দর্পণ || বিশ্ব কবিতা দিবস || তন্ময় রাণা




পোস্ট বার দেখা হয়েছে

শেষ টেলিফোন 


সব শেষ হয়ে গিয়েছিলো সেদিন ! 

শেষ বিকালে ,বিদায় নেওয়া সূর্যের-

লাল লালিমা মেখে,

বেজে উঠেছিল তোমার মুঠো ফোনের রিং ,

সব শেষ হয়ে গিয়েছিলো সেদিন !


তুমি অভিযোগ করোনি কোনো-

ছিলোনা তোমার কোনো অনুতাপও,

সহজ কথায় রেখেছিলে শুধু ,

মুক্তির আবেদন!


সত্যি বলতে কি .....

এই মুক্তিটুকু ছাড়া, 

অবশিষ্ঠ কিছুই দেওয়ার ছিলোনা,

আমার আর বাকি l


এক পলক চোখ বন্ধ করেছিলাম বুঝি! 

তারপর খোলা আকাশে, 

ভাসিয়ে দিয়েছিলাম মেঘেদের মাঝে,

আমার স্বপ্ন গুলো সেদিন!


দূর থেকে ভেসে এসেছিলো দরদী 

বাউলের সুর!

এক সমুদ্র ঢেউ যেন আছড়ে পড়েছিলো 

এ বুকে ,কেউ বোঝেনি....... 

শুধু ধরা পড়েছিলাম,

ওই মেঘেদের কাছে ,আমার কষ্টে ওরা,

অঝোরে ঝরেছিল সেদিন বৃষ্টি হয়ে l 

এখনো ঝরায় মাঝে মাঝে শ্রাবন কে 

সাথে নিয়ে l


আজ অনেক বছর হয়ে গেছে পার ...

সময় শিখিয়ে দিয়েছে কিভাবে ভালো 

থাকার অভিনয় করে যেতে হয় বারবার  

প্রমান স্বরূপ,

ফেসবুকে হাঁসি মুখের সেলফির,

ছবি দিই প্রায়l 


সব শেষ হয়ে গেছে জেনেও.... 

তবু অন্তহীন অপেক্ষারা শুধু জেগে থাকে,

যদি একবার আবার বেজে ওঠে সেই  টেলিফোন !


অবুঝ আবেগ গুলো,

কতগুলো অভিমানী শব্দ হয়ে,

রক্তের অণুকণায় মিশে,

যেন ছুটে বেড়ায় সবসময়!     


কিছু আবার বিক্ষিপ্ত হয়ে,

ফিনকি দিয়ে বেরিয়ে আসতে চায় !

অবশেষে আছড়ে পরে শেষে,  

আমার কবিতার খাতায়..... 

====

 ব্যর্থ প্রেম 


ব্যর্থ প্রেমের অনুভূতি গুলো আমায় ভীষণ নাড়া দিয়ে যায় l

যেখানেই আভাস পাই থমকে দাঁড়াই,

শুনতে চাই, 

তাদের ব্যর্থ প্রেমের কষ্টের সে সব গোপন 

উপাখ্যান l 

কষ্টের সে দ্রবণে নিজেকে ক্রমশ দ্রবীভূত করে যেন,

মেখে নিতে চাই ব্যর্থ প্রেমের,সব কষ্টের 

শেষ নির্যাস l

কখনো'বা শুনতে শুনতে পথ ভুলে হারিয়ে যাই দূরে কোথাও,

সম্বিৎ ফিরলে,শেষ ট্রেনে ঘরে ফেরার তাড়নায় দৌড়াই l

যদিও, আমি ভালো প্রেমিক হতে পারিনি কখনো,

হতে পারিনি কারো কাঙ্খিত মনের, স্বপ্নের নায়ক !

তবে অভাব কে প্রেমিকা বানিয়ে নিত্য  দিন আমি, 

একটু একটু করে বেশ পার হয়ে যাই   

জীবনের চড়াই উৎরাই l  

জীবনের সাথে চলে যে আমার,রোজের- ভাত রুটির লড়াই!

তবুও ব্যর্থ প্রেমের সে সব কষ্টের অনুভূতি গুলোয়,

আমি আকণ্ঠ নিজেকে ভেজাই,

ওদের সব,

কষ্ট গুলোকে কুড়িয়ে কাঁচিয়ে আমাতে মেখে নিয়ে,

ওদের খুশির প্লাবনে ভাসিয়ে,

আমি একটা-

আনন্দের,একটা সফল প্রেমের কবিতা লিখতে চাই........... 

