পোস্ট বার দেখা হয়েছে
সুন্দরবন অঞ্চলের লৌকিক উৎসব ও দেবতা
তথ্যসূত্র ~~ মঙ্গল মিদ্যা (রিপল)
চৈত্র মানে শেষ মাস, চৈত্র মানে ঋতুও শেষ, আর নানা রোগ অসুখের শুরু। গ্রাম বাংলায় বসন্ত থেকে শুরু করে নানা চর্ম রোগ বা রক্ত বিশুদ্ধি জনীন অসুখ দেখা যায়। অবশ্য এসব থেকে বাঁচার জন্য প্রকৃতি নিজেই সজনে ডাটা বা যুক্তিফুলের মত খাদ্য রেখেছে, তাছাড়া পয়লা বৈশাখে নিম-হলুদ বাটা মাখা তো আছেই, আঁটা বেলপানার সরবতটা বাড়তি ধরে রাখলাম।
যাইহোক মূল কথায় আসি, এইসময় সুন্দরবন অঞ্চলের মানুষরা এইসব নানান রোগ থেকে বাঁচতে ওইসব প্রকৃতির দান ছাড়াও বহু দেব-দেবীর পুজা অর্চনা করে থাকেন। গুটি বসন্ত থেকে বাঁচতে মা শীতলা, জ্বর থেকে বাঁচতে জ্বরাসুর, বিপদ থেকে রক্ষা পেতে রক্ষাকালী পুজা ছাড়াও নানাস্থানে হরিনাম সংকীর্ত্তন -এর আযোজন ও ভোগ হিসাবে ছিড়ে-দই ভেজা খাওয়ার রীতি আছে। নীলের ঘরে বাতি ও চড়ক পুজাটা বাদ দিলাম কারণ ওটা তো আমরা সবাই জানি। তবে আজ সুন্দরবন অঞ্চলের যে পুজা বা পাব্বনের কথা বলবো তা শুধুমাত্র গভীর সুন্দরবণ অঞ্চলেই দেখা যায়, অবশ্য বর্তমানে সেগুলোও লুপ্ত হবার পথে জনবহুল প্রচলন না থাকার কারণে।
"খেঁজুরভাঙা উৎসব " নামটা শুনে আপনারা প্রথম কি ভাবলেন জানি না তবে এই উৎসবটি দেখতে হলে বর্তমানে বাংলাদেশ সীমানায় অবস্থিত সুন্দরবন অঞ্চলে যেতে হবে। তবে গেলেই যে এই উৎসবের দেখা পাবে তার নিশ্চয়তা দিতে পারবো না।
ওখানে এই উৎসবটা মূলত মুসলিম ধর্মের মানুষরাই করে থাকে। তবে শুধুমাত্র মুসলিমরাই করে এটা বলা আমার ভুল হবে, বহু হিন্দুরা এমনকী দুই ধর্মের মানুষরা মিলিত ভাবেও করে থাকেন।
এই উৎসবের রীতি বা পালন খুবই সহজ। কয়েকজন মিলিত হয়ে দলবদ্ধ ভাবে গ্রামের পাড়ায় বাড়ি বাড়ি গিয়ে শঙ্খ বা শাঁখ বাজিয়ে সাহায্য চায়, গৃহকর্ত্রী চাল বা আলু বা অর্থ তাদের দান করেন। এই দলটি ১৫ বা ১২ দিন ধরে এমন ভাবেই নানা গ্রাম নানা বাড়ি বাড়ি যান সাহায্য নেন তারপর একদিন মিলিত হয়ে প্রাপ্ত দানগুলি দিয়ে বড় করে পুজো বা পাব্বনের আয়োজন করেন, সেখানে মেলাও বসে।
বাংলাদেশ সুন্দরবন অঞ্চলের মানুষরা প্রধাণত বনবিবি বা পীড় বড়খাঁর পুজো আয়োজন করেন।
তবে আমি ব্যক্তিগত ভাবে দেখেছি এইসময় বাড়ি বাড়ি অন্য গ্রামের মহিলারা আসে আর শাঁখ বাজিয়ে চাল সংগ্রহ করে, এটাকে আমাদের আঞ্চলিক ভাষায় *"মাগন সংগ্রহ"* বলে। এনারা এই মাগন সংগ্রহ করে প্রাপ্ত চাল বিক্রি করে যে টাকা পায় সেই টাকা দিয়ে মা মনসা বা শীতলা দেবীর পুজো দিয়ে আসেন স্থানীয় জাগ্রত মন্দিরে। এছাড়াও বহু মানুষ এই "মাগন" সংগ্রহ করে গ্রামের মহৎসব ও এমনকী ধর্মঠাকুরের পুজা ও মেলার আয়োজন করেন।
বাংলাদেশ সুন্দরবন অঞ্চলে যেটা খেঁজুরভাঙা উৎসব বলে ভারতের সুন্দরবন অঞ্চলের মানুষরা হয়তো সেটাকে মাগন সংগ্রহ করা বলে। সুন্দরবন অঞ্চলে এইরকম রীতির পুজা বা উৎসবের প্রচলন আছে।
আমি ২য় যে উৎসব বা পুজার কথা বলবো সেটা সুন্দরবন অঞ্চলের হিন্দু মুসলিম দুই সম্প্রদায়ের বিশেষ জীবিকার সাথে যুক্ত লোকরাই করে থাকেন। সুন্দরবনে এইসময় মানে বসন্তে যখন গাছের পাতারা ঝড়ে যায় তখন জঙ্গলের গভীরে মোম ও মধু সংগ্রহ করে মৌলরা প্রবেশ করে। তবে তারা যাওয়ার আগে মাকাল দেবতার পুজো দেয় তারপর যায়।
এইসময় সুন্দরবন বেড়াতে গেলে নদীর ধারে ধারে বা জঙ্গলে ঢোকার মুখে কাদামাটি দিয়ে অস্থায়ী একটা মুখমূর্তী দেখা যায়, ওটাই মাকাল ঠাকুর। এই পুজা শুধুমাত্র দলের প্রধান বা সর্দার করেন আর বাকিরা সাহায্য করে মাত্র। বলতে গেলে এই পুজার সঠিক কোন মন্ত্র নেই বা আচার রীতি পালন নেই, যেমন আয়োজন সম্ভব হয় তা দিয়েই পুজো হয়, তবে অনেকক্ষেত্রে হাঁস মুরগী চালকুমড়ো বলিও দেন, যদিও বলি সবাই বা সবসময় দেননা।
মাকাল ঠাকুরের পুজো দেওয়ার পরেই সবাই সুন্দরবনের ভেতর প্রবেশ করেন সবাই। প্রচলিত আছে মাকাল ঠাকুর সন্তুষ্ট হলে প্রচুর মোম মধু সমুদ্র কাঁকড়া পাওয়া যায়।
সুন্দরবন মানেই রহস্য, তা সেটা জঙ্গল হোক বা এখানের মানুষদের পুজা পাব্বন রীতি-নীতি। সুন্দরবন অঞ্চলের মানুষরা একটা কথা বিশ্বাস করে এখানে বাঁচতে হলে ধর্ম নিয়ে বিদ্বেষ করলে চলবে না, তাই নিজেদের ধর্মের সাথে তালমিলিয়ে দেবদেবী পীড় পীড়ানীদের পুজা অর্চণা করে থাকে, যা হিন্দু মুসলিম ধর্মের মিশ্রণ হয়।

0 মন্তব্যসমূহ