পোস্ট বার দেখা হয়েছে
কবিতা :-
মন কেমনের দিন
ঝুমা মল্লিক
মেঘ , যখন মন ছুঁয়ে,
বাতাসে ঘর বাঁধে ।
তখন শরীরে হয়েছিল বৃষ্টির জন্মদিন ,
শুধু মনে পরে, বেইমান সেই মেঘটির কথা।
যে দিয়েছিল গভীর ব্যথা ।
মন কেমনের দিনে
বনে বনে পাখিরা ,
ছলেবলে ডেকেছে আমায়
বনের ধারে ,ফিসফিস করে বলেছে
কান পেতে, মোদের গান একটিবার শোন
মনের মেঘ হবে নিবারণ ।
মন কেমনের দিনে
মেঘ গুলো ,কেন মন থেকে মনে আটকে থাকে,
বলবো তাকেই ,যাকে রেখেছি ভিতর ঘরে,
মনে পরে, ঝড়ো হাওয়া বুকের ভিতর তোলপাড় করে
এতো যে ঝড় বাদল ,গল্প বদল,
কেউ কি ,কিছু বোঝে না ?
মন কি মরে না ।
মন কেমনের দিনে মনে পরে ,
লাল,নীল সবুজ রঙে
ঢেকে রেখেছি বিস্মৃতি ।
তবুও তো অপেক্ষা করি -
আজ উপেক্ষা করি ,মনের মেঘ সরিয়ে
মনের কথা শুনতে পারি,দিন গুনতে পারি ?
আজ মন কে বলতে পারি ।
অনেক তো হলো,
এবার একটু দাঁড়াও,ওপারে যাবার বেলায় একটি গান তোমাদের শোনাতে পারি -
“ আগুনের পরশমণি ছোঁয়াও প্রাণে।
এ জীবন পুণ্য করো দহন-দানে “
*************************************************
ওটুকুই নিজস্ব
নীলতারা
বারান্দায় রোদ এলেই সেঁকে নিতে চাই শীতেল হাত পা
ঠিক কতক্ষণ?
যতোক্ষণ নিজেকে সওয়ানো যায় -
প্রখর সূর্য তাতে একটু বৃষ্টির জন্য ছুটি শ্রাবণের কাছে
কিন্তু কতটা বৃষ্টির প্রয়োজন?
যতোক্ষণ শরীরে কাঁপুনি না ধরে-
তোমার লতায় নিজেকে জড়িয়ে রাখতে রাখতে
কখন তুমি ভেবে ফেলো অনেকটা জুড়ে আছি
ছাড়াতে থাকো বন্ধন....
তৃপ্তিকেও জানতে হয় কতটুকু ঢেকুরের প্রয়োজন -
*************************************************
কবিতার জন্য কবিতা
ঋত্বিক গোস্বামী
ছেলেটা কবিতা পড়ত না
হাতে দালাল স্ট্রিট
সন্ধ্যার চ্যানেলে সে
রোজ দেখে নিত
শেয়ার বাজারের উথ্থান ও পতন
ছেলেটা কবিতা পড়ত না
সোজা হেঁটে যায়
সামনে এটিএম আর
নৈমিত্তিক হিসেব
কবিতা পড়ত না ছেলেটা
রোজ দপ্তরে এসে
নিরন্তর ইঁদুর দৌড় আর
তৈলাক্ত বাঁশের পাটিগণিত
আর বৈভব বারুদ থেকে
ক্রমশঃ হয়ে উঠত সনাতনি ছাই
মেয়েটিও কোনোদিন
ছোঁয়নি কোনো কবিতার অক্ষর
তবু ওর বুকের ভেতর ভালোবাসার ঢেউ
এত্ত ভালোবাসা যেন কয়েকটা
কাব্যগ্রন্থের সমাহার
এই সে স্বামীর কপালে
এঁকে দিল মঙ্গলটিপ
তারপর সন্তানের হাত
ধরে যোজনদৌড়
সন্ধ্যের ব্যালকনিতে উদাসি হাওয়া এসে গেয়ে যেত
কুসুমের গান
কবিতা পড়ে না ছেলেটা কোনোদিন
হে বর্ষণসিক্ত মেঘ
তুমি ওর বুকে
সবুজ বিপ্লব ঘটাও
আর তৈলাক্ত বাঁশ নয়
এবার প্রস্ফুটিত হোক
সোনালি ফসল।
*************************************************
সেই তো আমার কবিতা
মেঘে ঢাকা তারা
সেই তো আমার কবিতা!
