পোস্ট বার দেখা হয়েছে
অভিশপ্ত মহল
মেখলা ঘোষদস্তিদার
বনচম্পাপুর গ্রামের শেষ প্রান্তে ঘন জঙ্গলে ঢাকা সুউচ্চ রাজমহল,অভিক এক দালাল মারফত এই মহলটি ভাড়া নিয়েছে কর্মসূত্রে,
কোলাহল থেকে দূরে নিরালা নির্জনে এই মহলটি দেখেই অভিকের ভালো লেগে গেছে, অভিক দেরি না করে রাজমহলে থাকার দিনটি ঠিকই করে ফেললো, সাদা মার্বেলের উপর লাল কার্পেট,এ্যান্টিক আসবাবে ঘরগুলো সাজানো গোছানো, প্রবেশ দ্বার থেকে গভীর জঙ্গল পেরিয়ে মহলের সদর দরজা,জনমানবহীন এই মহলটি থেকে চার পাঁচ কিলোমিটার কোনো জনবসতি নেই,,,,,, শুধু আছে নিশিপক্ষীর ডানা ঝাপটানো,,,,,অদ্ভুত স্বর,,
অভিক আসছে জেনে রান্নার ঠাকুর হরিচাচা রান্না করে রেখে গেছে,,,,ফ্লাক্সে গরম কফি,,,,রুটি চিকেন,,
অভিক পৌঁছে ফ্রেশ হয়ে এক কাপ কফি নিয়ে চুমুক দিতে দিতে ব্যালকনিতে এসে দাঁড়ালো,,,,,শীতকাল,,,,অমানিশার ঘোর বিদঘুটে অন্ধকার,,,,উত্তুরে হাওয়ার দাপট,,,,চারদিক থমথম করছে,,,,,
অভিকের যেন মনে হলো তার পাশ ঘেঁষে একটা ছায়া সরে গেলো,,,,সে ঠিক বুঝে উঠতে পারলো না,,মনে খটকা লগলো বটে কিন্তু ভ্রূক্ষেপ না করে ঘরে ঢুকে গেলো,,
সারাদিনের ক্লান্তিতে অভিকের শরীর আর সায় দিচ্ছে না সে ভাবলো একটু গড়িয়ে নেবে,
বিছানায় গা এলিয়ে দিলো,,,,,
দুচোখের পাতা বন্ধ করতেই অভিক অনুভব করলো বিছানার সোজাসুজি জানালা দিয়ে দুটো লম্বা হাত তার গলার কাছে এসে থমকে আছে,,,,হাত ভরতি সোনার গয়না,,,,
ঘুমের মধ্যেই অভিক গোঙাতে লাগলো,,,,,তারপর সেই অবস্থাতেই কোনোরকমে চোখ মেলতেই দেখে কেউ কোত্থাও নেই,,,,,,ও ভাবলো নিশ্চয়ই কোনো দুঃস্বপ্ন ছিলো,,ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখে রাত দশটা,,
অভিকের ডিনার করার ইচ্ছেটাই চলে গেলো,,,,সাত পাঁচ ভাবতে ভাবতে গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে,,ও বোতলের জল প্রাণভরে খেতে লাগলো,,,,কিছুটা খাওয়ার পর দেখলো ওর গায়ের গেঞ্জিটা টকটকে লাল হয়ে যাচ্ছে আর ঠোঁটের দুপাশ দিয়ে জল না রক্ত গড়িয়ে পড়ছে,,,,,অভিক দেখে তো একেবারে তাজ্জব,,,,,
সাহস নিয়ে বোতলটা রেখে গেঞ্জিটা খুলে পাশে যেই রাখতে যাবে দেখে গেঞ্জি থেকে লাল রঙ উধাও,,,,,,
গা ছমছমে পরিবেশ,অভিক রামনাম জপ করতে করতে গায়ে চাদরটা টেনে শুয়ে পড়লো,,
রাত প্রায় অনেক হয়েছে অভিকের কানে ভেসে এলো নারী কণ্ঠ, ফ্যাসফ্যাসে গলায় বলছে " এসো, এসো কাছে আরো আরো কাছে,এসো এসো বলছি ",
অভিক ভাবলো উঠে দেখবে,,,,তারপর আবার ভাবলো না ও কুণ্ডলী পাকিয়ে শুয়েই থাকবে আর রামনাম জপ করবে,,,,,এইভাবে কতোক্ষণ গেছে অভিক টের পাইনি,,,,,
ঘুম ভাঙলো কলিং বেলের আওয়াজে,,,ততক্ষণে ভোর হয়ে গেছে,,,,অভিক উঠে দরজা খুলে দিলো,,,,হরিচাচা এসেছে রান্না করতে,,
