

তারপরেই নিজের গরম শালে অজ্ঞাতপরিচয় অভাগা বাচ্চাটিকে পরম মমতায় বুকের মধ্যে জড়িয়ে চোখ বুজলেন, দুচোখ ছাপিয়ে নোনাজল অভিষিক্ত করতে লাগলো যেন এই নতুন প্রাণকে।

সেই মুহূর্তেই তিনি শপথ করেছিলেন নিজের এবং শিশুটির কাছে, কোনো অসম্মানে,অবাঞ্ছিতের লজ্জার,দুর্ভাগ্যের দাগে নয়, নিজের পরিচয়ে প্রকৃত মানুষ করে জীবনে সুপ্রতিষ্ঠিত করে তুলবেন তিনি ওকে।

কোনো অবজ্ঞামিশ্রিত কৌতুহলী দৃষ্টিতে নয়, মাথা উঁচু করে এই সমাজকে তাকাতে হবে ওর দিকে।

শুরু হলো কমলিনীর নির্মাল্যকে পরিপূর্ণ করার সাধনা। 


কমলিনী নির্মাল্যকে যখন পান, ওর আমবিলিকাল কর্ডটা তখনও কাঁচা। সম্ভবত সেদিনই বিকেলের দিকে ভূমিষ্ঠ হয়েছিলো ও।

ট্র্যানস-জেন্ডার হওয়ায় আবর্জনার মতো ফেলে দিয়ে গেছে ভ্যাটে রাতের অন্ধকারে।

সেই একই গল্প, একই নির্মমতা!!

কী করে পারে !!!

কমলিনীর জন্মের পর মা ওকে ছাড়তে চায়নি বলে মায়ের স্বামী লোকটা মাকে ত্যাগ করেছিলো। 

মায়ের জেদ আর সারাজীবনের অকল্পনীয় লড়াইয়ের ফলে সেদিনের এমনই এক ট্রানস্জেনডার নিষ্পাপ শিশু আজকের 

ডাঃ কমলিনী সেন।

বয়ঃসন্ধিকাল থেকে সমাজের অকথ্য অমানবিকতা,অসম্মান সহ্য করেছেন নিজেও। মার আঁচলের নিরাপত্তা তো সবসময় সঙ্গে থাকেনি।

একটু বড় হলে মা কমলিনীকে সমস্তটা বুঝিয়ে বলেছিলেন...কোথায় ওর স্বাতন্ত্র। 

ঠিক যেভাবে কমলিনী বলেছেন নির্মাল্যকে, "যেখানে প্রকৃতি এবং ভাগ্যের কাছে তারা বঞ্চিত, সেটুকু মানতে তারা বাধ্য।

কিন্তু, লজ্জিত-সঙ্কুচিত হওয়ার কোনোও কারণ নেই।

তাদের এই ঘাটতিটুকুর জন্য তারা বা তাদের বাবা-মা দায়ী নয় কোনোভাবেই।

সমাজ তাদের ব্রাত্য করেছে, সে দায়-দায়িত্বহীনতার লজ্জা সমাজের।

সমাজ অবজ্ঞা-দৃষ্টি বদলে যাতে তোমার দিকে সপ্রশংস-সম্মানের দৃষ্টিতে তাকায়, নিজেকে তেমনভাবে তৈরী করো দাঁতে দাঁত চেপে এখন ওদের সব অসভ্যতা সহ্য করে।

জানি...নিজের জীবন দিয়ে জানি, কাজটা কতটা কঠিন। কিন্তু অসম্ভব নয়।" 


ক্লাস নাইনের নির্মাল্য যেদিন গায়ে ধুম জ্বর আর বিক্ষত শরীরে-মনে বাড়ি ফিরেছিলো স্কুল থেকে, সেদিনের ট্রমা থেকে নির্মাল্যকে বের করে আনা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছিলো কমলিনীর পক্ষে।

বহুকষ্টে নির্মাল্যর জ্বর কমলেও মেন্টাল-ট্রমা কাটতে সময় লেগেছিলো অনেকদিন।

ধীরে বলেছিলো মাকে, বন্ধ ঘরে ওকে জবরদস্তি বেআব্রু করে জনাআষ্টেক ছেলেমেয়ের যৌথ কৌতুহলনিবৃত্তির পৈশাচিক উল্লাস।