অথচ ,কি আশ্চর্য -
অস্পষ্ট তার অবয়ব!
যদিও যুগে যুগে যা চেয়েছি
যে মন,যে হৃদয়,যে আত্মা-
পেয়েছি তাতেই সবই তা!
যার ছায়াসঙ্গী আমি-
শয়নে,স্বপনে, জাগরণে!
অস্পর্শ তার ছবিটা!
যার মনের দেয়ালে অনুরণন,
কল্লোল,কলরব,
প্রতিধ্বনির উৎসার
আমার আত্মার-
তাকেই তো দিয়েছি সব!
মিলে মিশে ছয়লাপ,একাকার
দু'জনার অনুভবিতা!
*************************************************
পরিচয়
পিয়ালী সরকার
আসলে আমি কেউ হইনা | এই না হওয়াটা মর্মান্তিক , , ,
মেঘ চায় বৃষ্টি হতে,
সেই বৃষ্টি থেকে ভরপুর খালবিল, নদী নালা,
সেই জলের প্রশ্রয়েই চাষবাস,
ফলে ভরা মাঠ |
সঙ্গীতের সপ্তসুর চায়
অপার মেলবন্ধন, স্থায়ী থেকে
অন্তরা হয়ে সঞ্চারী হাতে হাত
রাখতে চায় বিশ্বাসে,
যেমন নিশ্চিন্ত নিরাপত্তায় অকটেভ মেশে সেসটেটে |
গঙ্গোত্রী থেকে নদীও অলকানন্দাকে নিয়ে
হরদ্বারের চেনের বাঁধন ছুঁয়ে ,
এলাহাবাদে মেলে কুম্ভে ,
আপন পর তবু ভেসে যায় ভাগীরথী- পদ্মার ভাগাভাগিতে |
অথচ আমি কেউ হই না |
পরিচয়হীনতাই
আমার
শেষ
স্বীকৃতি !
গুটিয়ে নিচ্ছি তাই | নেবোও গুটিয়ে | যেমন গোটায়
দুই শতকী কচ্ছপ বা স্বল্পায়ু শঙ্খ কোনও অজানা স্পর্শে,
যেমন লজ্জাবতী অচেনা সংসর্গে আর
দেখেনা সূর্যতাপ ,
বা যেমন ভীরু ডাভ নীরব
অভিমানে গোটায় ডানা
আকাশের নীল থেকে ,
তেমনই ....
*************************************************
নিবন্ধ
আমি এবং আমার ভাষা
ধর্মেন্দ্র রাওয়াত
এই কিছুক্ষণ আগে আমি আড্ডা দিচ্ছিলাম একটি ছোট্ট গ্রামে আমার বহুপুরনো পরিচিত বন্ধুদের সাথে। আমাদের সেই আড্ডা'র মধ্য থেকে আমার এক প্রিয় বন্ধু হঠাৎই আমার দিকে তাকিয়ে বলল- আচ্ছা ধর্মেন্দ্র, তোর তো বাঙ্গালীদের সঙ্গে ওঠাবসা বাংলাতেও পড়াশোনা কালচার সমস্ত কিছুই আদব-কায়দা আচার-আচরণ ভালোলাগা- মন্দ লাগা । তাহলে তুই নিজেকে বাঙালি বলে ভাবিস না বিহারী ?