কুয়াশাচ্ছন্ন গোটা মহল,আকাশের মুখ ভার,,,একটা গুমোট পরিবেশ,,,আর খানিক্ষন পরেই বিলাস আসবে অভিকের বন্ধু,,,,,,,, জাঁকিয়ে শীতও পড়েছে,,,,,হাড় হিম করা,ঠাণ্ডা হাওয়া বইছে,,,,হরিচাচা রান্না সেরে চলে গেছে আবার সন্ধ্যা বেলায় আসবে,,,
স্নান সেরে অভিক অপেক্ষা করতে লাগলো বিলাসের জন্য,,,,,, ঠিক আড়াইটে নাগাদ বিলাস আগমন ঘটলো রাজমহলে,,বিলাস ফ্রেশ হয়ে লান্ছ সেরে ফেললো,,,তারপর দু'জনেই একটু বিশ্রাম নিয়ে নিলো,,,
সন্ধ্যা সাতটা নাগাদ কলিং বেল বাজতেই বিলাস গিয়ে দরজা খুলে দিলো,,কিন্তু কাউকে দেখতে পেলোনা দরজা বন্ধ করে দিলো,,আবার কলিং বেল বেজে উঠলো,,,বিলাস দরজা খুলে এবারও করোকে দেখতে না পেয়ে দরজা পেরিয়ে আরো একটু সামনের দিকে এগিয়ে গেলো,,,
বৃষ্টির ঝমঝম শব্দ,,,, ঝোড়ো হাওয়া এলোপাথাড়ি, বাজ বিজলির খেলা চলছে,,,সেই আলোতে বিলাস দেখলো এক মহিলা গা ভরতি গয়না পড়ে গাছের তলায় দাঁড়িয়ে আছে জড়োসড়ো হয়ে,,,,,
বিলাস কাছে গিয়ে কিছু জিজ্ঞেস করার আগেই ঐ মহিলা দুটো হাত দিয়ে গলা চেপে ধরলো,,,,,
ওদিকে বিলাসকে না দেখে অভিক ভাবলো নিশ্চয়ই ও বৃষ্টি আর শীত উপভোগ করছে বারান্দায় গিয়ে,,,,,,অভিক দেখলো দরজা খোলা তাহলে সে একেবারে ঠিক অনুমানই করেছে,,,,,
অভিক বিলাসকে ডাকতে ডাকতে বাইরে বেড়িয়ে এলো দেখলো কেউ নেই,,,,,ফিরে ঘরে ঢুকতে যাবে এমন সময় বিদ্যুৎ - এর আলোয় অভিক যা দেখলো তাতে একেবারে থ হয়ে গেলো,,,,,,,
গা ভরতি গয়না পড়া এক মহিলা মূলোর মতো দাঁত বের করে বিলাসের ঘাড়ের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে আর হাত দুটো দিয়ে বিলাসের গলা চেপে আছে,,,,বিলাস প্রাণপণে নিজেকে রক্ষা করার চেষ্টা করছে,,,,,,
অভিকের বুঝতে আর দেরি হলোনা,,,সে সঙ্গে সঙ্গে গলায় ঝোলানো মাকালির লকেট নিয়ে ছুটে গিয়ে ঐ মহিলার মুখের সামনে তুলে ধরলো অন্য হাত দিয়ে মোবাইলের টর্চ ফেললো ওর মুখের উপর ওমা নিমেষে উধাও,,,,,,,
ঠিক সেই সময় ছাতা মাথায় হন্তদন্ত হয়ে হরিচাচা এসে হাজির হলো সেখানে,,,,,,,
হরিচাচা সব দেখেশুনে বললে পালান পালান দাদাবাবু পালান,,,,,এখানে আর এক মুহূর্তও দেরি করা যাবেনা,,,চলুন আমার সঙ্গে আমার বাড়িতে,,,,,,
ঊর্ধ্বেশ্বাসে ছুটতে লাগলো ওরা,,,,,,তারপর কখন হরিচাচার বাড়িতে পৌছলো,,,,,দীর্ঘ রাতে কি ঘটলো,,কিভাবে কাটালো কিচ্ছু ওদের আর মনে নেই ,,,
ভোর হতেই অভিক দেখলো টিনের ছাউনি দেওয়া এক মাটির বারান্দায় ওরা শুয়ে আছে,,,,,ওদের ঘিরে আছে গ্রামের লোকজন,,,,,
অভিক হরিচাচাকে ডাকতে লাগলো,ভীড়ের মধ্যে থেকে একজন বলে উঠলো হরিচাচা সে তো কবেই মরে ভূত হয়ে গেছে,,,,,,তা আপনারা কে,,,এইখানে এই অবস্থায়,,,,,
অভিকের মুখে সব ঘটনা শোনার পর গ্রামের লোকেরা বললো রাজমহল একটা অভিশপ্ত প্রাসাদ,,,,ঐ মহলের মালিক আজ থেকে প্রায় দশ বছর আগে স্ত্রী কে খুন করে পালিয়ে গেছে,,,,,,,তারপর থেকে ঐ মহলে অতৃপ্ত আত্মার আনাগোনা,,,,,,,নানারকম বিশ্রী শব্দ কথা ভেসে আসে,,,,,ঐ মহলের ত্রি সীমানা কেউ মাড়ায় না,,,,,,,,যারা যায় তারা আর ফিরে আসেনা,,,,,,
