আর নয় যুদ্ধ ~ গোপা ঘোষ




পোস্ট বার দেখা হয়েছে

আর নয় যুদ্ধ

গোপা ঘোষ


 সভ্যতার উষালগ্নে মানুষ সংঘবদ্ধ সামাজিক জীবনে প্রকৃতির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছিল । কিন্তু সে যুদ্ধ ছিল অস্তিত্ব রক্ষার সংগ্রাম । মানুষ সে লড়াইয়ে জয়ী হয়েছিল বলেই আজ বিশ্বসভ্যতা গৌরবময় শিখরে আরোহণ করেছে । আজও বিশ্বের সর্বত্র যুদ্ধের দামামা বাজতে শোনা যায় । আজকের দিনে মানুষের যুদ্ধ অস্তিত্ব রক্ষার জন্যে নয়, যুদ্ধ হয় মানুষকে ধ্বংস করার জন্যেই । যুদ্ধের এ উন্মত্ত আয়োজন বিশ্বশান্তিকে করেছে বিপর্যস্ত , উন্নয়নের গতিকে করেছে স্তিমিত।


মানব চরিত্রের পশু প্রবৃত্তির প্রাবল্যে অধিকাংশ সময় মানুষ ধ্বংসাত্মক যুদ্ধ - যুদ্ধ খেলায় মেতে উঠেছে । হিংসা , বিদ্বেষ , সম্পদের অসীম লোভ , প্রভাব বিস্তারের লালসা , ধর্মান্ধতা , রাজনৈতিক স্বার্থপরতা যুগে যুগে যুদ্ধের পেছনে ইন্ধন 

যুগিয়েছে । তবে একথা সত্য , অদূরদর্শী রাষ্ট্রনেতাদের চরম দায়িত্বহীনতার কারণে সংঘটিত যুদ্ধে সাধারণ মানুষ কোনোদিনই অংশ নেয় নি , শান্তিপ্রিয় জনগণ যুদ্ধের নির্মম শিকারে পরিণত হয়েছে মাত্র ।

অতি প্রাচীনকাল থেকে একদিকে যেমন চলেছে সভ্যতা নির্মাণের প্রচেষ্টা , তেমনি চলেছে সভ্যতা বিধ্বংসী ও মানবতাবিরোধী যুদ্ধের হোলিখেলা । ট্রয় নগরী ধ্বংস হয়েছে যুদ্ধে । নেপোলিয়ন ও আলেকজান্ডারের যুদ্ধংদেহী মনোবৃত্তির কারণে সভ্যতার গতি গেছে থমকে। চলতি শতাব্দীর শুরুতে প্রথম মহাযুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে সারা দুনিয়া । প্রথম মহাযুদ্ধের ধ্বংসলীলার ক্ষত না শুকাতেই চল্লিশের দশকে বিশ্ববাসীকে জড়িয়ে পড়তে হয় আরেকটি মহাযুদ্ধে ।


দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের শেষ দিকে ১৯৪৫ সালের আগস্ট মাসে সকাল আটটা বেজে পনেরো মিনিটে  জাপানের হিরোশিমা ও নাগাসাকি শহরে  মার্কিন বি টুয়েন্টিনাইন বোমারু বিমান এনোলা গ্রে দানবের মত এলো পৃথিবীর প্রথম পারমাণবিক বোমা নিক্ষেপ করে নিমেষে একটি প্রাণের শহরকে তালগোল পাকানো ধ্বংসস্তূপে পরিণত করে দিতে। তখন আধো জাগরণে শহরের লোকজন। ঘুমের আমেজ তখনও লেগে শহরের মানুষের চোখের পাতায়। হয়তো দেবশিশুর মত ফুটফুটে শিশুরা চলেছে স্কুলে।  এর ধ্বংসের ক্ষমতা যে কত ভয়ঙ্কর এবং এই ভয়াবহতা যে কত সুদূরপ্রসারী তা বোধহয় বোমা নিক্ষেপকারীরাও জানতেন না।

