দর্পণ | ধারাবাহিক দৈনিক কলম | উপস্থাপনায় ~ তসলিম পাটোয়ারী




পোস্ট বার দেখা হয়েছে


 

ঠাঁই ।। তসলিম পাটোয়ারী 

-----------------------------------

প্রাচ্য জননী বললেন, যে ফল পেয়েছো পাঁচ ভাইয়ে ভাগ করে খাও। গ্রীনল্যান্ডের এস্কিমোরা একটা মাছ শিকার করলেও বলতো, এসো সবে মিলে খাও। বুঝা যায়, প্রাচ্য ও প্রতীচ্যে সবকিছুতে সবার সমান অধিকার ছিল। কিন্তু কৃষি যুগে এসে সব পাল্টে গেল। গোষ্ঠী মালিকানার উপর প্রতিষ্ঠিত হলো গোষ্ঠীপতির মালিকানা। এলো সামন্তপ্রভু। অস্তিত্ব রক্ষার জন্য কিছু মানুষ সামন্তপ্রভুর পক্ষেই লাঠি ধরলো, উচ্ছিষ্টের আশায়। 


জুলমতও তাই, উচ্ছিষ্টের আশায় নিজেকে বিকিয়ে দেয় শফি তালুকদারের কাছে। সে নাচে তালুকদারের পাছে পাছে, তালুকদারের মাথায় ছাতি ধরে, তালুকদারের পক্ষে লাঠি ধরে। 


হোসেন মৃধাও ভূস্বামী, তবে ক্ষুদ্র। নিজ গ্রামে সে অনেক জমির মালিক। তালুকদার বাড়ির পাশেও ছিল তার এককানির একটা জমি। দীর্ঘ পথ ভেঙে এই জমির তত্ত্ব তালাশ কষ্টকর ছিল মৃধার পক্ষে। ফলে জমিটা পতিতই থাকতো। জমির উপর নজর পড়লো শফি তালুকদারের। তালুকদার মৃধাকে অনুরোধ করলো জমিটা তাকে দিয়ে দিতে। তাহলে তার চাষীদের একটানা লাঙ্গল বাইতে সুবিধা হয়, এক জাতীয় ফসল ফলাতে সুবিধা হয়। কিন্তু মৃধা তালুকদারকে সন্মান দেখালো না, দিল না জমিটা। তালুকদার সে আঘাতে দাঁতে দাঁত খিঁচলো, হা করলো মাৎস্যন্যায়। সে জুলমতকে নিয়ে মৃধার বাড়ি যায়। মৃধা কুলিয়ে উঠতে পারবেনা ভেবে শেষে সন্মত হয়। আসলে মৃধার ভয় ছিল জুলমতের লাঠিকে, কখন সে মাথা দু'ভাগ করে দেয়। 


অস্ত্রকে ভয় পেয়ে আসছে মানুষ। অস্ত্র দিয়ে যুগে যুগে একে অন্যকে, এক গোষ্ঠী অন্য গোষ্ঠীকে পরাভূত করেছে, তৃতীয় বিশ্বে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখল হচ্ছে হরদম। 'পেন ইজ মাইটিয়ার দ্যান দি সোর্ড' ধ্বনি তুলে ইংরেজ লেখক 'এডওয়ার্ড বুলওয়ের লিটন' মসিধারীদের মাথা উঁচু  করেছেন বটে, কিন্তু অসিধারীরা কিংবা এর উপকারভোগীরা তাদের মসিকৃষ্ণ কাম ঠিকই সেরে নিয়েছে। সমষ্টি মানুষকে তারা পদানত করেছে, নিজেদের মাথায় তাজ তুলেছে, উচ্ছিষ্ট বিলিয়েছে নীতি আদর্শ বিবর্জিত সারমেয়কে। 


