পোস্ট বার দেখা হয়েছে
স্মরণে ঋতুপর্ণ
নীলাঞ্জনা ভৌমিক
তুমি কোথায় !!
গতানুগতিকতার বিপরীত এক ব্যক্তিত্বের নাম ঋতুপর্ণ ঘোষ। প্রচলিত ধ্যানধারনা থেকে মুখ ফেরানো বিশেষ দর্শকদের সিনেমা হলের দিকে চুম্বকের মতো আকর্ষণ করার নাম অনিত্যের আঙ্গিক। নিত্য অর্থাৎ যা বহমান, অপরিবর্তন- শীল তাকে বেশিদিন দর্শকদের আকর্ষণ করতে পারে না। তাই বিষয়ভাবনার একমুখীতত্বের দিক থেকে চিন্তা জগতকে একেবারে ভিন্ন বাঁকে মোর ঘোরানোর নাম ঋতুপর্ণ। ' দহন ' - কে নিয়ে তাঁর যাত্রা শুরু হয় ' হিরের আংকি ' যদিও প্রথম চলচ্চিত্র। ' দহন ' - এ দেখা এক দম্পতির ( পলাশ ও রমিতা ) বখে যাওয়া কিছু অভিজাত পরিবারের ছেলেদের আকস্মিক আক্রমণে ঘটে যাওয়া তথাকথিত সুখী জীবনের পরিবর্তন - এই ঘটনা হয়তো আড়ালে আবডালে অহরহ ঘটে চলেছে সমাজে কিন্তু তাকে পর্দায় তুলে ধরার প্রথম সাহসিক প্রয়াস বোধহয় এই স্বনামধন্য পরিচালকের পক্ষেই সম্ভব। আজো নারী স্বাধীনতার নামে যে মিথ্যা অহঙ্কার সমাজের বুকে চেপে বসে রয়েছে তার দিকে কঠোর আঙল তুলেছেন তিনি। তাঁর পক্ষেই বলা সম্ভব-" শিল্পীর কোন লিঙ্গ হয় না।" 'এলজিবিটি ' - সমাজের যে একটা সমস্যা নয় ,বাস্তব সম্পর্ক- এই ধারণাটা যখন কারোর পক্ষেই মেনে নেওয়া সম্ভব হয় নি তখন কিন্তু ঋতুপর্ণের মতো সাহসি মানুষের পক্ষেই সম্ভব হয়েছিল। কারণ পুরুষ হয়েও অন্তরে তিনি নারীত্বকেই বহন করে চলেছিলেন। তাই এইরূপ লিঙ্গ সমস্যার বাস্তবতা উপলব্ধি করতে তাঁর কোনো অসুবিধা হয় নি। স্টার জলসায় প্রদর্শিত বাংলা টিভি সিরিয়াল " গানের ওপারে "- পরিচালক ঋতুপর্ণ ঘোষের আরো একটি অসাধারণ প্রতিবেদন। এটিও গতানুগতিকার ঊর্ধ্বে। রবীন্দ্র সংগীতের ধারাকে অন্যখাতে বইয়ে দেওয়া বোধহয় তাঁর পক্ষেই সম্ভব। শিল্পী হতে গেলে আভিজাত্যের প্রয়োজন পরে না সে ধারনাও তিনি এই সিরিয়ালটিতে সুন্দর ভাবে তুলে ধরেছেন। আধুনিক স্বনামধন্যা লেখিকা সুচিত্রা ভট্টাচার্য্যকেও আমার সশ্রদ্ধ প্রণাম জানাই। সুচিত্রা ভট্টাচার্য্য আর ঋতুপর্ণ ঘোষের অপূর্ব মেলবন্ধন আমরা দেখতে পাই চলচ্চিত্রে তাঁর সৃষ্টির মধ্যে ঠিক যেমন দেখতে পাই সত্যজিৎ রায় এবং বিভূতিভূষণ বন্দোপাধ্যায়ের অপূর্ব সৃষ্টিতে। ঋতুপর্ণ ঘোষের মননশীলতা ও সংবেদনশীলতা আপামর চলচ্চিত্র প্রেমীদের হৃদয়ে আজীবন স্মরণ করাবে। তাঁকে আমরা হঠাৎই একদিন হারিয়ে ফেললাম আর সেইসাথে স্পর্শকাতর, হৃদয়গ্রাহী চলচ্চিত্র থেকেও বঞ্চিত হলাম। এই বিশেষ দুঃখের দিনে ( ৩০ শে মে,২০১৩ - প্রয়াণদিবস ) ঋতুপর্ণ ঘোষকে আমার সশ্রদ্ধ প্রণাম জানাই।