====

 শব্দের খোঁজে 


শব্দেরা বড়োই বিক্ষিপ্ত যেন আজ l

শুধুই, 

এদিক-সেদিক ছুটে বেড়ায় তারা সেই সকাল থেকে রাত l


ওদের জড়ো করার নেশায় আমার বয়ে যায় বেলা l

আমার একলা পড়ে থাকা সাদা 

কবিতার খাতা,

প্রায় শুকনো হয়ে আসা পেনের মুখ 

বুকে নিয়ে,

একরাশ মন খারাপি আবেশ মেখে,

নিত্য-দিন সে- 

বসে থাকে যেন আমারই ভরসায় l 


আমি হাতড়ে বেড়াই কখনো জীবনের 

বিভিন্ন- 

আবেগ অনুভূতি আর স্মৃতির সাগরে 

ভেসে,

কখনো বিস্তীর্ণ সবুজ বনানী পার করে  

কখনো'বা, 

সমুদ্র তটের পরিত্যক্ত কোনো ঝিনুকের খোলে আবার কখনো, 

মেঘের ভেলায় চড়ে ভেসে বেড়াই দূরে 

আমার সেই,

হারিয়ে যাওয়া কাঙ্খিত শব্দের খোঁজে l 


একে একে পার হয়ে যায় ঋতু বদলে 

দিন!

আশ্বিনের পাঁজা তুলোর মেঘ একসময়  মিলিয়ে যায়, 

অকাঙ্খিত দূষণের কালো মেঘের 

আড়ালে l

কার্তিকি রাতের আকাশ,নিজ ঘরানা তৈরি করে নেয়,  

অঘ্রান'কে ডেকে নিয়ে,হেমন্তিক সাজে সেজে l 


এসবের মাঝেই আমার হারানো শব্দগুলো  খুঁজতে খুঁজতে,

ক্লান্তিতে একসময় ঘুমিয়ে পড়ি আমার চেনা বিছানায়  l 


শীত ছুঁই ছুঁই সকালের ভোর আমার ঘুম 

ভাঙিয়ে দিয়ে যায় l

হারিয়ে যাওয়া শব্দের খোঁজে আবার সে  যেতে বলে আমায়,

আমি ছুটে বেড়াই,হঠাৎ করে যেন মন 

মেতে ওঠে- 

দূরে কোথা থেকে ভেসে আসা পৌষের নতুন ধানের গন্ধে l  


আমি আবার নতুন করে বুক-বাধি ছুট লাগাই সেদিকেই, 

আমার হারানো শব্দ গুলোকে একত্রিত করার আশায়  l 

====

 এমন হয় 


আমি যাতে কবিতা লিখতে পারি 

সে জন্যই,

বোধহয় এমন'টা রোজ হয় l


হেমন্তের-

নরম সকালে,জানলার কাঁচ চুঁইয়ে

হিমেল বাতাস, 

আমার ঘুম ভাঙিয়ে দিয়ে যায় l  


সবুজ ঘাসের- 

উপর জমা শিশির বিন্দু তাই বোধহয় 

আমার,

নাগাল পেলেই,পা ভিজিয়ে দিয়ে যায় l 


সূর্য রশ্মির ছটা, 

আমনি ধানের ক্ষেতে,যেন মুঠো-মুঠো সোনা ছড়ায় l 


গোধূলি বিকেল-

বোধহয়,কামরাঙা রঙে তাই নিজেকে 

রাঙায় l


রাতের আকাশ, 

বোধহয় নক্ষত্র মালায়,তাই নিজেকে 

সাজায় l 


আমি যাতে কবিতা লিখতে পারি 

সে জন্যই বোধহয়, 

আমার জীবন থেকে তোমাকে, এভাবেই  হারিয়ে যেতে হয়! 

====

 প্রেমের কবিতা 


মনের মধ্যে একটা অস্থিরতা চলছে'তো

চলছেই!

কত শতাব্দী ধরে একটা কবিতা লিখতে চাইছি,

শব্দ গুলো যেন অভিমান করে দূরে সরে 

সরে গেছে l 


ওদের দাবি ছিল,একটা প্রেমের কবিতা 

লিখি, 

আমি লিখতে পারিনি!

আদপে আমি'যে কখনো প্রেমিক হতে পারিনি! 


তাই সন্ধ্যা নেমে নির্জন আসা পার্কের 

নির্জন কোনে , 

শেষ ট্রেন ছেড়ে যাওয়ার পরেও ফাঁকা 

বেঞ্চে, 

কিংবা গোধূলির আলো মাখা রবীন্দ্রসদন

চত্বরে 

প্রেম আমায় কখনো ছুঁয়ে দেখতে চায়নি !