কিন্তু জুলমত গরিব। সে পেটের দায়ে তালুকদারের উচ্ছিষ্ট পায়, ফল পায়, ফসল পায়, কানাকড়ি পায়, পায় খালের ওপারে তালুকদারের পুকুর সংলগ্ন ছোট্ট ভিটা। এই ভিটা একদিন জুলমতদেরই ছিল। দৈন্যের দায়ে তার বাবা বিক্রি করেছে তালুকদারেরই কাছে। তালুকদার ভিটাটা খালি রাখায় ওদের বসতিও টিকে যায়। মা'র মৃত্যুর পরও জুলমত সেখানে থাকতে পায়। 


কাজীদের নারীরা, কন্যারা পর্দার ভিতরেই থাকে। এ শুধু যেসব কাজীদের ঘরে ভাত আছে তাদের ক্ষেত্রে। তারা স্বামীভক্ত, সংসারভক্ত, পিতৃভক্ত, কুলভক্ত, প্রচলিত প্রথাভক্ত। তারা পর্দা করে, মূক ও বধিরের মতো দিন পার করে। তাদের সুন্দর মুখ, মুখে সুধা বচন। কিন্তু দু'মুঠো অন্ন জোগাড় যাদের কষ্টসাধ্য, তাদের অবস্থান আর্থিক স্তরায়নের একদম নিচে। অভাব তাদেরকে বেপর্দা করে দেয়, বাইরে যেতে বাধ্য করে। তারা গরু ছাগল হাঁসমুরগি পালে, স্বামীকে বাবাকে সাহায্য করে। এসব ঘরের পুরুষরা বড়জোর প্রান্তিক চাষী হয়, নয়তো পাইকাস্ত ক্ষেতমজুর হয়। কাজীদের এমন একটি পাইকাস্ত ঘরের কিশোরী আয়শা। 


লতিয়ে উঠা আয়শাকে জুলমত হয়তো দেখেছে কাজী বাড়ির বাইরে কোথাও। দেখে থৈথৈ করে উঠেছে তার কঠিন মনও। তার চোখে থেকে থেকে উঠেছে ভেসে আয়শা, আয়শা। নিশীথ রাতে সে তড়পায়, আয়শাকে যেন পায় তার ঘরে, তার পাশে। সে হাত বাড়ায়, কিন্তু শূন্য হাত ফিরে আসে। তার বুকের তলা চিনচিন করে উঠে। সে সুযোগ খোঁজে কেমন করে আরবার দেখা মেলবে আয়শার। মনে পড়ে তখনই তার রূপকথার গল্প। কদম ডালে চুপটি করে বসে থেকে রাজকুমারও দেখেছে স্নানরতা ঊর্বশীর উদ্দাম উদাম যৌবন। জুলমত সুযোগ খোঁজে। একদিন ঠিকই তাল গাছের আড়ালে দাঁড়িয়ে চাটে আয়শার অপরূপ রূপ। আয়শা ঘাটে বসে দুনদুলের ছোবড়া দিয়ে ডলছিল তার অঙ্গ। মধ্যাহ্ন আদিত্যের ঝিলিকে চিকচিক করে উঠছিল আয়শা। তার গলার একাদশীর চাঁদরূপ রূপার তাবিজমালা থেকে আলো বিচ্ছুরিত হয়ে এসে পড়ছিল জুলমতের চোখে। জুলমত আয়শাকে পেতে মরিয়া হয়ে উঠে। 


আয়শা বনেদি ঘরের মেয়ে। ওকে পাওয়া সহজ নয়। আলাপ দিয়ে দেখেছে জুলমত। তা ফিরে এসেছে। জুলমত শেষে তালুকদারের হাতে পায়ে ধরে। তালুকদার আয়শার বাবাকে বুঝায়। কাজীরা কানাকানি করে তালুকদারের কাছে আসে। কিন্তু কিচ্ছু করার নেই তালুকদারের। তালুকদার বলে দিয়েছে, পা চাটা কুকুর, ঘ্যাৎ করে মনিবের পায়ও কামড় দিতে পারে। ভালোয় ভালোয় না দিলে জুলমত যদি তাকে তুলে আনে কে নেবে তার দায়। কাজীরা দূরে সরে যায়। একদিন আয়শার বাপ ভাইয়েরা আয়শাকে জুলমতের হাতে তুলে দেয়।