===
ঋতুপর্ণ ঘোষ এক শাপভ্রষ্ট দেবপুরুষ
সুস্মিতা চক্রবর্তী
ঋতুপর্ণ ঘোষ বলতেই মনে হয় একজন ভীষণ সাজগোজ করা, মাথায় ব্যাণ্ডানা বা পাগড়ি আর একটু অদ্ভুত টোনে কথা বলা। কিন্তু এরকম ভীষণ রঙিন ব্যক্তিত্ব বাংলায় বিরল। সাউথ পয়েন্ট স্কুলে স্কুলে শিক্ষার পরে যাদবপুর ইউনিভার্সিটি থেকে ইকোনমিকসের মাস্টার্স করেন। সেই মানুষটি পরে চলচ্চিত্রে ১২টি পুরস্কারের মালিক।
সাউথ পয়েন্ট স্কুলে স্কুলে শিক্ষার পরে যাদবপুর ইউনিভার্সিটি থেকে ইকোনমিকসের মাস্টার্স করেন। সেই মানুষটি পরে চলচ্চিত্রে ১২টি পুরস্কার অর্জন করেন। নিজেও চলচ্চিত্র অভিনেতা ছিলেন। আমার দেখা ওনার শ্রেষ্ঠ অভিনয় -"মেমোরিজ ইন মার্চ"। ব্যক্তিগতভাবে তিনি রূপান্তরকামী ছিলেন।
এটা ভাবার কারণ নেই। ঋতুপর্ণ ছিলেন সব মিলিয়ে একটা গোটা মানুষ, যাকে কোন ধর্ম, জেণ্ডারের নিরিখে বিচার করা চলে না।
একটা চিত্র পরিচালক ১২টা পুরস্কার পেয়েছেন মাত্র ৩৯ বছর তার জীবনের স্থায়িত্ব। সাধারণ দৃষ্টি ভঙ্গি দিয়ে ঋতুপর্ণকে বিচার না করাই ভালো। তিনি তাঁর জীবন নিজের মতো করেই সম্পূর্ণ সচেতন ভাবেই কাটিয়েছেন। অসাধারণ কাজ। নিজেও অভিনয় করেছেন। প্রথম অভিনীত সিনেমা "কথা দেইথিলি মাকু" একটি ওড়িয়া সিনেমা। সিনেমার নতুন এক ধারা তৈরি করেছিলেন ঋতুপর্ণ।
''হীরের আংটি'' দিয়ে পরিচালনা শুরু। শেষ ''চিত্রাঙ্গদা''-মাঝে উপহার দিয়েছেন উনিশে এপ্রিল, দহন, উৎসব, চোখের বালি, দোসর, রেনকোট, শুভ মহরত, সব চরিত্র কাল্পনিক, নৌকাডুবি, the last Liyar। শুধু চলচ্চিত্র পরিচালনার গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ ছিল না তাঁর প্রতিভা। দু’টি বহুল প্রচলিত বাংলা ম্যাগাজিনের সম্পাদক হিসাবেও দাপটে কাজ করেছেন তিনি। বিজ্ঞাপনের কপিরাইটার হিসেবে জীবন শুরু করেন। বিজ্ঞাপনেও যুগান্ত আনেন তখন।
তাই পরিচিত গণ্ডীতে ঋতুপর্ণ ঘোষ কে বেঁধে ফেলা ভুল হবে। যেখানেই থাকুন ভালো থাকুন। সবার মনের মধ্যে বেঁচে থাকুন শাপভ্রষ্ট দেবপুরুষ ঋতুপর্ণ ঘোষ।

0 মন্তব্যসমূহ