মা-মেয়ে দুজন সমব্যথী-বন্ধু হয়ে দুজনকে জড়িয়ে কেঁদেছিলো।

কমলিনী মা হয়ে মেয়েকে বলেছিলেন নিজের জীবনের এমনই এক যন্ত্রণাদগ্ধ অভিজ্ঞতা।

মেডিকেল কলেজে প্রথম বছরের শেষে হস্টেলের ঘরে ওকে একইভাবে  নির্লজ্জ নৃশংসতায় সম্পূর্ণ বেআব্রু করেছিলো কিছু মেয়ে।

ও নিরুপায়ভাবে স্বীকার করেছিলো ওদের সাথে নিজের শারীরিক স্বাতন্ত্র, তবু ওরা আরও উদগ্র লালায়িত হয়েছিলো অকারণ নির্মম কৌতুহল-চরিতার্থে।

সেদিন কমলিনী জেনেছিলেন নতুন করে মেয়েরাও এত নিষ্ঠুর , কদাচারী, কদর্যভাষিনী হতে পারে।

একইভাবে নির্মাল্যর মতোই ও যখন কেঁদেছিলো, তখন ওরা কুৎসিতরকম হাসছিলো।

কেউ বলেছিলো, "তুই এখানে কী করছিস?!

তোর জায়গা তো এখানে নয়, তোর তো তালি মেরে লোকের দরজায় বাচ্চা নাচানোর কথা।"

হায় রে!! 

ওরা একদিনের জন্যও এর সিকিভাগ কৌতুহলেও জানতে চায়নি জয়েন্টে ওর ranc. 

যদি জানতো দ্বিতীয় স্থানে কোয়ালিফাই করা ওদের এক সহপাঠিনীকে ওরা এভাবে হেনস্থা করছে, তবে কি একটুও লজ্জিত হতো?

বোধহয় না। 

এই বোধ থাকলে এমনটা করার কথাই ওরা ভাবতে পারতো না।

একজন বলেছিলো, "তুই কী লাকি রে, তোর কখনো রেপড্ হওয়ার ভয় নেই।"

সবাই হেসে গড়িয়ে পড়েছিলো সেই কথায়।

ওর সেদিন কেমন করুণা হয়েছিলো ওদের জন্য, ওরা এটুকুও জানে না, যে শরীরের মতো মনও ধর্ষিত হয়। যেটা ওরা করছে।

ওর মনকে,মান-সম্মানকে গণ-ধর্ষণ করেছিলো ওরা।

কমলিনীর খুব মনে হতো, যদি 

'ক্যাপ্টেন নিমো'র মতো সমাজের প্রতি অনিঃশেষ ঘৃণা রেখে ও ওর মতো মানুষদের নিয়ে কোথাও নতুন সুন্দর পৃথিবী গড়ে নিতে পারতো, যেখানে নিজের মতো সম্মানের সাথে বাঁচার অধিকার থাকবে সবার। 


কমলিনী চেয়েছিলেন সফল-সার্থক গাইনোকলোজিস্ট হতে, 

মানুষকে একটু হলেও বোঝানোর সুযোগ পেতে ...

ট্র্যানস-জেন্ডাররা আলাদা নয়,তারা কিছু শারীরিক-বৈকল্যসহ আমাদেরই আত্মজন,আমার-আপনার গর্ভের শিশুটিও এমন হতেই পারে।

আজ তিনি সফল গাইনোকলোজিস্ট।

চেষ্টাটা চালিয়ে যাচ্ছেন,যাবেন আমরণ। 


পড়াশোনায় ভালোর সাথে দুটো বিষয়ে নির্মাল্যর ঈশ্বরীয় প্রতিভা লক্ষ্য করেছিলেন কমলিনী।

নির্মাল্য আপনমনেই খুব ভালো ছবি আঁকতো ছোট থেকেই।

আরেকটি গুণ পরে আবিস্কার করেছিলেন ওর টেবিল গোছাতে গিয়ে...

খুব ভালো লেখে ও।

মিশনারী স্কুলে পড়ার জন্য বাংলার সাথে ইংলিশেও ওর যথেষ্ট মুন্সীয়ানা।

ওর কৈশোর পেরোনো মনের সহজ জিজ্ঞাসা গোপনে কলমের আঁচড়ে ফুটতে দেখেছেন কমলিনী,... 


"জন্মান্ধ,মূক,বধির যখন 

কেউ সমাজে ব্রাত্য নয়,

শুধু নারী-পুরুষ বিভেদবিহীন...