আয়শার রূপ ছিলো, হয়তো আরেকটু ভালো ঘর সে পেতো। কিন্তু কই তাও তো এলো না, গরিব বলে। ভালো ঘর পেলেই কী হতো, সেই তো ভাত রাঁধতেই হতো, স্বামীর তলে শুতে হতো, ছেলেমেয়ে উৎপাদন করতে হতো, উষ্ঠা লাথি খেতে হতো, যা অবলার নসিব। আয়শা নিজেকে বুঝায়, কই, অভাবের সময় তো ফিরেও তাকালোনা কাজীরা। কাজীরা শুধু কথায়ই বড়ো। কিসের বংশ, কিসের কৌলিন্য। দু'মুঠো ভাতই বংশ, দু'মুঠো ভাতই কৌলিন্য। আয়শা পরিণয়  মেনে নেয়। আল্লাহ যে এভাবেই তার জীবন লিখে রেখেছেন। 


আয়শার বুদ্ধিতে শফি তালুকদারের কাছে হাত পাতে জুলমত। সে বাবুরহাট বাজারে তরিতরকারির ব্যবসা ধরে। লোকে মুখ চাওয়াচাওয়ি করে, ভালোই, এবার গ্রাম শান্ত হবে, তালুকদারের শয়তানিও কমবে। তবুও মানুষের কথার কাঁটায় আহত হয় আয়শা। তাকে ছটফট করতে দেখলে জুলমতও ছটফট করে। আয়শা পাশে দাঁড়ায়। বলে, থাক মাইনষের কতা মাইনষের মুহে থাক, আমি তো আছি আমনের লগে। 


জুলমত আয়শাকে আদর করে, ফিসফিস করে বলে, তোর মাথা ছুইয়া কই, তোর কষ্ট অইলে আমারও কষ্ট অয়, তুই ক আয়শা, আমি ছোড জাত! আল্লায় তোরেও বানাইছে আমারেও বানাইছে। জুলমতের দু'ফোটা অশ্রু মিশে যায় আয়শার বুকে। আয়শা আঁচলে মুছে স্বামীর মুখ। আয়শার চাঁদমুখ খানা উঁচিয়ে ধরে জুলমত। সমস্ত আবেগ দিয়ে বলে, তোরে আমি ছোড অইতে দিমুনা কোনোদিন। 


ছোট্ট খোলা দোকানে পিড়িতে বুদ্ধাসনে বসে চোখ বুঁজে আয়শার কথা ভাবে জুলমত। টুকরিতে সাজানো আনাজপাতি সবই আয়শার হাত পা কান গলা। আয়শাকে রূপার জিনিস নিজে যা পেরেছিল দিয়েছিল আর গোপনে দিয়েছিল আয়শার দরদী বাবা মা। কিন্তু সবই আয়শা খুলে দিয়েছে স্বামীর হাতে, ব্যবসা বাড়াতে। তাই জুলমতের সজল চোখ। সে জানে বনেদি ঘরের বউঝিদের ঠাসা অলংকার থাকে, গরিবের বউঝিদেরও কমবেশি থাকে, কিন্তু আয়শার কিছুই থাকলোনা। আয়শার কাঁচা হলুদ রং ফুটিয়ে তোলে এমন সুন্দর বসনও জুলমত দিতে পারেনি কোনদিন। মোটা কাপড়ে মোড়া থাকে আয়শার তপ্তকাঞ্চন বরন দেহ। এক ফোঁটা তেলের ছোঁয়া না পেয়ে মেঘকালো চুলগুলো যেন কচুরিপানার শুঁকনো মূল। বিদ্রোহ জানাতে ভেসে উঠেছে মুখের চোয়ালগুলো। সাধ ছিলো জুলমতের তেল কেনার, সাবান কেনার। কিন্তু নুন আনতেই পান্তা ফুরায়। ওরা কোনো বেলা অর্ধাহার করে কোনো বেলা উপোস করে। 