আমি বললাম- বেশ তাহলে কথাটা যখন উঠলোই তাহলে এই বিষয়ে আমার দর্শন শোন। অবশ্য যদি শুনতে চাস ,তো বলি।
সবাই একসাথে বলে উঠল- হ্যাঁ হ্যাঁ বল বল । শুনবো।
সবাই আগ্রহ নিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। আমি বললাম -দেখ আমাদের আশেপাশে পশুপাখি জন্তু-জানোয়ার প্রত্যেকেই শরীরকেন্দ্রিক হয়। তারা শরীর নিয়ে বাঁচে আবার শরীর নিয়েই মরে । তারা অন্নময় কোষে বাঁচে তারা অন্নময় কোষেই মরে। কিন্তু আমরা মানুষেরা শুধু শরীর বাদী নই। আমরা তার উপরে উঠতে চায় । অর্থাৎ আমরা মনোময় কোষেও বিচরণ করতে চায়। আমরা অধিকতর সময় মনো-জগতে বিচরণ করি । প্রথম যাত্রায় আমাদের সাধন-ভজন সংস্কৃতি মনোজগতের অংশ। আমাদের ধর্ম আছে সংস্কৃতি আছে ।অন্যান্য জীব জন্তুর যেমন শরীরকেন্দ্রিক জীবন হয়। আমাদের কিন্তু সংস্কৃতিক কেন্দ্রিক জীবন। আমার সংস্কৃতি 'আমি কে'?তার পরিচয় বহন করে । তাই প্রবাদ বাক্য আছে যে ' মানুষ কেবলমাত্র রুটিতেই বাঁচে না'।আমাদের আরো কিছু চাই । সে চাওয়াটা হচ্ছে সংস্কৃতি, ধর্ম। বাংলায় বা হিন্দিতেও খুব সুন্দর একটা কথা আছে, শব্দ আছে ।সেটা হচ্ছে মানুষ যখন মারা যায় তখন আমরা জিজ্ঞেস করি - 'মাটি চলে এসেছে'?অথবা 'মাটি চলে গেছে শ্মশানে' ?আমরা শরীরটাকে মাটি হিসেবেই গণ্য করি । মাটি থেকেই তৈরি হয় আবার মাটিতেই মিশে যায় । মানুষের কাছে সংস্কৃতি, ধর্ম অনেক বেশি মূল্যবান । অনেক সময় দেখবি বা বেশিরভাগ সময়ই দেখবি আমরা আমাদের শরীর থেকে আমাদের সংস্কৃতিকে নিয়ে বেশি আতঙ্কিত থাকি । আমাদের ভয় হয় যে সংস্কৃতি বা ধর্ম মরে গেলে আমরাও হয়ত মারা যাবো। বা আমাদের স্বতন্ত্র কোন সত্তা থাকবে না । তাই সংস্কৃতির জন্য আমরা আমাদের শরীরটাকেও বিসর্জন দিতে ভয় পায় না ।
ছোটবেলা থেকেই আমি যখন আমাদের মামার বাড়ি কানপুরে যেতাম। তখন মাথায় এ বিষয়টা থাকত যাতে এমন কিছু না করি, না বলি, না ভাবি, না আচরণ করি যাতে বাঙালি তথা পশ্চিমবঙ্গের মানুষের দুর্নাম হয়। কেন না আমাকে দেখেই আমার মামারা পুরো পশ্চিমবঙ্গের ছবিটা দেখতে পাবে অর্থাৎ আমার শরীরটা দেখে নয় আমার সংস্কৃতি দেখে আমার আচরণ দেখে আমার সংস্কার দেখে। অনেক সময় দেখবি তুই যদি কোন কিছু করিস তোকে বলা হয় -এই তুমি কোন বাড়ির ছেলে ? অর্থাৎ সে জানতে চাই তুই কোন সংস্কৃতির ছেলে ।
তুই যদি অন্য কোন রাজ্যে বা অন্য কোন দেশে গিয়ে দাঁড়িয়ে যাস ।নির্বাক ।তবু তোকে তোর পোশাক আশাক দেখে বুঝে যাবে যে তুই বাঙ্গালী। কারণ পোশাক হচ্ছে একটা সংস্কৃতির পরিচয় অথবা মনে কর তোর শরীরে কোনো পোশাক নেই । তুই উলঙ্গ দাঁড়িয়ে আছিস কোন মানুষের কাছে বা অন্য কোন রাজ্যে অথবা অন্য কোন দেশে । সে তোকে অবশ্যই বলবে- আপনি কিছু একটা করুন, কিছু একটা বলুন ,তাহলেই বুঝতে পারবো আপনি কে?অথাৎ শরীরটা দেখে সে কিছুতেই জানতে পারবে না যে তুই কে। যতক্ষণ না তুই কিছু বলছিস, কোন কিছু করছিস । তোকে বোঝার জন্য, জানার জন্য ,তোর সঙ্গে পরিচিত হবার জন্য, তোর সংস্কৃতিকে জানা একান্ত দরকার । তবেই তোকে চেনা যাবে তুই কে?
