দর্পণ | সাপ্তাহিক পরিচালক কলম | কাব্য গাথা




পোস্ট বার দেখা হয়েছে


 

হে মহাজীবন .....
উপস্থাপনা : দেবাশীষ ভট্টাচার্য্য


" কে তুমি খুঁজিছ জগদীশ ভাই আকাশ পাতাল জুড়ে’ 
কে তুমি ফিরিছ বনে-জঙ্গলে, কে তুমি পাহাড়-চূড়ে? 
হায় ঋষি দরবেশ, 
বুকের মানিকে বুকে ধ’রে তুমি খোঁজ তারে দেশ-দেশ।  "

জীবনী মানে কিন্তু সন তারিখ দিনপঞ্জি উল্লেখ নয় কেবলমাত্র। জীবনী হলো সেই দিশা যেখা‌নে উল্লেখিত ব্যাক্তির কার্যকলাপ সুনির্দিষ্ট এবং সরলভাবে ব্যাখ্যা করা হয়। নজরুল ইসলামকে নিয়ে কতগুলো জীবনী লেখা হয়েছে, তার সংখ্যা আমার জানা নেই। তবে আমার বিশ্বাস, অত জীবনী অন্য কোনো বাঙালিকে নিয়ে লেখা হয়নি । এর একটা কারণ নজরুল সম্পর্কে সঠিক তথ্যের অভাব। বিশেষ করে সৈন্যবাহিনী থেকে তিনি কলকাতায় ফিরে আসার আগের সময়টা আমাদের কাছে একান্ত অস্পষ্ট। শোনা কথা, যে যা কল্পনা করতে পেরেছেন, তিনি তাই লিখেছেন।

" সখি! নতুন ঘরে গিয়ে আমায় প’ড়বে কি আর মনে? 
সেথা তোমার নতুন পূজা নতুন আয়োজনে! 
প্রথম দেখা তোমায় আমায় 
যে গৃহ-ছায় যে আঙিনায়, 
যেথায় প্রতি ধূলিকণায়, 
লতাপাতার সনে 
নিত্য চেনার বিত্ত রাজে চিত্ত-আরাধনে, 
শূন্য সে ঘর শূন্য এখন কাঁদছে নিরজনে।।"

তাঁর সম্পর্কে সঠিক তথ্য দিতে পারতেন, এমন কোনো যোগ্য আত্মীয় তাঁর ছিল না। তাঁর দুই ভাই ছিলেন, লেখাপড়া সামান্যই জানতেন। তাঁরা তাঁর জীবন সম্পর্কে নতুন কোনো আলোকপাত করতে পারেননি। তাঁরা দেখেছিলেন বালক এবং কিশোর নজরুলকে, যাঁর বালকসুলভ কাজকর্ম তাঁদের মনে থাকার কথা নয়। সুতরাং তাঁদের কাছ থেকে কোনো গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যায়নি। তাঁর পুত্ররা—সব্যসাচী আর অনিরুদ্ধ—কলকাতা-পূর্ব অধ্যায় সম্পর্কে না হলেও, কলকাতা অধ্যায় সম্পর্কে হয়তো তথ্য দিতে পারতেন। কিন্তু নজরুল যখন মানসিক রোগে আক্রান্ত হলেন, তখন তাঁরা বালক মাত্র।

" বেলা শেষে উদাস পথিক ভাবে, 
সে যেন কোন অনেক দূরে যাবে – 
উদাস পথিক ভাবে। 
 
  ‘ঘরে এস’ সন্ধ্যা সবায় ডাকে, 
‘নয় তোরে নয়’ বলে একা তাকে; 
পথের পথিক পথেই বসে থাকে, 
জানে না সে কে তাহারে চাবে। 
উদাস পথিক ভাবে।  "

তিনি যে পরিবারে জন্মেছিলেন, সে পরিবারের বিদ্যা অথবা বিত্ত—কোনোটাই ছিল না । কিন্তু নজরুল যা হয়েছিলেন, তা নিজের প্রতিভা দিয়েই হয়েছিলেন, পরিবারের কারণে নয়। তিনি যে পরিবারে জন্মেছিলেন, সে পরিবারে সন্তানদের জন্মতারিখ পর্যন্ত লিখে রাখার ঐতিহ্য ছিল না।