হাটে বাহার আলী আর ফাজিল খলিফাই ছিলো আনাজ তরকারীর পুরনো বিক্রেতা। ফাজিল খলিফা অতিশয় বৃদ্ধ হলে ছেলেরা তাকে বাড়ি নিয়ে যায়। তারপর জীবন যুদ্ধে আসে অনেক নবীন। হাটে মানুষও বাড়তে থাকে। এখন সবজিপট্টির গলিটা দু'পাশের বিক্রেতাদের ঠাসাঠাসিতে সংকীর্ণ। ক্রেতারাই হাঁটতে পারেনা। 


হাটবারে বিকিকিনি বেশি হবে, আশায় থাকে জুলমতরা। কিন্তু হাটবার এলে গৃহস্থরা তাদের উৎপাদিত শাক সব্জি তরিতরকারী নিয়ে আসে। মানুষ তরতাজা জিনিস কিনে আগে, ফলে বেপারির বেচাবিক্রি হয় কম। জুলমত আর বাহার আলীরও কম হয়। তারা বসে বসে বিড়ি টানে। জুলমত অর্ধেক টানে, বাহার আলী বাকী অর্ধেক টানে। দু'হাটুর মাঝখানে চিবুক রেখে তিনমাথা এক করে তারা ভাবে বাঁচার উপায় কী।  


বাহার আলী দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে। দূর দিগন্তে চোখ রেখে বলে, ইচ্ছা আছিল পোলাডারে পড়ামু। সফরমালী হাই স্কুলে দিলামও। পারলাম না ভাই। পড়ালেহার খরচ কম না। বেতন, বইখাতা, জামা কাপড়, মেলা খরচ। পোলাডায় খুব কানলো। অর মাথা আছিল। শেষে দিলাম খা বাড়ির কামে। মফজল খার বাড়িডা দেখছেননা, কী সুন্দর সাজাইছে আমার পুতে। বুঝলেন ভাই, পোলাপাইন পড়ানো আমাগো কাম না। এক যদি সরকার বেবাকরে পড়ায় তয় যদি অরা পড়তে পারে। নইলে জমিদার তালুকদারগো পোলাপাইনই পড়বো, তাগো পয়সা আছে। জুলমতের রক্ত টগবগ করে। জমিদার জোতদারের কথা উঠলেই তাদের মাথা গুঁড়িয়ে দিতে ইচ্ছা করে তার। অন্যের মাথায় বাড়ি দিয়ে তবেই তারা জমিদার তালুকদার। সেই সব নোংরা অর্জন নিয়েই যতো তর্জন গর্জন তাদের ওয়ারিশদের। 


কিন্তু জুলমত এখন দূর্বল। একে একে তার দু'টি ছেলে আতুড়ঘরেই মারা যায়। মানুষ তাকে নিন্দে, বলে জুলুমকারীকে উপরওয়ালা ছেলেমেয়ে দেননা। আয়শা কেঁদেকেটে বলে, এইবার একটু আল্লা বিল্লা করেন, নমাজ রোজা করেন। জুলমত লজ্জা পায়। ছোট কাল থেকে ধর্মের সাথে তার যোগাযোগ নেই। আয়শা ধৈর্যের সাথে স্বামীকে নামাজ রোজা শিখায়। জুলমত মসজিদে যায়, জামাতে নামাজ পড়ে, নামাজ শেষে ইমাম সাহেবের সাথে বসে, আরো ধর্ম কর্ম শিখে। আয়শা ও জুলমত অবশেষে কুলসুম ও নুরুকে পায়। 