ভীষণ খিদে আমায় প্রেমিক হতে দেয়নিl

সারাটা জীবন, 

অভাবের ছড়ি ঘুরিয়ে শুধুই আমায় ছুটিয়ে  মারিয়েছে,

জীবনের এক প্রান্তর থেকে আরেক 

প্রান্তরে ! 


মীরার মতো কালো মেঘের আড়ালে কখনো আমি,

কৃষ্ণকে খুঁজে পাইনি!প্রেমিকার লম্বা

ঘন কালো চুলে,

কখনো আমার মুখ ঢেকে যায়নি!


প্রেয়সীর গভীর,

কালো চোখের তারার মাঝে কখনো 

হারিয়ে যাওয়া হয়নি! 

ঠোঁটের কোনে,কিংবা উত্তোল বুকের 

কালো তিলে, 

আদর মাখিয়ে কাউকে, "তুমি" তিলোত্তমা 

বলে ওঠা হয়নি l  


তবুও আমি প্রতীক্ষায়,

এই মহামারী কাটলে,বানভাসি 

মানুষের -

ঘর, দালান,উঠোন সব শুকনো হলেl 


ভেসে যাওয়া- 

ঘর বাড়ির ধ্বংস স্তুপ সরিয়ে,সম্বলহীন মানুষ গুলো- 

আবার ঘর বাঁধলে,ভরপেট খেয়ে

কাল কি খাবে, 

সে ভাবনা ভুলে ঘুমোতে গেলেl 


কিংবা- 

নতুন কোনো সকালের নরম আলো 

মেখে ওই,

একচিলতে ঘরের ছোট্ট পরিধি ঘিরে, 

কখনো দুটি মন,

একসাথে ভালোবাসার ঘর বাঁধলেl 


সেদিন হয়তো,ওদের ভালোবাসা দেখে

মোহিত হয়ে- 

আমার হারিয়ে যাওয়া অভিমানী 

শব্দ গুলোকে-  

ফিরিয়ে এনে,সব অস্থিরতা কাটিয়ে 

আমি ঠিক একটা,

প্রেমের কবিতা লিখিতে পারবো l 

====

 পৃথিবী আবার শান্ত হবে


আজ আর তুমি আমি মাখা  

ক্যাতক্যাতে,  

কোনো প্রেমের কবিতা নয়,

কিংবা, 

যৌনতার সুড়সুড়ি মাখা কোনো,  

প্রেমের গল্পও নয় l 


আজ দু-কলম বরং অসহায় মানুষ গুলোর জন্য থাকl

শব্দরা ভিজুক বরং আজ করুণ 

ওই, 

আতঙ্কিত মানুষ গুলোর জন্য একটু সমবেদনায় l


হয়তো,

ওদের জীবনেও প্রেম ছিলোl  

হয়তো, 

আধ পেটা খেযেও ওদের মনে সুখ 

ছিলো l 


হয়তো- 

ওখানেও,কোনো ষোড়শী কন্যার মনে, 

লেগেছিলো ফাগুনের রং l

হয়তো-

কোথাও,ঘর বাঁধতে চলেছিলো 

দুটি মন l 


দুদিন আগে অবধিও সেখানে ভরা ছিলো মায়ের কোল 

শিশুরা পরম সুখে ঘুমিয়ে ছিলো নিশ্চিন্তে মেখে 

মায়ের উষ্ণ বুকের ওম l 


আগ্রাসী সাম্রাজ্যবাদী লালসার আগুনে গোলায় 

ছিন্ন বিচ্ছিন্ন হয়ে এমন দগ্ধ 

হবে যে- 

ওদের জীবন,ওরা ভাবতে পারেনি কখনো এমন!


রাষ্ট্রপুঞ্জের শরিকি দেশ স্বার্থ বাঁচিয়ে- 

মধ্যস্তায় মজে,ভেজাতে পারেনি 

যে চিড়ে,

প্রতি মুহূর্তে ওরা তাই আজ ঝলসে যাচ্ছে,

বোমারু গোলা আর মিসাইলে 

পুড়ে পুড়ে l 


কবিতারা আজ ক্ষমা চেয়ে নেয়  

ওদের কাছে 

শেখাতে পারেনি যে প্রেমের ভাষা 

মিটিয়ে 

সাম্রাজ্যবাদী দের ভোগ ও লালসা l 


আমার কবিতাও মাথা নত করে লজ্জায় !

তবুও তিল তিল করে বাঁচে রোজ,

একদিন পৃথিবী-

আবার শান্ত হয়ে,ওদের উঠোনে আবার-

বসন্ত আসবে, ঠিক এই আশায়l 

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