তাঁকে সাধারণ মানুষের মাপে বিচার করতে গেলে ভুল হওয়ারই কথা। কিন্তু আর পাঁচজন মানুষের মতো তাঁকে চিরাচরিত ছকে গড়ে তুলেছেন জীবনীকারেরা। তিনি যে ব্যতিক্রম, সেটা অনেকেই মাথায় রাখেননি। তাঁর বেলাতে প্রতিষ্ঠিত রীতি যে অচল হতে পারে, তাঁরা সেটাও মনে করেননি।

তবু যা পাওয়া যায় বা জানতে পেরেছি সবমিলিয়ে বলতেই পারি যে নজরুল জন্ম ঐতিহাসিক এবং যুগে যুগে তাঁর তুলনা তিনি নিজেই।

গুরুত্বপূর্ণ যা, তা হলো: তিনি কী করে হঠাৎ একদিন উল্কার মতো বাংলা সাহিত্য এবং সংগীতজগতের মধ্যগগনে আবির্ভূত হয়ে সমস্ত আকাশকে উজ্জ্বল করে তুলেছিলেন। কী করে তিনি দুখু মিয়া থেকে নজর আলি, নজর আলি থেকে নজরুল এসলাম, নজরুল এসলাম থেকে নজরুল ইসলাম, নজরুল ইসলাম থেকে কাজী নজরুল ইসলাম, কাজী নজরুল ইসলাম থেকে হাবিলদার কাজী নজরুল ইসলাম, এবং শেষ পর্যন্ত বিদ্রোহী কবি নজরুল ইসলাম হয়ে উঠলেন.....

" আমার আপনার চেয়ে আপন যে জন 
খুঁজি তারে আমি আপনার, 
আমি শুনি যেন তার চরণের ধ্বনি 
আমারি তিয়াসী বাসনায়।।  "

*************************************

কবিতা / শিবাজী  সান্যাল


প্রথম বৃষ্টি
=========

বছরের প্রথম বৃষ্টি , সঙ্গে বেশ হাওয়া
নেহা জানালা বন্ধ করে তাকাল বাইরে
বিদ্যুৎ , ঝমঝম শব্দ , কাঁচে জলের ধারা
অবিরাম এক ছন্দগীত যাচ্ছে ছেয়ে চারদিকে ।

তিন বছর আগে এমনই এক প্রথম বর্ষায়
ব্যালকনির অন্ধকারে মাথা রেখেছিল অসীমের বুকে
প্রতিটি জলবিন্দু সেদিন ছিল উৎসবের বারতা।


স্বপ্ন ভঙ্গ
=========

অরুণাভ বেশ দেরি করে এল
আজ ওকে মেঘা ডেকেছিল

কিছুই  জানতে চাইলাম না
কারণ ও মাথা নিচু করে বসে রইল

তারপর
একসময় ও উঠে চলে গেল  ।


নৌকো
========

নদীর ঘাটে বসেও বেশ কাটে সময়
নৌকোগুলো আসে ,
অনেকে নামে  , অনেকে চড়ে
আবার নৌকো আস্তে আস্তে দূরে মিশে যায়।

যখন কোন নৌকো থাকে না
ঘাট বড় শূন্য মনে হয়।


পার্থক্য
=========

ছেলেটি বলল , “ আমি গাঁয়ের , গরীব , কালো
আমার কিছুই  মেলেনা এখানে, এক কুন্ঠিত জীবন
কাটাই বিচ্ছিন্ন একাকী । প্লিজ , এস না বারবার
আমার কাছে। বড় অস্বস্তি হয় তুমি কাছে এলে।

তবুও মেয়েটি ওর পাশেই বসল ক্লাসে এসে।


*************************************

ইলেকট্রিক পোস্ট
জয়তী


রাত্রি তাঁতঘরে রাত্রি বুনছে আপন অন্ধকার -

অপরূপ সেই মূর্তি, গম্ভীর নির্জন সুন্দর -

পলকে কেঁপে উঠে, মাটিতে শুয়ে পড়লো এক দীর্ঘাকার সৈনিক -

আষ্টেপৃষ্টে বাঁধা তড়িৎ-এর হাত, এ শরীর কী বইতে পারে?