আমি বাংলায় পড়াশোনা করেছি। আমি বাংলায় কথা বলি। আমি বাংলায় গান গাই । আমার বন্ধুবান্ধব বাঙালি। আমি যে পরিবেশে মানুষ হয়েছি তা সম্পূর্ণরূপে বাঙালির ।আমি যে ফুল, ফল খাই যেখানকার বায়ুতে আমি প্রাণভরে নিঃশ্বাস নিই। যে মাটিতে দাঁড়িয়ে আমি আকাশের তারা গুনি। যেখানকার সবুজে সবুজ আমাকে জড়িয়ে আছে। জড়িয়ে থাকে। যেখানকার মানুষের সংস্পর্শে থেকেই বাংল শিখি, বাংলা কবিতা লিখি। মুক্তস্বর, বদ্ধস্বর বুঝি । বাংলায় গান গাই । আমি চোখ দিয়ে যা কিছু দেখি তা বাংলার সংস্কৃতির, যা শুনি তা বাংলার সংস্কৃতির , যা কিছু স্পর্শ করি তা বাংলার সংস্কৃতির।
যে ভাষায় আমি শুধু জাগরণে নয় ঘুমেও স্বপ্ন দেখি সে ভাষায় আমার মাতৃভাষা।
তাই আমি গর্বের সঙ্গে বলতে পারি এবং বলি বলতে চাই -
আমি বাঙালি। আমার মাতৃভাষা বাংলা ।
*************************************************
গল্প
" স্বাবলম্বী "
অনুরাধা ভট্টাচার্য্য
সেদিন আসন্ন সন্ধ্যায় দেবিকা ব্যারাকপুরের নিজস্ব ছোট্ট বাড়ির উঠোনের ফুলের বাগানে একটা চেয়ারে বসে আশাপূর্না দেবীর লেখা একটা গল্পের বই পড়ছিল । এই আসন্ন সন্ধ্যায় পাখিদের ঘরে ফেরার সময় তাদের কিচিরমিচির আওয়াজে দেবীকার মন এক অজানা আনন্দে ভরে ওঠে । সারাদিনের একাকিত্বটাকে যেন ভুলিয়ে দেয় । সেদিনও পাখিদের ওই কল- কাকলিতে যেন হারিয়ে গিয়েছিল দেবিকা ।বুকের উপর গল্পের বইটা নিয়ে , সামনের বড়ো গাছটায় দলে-দলে ফিরে আসা পাখিদের দেখতে দেখতে আর তাদের কল কাকলির মাঝে হঠাৎ যেন ঘোর ভাঙে --- ফোন বাজল কি? নিজেই নিজেকে প্রশ্ন করে ।তারপর উঠে যায় ঘরের ভেতর । হ্যাঁ , ফোন বাজছে । ঘরে গিয়ে ফোনটা তুলে 'হ্যালো' বলতেই ও পাশ থেকে মিষ্টি সুরে আট বছরের নাতনি দিয়ার অভিযোগ -- ' কখন থেকে ফোন করছি। কোথায় ছিলে তুমি?'
-- আমি তো বাগানে ছিলাম , তাই ফোনটা তুলতে দেরী হ'ল । তুমি কেমন আছো?
-- আমি ভালো আছি ।আগামী মাসে আমার জন্মদিন , তোমার মনে আছে তো?
-- সেটা কি ভুলতে পারি দিদিভাই ?
-- তাহলে আমার জন্মদিনে তুমি আসছ তো?
-- না দিদিভাই , আমার পায়ের ব্যাথাটা বড় বেড়েছে । এই ব্যাথা নিয়ে অতদূরে যাই কি করে?
-- তাহলে আমার জন্মদিনের উপহার টা?