ওরাই কেন দগ্ধ হয়?...." 


নির্মাল্যকে কমলিনী শিখিয়েছেন কিভাবে যন্ত্রণাকে অশ্রুতে বা মুখর প্রতিবাদে উপচে যেতে না দিয়ে বুকের তলায় জমতে দিতে হয়, আর সেই জমাট যন্ত্রণার শক্তি সঞ্চয় করে নিজেকে সমাজে যোগ্যতার উচ্চমানে নিয়ে যেতে হয়, ভেতরের আগুনে নিজেকে পুড়িয়ে নিখাদ সোনা হতে হয়,যার ঔজ্জ্বল্য সমাজের চোখ ধাঁধিয়ে দেবে। 


হঠাৎ কমলিনীর সম্বিত ফেরে প্রবল করতালির শব্দে।

স্মৃতির অতলে যেন ডুবে গেছিলেন অগোচরেই কখন।

চারপাশে তাকিয়ে দেখলেন, বিশাল অডিটোরিয়াম ভর্তি মানুষ উঠে দাঁড়িয়ে সানন্দ করতালিতে অভিবাদন জানাচ্ছে...

মঞ্চের দিকে তাকিয়ে অজান্তে নিজেও উঠে দাঁড়ালেন তিনি... 

নির্মাল্য!!! তার নির্মাল্যকে

দ বেস্ট ফ্যাশন ডিজাইনারের অত্যন্ত প্রেস্টিজিয়াস অ্যাওয়ার্ড দেওয়া হচ্ছে। 


নির্মাল্যকে কিছু বলতে অনুরোধ করলে মাইক্রোফোন নিয়ে বলে , "আজ আমি যেখানে দাঁড়িয়ে, তার নেপথ্যের কারিগর আমার মা ডঃ কমলিনী সেন।

মা, এখানে আমার কাছে এসো প্লিজ, আমার যেটুকু বলার, তুমিই বলো।"

উঠে এলেন কমলিনী ডায়াসে নির্মাল্যর পাশে। একটু যেন বিহ্বল...

সবাইকে নমস্কার জানিয়ে বললেন, 

"আপনারা নিশ্চয়ই জানেন, আমি-নির্মাল্য দুজনেই ট্র্যানস্-জেন্ডার?"

জনাকীর্ণ সভাগৃহ নিস্তব্ধ।

নির্মাল্য আমার বায়োলজিকাল ইস্যু নাহলেও আমার আত্মার অংশ-আত্মজ।

সমাজ বহুচেষ্টা করেও আমাদের ব্রাত্য করে রাখতে পারেনি।

কারণ, আমরাও আপনাদের মতোই স্বাভাবিক মানুষ। হ্যাঁ, কোথাও কিছু না কিছু শারীরিক-মানসিক প্রতিবন্ধকতা অনেকের মতো আমাদেরও আছে। কিন্তু তার জন্য তো আমরা দায়ী নই।

সমাজ আমাদের উপর একটা তকমা লাগিয়ে ছুড়ে ফেলে দিয়েছে ঘৃণায় বারবার। আমাদের জীবনেও প্রেম-ভালোবাসা, আনন্দ-যন্ত্রণা, মান-অপমান অনুভূত হয়।

মেডিকাল সায়েন্স,শিক্ষা , আধুনিকতা সবকিছুর উত্তরণ ঘটলেও মানবতার অধঃপতন হয়ে চলেছে ভয়ঙ্করভাবে..

সমাজের থেকে প্রতিমুহূর্তে অকারণ আঘাত পেয়ে আমাদের মনেও আপনাদের সমাজের প্রতি অভিমানাহত-ঘৃণা তৈরী হলে তা কী অপরাধ, বলুন তো?" 


হঠাৎই একজন এসে নির্মাল্যর কানেকানে কী বলায় উজ্জ্বল হয়ে উঠলো ওর শান্ত চোখদুটো। 


কর্মকর্তাদের একজন এসে বললেন, "এইমাত্র আমরা একটি অত্যন্ত আনন্দসংবাদের প্রাপ্তি সবার সাথে ভাগ না  করে পারছি না।

এবারে আনন্দ পুরস্কারে সম্মানিত হয়েছে নির্মাল্য সেনের প্রথম উপন্যাস 

' আমাদের কথা। ' ..."