 ঠাণ্ডা মাথায় হিমশীতল করা অপারেশনের তেজস্ক্রিয়তা আজ এত বছর পরেও বিকলাঙ্গ শিশুর জন্ম দেয়, ত্বকের ক্যান্সারের সঙ্গে ঘর করেন নিরপরাধ সাধারণ মানুষ।


এরপরেও ভিয়েতনাম , নিকারাগুয়া , লেবানন , এঙ্গোলা , কম্বোডিয়া , মায়ানমার , ভারত , পাকিস্তান প্রভৃতি স্থানে সংঘটিত হয়েছে বর্বর যুদ্ধ । অতি সম্প্রতি ইরান - ইরাক , ইরাক - কুয়েত , ফিলিস্তিন - ইসরাইল যুদ্ধ ছাড়াও বুয়ান্ডা , জায়ার , শ্রীলঙ্কা , মায়ানমার , বসনিয়া , কাশ্মীর , চেচনিয়া প্রভৃতি স্থানে জাতিগত সংঘাত এবং বিচ্ছিন্নতাবাদ প্রতিনিয়ত রক্ত ঝরাচ্ছে । সম্প্রতি রাশিয়া সরকার এবং ইউক্রেন  মধ্যে চলছে রক্তক্ষয়ী  সংঘর্ষ , যা ঐ দেশের জনগণের শান্তি বিনষ্ট করছে।রাষ্ট্রপুঞ্জের হুঁশিয়ারি অগ্রাহ্য করে ইউক্রেনের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান ঘোষণা করলেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। ক্রিমিয়া দিয়ে ইউক্রেনে ঢুকল রুশ সেনা। ইউক্রেনের বিভিন্ন এলাকা থেকে 24th February  সকাল থেকেই শোনা গেল বিস্ফোরণের শব্দ, অ্যাম্বুলেন্স ও পুলিশের সাইরেন। কিন্তু পুতিনের এই সিদ্ধান্তকে মোটেও ভালো নজরে দেখছেন না খোদ তাঁর দেশের লোকেরাই। বিশ্বজুড়ে রাশিয়ানরা রাস্তায় নেমে পুতিনের এই সিদ্ধান্তের তীব্র নিন্দা করছেন। অনেক রুশ নাগরিকই প্রতিবাদে সামিল হয়ে পুতিনকে হিটলারের সঙ্গে তুলনা করেছেন।


যুদ্ধ মানবতাকে পদদলিত করে । যুদ্ধ মানে রক্তপাত , যুদ্ধ মানেই ধ্বংসলীলা । যুগে যুগে যুদ্ধের তাণ্ডব মানুষের ভাগ্যকে করেছে বিড়ম্বিত , সভ্যতাকে করেছে বিপন্ন । হিরোশিমা ও নাগাসাকি আজও বিশ্ববিবেককে বিচলিত করে । যুদ্ধের কারণে কত নিরপরাধ মানুষ যে অকালমৃত্যুর শিকার হয়েছে তার কোনো ইয়ত্তা নেই । কত স্বামী হারিয়েছে প্রিয়তমার মুখ , কত স্ত্রী হারিয়েছে প্রাণপ্রিয় স্বামী । আর কত মায়ের বুক শূন্য হয়েছে তারও কোনো লেখাজোখা নেই । বিশ্বের উন্নয়নধারাকে কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় পৌঁছাতে দেয় নি যুদ্ধ । যে বিপুল সম্পদ যুদ্ধের রসদ ও অস্ত্র সংগ্রহে ব্যয় করা হয়েছে তা দিয়ে এই ভূপৃষ্ঠ সোনার প্রলেপে ঢেকে দেওয়া যেত । যুদ্ধ মানুষে মানুষে , দেশে - দেশে ও জাতিতে - জাতিতে অবিশ্বাস সৃষ্টি করে , বৃদ্ধি করে উত্তেজনা ।