-- রাখা থাকবে । তোমরা যখন আসবে, তখন পেয়ে যাবে ।
-- না, তা হবে না ।দাদাভাইকে ওর জন্মদিনের দিনই ওর পছন্দের মাউথঅর্গান দিয়েছ ।আমাকেও আমার জন্মদিনের দিনই আমার পছন্দের কানের দুলটা দিতে হবে ।
পেছন থেকে কেউ একজন দিয়াকে ডাকল। ফোনে দেবিকার কানে সেই আওয়াজটাও ভেসে এল । ও পাশ থেকে দিয়া ' আমি রাখছি ঠাম্মা' বলে ফোনটা রেখে দিল ।
ব্যারাকপুরের বাড়িতে দেবিকা একাই থাকে ।বছর দুয়েক আগে তার স্বামী মারা গেছেন ।যাবার সময় এই বাড়িটা ছাড়া আর কিছুই রেখে যাননি ।তবে রাজার , মানে দেবিকার স্বামীর একটা এল,আই,সি পলিসি ছিল ।সেখান থেকে যা সামান্য কিছু টাকা পাওয়া গেছে, দেবিকার ছেলে আর্য সেই টাকা দেবিকার নামে ব্যাংকে ফিক্সড করে দেয় ।প্রতি মাসে সেখান থেকে সামান্য ইন্টারেস্ট দেবিকার হাতে আসে ।এছাড়া ছেলে আর্য প্রতি মাসেই মাকে নিয়মিত টাকা পাঠায়। যদিও দেবিকা কোনদিনই কোন প্রয়োজনেই ছেলের কছে টাকা চায়নি ।
আর্য চাকরিসূত্রে স্বপরিবারে পূণায় থাকে । দেবিকা নিজের জায়গা ছেড়ে পূণায় গিয়ে থাকতে রাজি হয়নি ।তাই সে তার একাকিত্বের জন্য কারোকে দায়ী করে না ।অন্যদিকে আর্য প্রতি বছর বাচ্চাদের স্কুলের ছুটিতে অর্থাৎ গরমে ,স্বপরিবারে মা'র কাছে আসে । আর এই গরমেই তার ছেলে রাণার জন্মদিন ।তাই প্রতিবছর নাতির জন্মদিন টা দেবিকা ভালোই উপভোগ করে ।
এ বছর হঠাৎ দেবিকা ,তার অল্প অল্প করে জমানো টাকা থেকে নাতির জন্মদিনে
নাতির পছন্দের একটা উপহার তাকে কিনে দেয় । দাদাভাই এর উপহার দেখে নাতনি দিয়া আব্দার করে তাকেও তার জন্মদিনে তার পছন্দের উপহার ঠাম্মাকে দিতে হবে ।শুধু তাই নয় , পরদিন ঠাম্মাকে নিয়ে বাড়ির পাশেই এক গয়নার দোকানে গিয়ে একটা কানের দুল পছন্দ করে বলে, ' এই দুলটাই আমার জন্মদিনে চাই ।'
নাতির জন্মদিনের দুইমাস পরেই নাতনির জন্মদিন ।এই সামান্য সময়ে সোনার কানের দুল কেনার মত টাকা তো জমেনি । অথচ জন্মদিনে দুলটা পাঠাতেই হবে। নাতনির আব্দার বলে কথা ।কিন্তু কি করবে, কোথায় টাকা পাবে, কিছুই বুঝে উঠতে পারছিল না দেবিকা। তাই পরদিন যখন ছেলে ফোন করে তখন বাধ্য হয়েই ছেলেকে বলে, ' আমায় হাজার দুয়েক টাকা পাঠাতে পারবি?'
আর্য একটু অবাক ই হয় ,সাথে খুশিও ।কারন, এই প্রথম মা তার কাছে মুখ ফুটে কিছু চেয়েছে। তাই খুশি হয়েই বলে , ' নিশ্চয়ই ' ।তারপর কৌতুহলবশতঃ বলে ফেলে , 'কি করবে ?'
'কি করবে ? ' প্রশ্নটা টাকার হিসাব চাইবার জন্য ছিল না ।ছিল নেহাতই কৌতুহল । কিন্তু এই কথাটাই দেবিকার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিল । দেবিকার মনে আঘাত লাগলো । ভাবলো , ছেলের কাছে টাকা চেয়েছি , তাই সে কৈফিয়ৎ চাইল !