তার সমস্ত অন্ধকার শুষে,নক্ষত্রলোক জ্বেলেছে লক্ষ ওয়াট -

সভ্যতার নাকফুলে জ্বলে উঠছে ঝাড়বাতি, আলোর সুড়ঙ্গের চাবিকাঠি -

কাঁধের পোড়া গন্ধ জমিয়ে রেখেছে আইস বাক্সে - জেলী মাছের ফসফরাস চোখ -

সে নীরব হুঙ্কার, দহন, যন্ত্রণার অন্যপিঠে সুখী দানবটা বড়ো অহংকারী -

তারারাও আজ আকাশকে দিয়েছে ফাঁকি, গাছের কোণে কোণে জোনাকির চোখ জ্বলছে নিভছে -

নির্জন অন্ধকারে চোখ মেলছে রাত্রি কুঁড়ি। অশ্বত্থের কোটরে রাতচরার পাখসাট -

তুমি শুয়ে আছো মাটিতে বহুদিনের ক্লান্ত ক্রীতদাস!

তড়িৎ শূন্য বল্লরীমালা ছিঁড়ে আছে শরীরে- চারিদিকে ঝোড়ো বাতাসের গোঙানি -

তারপর, জানিনা....

কখন যে পাখিরা বেরিয়ে এলো রাত পোশাক ছেড়ে...

তোমার জায়গায় অন্য এক পাথর পিলার দাঁড়িয়ে!

************************************

   একে আজাদ 





*************************************

               শব্দ ঋণ
            অরিজিৎ রায়

রাতের আকাশে চাঁদের নোলকে
ভাষাহীন কারুকার্য আঁকলে,
আমার ভয় হয়!
চাঁদের দেশে নিকষ কালো পাহাড়ের
সমঝোতা বুকে তোমায়
দেখতে ইচ্ছে করে না।
মেঘেদের পারস্পরিক আব্দারে
জোছনারা দেশ থেকে দেশান্তরে
পাড়ি দিলে ,
তোমায় খুঁজে পাই সর্বত্র।
অলিক ভাবনায় তোমাকে ছুঁতে চেয়েও
অধরা যেটুকু থাকে,
তেপান্তরের দীঘিতে তুমি ডুব দিলে
একবুক সাঁতারে তোমাতে মিশে যাই বারবার।
এভাবে শরীর ও মন ভারি হয়ে উঠলে
সাদা পাতায় তোমাকে নতুন করে সাজাই
শব্দের কাছে আজীবন কৃতজ্ঞ থাকব বলে!


*************************************


ওকালতনামা / সায়ন্তিকা

শকুন আর চড়াইয়ের কামড়ে গাছগুলো ভেঙে গ্যাছে

বটবৃক্ষটা জ্বলছে  বলে জাম গাছটা কেবল নিভে যাইনি ,
দেবদারুটার নিচে শুয়ে আছে রোদ ,
রজঃস্বলা নারীদের শরীরের চিহ্নগুলো বড়ো বেশি প্রতীকী ۔۔۔۔۔
ধান ক্ষেতগুলো রাতের বেলায় য্যানো মেরিলিন মনরো হয়ে উঠেছে ,
একটু গভীরে গেলেই বিপদ অনিবার্য !

পুরুষ বেশ্যার শরীর খুবলে খেয়ে ফেলেছে মেয়েলি হাওয়ারা ,
ওদের লকলকে জিভ চেটে খায় ইঁদুরের সিঁড়ি ,
সেখানে রজঃস্বলা নারী আর হিংস্র বাঘিনীর মধ্যে বিশেষ কোনো প্রভেদ নেই ,
খেঁজুর রসে শুধু ডুবে আছে চাঁদ !

ওই গাছগুলো , সোনালী ক্ষেত, গৈরিক স্তন , বারুদ আর নেতাজির ঘোড়াটার কী আদৌ কোনো মালকিন আছে ?