জুলমতের ব্যবসা খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে পনের বৎসর। এদিকে উদ্ভিন্নযৌবনা হয়ে উঠে কুলসুম। পুকুর পাড়ে ছাড়াবাড়িতে লম্পট ছেলেদের উঁকিঝুঁকি বাড়ে। আয়শা স্বামীকে বলে, মাইয়্যা সোমত্ত অইছে, বেবস্তা করেন। রফি তালুকদারের কাছে মানুষ অভিযোগ করে, পুকুর পাড়ে নষ্টামি হয়। তালুকদার একদিন স্বচক্ষে দেখতে আসে। কিন্তু কুলসুমকে দেখে সে আঁতকে উঠে, ভাঙা ঘরে এমন রাঙা আলো! 


জুলমতও আত্মজাকে দেখে শিউরে উঠে। আয়শার সব পেয়েছে সে। সর্বাঙ্গসুন্দরী, সর্বগুণসম্পন্না। কিন্তু অযথা বদনাম রাষ্ট্র হলে তখন ভালো ছেলেও এগিয়ে আসবেনা। মেয়ের চিন্তায় মশগুল জুলমত। তার ঘাম ঝরে দরদর। আয়শা সুপারির খোল পাখায় বাতাস দিয়েও সে ঘাম মজাতে পারে না। মেয়ে পাত্রস্থ করতেও এখন টাকা লাগে। মেয়ে সুন্দরী হলেও ছেলেপক্ষ দাবি ছাড়েনা। পাঁচ সাত দশ হাজার টাকা লাগেই। থাকে রেডিও, ক্যাসেট প্লেয়ার, সাইকেলের দাবী, মেয়ে সাজানো, মেহমান খাওয়ানো। এতো টাকা জুলমত পাবে কোথায়! 


জুলমতের মতো অসংখ্য বাবা মা কন্যাদায়গ্রস্ত। আয়শা রাতের অন্ধকারে ভাইজানদের কাছে যায়। গরিব ভাইজানরা তাকে ফিরিয়ে দেয়। শীর্ণ অবসন্ন দেহে জুলমত রফি তালুকদারের কাছেই যায়। তালুকদার ভরসা দেয়। বলে, পাত্র ঠিক করো চাচা, পুকুরের মাছ বেচলে ব্যবস্থা একটা অইবোই। 


জুলমতের সামনে দিয়েই পুকুরের একদফা মাছ বিক্রি হয়। জুলমত আশায় বুক বাঁধে। সে মালিকের কাছে যায়। হুজুর বলে ডাকে। রফি তালুকদার মাথা তুলে তাকায়। হাসে মিটমিট। বলে, এক কাজ করো চাচা, কুলসুমরে আমাগো আকিল মিয়ার লগেই বিয়া দিয়া দেও। তোমার খরচ বরচ লাগবোনা, আমিই দেখুম। কাছারি ঘরের লগে দিয়া তাগরে ঘর বানাইয়া দিমু। 


জুলমতের পায়ের তলার মাটি সরে যায়। নিজের কানকে সে বিশ্বাস করতে পারেনা। রফি তালুকদারের গোলাম ঐ মাইঝ বয়সী আকিল্যা! মাইনষে তারে খোঁজা কয় মল্লিক কয়। ওর কাছে কেমনে কুলসুম পাইব তার পবিত্র যৌবনের মর্যাদা, মা অওনের গৌরব। রফির কালো কুৎসিত থাবা বুঝতে পারে জুলমত। মাঝবয়েসী বিধবা হরিসুন্দরী রফিকে চড় দিয়েছিল সে গুজব এখন সত্যি মনে হয় তার। জুলমতের চোখে ভেসে উঠে শফি তালুকদারের সেই খাস কামরা। ছেলের আমলেও কী তবে সেই কামরায় নিশীথ রাতে বেজে উঠে নূপুরের নিক্কণ, হাত-পা ছুঁড়ে গোঙায় অসহায় মেয়েরা! জুলমতের রক্তে লাগে প্রলয় দোলা। সে চিৎকার করে উঠে, না এইডা অয় না। 