মুহূর্তের নৈঃশব্দ।

করতালি আর পৌণঃপৌনিক ক্যামেরার আলোর ঝলকানিতে ভরে উঠলো সভাগৃহ।

সব ছাপিয়ে নেপথ্যে ...

"আমার হাত বান্ধিবি, পা বান্ধিবি,

মন বান্ধিবি কেমনে!?

আমার চোখ বান্ধিবি, মুখ বান্ধিবি

পরান বান্ধিবি কেমনে?!"

 ★★★

 হ্যাপি বার্থ ডে

জয়া চক্রবর্তী সোমা


 সুমনার আজ প্রচন্ড অভিমান হয়েছে। এই দিনটা নিয়ে সে কত প্ল্যান করেছিল আর স্বাগত কিনা এক লহমায় সব নস্যাৎ করে বলল-" কালকের দিনটা আমি একটু একা থাকতে চাই। প্লিজ কিছু মনে করিস না।" চোখে জল এসে গিয়েছিল সুমনার৷ স্বাগত'র তো বাবা মা ভাই বোন কেউই নেই। এই মুহুর্তে স্বাগত'র সবচেয়ে কাছের মানুষ সে। অথচ স্বাগত'র সবচেয়ে স্পেশাল দিন, ও জন্মদিনেই কিনা সুমনাকে ব্রাত্য করেছে স্বাগত। 

মুখে কিছু বলে নি সুমনা। কিন্তু দারুণ অঘাত তো লেগেছেই। সুমনা জানে স্বাগত সেটা বুঝেওছে৷ তাই তো সকাল থেকে বার তিনেক ফোনও করেছে। ধরে নি সুমনা। ভেবেছিল ধরবেও না। শেষে স্বাগত এস.এম.এস করেছে-" একবার ফোনটা ধর প্লিজ। আজ আমার জন্মদিনের দিনেও তুই এমন করবি?" বাধ্য হয়েই ফোন ধরেছিল সুমনা। বলেছিল-" তুই নিজেই তো বলেছিলি একা থাকতে চাস। তাই.." 

স্বাগত বলে-" রাগ করেছিস?" উদাস গলায় সুমনা বলে-" নাঃ।" স্বাগত একটু চুপ করে থেকে বলে-" আজ বিকেলে আসবি আমার বাড়ি।" সুমনা বলে-" কেন? তুই যখন প্রথমে চাস নি, এখন আমার মন রাখতে ডাকছিস কেন? " স্বাগত বলে-" মিথ্যে বলেছি তোকে একটা। আমি আজকের দিনটা...মানে আসলে আজকের দিনটা আমি এক বিশেষ অতিথির সাথে কাটাই। প্রথমে ভেবেছিলাম তার কথা তোকে বলব না। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে তোর সঙ্গে যখন আমার জীবনটা জড়াতেই চলেছে তখন এই লুকোচুরির দরকার নেই। তার সাথে তোর পরিচয় করাবো বলেই আজ ডাকছি। " 

দারুণ অবাক হয়েছিল সুমনা। কে এমন সেই মানুষ যার সাথে সুমনার আলাপ করাতে চায় স্বাগত? কই গত দশ মাসের আলাপে তো স্বাগত একবারের জন্যও সেই মানুষটির কথা বলে নি সুমনাকে। অথচ সুমনার মনে হয়েছিল স্বাগত'র ব্যাপারে সে সবটাই জানে। সুমনা হয়ত অভিমান করে না-ই বলে দিত। কিন্তু এই বিশেষ মানুষটি কে তা জানার কৌতুহল তাকে না করতে দিল না। 

 স্বাগতদের বাড়িটা ঠাকুরপুকুর বাজার থেকে ডানদিকে যে রাস্তাটা চলে গেছে সেখানে কিছুটা এগিয়েই। রসপুঞ্জের বেশ কিছুটা আগে। কিন্তু ওখানে গেলেই যেন মনে হয় শহরকে পিছনে ফেলে এসেছে। সুমনা এর আগেও বার দুই স্বাগত'র বাড়ি এসেছে। একবার সব কলেজের বন্ধুদের সাথে। আর একবার একাই। তাই চিনতে অসুবিধা হল না।