প্রাচীন রােমের একটি প্রবাদ হলাে- ‘শান্তি যদি চাও, যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হও।' এ নীতিতেই বিশ্বের পরাশক্তিগুলাে বিশ্বাসী। আর তাই বিশ্বে যুদ্ধের শেষ নেই, শান্তির পক্ষে জনমতেরও অভাব নেই। আরেকটি বিশ্বযুদ্ধ শুরুর ডামাডােল হয়তাে এখন নেই । কিন্তু স্নায়ুযুদ্ধ চলেছে অনেক দিন। আপাতত বিশ্বের এক নম্বর শক্তি আমেরিকা। প্রতিদ্বন্দ্বীর অভাবে এখন আমেরিকাও শান্তির পক্ষে। আর যুদ্ধ নয়, পৃথিবীতে শান্তির স্থায়ী আবাস গড়ে উঠুক- এটাই শান্তিপ্রিয় মানুষের প্রার্থনা। যুদ্ধ মানুষকে ধ্বংস করে, ধ্বংস করে সভ্যতাকে। পৃথিবী আলােকিত হােক শান্তির আলােকবর্তিকা হাতে। শ্বেত কপােত উড়ক অনন্ত আকাশের সীমানায়।

বছরের পর বছর ধরে শান্তির জন্য আন্দোলন করে যাচ্ছে পৃথিবীর একাংশের মানুষ। কিন্তু তা আজও ব্যর্থ পরিহাসের কান্না।


আজও শিশুদের হাতে রিমোট কন্ট্রোলে যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা। নতুন বইয়ের গন্ধ নেই।খেলার মাঠ নেই। ঝাঁ চকচকে দোকানে যুদ্ধের খেলনার সরঞ্জাম। গিটার নেই, পুতুল বা রঙীন মাছ নেই।কিশলয় প্রাণ সকল মহীরুহ হয় বারুদের গন্ধে, রক্তের হোলি খেলায়। রূপকথার গল্পে চাঁদ তারা নেই।কল্পনায় অপু নেই,অমলের দইওয়ালা নেই।নেই নন্টে ফন্টে বা ফেলুদা, কাকাবাবু। আজ শিশুদের হাতে নেই সুকুমার রায়ের আবোল তাবোল তার বদলে রয়েছে মুঠোফোনের  কিছু গেমস।


এই সমস্ত রন্ধ্রের মধ্যেই চুপিসাড়ে প্রবেশ করে যুদ্ধের রণপা।

রাষ্ট্র নায়করা ঠকঠক পায়ে ,সত্যি , মিথ্যার যুদ্ধর আতঙ্ক সৃষ্টি করে , রণডঙ্কা বাজাতেই থাকে।


স্বার্থান্বেষী মহল ও সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলো অনেক ক্ষেত্রে যুদ্ধের ইন্ধনদাতা। বৃহত্তর শক্তিগুলো তাদের অস্ত্রের বাজারকে সম্প্রসারিত রাখার লক্ষ্যে একমুখে শান্তির কথা বলছে , অন্যমুখে যুদ্ধের আগুনে ঘি ঢালছে । তা সত্ত্বেও বিশ্ব মানবতা আজ সেই দিনটির প্রতীক্ষায় রয়েছে , যেদিন দুনিয়ার আকাশ - বাতাস থেকে থেমে যাবে যুদ্ধের দামামা । তাইতো সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় বলেছিলেন.........

"কার দিকে তুমি গুলি ছুঁড়ছো হে, এখানে সবাই মানুষ!’ 

তুমি কে, তুমি কি গ্রহান্তরের দলছুট?

তোমার কখনো ছিল না কি শৈশব? 

তুমি কি কখনো দেখোনি মাটিতে ঘুমন্ত কোনো শিশু? 

জানলার ধারে দাঁড়ানো, একলা, শুন্যদৃষ্টি নারী? 

কার দিকে তুমি গুলি ছুঁড়ছো হে, এখানে সবাই মানুষ!"

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