রফি তালুকদার ঠোঁট কামড়ায়, তার চোখে আগুন। হাতের তালুতে ঘষে ঘষে সে নখ শাণিত করে, জাগায় ন্যাকড়ের থাবা, ছিন্নভিন্ন করে দিতে চায় জুলমতের টুপিওয়ালা মাথাটা। কিন্তু রফি চোখ বুঁজে, শ্বাসের পর শ্বাস ছেড়ে নিজেকে দমায় কোনোমতে, চোখ খুলে বলে, কুলসুমই সুখে থাকতো চাচা। জুলমত রফির চোখে লোলুপতা লাম্পট্য দেখতে পায়। সে কুলসুমের বিপদ গোনে। ঘরে ফিরে আয়শাকে জড়িয়ে ধরে। আয়শা থরথর করে কেঁপে কয়, অহনই গিয়া বাহার ভাইয়ের লগে আলাপ করেন, আমাগো আর আপনজন কই। 


বাহার আলী বলে, জুলমত ভাই হানক হাপের লেজে পা দিছেন, ছোবল মারবই, অহন কী করবেন তয়। জুলমত বাহার আলীর হাত ধরে কেঁদে কয়, আমার মাইয়্যাডারে বাচান ভাই। বাহার আলী দাড়ি মুঠ করে আর ছাড়ে, চুল মুঠ করে আর ছাড়ে। হঠাৎ বলে উঠে, আমার পোলাডারে আমনেগো পছন্দ অয়? যান বাইত গিয়া মাইয়্যার মা'র লগে কতা কন। যদি খাডে তয় কাকপক্ষীও যেন না জানে। হুমকের সপ্তায় বাদ জুম্মা কাম সাইরা ফালামু। 


কুলসুম শশুরবাড়ি চলে গেছে সে কথা প্রকাশ পায়। সেই সাথে প্রকাশ পায় জুলমতকেও ভিটা ছাড়া করার কথা। দু'দিন পরেই রফি তালুকদারের লোকেরা চড়াও হয় জুলমতের উপর। তারা জুলমতের ঘরের পাটখড়ির বেড়া কেটে ফেলে। ঠেলে গুড়িয়ে দেয় ছনের চালা। ঘরে আগুন দিতে গেলে মুহূর্তে সাই সাই করে উঠে জুলমতের লাঠি। হায়দরী হাঁক হাঁকে জুলমত। পুকুরের রুই কাতলা জলে দুন্দুভি বাজায় লেজ ঝাপটিয়ে। জুলমত ঝাপিয়ে পড়ে তালুকদার বাহিনীর উপর। কিন্তু নখদন্তহীন বৃদ্ধ জুলমত। তার ঘুণেধরা লাঠিখানি পলকেই ভেঙ্গে গুড়িয়ে যায়। তার গায়ে পড়তে থাকে অবিরাম লাঠি। তাকে জড়িয়ে ধরে আয়শা ও নুরু। ফিনকি দিয়ে রক্ত ছুটে জুলমতের, আয়শার, নুরুর। খোদার আরশে তাদের আর্তচিৎকার পৌঁছলে গায়ের মানুষ এসে জড়ো হয়। 


বাহার আলীও আসে। সে জুলমতের বাহাত খানি নিজের কাঁধের উপর চাপিয়ে দিয়ে বলে, ভাই চলেন, আমাগো ভিটায় অনেক জায়গা আছে। একটা লাডি দিয়া কিচ্ছু অয় না। লাডি ধরলে বেকে মিল্যা ধরন লাগে। 


জুলমত উপরের দিকে তাকায়, বিড়বিড় করে বলে, দাগ দিয়া, খতিয়ান দিয়া তোমার সব জাগা অগরেই বুজাইয়া দিলা খোদা, আমার ঠাঁই কই।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