*************************************


দৃষ্টির নেপথ্যে / পিন্টু বেতাল


ধ্বংসস্তূপে কান পেতে শুনি- আগামীর কান্না,
ভগ্নস্তূপে- ভবঘুরে ক্ষুধা, আস্তাকুড়ে বন্যা!
পৃথিবীটা তবু কুশলেই বাঁচে কুটিল মনস্তাপে;
ঝরাপাতা যত- বেঘোরে চূর্ণ, কঠিন আর্তনাদে!

মণিমাণিক্য সকাল শুধু, তাদের জন্য উদয়-
যারা পৃথিবীর সব বায়ু চুষে, ঝাঁঝরা করিছে হৃদয়;
আয়ুটুকু তবু তাহাদেরই দামী- সুখের পায়রা স্রোতে।

নিঃস্ব- যে আজ, নিজেরে বিলায়ে- 'ভবঘুরে' বিপরীতে।।

************************************


আবেগ / তন্ময় রাণা


আবেগ যখন জ্বলন্ত বাস্তবের কড়াইয়ে ফুটতে শুরু করে,
তখন পুড়তে থাকা আবেগের যন্ত্রণা,
ভীষণ কষ্ট দেয় আমায়!
যুক্তিগুলো,
দাঁত বের করে মুখ তখন ভেংচিয়ে
যায়।

নোনা জলের স্রোতে মন খড়কুটোর
মতো ভেসে যায়।
কষ্ট গুলো দলা পাকিয়ে জমাট বাঁধতে থাকে গলায়।
সেসব থেকে শিক্ষা নিয়ে আবেগ গুলোকে
যুক্তির পুরুষ্ঠ আবরণে ঢেকে দিই
স্বস্তি পাবার আশায়।

সাদা কাগজটাকে আঁকড়ে ধরে
একটা
কবিতা লিখতে ইচ্ছা হয়,শব্দ বাড়ন্ত
হয়ে,
তখন আবার কলমও হোঁচট খায়।

তবুও কলম,
ঘষতে থাকি অং,বং,চং শব্দ না জুড়ে,
উৎপটাং উদাহরণে,
পাতা না ভরিয়ে আত্ম-তৃপ্তির জন্য একটা
ভালো কবিতা লেখার নেশায়।

************************************

            তুমি ছিলে
          রতন চন্দ্র রায়

         
            
কি ভাবে করিবো, তোমার সূচনা
       তোমার কাজের নেই, কোন সীমানা,
তুমি ছিলে, মুয়াযযিন
        তোমার আযানের ধ্বনিতে
ছুটে যেতো সবাই, নামাজে।

তুমি ছিলে, ভারতীয় সেনা
      তোমার বজ্রকন্ঠে, ভয় পেতো শত্রু সেনা,
তুমি ছিলে, সাংবাদিক
     তোমার কলমে উঠিত ভেসে
অসহায় মানুষের দাবি,
     তুমি ছিলে, বেতারে
কতইনা গজল গেয়েছো, তোমারই কন্ঠে।

দরিদ্র পরিবারে জন্ম গ্রহণ করে ও
      তুমি বুঝিয়ে ছিলে, বিশ্বকে....
দারিদ্রতায় থেকেও মানুষ পারে
      জীবনের চরম সীমানায় পৌঁছতে...

জীবন সংগ্রামে লিখেছিলে, তুমি
       না বলা, মানুষের মনের কথা
তোমার বজ্রকন্ঠে
      ব্রিটিশ সরকার হয়েছিলো, জড়সড়
তোমার কবিতার ভাষার জন্য
     কারাবন্দি হয়েছিলে।

বিংশ শতাব্দীর, কবি তুমি
     অসহায় মানুষের বাঁচার প্রেরণা।

তোমার মত পায়নি কেউ, এত নাগরিকত্ব
      ব্রিটিশ-১৮৯৯-১৯৪৭, ভারতীয়-১৯৪৭-১৯৭২,
বাংলাদেশ-১৯৭২-১৯৭৬
      তুমি পেয়েছিলে, তোমার যোগ্য সম্মান।

তুমি আজ, রয়েছো শুয়ে
      ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মাঝে
আযানের ধ্বনি শোনাযায়
      তোমার সমাধির পার্শ্বে
তোমার সমাধির পাশে দাড়ালে
      আজ ও মনে হয় বলছো তুমি
তোমার বিদ্রোহী কবিতার লাইন...


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