স্বাগত একাই থাকে। ওর বাবা নাগপুরে তার সেকেন্ড ওয়াইফকে নিয়ে সেটেলড। স্বাগত'র সাথে সম্পর্ক নেই। আর স্বাগত'র মা ছোটবেলাতেই মারা যান। তখন স্বাগত'র বয়েস দশ । এটা আসলে স্বাগত'র দাদামশাই এর বাড়ি। দাদামশাই স্বাগত জন্মানোর আগেই গত হয়েছেন। আর  কয়েকবছর হল দিদাও চোখ  বুজেছেন। সুতরাং এখন এই একতলা ছোট বাড়িটায় স্বাগত একদম একা। 

বাইরের লোহার দরজা খুলে বাগান পেরিয়ে এগিয়ে যায় সুমনা মেন ডোরের কাছে। ভিতরে স্বাগত'র গলা কানে আসছে। স্বাগত সম্ভবত ফোনে কথা বলছে খুব আস্তে। কি বলছে স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে না। শুধু টুকরো টুকরো কথা কানে আসছে-" তুমি দেখো তোমারও ভালো লাগবে।" " তোমার মতই সাদা ওরও প্রিয়।" সুমনা বুঝল তার ব্যাপারেই ফোনে কাউকে কিছু বলছে স্বাগত৷ সুমনার মত তারও প্রিয় রঙ সাদা। সুমনা দরজায় কলিং বেল বাজায়। একটা হালকা মিষ্টি বাতাস রজনীগন্ধার গন্ধ ছড়িয়ে বয়ে গেল। তাহলে নিশ্চয় স্বাগত'র সেই বিশেষ অতিথি এসে পরেছেন। উপহারে রজনীগন্ধা এনেছেন বোধহয়। কয়েক মুহুর্ত পরেই দরজা খুলল স্বাগত এক মুখ হাসি নিয়ে। 

স্বাগত'র মুখের দিকে তাকালেই সুমনার সব রাগ দুঃখ অভিমান কোথায় যেন উড়ে যায়। স্বাগত বেশ নাটকীয় ভঙ্গিতে বলল-" প্লিজ কাম ইন ম্যাম।" হেসে ভিতরে ঢোকে সুমনা। স্বাগত এমনিতে বেশ অগোছালো।  কিন্তু আজ সারা বাড়িটাই বেশ পরিপাটি সাজিয়েছে৷ বিশেষ অতিথিটি সত্যিই বিশেষ। সুমনা বলে-" কে আসবেন বলছিলি কই তিনি।" স্বাগত একটু হেসে বলে -" আসবেন আসবেন, এত তাড়া কিসের?" সুমনা অবাক হয়ে বলে-" আসেন নি? ও মা তাহলে এমন সুন্দর রজনীগন্ধার গন্ধ আসছে!  আমি ভাবলাম তোর স্পেশাল সামওয়ান হয়ত এনেছে তোর জন্য উপহারে।" স্বাগত একটু অপ্রতিভ হেসে বলল-" রুম রিফ্রেসনার রে। তুই বোস।" সুমনা বলে-" তোকে সেই বাজারের মোড় থেকে মোবাইল ল্যান্ড ফোন দুটোতেই ট্রাই করে যাচ্ছিলাম। একটাতেও পেলাম না। আসলে ওই মোড়ের মাথায় এসে কোনদিকে আসবো কনফিউসড হয়ে যাই।" স্বাগত হেসে বলে-" আর বলিস না। মোবাইলে চার্জ নেই,অফ হয়ে গেছে।  আর ল্যান্ড ফোনটা তো কবে থেকে ডেড হয়ে বসে আছে। "  

মনে একটা কাঁটা বিঁধল সুমনার। স্বাগত কি মিথ্যে কথা বলছে? সুমনা নিজে কানে শুনেছে ঘরে ঢোকার সময় স্বাগত কারো সাথে কথা বলছিল। অথচ ঘরে কেউ নেই। সুমনা অবশ্য সেই নিয়ে কথা বাড়ালো না। হেসে বলল-" তা বার্থডে বয়ের কেক কই?" স্বাগত বলল দাঁড়া আনছি। বলেই রান্নাঘরে গেল। সুমনা শোকেসের সামনে এসে দাঁড়িয়ে বই গুলো দেখছিল। শোকেসের কাঁচে পিছনে রান্না ঘরের ছায়া পরেছে। সুমনার হঠাৎ মনে হল স্বাগত যেন হাত বাড়িয়ে কারোর থেকে কেকটা নিল হাসি মুখে৷ সুমনা চকিতে পিছন ঘোরে। কিন্তু ততক্ষণে স্বাগত শিস দিতে দিতে বেরিয়ে এসেছে রান্নাঘর থেকে। ভ্রু কুঁচকে ওঠে সুমনার। না সে ভুল দেখে নি। সে স্বাগত'র পাশ কাটিয়ে প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই গিয়ে ঢোকে রান্নাঘরে। নাঃ, কেউ কোত্থাও নেই। এতটা ভুল দেখল সুমনা? 