কখন কোন কথা কাকে কি ভাবে আঘাত করে তা কেউই বলতে পারে না ।দেবিকা মনস্থির করে নেয় যে , সে আর কোনদিনই ছেলের টাকায় হাত দেবে না । ছেলে যা টাকা পাঠাবে তা অমনিই ব্যাংকে থাকবে ।তার এই সিদ্ধান্তের কথাও সে ছেলেকে জানাবে না।অনেকক্ষণ বসে বসে দেবিকা অনেক কিছু ভাবে । তারপর একসময় উঠে আলমারি খুলে নিজের গয়নার বাক্স বার করে । নিজের পুরানো গয়নাগুলো নাড়াচাড়া করতে করতে একটা গয়না হাতে তুলে নেয় ।গয়নাটা প্রথম বিবাহবার্ষিকীতে তার স্বামী রাজা তাকে উপহার দিয়েছিল ।সেই মূহুর্তগুলো যেন দেবিকার চোখের সামনে প্রজ্বলিত হয়ে উঠল । দেবিকা কিছুটা ইমশোনাল হয়ে পড়ে , পর মূহুর্তেই সে নিজেকে সামলে নিয়ে ওই গয়নাটা বাইরে রেখে বাকি গয়নাগুলো বাক্সে ভরে আলমারিতে তুলে রাখে । এরপর এক মূহুর্তও দেরি না করে গয়নাটা নিয়ে সোনার দোকানে পৌঁছে যায়।পুরানো গয়নার পরিবর্তে দিয়ার পছন্দ করা দুলটা কেনার পরও তার হাতে কিছু টাকা থেকে যায়। দোকানিকে আর্যর ঠিকানাটা দিয়ে দুলটা ওই ঠিকানায় পার্সেল করে দিতে বলে ঘরে ফিরে আসে ।
এবার ? ছেলের টাকা আর সে নেবেনা এটা তো মনস্থির হয়ে গেছে । কিন্তু এরপর তার চলবে কিভাবে ? ব্যাংক থেকে যে সামান্য টাকা ইন্টারেষ্ট - স্বরূপ হাতে আসে , তাতে তো তার মাস চলবে না । তাহলে এখন সে কি করবে ? এই চিন্তায় দিন দুয়েক তার ভালো করে ঘুম হয় না। এক ভয়ানক অস্থিরতার মধ্যে দিন কাটে । তার খুব রাগ হয় নিজের ওপর ।জীবনের মূল্যবান সময়গুলো যে কিভাবে নষ্ট করেছে, সেটা আজ সে উপলব্ধি করতেপারছে।
জীবনের ৬৫ বছর পার করে এসে আজ যেন তার নতুন করে জাগরণ হ'ল---- ' কেন আমি অন্যের উপর নির্ভরশীল? আমি নিজেও তো কিছু করতে পারি । এমন কিছু যাতে সবাই আমার নামেই আমাকে চিনবে । আমার বাবা , স্বামী বা ছেলের নামে নয় ।
কিন্তু কী কাজ করবে সে এই বয়সে ? কোথায় যাবে ? কে তাকে কাজ দেবে ? এই চিন্তায় যখন সে অস্থির, তখন ওপরওয়ালা যেন তার সমস্যার সমাধান করতে পাশের বাড়ির রমলাকে তার কাছে পাঠিয়ে দিলেন।
এর আগেও একবার রমলা দেবিকাকে বলেছিল তার দুই ছেলের পড়াটা যেন দেবিকা দেখিয়ে দেয়.। তখন দেবিকা রাজি হয়নি। এবার রমলার আর্জিটাও জোরদার ছিল , আর দেবিকার ও প্রয়োজন ছিল।রমলা এসে দেবিকাকে বলে , ' দিদি , এবার তুমি আর না বলতে পারবে না।আমার দুই ছেলেকে আমি অন্য কারো কাছে দিয়ে শান্তি পাবো না ।একমাত্র তুমি ছাড়া আর কেউ ওদের সামলাতে পারে না।এতদিন আমি ওদের পড়াশোনা দেখে নিয়েছি , কিন্তু এখন আমি একটা চাকরি পেয়েছি, তাই ওদের পড়াশোনার জন্য ঠিকমতো সময় দিয়ে উঠতে পারবো না । তোমাকে ওদের পড়াশোনার দায়িত্বটা নিতেই হবে।'
দেবিকা যেন হাতে স্বর্গ পেল, সাথে মনে বল - ও। কিছু তো একটা কাজ পাওয়া গেল। এটা নিয়েই এগিয়ে যাওয়া যাবে । এই ভেবে শুরু হ'ল তার নতুন যাত্রা--- রমলার দুই ছেলেকে নিয়ে ।এরপর ধীরে ধীরে কতগুলো বছর পেরিয়ে গেছে তা দেবিকার নিজের ই হিসেব নেই ।
আজ সে ' দেবিকা ম্যাডাম ' নামে পরিচিত ।শুধু তাই নয় , তার সাফল্যে অনুপ্রাণিত হয়ে বেশ কিছু বয়স্কা মহিলা নিজের উপযুক্ত কিছু না কিছু কাজ করে নিজেরা স্বাবলম্বী হতে সফল হয়েছে ।
আজ আর দেবিকার ছেলের প্রতি কোন রাগ বা অভিমান নেই । আজ তার এই সাফল্যের জন্য সে তার ছেলের কাছে কৃতজ্ঞ ।সেদিন ছেলের ' কি করবে ' প্রশ্নটাই আজ তাকে স্বাবলম্বী হতে সাহায্য করেছে ।তাই আজ সে নিজের পরিচয়ে ' দেবিকা ম্যাডাম ' নামে পরিচিত ।
0 মন্তব্যসমূহ