পোস্ট বার দেখা হয়েছে
মহামতি কর্ণ...
নিবেদিতা দে ( জয়া)
পাঞ্চাল দেশে সাজো সাজো রব! যজ্ঞলব্ধ পরমাশ্চর্য দ্রুপদ রাজকন্যা কৃষ্ণার আজ স্বয়ম্বরসভা। চর্তুদিক থেকে তাঁর খ্যাতি দেশ থেকে দেশান্তরে ছড়িয়ে পড়েছে। পাঞ্চাল নগরী তাই পরিনত হয়েছে জন সমুদ্রে। মহামতি কর্ণ স্বয়ম্বর সভায় এসেছেন নিছক কৌতুহলের বসেই, প্রতিযোগিতা করতে আসেন নি।ভেবেছিলেন দুর্যোধন এই পণে বিজয় লাভ করলে বন্ধুপত্নীকে নিয়ে সগৌরবে হস্তিনাপুরে যাত্রা করবেন। স্বয়ং ভগবান শ্রীকৃষ্ণ যেখানে উপস্থিত সেখানে বিধাতা কর্ণের ভাগ্যে অন্য কিছুই লিখে রেখেছেন।রাজন্যবর্গের মধ্যে কেউ লক্ষভেদ তো দূরের কথা ধনু তুলে ধরার সাহস হলো না। অনেকেই ব্যর্থ,এমন কি দূর্যোধনও ব্যর্থ হলেন। বহু সময় ধরে ধৈর্য ও অপেক্ষার পর, দুর্যোধনের যখন কোন আশা নেই, মহাদাতা কর্ণ ধীর মন্থর গতিতে নিঃশব্দে এগিয়ে অনায়াসে ধনু তে গুন আরোপ করলেন। পাঞ্চালীর মুখ যেন বিবর্ণ হয়ে উঠলো। অস্থির হয়ে উঠলেন। ইতস্তত করার কোন অবকাশ নেই দেখে,ভ্রাতা ধৃষ্টদ্যুম্ন ও পিতার কোন অনুমতি না নিয়েই দ্রৌপদী স্পষ্ট ও দৃপ্ত কন্ঠে বলে উঠলেন..."আমি সুতপুত্র কে বিবাহ করবো না। কর্ণ এই পনে বিজয়ী হলে, তাঁকে বরমাল্য দেবার পূর্বে আমি বরং আত্মহত্যা করবো।" মহামতি কর্ণ মৃদু হাসলেন, সেই হাসি বেদনার তিক্ত মধুর হাসি। খুব সাবধানে সন্তর্পণে ধনু নামিয়ে রেখে কর্ণ শান্ত গম্ভীর কন্ঠে বলেলেন ,"কল্যাণী আপনি সুখী হন, সুস্থ থাকুন,আমার জন্য আপনাকে মৃত্যু কেন কোন দুঃখ বরণ করতে হবে না।" আমি নিবৃত্ত হলাম। তারপর অনন্ত আকাশ পানে চেয়ে বিভাবসুকে প্রনাম জানিয়ে নিজের অন্তরের বেদনা মৃদু হাসিতে লুকিয়ে, নিরবে নিজের আসনে এসে বসলেন।
এদিকে শ্রীকৃষ্ণ স্থির,পলকহীন দৃষ্টিতে এই নাটক দেখছিলেন। বহু জিনিস তিনি বহু পূর্বেই অনুমান করে নিতে পারতেন।বহু সম্ভাবনা তাঁর আশ্চর্য সহজাত বুদ্ধিতে কল্পনা করে নেন। আগামী ভবিষ্যতেও তাঁর দৃষ্টি পৌঁছায় অনায়াসেই। তাই কর্ণ যাতে এই প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করেন।এবং তিনিই যে এই একমাত্র যোগ্য পাত্র তা জানিয়ে তাকে আগেই উৎসাহিত করে এসেছিলেন। তিনি বুঝলেন, কর্ণ চিরশত্রু হলেন পাঞ্চালদের। এই কালো গভীর ক্ষতের দাগ কখনই মুছবে না কর্ণের হৃদয় থেকে।
অঙ্গরাজধিপতি কর্ণ মহেন্দ্রদুর্লভ শৌর্যের অধিকারী ও অলোকসাধারণ উদার চরিত্র হওয়া সত্ত্বেও সুতপুত্র বলেই কোন ক্ষেত্রেই যোগ্য মর্যাদা পান নি। ভাগ্যের কি নিদারুণ পরিহাস! কুন্তীরই পুত্র তিনি, পঞ্চপাণ্ডবদের মতো তিনিও দেব অংশে জন্মগ্রহণ করেও পিতৃপরিচয় থেকে বঞ্চিত। তিনি নিজের এই পরিচয় জানলেও.. যিনি জন্মক্ষণেই মাতৃত্যক্ত। সেই শিশুর যিনি জীবন রক্ষা করেছেন, তার পরিচয় ত্যাগ করবেন তেমন প্রকৃতির অকৃতজ্ঞ মানুষ তিনি ছিলেন না।
অথচ এই পরিচয়ের জন্যই স্বয়ম্বর সভায় দ্রৌপদী তাঁকে মর্মান্তিক অপমানে দগ্ধ করলেন। মহামতি কর্ণ ইচ্ছা করলে নিজের দাবি প্রতিষ্ঠা করতে পারতেন কিন্তু সেই প্রবৃত্তি তার হয় নি... কে জানে দৌপ্রদী নিজের এই অন্যায় রূঢ় আচরণে কখনো কোনদিন অনুতপ্ত হয়েছিলেন কিনা..!!