আর হরিচাচা ঐ মহলের রান্নারঠাকুর ছিলেন,,,,,হরিচাচার মৃত্যুর কারণ আজো আমরা জানতে পারেনি,,,,,,
আপনাদের ভাগ্য ভালো ঐ হরিচাচার জন্যই আজ আপনারা প্রাণে বেঁচে গেছেন।
।। কবিতা ।।
জয় ভূতচতুর্দশী
মেখলা ঘোষদস্তিদার
ভূতেদের কথোপকথন
----------------
চোদ্দ প্রদীপ আলোর শেজে,
ছন্দে কথা যায় যে বেজে,
------------------------------------
চোদ্দ ভূত,,,,,( মামদো,হোঁৎকা, কোঁতকা, ঘোঁতকা,চ্যাঙ,ফিরিঙ্গি, মুরুব্বী, বিজলি,নোক্কী,ভূতি, পুতনি, বেঁকা,শোকু,সুঁটকো),,,,,,,একজন বেশি ভূত ঢেঙা,,,,
ঢেঙা,,,,, চতুর্দশী ভূত দিবসে
জ্বলবে বাতি চোদ্দটি যে,
চোদ্দভূতের সাথে আমি
যাবো ঠিকই আলোর শেজে,,,,,
মামদো,,,,, কে চেল্লায় রে,,,,কে? এ গলাতো অচেনা,,আগে তো শুনিনি,,, এডা আবার কেডা রে,ওই হোঁৎকা, কই কোঁতকা, কই গেলি সব ছানাপোনা, এদিকে আয়রে বেলা যায়রে,,,
হোঁৎকা,,,,,,,, কি বলছো বুড়ো বাবা
কও দেখি একবার,
তারপর দেখে নিও
দেবো জোরে বিষমার,
মামদো,,,,, ঐ দ্যাখ্ গলা শুনি
ওডা কেরে কেরে,
নাকি সুরে গান ধরে
ওই তো পাকা বেড়ে,
হোঁৎকা,,,,,,,, বুড়োবাবা ভেবোনা
দেখাচ্ছি মজা ওকে,
ওই তোর নাম কিরে
ওরে বাবা বিড়ি ফোঁকে,
ঢেঙা নাম বেশ বেশ
নেমে আয় শেষমেশ,
ঢেঙা,,,,,,,, পিটিয়ে মেরেছে ওরা
পুঁতে দিয়ে মাটিতে,
মা কাঁদে দুবেলা
খোঁজে ফেরে বাটিতে,
মামদো,,,,,, আহা আহা সত্যি তো
কীযে ব্যথা হায়রে,
প্রতিশোধ নিতে হবে
ওরে বুকে আয়রে,
ঠিক আছে তুই যাবি
হোঁৎকা শুনেছিস
মিলেমিশে মুখ দেখে
আলোতে তাপ নিস,,
ঢেঙা,,,,,, নাগো না বুড়োবাবা
অন্যায় সয়েছি,
আগে হবে প্রতিকার
আলো তাপ তারপর,
নাহলে মিছে সব
সত্যের কলরব,,
মামদো,,,, ঠিক আছে দেখে নিস
তোর কথা ফলবেই,
চোদ্দ প্রদীপ শিখায়
আগুনে সে জ্বলবেই,,
কোঁতকা,,,,, চল্ ভাই ঢেঙারে
আর নেই চিন্তা,
নাকি সুরে না কেঁদে
নাচ তুই ধিনতা,,
মামদো,,,,,, ঝুরি বাতি,তারা রঙ
মশালটা এনেছিস,
চল্ সব জলদি
বোমগুলো রেখেছিস,,
ঘোঁতকা,,,,, হাঁ হাঁ বুড়ো বাবা
আছে সব ঠিক ঠাক,
চোদ্দ বাতির আলোয়
কাজ হবে ঝিঁকঝাঁক,
ঢেঙা,,,,, গড় করি বুড়োবাবা
তোমার চরণে,
মর্ত্যের লোকগুলো
কী ভীষণ দংশনে,,
মামদো,,,,, আজ দিন আমাদের
ওরা ভয়ে কাঁপবে,
শয়তান,বদ তারা
প্রতিপদে হারবে,,
সবাই ( একসঙ্গে চিৎকার করে),,,,
ঠিক ঠিক বুড়োবাবা
ওদের দিন শেষ,
খুনোখুনিটা, রেষারেষি
থেমে যাবে বিদ্বেষ,
জালিয়াতি, রাহাজানি
লুটপাট, উৎপাত
নিরীহ মানুষ সব
বলি হয় দিনরাত,
ঢেঙা ভাই মনমতো
জবাই করবি
মটকিয়ে ঘাড়গুলো
হিসেব ভরবি,
মায়ের কষ্ট শত
কিছুটাতো মিটবে
নিষ্পাপ বেচারারা
অবশেষে জিতবে,
কপিলার কার্নিশে
আলোকিত মিছিলে
হেঁ হেঁ হেঁ চোখে চোখ
হাসবো সবে মিলে,
প্রদীপের আলো তাপে
পাপীরা মরবে
সত্যের জয়গানে
তোর মন ভরবে।।
0 মন্তব্যসমূহ