মনে অস্বস্তি নিয়ে বেরিয়ে আসতে যায় সে আর তখনই দেখে গ্যাস ওভেনের সামনে দুটো বাটি রাখা। দুটোতেই পায়েস খাওয়া হয়েছে। কিন্তু কে পায়েস খেয়েছে? স্বাগত? তাহলে আর একটা বাটিতে কে খেয়েছে? কেউ এসেছিল? নাকি আছে? এই বাড়িতেই। যার সাথে কথা বলছিল স্বাগত কিম্বা যে কেকের প্লেটটা এগিয়ে দিল..কিন্তু এত তাড়াতাড়ি সে রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে কোথায় গেল? 

কাঁধে হাত রাখে স্বাগত। চমকে পিছনে ঘোরে সুমনা। স্বাগত শান্ত গলায় বলে আয় কেকটা কাটি। একটু অস্বস্তি নিয়েই বাইরে আসে সুমনা। ঘরে নীলচে ড্যান্সিং লাইটটা জ্বালিয়ে কেকটা টেবিলে রেখে ক্যান্ডেল জ্বালিয়েছে স্বাগত৷ সুমনার দিকে তাকিয়ে হেসে তুলে নেয় ছুরি। তারপর এক ফুঁয়ে নিভিয়ে দেয় মোমবাতি। মোমবাতি নিভতেই ঘর নীলাভ অন্ধকারে ঢেকে যায়। আর সুমনা বলে ওঠে-" হ্যাপি বার্থ ডে টু ইউ...।" শেষ করতে পারে না সুমনা। স্পষ্ট বুঝতে পারে সে একা নয়। যেন আর একটি নারী কন্ঠও খুব অস্ফুট স্বরে গলা মেলাচ্ছে তার সাথে। চট করে শুনলে ইকো বলেই ভুল হয়। কিন্তু তা নয়। দারুণ চমকে পিছন ঘোরে সুমনা। না,  যতই নীলচে অন্ধকার থাকুক সে স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে যে ঘরে সে আর স্বাগত ছাড়া আর কেউ নেই। স্বাগত কাটা কেকের টুকরো এগিয়ে দেয় সুমনার দিকে। সুমনা দেখে প্লেটে আরো একটা টুকরো কেটে রেখেছে সে। কার জন্য? সুমনার যেন কেমন ভয় ভয় করে।  সে একটু ইতস্তত করে বলে -" স্বাগত কি হচ্ছে বল তো?" কথা শেষ হতে না হতেই বেজে উঠল ল্যান্ড ফোন। স্বাগত যেন প্রস্তুতই ছিল। প্রায় ছুটে গিয়ে ধরল ফোনটা। অবাক চোখে সুমনা চেয়ে দেখে ফোনের তারটার সাথে মূল তারটার কোন যোগই নেই। অথচ কথা বলছে স্বাগত উদগ্রীব ভাবে। এটাকে স্বাগতর পাগলামিই ভাবতে পারত সে। কিন্তু তার বিহীন ল্যান্ড ফোন এভাবে বেজে উঠল কি ভাবে? স্বাগত  হাসি হাসি মুখে বলছে-" আমি বলেছিলাম না ওকে তোমার ভালো লাগবেই। " সেন্সেটিভ ফোনের ওপার থেকে স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছে সুমনা নারী কন্ঠ বলছে-" সুখে থাক তোরা। হ্যাপী বার্থ ডে।" ফোন রেখে সুমনার দিকে ফিরে তাকায় স্বাগত। মুখে একই সাথে তৃপ্তি,  আনন্দ আর একটা বিষিন্নতা। সুমনা বিস্মিত চোখে চেয়ে থাকে স্বাগত'র দিকে। স্বাগত ভেজা গলায় বলে-" মা, প্রতি বছর এই দিনটায় আসে। আবার আসবে এক বছর পর..."

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