সময় মহাকালের রূপ।একা দ্রৌপদী নন, সময়ের সাথে সাথে মাতা কুন্তী কেও অনুতপ্ত হতে হয়েছিল বৈকি।
আজ যখন যুদ্ধ অবসম্ভাবী তখন চিরদুঃখিনী কুন্তি অতি প্রত্যুষে উঠে যমুনাভিমুখে যাত্রা করলেন। কুন্তী জ্ঞাত ছিলেন,কর্ণ আপন ইষ্ট সুর্যের বন্দনা যখন করেন, তখন তিনি কাউকেই বিমুখ করেন না। এই পূণ্য অবসরের অপেক্ষায় কুন্তী চেয়ে রইলেন দীর্ঘক্ষণ।
সুর্য প্রণাম সেরে কর্ণ অবাক দৃষ্টিতে পঞ্চপাণ্ডবের মাতা দেখেছেন। মাতা কুন্তির ঠোঁট কাঁপলেও মুখ থেকে কোন কথা ফুটলো না। অতিকষ্টে সমস্ত দ্বিধা সংকোচ পরিহার করে বললেন, "আমি তোমার জননী.. তুমি রাধেয় নও, তুমি কৌন্তেয়।আমার অল্প বয়েসের নির্বুদ্ধিতা ও লোকলজ্জার ভয়ে এক মৃৎপাত্রে স্হাপন করে নদীর জলে তোমায় ভাসিয়ে দিয়েছিলাম।" আজ তার প্রায়শ্চিত্ত করতে এলাম। তুমি ধার্মিক ও মহান। আমি তোমার গর্ভধারিণী মা।আমার বাক্য রক্ষা করাই তোমায় প্রধান কর্তব্য।তুমি সিংহাসন গ্রহণ কর।আমার পাঁচ পুত্র তোমায় সানন্দে গ্রহণ করবে। এই আমার প্রার্থনা। কর্ণের মুখভাব দৃঢ় ও কঠিন হয়ে উঠলেও ধীর ও শান্ত ভাবে বললেন, যিনি আমায় অনিবার্য মৃত্যু থেকে রক্ষা করেছেন সেই প্রাণদাতা অধীরথই ধর্মত আমার পিতা।এ আমার নবজন্ম, এর ওপর আপনার কোন দাবি থাকতে পারে না। তবুও আমি কথা দিচ্ছি এই যুদ্ধে আর যাই হোক আপনি অবশ্যই পঞ্চপুত্রের জননী থাকবেন। এই কথার অন্যথা হবে না। সুতরাং আপনি নিশ্চিতে মনে ফিরে যান।
এদিকে দৌপ্রদী পঞ্চস্বামী, তাঁর পুত্র সন্তানের কথা ও আসন্ন রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের কথা ভেবে আকুল হয়ে শ্রীকৃষ্ণের নিকট ছুটে গেলেন। কৃষ্ণ মৃদু হেসে পাঞ্চালীকে সেই দিনের স্বয়ম্বরসভার কথা ইঙ্গিতে বুঝিয়ে ধৈর্য ধরতে আদেশ দিলেন। কৃষ্ণারও সেই দিনের কথা মনে পড়ছে বৈকি। অনুতপ্তও হয়েছেন কতোবার আনমনে। কিন্তু এতদিন পর কর্ণ তা আজও মনে রেখেছেন বলে তিনি যেন আরো ভীষণ রকম ভাবে হতবাক হয়ে গেলেন। তিনি অসাধারণ রূপবতী ও বুদ্ধিমতী হয়েও কর্ণের বাহ্যিক পরিচয়টাই দেখলেন, হৃদয় দিয়ে দেখলেন না।
আজ মহাভারতের চরিত্রে যে কর্ণ কে আমরা দেখি, যার সবকিছু থেকেও কিছুই নেই।
বারংবার ভাগ্য তাকে যে ভাবে বিড়ম্বনা ও বিতাড়িত করেছে। শত গুনে গুণবান ও মহান হয়েও এমনকি রাজবংশের সন্তান হয়েও সারাজীবন ধরে যেভাবে তাকে কষ্ট, যন্ত্রণা,পেতে হয়েছে। মহাবীর যোদ্ধা হয়েও যুদ্ধে নিরস্ত্র অবস্থায় কূটনৈতিক চালে যে ভাবে তাকে অন্যায় ভাবে নিহত করা হয়েছে,তা আজকের সমাজেও একই ঘটনা দেখা যায়। সে পুরুষ হোক কিংবা নারী। "কথায় বলে যা আছে মহাভারতে তাই আছে ভারতে।"শেষ পর্যন্ত সব থেকেও তাকে সব হারাতে হয়। তাই মহাভারতের সব চরিত্রের মধ্যে কর্ণের চরিত্র আমায় সবচেয়ে বেশি টানে।
____________
তথ্যসূত্র _মহাভারত রাজশেখর বসু, ও পাঞ্চজন্য_ গজেন্দ্রকুমার মিত্র
0 মন্তব্যসমূহ